আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পদ্মা সেতুতে যুক্ত হচ্ছে রেল ॥ মাত্র আড়াই ঘণ্টায় যাওয়া যাবে ঢাকা থেকে যশোর

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫
পদ্মা সেতুতে যুক্ত হচ্ছে রেল ॥ মাত্র আড়াই ঘণ্টায় যাওয়া যাবে ঢাকা থেকে যশোর

মশিউর রহমান খান ॥ পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে চলবে ট্রেন। আর ঢাকা থেকে যশোর যেতে সময় লাগবে মাত্র আড়াই ঘণ্টা। বর্তমানের চেয়ে দূরত্ব কমবে কমপক্ষে ১০০ কিলোমিটার পথ। এ লক্ষ্য দ্রুত বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বেশ জোরেশোরে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পদ্মা সেতুর উপর সম্পূর্ণ আলাদা রেলসেতু নির্মাণের মাধ্যমেই দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের আশা পূরণে সরকারও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া হয়ে পদ্মা সেতু দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের যশোর পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারিত হচ্ছে। আর এ রেলপথটি সম্পন্ন হলে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত দূরত্ব হবে মাত্র ১৬৬.৩৩ কিলোমিটার। গত বছর অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেল মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে রেলওয়ের আওতায় আনার জন্য পদ্মায় রেল সংযোগ স্থাপনের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প-১ (ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-৮২.৩১ কি.মি.) এবং প্রকল্প-২ (ভাঙ্গা-নড়াইল-যশোর-৮৪.০১ কি.মি.) ২টি প্রকল্প গ্রহণ করে।

বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে ঢাকায় আসতে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে ১০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। এ পথটি চালু হলে দূরত্ব ও সময় অনেক কমবে। এছাড়া পদ্মা সেতু তৈরির পর সকল স্টেশনে ট্রেন থামার পর সর্বমোট আড়াই ঘণ্টায় ঢাকা থেকে যশোর যাওয়া সম্ভব হবে। এজন্য দুটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলওয়ের তথ্যমতে, পদ্মা সেতুর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল সংযোগ স্থাপনে পাটুরিয়া-ফরিদপুর-পুকুরিয়া-ভাঙ্গা ৬০ কিলোমিটার রেলপথ এরই মধ্যে সংস্কার করা হয়েছে।

সম্প্রতি পদ্মাসেতু-জাজিরা-ভাঙা রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে রাজধানীর গে-ারিয়া রেল স্টেশন পরিদর্শনকালে রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক এমপি সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত রেললাইনের এলাইনমেন্ট ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে চূড়ান্ত করা হয়েছে। মোট ৮২.৩২ কিলোমিটার রেললাইন ও ২৭ কিলোমিটার লুপ লাইন ছাড়াও এ সেকশনে ১২৫টি রেলসেতু নির্মাণ করতে হবে। বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীতে নৌচলাচলের জন্য পর্যাপ্ত ক্লিয়ারেন্সের জন্য গে-ারিয়ার পর ১৬.৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড রেলপথ এবং ২.০২ কিলোমিটার র‌্যাম্প নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও পদ্মার দু’পার মিলিয়ে মোট ২৩.৩৬৮ কিমি ভায়াডাক্ট নির্মাণ করা হবে। এছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে রেলপথ ও সড়ক পথকে আলাদা করতে ৪০টি আন্ডারপাস সেতু ও তিনটি ওভারপাস নির্মাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার গেন্ডারিয়া অংশে পাঁচটি লেভেল ক্রসিংয়ে গেট বসানো হবে।

রেলসূত্র জানায়, নতুন এ রেলপথটি নির্মাণ হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী ও দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিপুল অবদান রাখবে। এছাড়া রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াত ও বাণিজ্য সুবিধা বর্তমানের চেয়ে কয়েকগুণ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। রেলসূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে ট্রেনলাইন চালু করতে আলাদা রেলসেতু তৈরি করা হবে। সেতুর ২ প্রান্তের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করতে হলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে ঢাকা বিভাগের ৬ জেলায় বিদ্যমান দুটি স্টেশন ছাড়াও নতুন ৬টি রেলস্টেশন স্থাপন করা হবে। এগুলো হলো- কেরানীগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা ও শিবচর। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, সিরাজদিখান, শ্রীনগর, লৌহজং, জাজিরা, শিবচর ও ভাঙ্গা উপজেলার প্রায় ৮৭টি মৌজার ওপর দিয়ে এই রেলপথটি নির্মাণ করা হবে। এতে বেশকিছু আধাপাকা বাড়িসহ স্থায়ী ভবন অপসারণের প্রয়োজন হবে।

জানা গেছে, সম্ভাব্য রুট নির্ধারণের জন্য রুটটির জন্য করা সমীক্ষাকালীন ৩টি তুলনামূলক বিবরণী তৈরি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ছোট-বড় বেশকিছু সেতু নির্মাণের ফলে প্রকল্পটির পরিবেশগত সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এ ক্ষেত্রে প্রকল্পটির ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় এডিবি ও সরকারের গাইড লাইন অনুসরণ করা হবে।

রেলপথটি নির্মাণে মোট ৩৬৫ দশমিক ১০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে। এর মধ্য ২৭৩ হেক্টর ব্যক্তি মালিকানাধীন ও ৯২ হেক্টর সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ)। প্রকল্পের আওতায় বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাসহ ৪টি বড় ও ৫৬টি ছোট রেল সেতু নির্মাণ করতে হবে। ৫টি রেলক্রসিংসহ ৪০টি পয়েন্টে আন্ডারপাসসহ জাতীয় মহাসড়কে ৩টি ফ্লাইওভার থাকবে। রেলসূত্র জানায়, সমীক্ষা-১ অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রেলপথটি লাভজনক হবে। ভাঙ্গা থেকে জাজিরা পর্যন্ত রেলপথ ২০২০ সালের মধ্যেই চালু করা সম্ভব হবে। তবে রাজধানী থেকে পদ্মা সেতু পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

জানা গেছে, এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে চীনের সিআরইসি (চায়না রেলওয়ে গ্রুপ) কোম্পানি। প্রাথমিকভাবে পদ্মা নদীর ওপর সড়ক সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) এ সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন করে তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মা সেতুতে রেলপথ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুর সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সে অনুযায়ী, সড়ক ও রেলপথবিশিষ্ট দ্বিতল সেতু নির্মাণের নকশা চূড়ান্ত করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রেলওয়ের আওতায় আনার লক্ষ্যে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে যশোর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয় রেলওয়ে মাস্টার প্ল্যানে।

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫

৩০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: