আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে প্রতিকূলতা

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • মেহেরুননেছা

মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা সাপেক্ষে দেখা যায় যে, নারী ছিল উৎপাদনের ধারক। উৎপাদন, আয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালিত হতো গোষ্ঠী বা গোত্র প্রধান নারী দ্বারা। তখন পুরুষরা নারীর সহযোগী হিসেবে কাজ করত। সভ্যতার প্রথম ধাপ আগুনের আবিষ্কারের পর মানুষ রান্না করে খেতে শিখল। সন্তান ধারণ, লালন-পালনের দায়িত্বটি প্রকৃতিগত কারণে নারীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি মৌলিক কর্মকা- হওয়ায় ধীরে ধীরে তাদের কর্ম বলয়ে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। শুধুমাত্র সন্তান ধারণ ও লালন-পালনের দোহাই দিয়ে নারীকে গৃহবন্দী করা হয়েছে বটে, কিন্তু একজন নারী আদি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত উদয়াস্ত যেসব কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেগুলোকে অনুৎপাদনশীল কাজ হিসেবে বিবেচনা করার অধিকার কতটুকু আমাদের? প্রতিদিন একজন নারী যে কাজ করে, সে সবের আর্থিক মূল্য হিসাব করলে একজন গৃহবধূর মাসিক বেতন কত, তা সহজেই অনুমেয়। কোন গৃহবধূর স্বামীকে, ‘আপনার স্ত্রী কি করেন’Ñ এ মর্মে প্রশ্ন করা হলে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে উত্তর আসে, কিছু করে নাÑ হাউসওয়াইফ। বছরে দু’চার সেট জামা-কাপড় আর দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে এই হাউসওয়াইফটি যদি ওই স্বামীর ঘরে অদৃশ্যে মূল্যসংযোজন না করত, তাহলে ওই ভদ্রলোক স্বামীর পরিবারের পরিণতি কি দাঁড়াত, ভেবে দেখার বিষয়।

স্বাধীনতাকামী মানুষের মূল সেøাগান ছিল, সমাজের সব মানুষের সমান অধিকার। এদেশের সব মানুষ যেন খেয়ে পরে সুষ্ঠুভাবে দিন যাপন করতে পারে। স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও মানুষ তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি। কারণ যেখানে শ্রেণীবৈষম্য প্রতিনিয়ত সমাজের, সভ্যতার গায়ে কালিমালেপন করছে, সেখানে আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রতিনিয়ত মুখ থুবড়ে পড়ছে। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বা প্রান্তিক মানুষ। নারীরা পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ শ্রমঘণ্টা ব্যয় করেও পুরুষের সমান সুবিধা ভোগ করতে পারে না। পারিবারিক ক্ষেত্রে বাধা, শিক্ষায় বাধা, ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার, কর্মক্ষেত্রে নারী হয়রানি, পরিবহনের সুযোগ-সুবিধার অভাব, ভূ-সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের অভাব, বাল্য বিবাহ, আবাসন সুবিধার অভাব, সামাজিক ও আইনগত নিরাপত্তার অভাব, ফতোয়া-প্রতিদিন এসব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে নারীকে টিকে থাকতে হয়। এ যেন শরীরের একটি পা-বিহীন খুঁড়িয়ে চলা মানুষের মতো আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো নারীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে ক্র্যাচে ভর করে।

স্বনির্ভরতা বা ক্ষমতায়নের প্রশ্নে নারীর জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রধান ধাপ হলো, কর্ম উপযোগী সামর্থ্যসম্পন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা অবৈতনিকীকরণ করার পরও নারী শিক্ষার হার পুরুষের তুলনায় ১০০:৬০। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পরিবার।

পরিবার এবং সমাজ আঙ্গুল শাসিয়ে বলে নারীর জন্য ধর্ম শিক্ষাই যথেষ্ট। বেশি বিদ্যান নারী দিয়ে কী হবে । দ্বিতীয় বাধা হিসেবে কাজ করে পাড়ার বখাটেদের উৎপাত, ইভটিজিং এবং সর্বশেষ ধাপ ধর্ষণ ও হত্যায় গিয়ে সমাপ্তি ঘটে। শিক্ষাক্ষেত্রেও নারী নিরাপদ নয়। মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলে শিশু ধর্ষণ, ভিকারুননিসায় পরিমলদের হাতে ছাত্রী ধর্ষণ, এরূপ আরও অসংখ্য ধর্ষণ-সংস্কৃতির আবর্তে আবর্তিত হচ্ছে আমাদের নারী শিক্ষা ক্ষেত্রগুলো। যেগুলোর ৯০ শতাংশই অপ্রকাশিত থেকে যায়। ক্রমাগত বিচারহীনতা, জৈবিক তাড়না, নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় উস্কানি, রাস্তাঘাটে নারীর ওপর থুতু নিক্ষেপ, নৈতিক শিক্ষার অভাব ও বিশ্বব্যাপী পর্নোগ্রাফির বিস্তার এর অন্যতম কারণ। নারী শিক্ষার আরেকটি প্রধান বাধা বাল্য বিবাহ। মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার জন্য শতকরা ৯০ ভাগ অভিভাবক নানা রকম ফন্দিফিকির বের করে। এফিডেভিট করে বয়স বাড়িয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮। সরকার যেখানে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করেছে সেখানে বিয়ের বয়স না বাড়িয়ে কমানোর চেষ্টা কি একটি স্ববিরোধী পদক্ষেপ নয়! অন্যান্য মৌলিক অধিকারের মতো শিক্ষার অধিকারও নারীর সাংবিধানিক অধিকার।

সংবিধানে নারী-পুরুষ শ্রেণীভেদ না করে সমঅধিকারের কথা বলা সত্ত্বেও আমাদের দেশে প্রচলিত পারিবারিক আইনগুলো নারীদের বিপক্ষে খড়গ তুলছে যেন। এদেশের নারী সম্প্রদায় যেখানে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, সেখানে নারীর ক্ষমতায়ন প্রশ্নটির সম্মুখে বিরাট বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে নারীর দারিদ্র্য। বর্তমান সরকার নারী উদ্যোক্তা গড়ে তোলার জন্য ‘একটি বাড়ি একটি খামার’, ‘স্বপ্ন’ প্রকল্প নামে অনেক প্রণোদনামূলক নারী উন্নয়নবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারী উদ্যোক্তা গড়ে তোলার জন্য ভূসম্পত্তিতে নারীর অধিকারের বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে হবে। একজন নারী যখন একটি খামারের প্রকল্প গ্রহণের জন্য উদ্যোগী হবেন, তখন সে পিতার নাকি স্বামীর ভূসম্পত্তিতে তা প্রয়োগ করবেন, সে বিষয়টি একটি অমীমাংসিত জটিল ব্যাপার।

বাংলাদেশ ব্যাংক গবর্নর সম্প্রতি বলেছেন, প্রতি বছর ১০ হাজার নারী উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। কারণ নারী উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে সময় মতো পরিশোধ করেন এবং নিজের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় জিডিপিতে বিরাট ভূমিকা রাখছেন। দেশের মোট শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে ১০ শতাংশ হলো নারী উদ্যোক্তা। এতদসত্ত্বেও নারীর ভূসম্পত্তির অধিকারটি নিশ্চিত এবং নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এ পরিকল্পনা সফলভাবে কাজ করতে সামর্থ্য হবে না।

নারীর আইনগত সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে হবে। নির্যাতনের শিকার ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে নারী প্রাপ্য বিচার পায় না। আইনের ফাঁকফোকর তৈরি করে রাখা হয়েছে, যাতে সমাজের রাঘব বোয়াল-মোড়লদের ছত্রছায়ায় লালিত অপরাধীরা আইনের তর্জনী দুমড়ে রেখে রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করতে পারে অনায়াসে।

নারীর আবাসন ও স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য বাজেটে ব্যাপক বরাদ্দের প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে জিডিপির ৬৫ শতাংশ অর্জন নারীর। সুতরাং তাদের শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা সেবা, চলাচলে নিরাপত্তা বিধানসহ অন্যান্য প্রয়োজনে মোট বাজেটের ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ পৃথিবীর দশম স্থানে অবস্থান করছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক নিদর্শন। কৌশল, নীতিগত পরিবর্তন ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ধীর পদক্ষেপ হলেও তা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এটুকুতেই সন্তুষ্টির ঢেঁকুর তুলে থেমে থাকা ঠিক হবে না। নারীর চলার পথের সকল বাধা হোক দূর। নারী হোক অশুভ বলয়মুক্ত। সংস্কারের খোলস-অচলায়তন ভেঙ্গে বেরিয়ে আসুক নারী, মাথা উঁচু করে দাঁড়াক মানুষের সারিতে। সকল ক্ষেত্রে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি হোক সরব-পুষ্ট-সবল।

লেখক : রিসার্চ ফেলো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

নারী উদ্যোক্তা

e-mail: meerameherun@gmail.com

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: