আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বেলা অবেলার রঙরাগিণী

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • খুরশীদ আলম পাটওয়ারী

এ দেশীয় চিত্রকলার আধুনিক ইতিহাস যেমন স্বল্পকালীন তেমনি তা নানা বিপরীত ছোট-বড় টানাপোড়েনের শিকার হয়েছে। বলাবাহুল্য, এ দেশের আধুনিক চারুশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে। শিল্প আলোচক আবুল হাসনাতের এক লেখায় জানা যায়, ‘আর্ট ইনস্টিটিউটের তত্ত্বীয় আবর্তনের শিক্ষার্থী ছিলেন শিল্পী তাহেরা খানম। তিনি যখন শিক্ষার্থী তখন প্রথার শাসন ছিল চিত্রবিদ্যা চর্চার ক্ষেত্রে, প্রতিকূলতা ছিল নানা ধরনের। আর স্ত্রী শিক্ষাক্ষেত্রে ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুকূল ছিল না। এই বিদ্যায়তনে প্রথম ও দ্বিতীয় আবর্তনে কোনো ছাত্রী শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহী থাকলেও প্রতিকূল কারণে ভর্তি হননি। তৃতীয় আবর্তনে তাহেরাসহ আরও পাঁচজন এই প্রথা ভাঙ্গায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তৎকালে পঞ্চাশের দশকে এটা ছিল সত্যিকার অর্থেই বিপ্লবী পদক্ষেপ। তাহেরা খানমসহ এই পাঁচজন সে জন্যে প্রণম্য।’

সম্প্রতি বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস এ বর্ষীয়ান শিল্পী তাহেরা খানমের ‘বেলা অবেলার রঙরাগিণী’ শীর্ষক একক চিত্রকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রখ্যাত শিল্পীদ্বয় সৈয়দ জাহাঙ্গীর এবং সমরজিৎ রায় চৌধুরী যৌথভাবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। ১৯৫৯ সালে ড্রয়িং ও পেইন্টিংয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের ৪৪ বছর পর ঢাকার গ্যালারি চিত্রকে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। একযুগ পর পুনরায় তিনি দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হলেন এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শওকত ওসমানের একটি উদ্ধৃতি উল্লেখযোগ্যÑ ‘এখন যে সময়ে চারুকলায় স্নাতক হবার সঙ্গে সঙ্গেই একক চিত্রপ্রদর্শনী করবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শিল্পী, এখন পদ্য রচনায় হাতেখড়ি নেবার সঙ্গে সঙ্গেই কবিতার এই বই প্রকাশ করবার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে কবি যশোপ্রার্থী। আমি কি স্মরণ করিয়ে দেব, এবং কেউ কি বিশ্বাস করবেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মাত্র একটিই একক প্রদর্শনী হয়েছিল?’

দেশের বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর সহধর্মিণী হওয়ায় সংসারের অনেক ঝক্কিঝামেলা-বিপত্তি ঘাড়ে নিয়ে তিনি কাইয়ুম চৌধুরীকে উদার মনে নিরলস সহযোগিতা করেছেন, কাইয়ুম চৌধুরীর সৃষ্টির বৈচিত্র্য, ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর সম্যক অবহিত ছিল। এজন্যেই নিজে চিত্রকলায় খুব সচল না থেকে স্বামী এবং শিল্পীর কাজে, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিরন্তর সহযোগিতা আর উৎসাহ জুগিয়েছিলেন।

আর্ট স্কুলের শুরুর দিকের ছাত্রী হওয়ায় শিল্পী তাহেরা খানম হাতে-কলমে শিক্ষা পেয়েছেন কিংবদন্তি শিল্পীদের কাছ থেকে। পাঠ নেয়ার সুযোগ হয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদসহ আরও অনেক প্রথিতযশা শিল্পীর কাছ থেকে। তখন শিক্ষানবিশ শিল্পীগণ দলবেঁধে স্কেচ করতে যেতেন বুড়িগঙ্গায়, রেসকোর্স ময়দানে, মতিঝিল প্রভৃতি স্থানে। এভাবেই শিক্ষক আর সতীর্থদের সাহচর্যে তারা ঋদ্ধ হয়েছেন।

আলোচ্য প্রদর্শনীতে শিল্পীর মোট ৪৮টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে যার কিছু কাজ সাম্প্রতিক সময়ের। ২০০৫ সাল থেকে বেঙ্গল শিল্পালয়ের অভিভাবকত্বে দেশে-বিদেশে নিয়মিত নানা কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছিল। শুরুর দিকে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর সহধর্মিণী হিসেবে তিনি সঙ্গী হতেন। অতঃপর দীর্ঘ বিরতিতে পড়া শিল্পী তাহেরা নতুন করে সৃষ্টিশীলতায় উদ্দীপ্ত হলেন। এরপর ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিনি এশিয়ার পাঁচটি দেশে আয়োজিত কর্মশালায় আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করে অনেক ছবি এঁকেছেন। এর ফল হলো আলোচ্য প্রদর্শনী। প্রদর্শনী আয়োজনে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন শিল্পীর স্বামী কাইয়ুম চৌধুরী এবং বেঙ্গল গ্যালারির সুবীর চৌধুরী। কিন্তু আজ তাঁদের দু’জনের কেউই জীবিত নেই। এটি নিঃসন্দেহে শিল্পীর পূর্ণতার ক্ষেত্রে একটি বিশাল শূন্যতা।

শিল্পী তাহেরা খানমের এ প্রদর্শনীর সব ছবিই এক্রিলিক মাধ্যমে করা। সেই অর্থে মাধ্যমগত বৈচিত্র্য নেই। যদিও শিল্পী ষাটের দশকজুড়ে জাল রং, তেল রং এবং চারকোলে কাজ করেছেন। বিভিন্ন মিশ্র মাধ্যমেও তিনি কাজ করেছেন। প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ, ফুল, ফলাগাছ, গাছালি নিঃসর্গ পাখি, আকাশ ইত্যাদি নানা আবহ কখনো মোটা ব্রাশের আঁচড়ে, কখনো চিক্কন রেখায় তিনি ক্যানভাসে উঠিয়ে এনেছেন। মানবীয় নানারকম সম্পর্কও দেখা যায় তাঁর ছবিতে। গভীর বোধ দিয়ে তিনি মানুষের মর্মযাতনা, হাসি, কান্না, আর বেদনাকে রূপায়িত করেছেন। ছোট ছোট সিরিজের আশ্রয়েও যেমন ‘প্রকৃতির রঙরাগিণী’, ‘প্রকৃতির স্বরগ্রাম’, ‘নিসর্গ নীড়’, ‘বাগানে বিহঙ্গ নিজেরে হারায়ে খুঁজি’ শিরোনামে ছবি এঁকে নিজেকে প্রকৃতির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। আবার নারীর দেহসৌষ্ঠবের সৌন্দর্য, কমনীয়তা, নগ্নতা এঁকে সাহস দেখাতেও পিছপা হননি। পাখি আর নারীর মধ্যে তিনি কোন সাযুজ্য খুঁজেছেন একাধিক চিত্রকর্মে। আত্মপ্রকাশ তথা আত্মস্বাধীনতা যেন এসব ছবিতে প্রতীকায়িত হয়েছে।

রঙের ব্যবহারে উদারতা এবং ঔজ্জ্বল্য তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। সবুজ, হলুদ, কালো, বাদামি, লাল, সাদার কজমকালো উপস্থাপনা যেমন আছে, তেমনি ছবি প্রয়োজন, প্রাকৃতির বাস্তবতায় হালকা উনুজ্জ্বল রং ব্যবহারেও তার মুন্সিয়ানা আছে। ‘মগ্ন মেনাক’ শীর্ষক একটি ছবিতে পাহাড়ের সৌন্দর্য, নিসর্গ বৃক্ষরাজি সব মিলিয়ে এক ধরনের পার্বত্য আবহ পাওয়া যায়। স্বামী কাইয়ুম চৌধুরীর একটি অনবদ্য প্রতিকৃতি এঁকেছেন তিনি। মোটা ফ্রেমের চমশায় প্রসারিত দৃষ্টি নিয়ে শান্ত সমাহিত এক আবেশে ফ্রেমবদ্ধ করেছেন তিনি এই কিংবদন্তি শিল্পীকে।

‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’ শিরোনামে ছবিগুলোতে তিনি মূলত নারী দেহ, আন্তঃসম্পর্ক, ভঙ্গিমা ইত্যাদিকে নানা বৈচিত্র্যে উপস্থাপন করেছেন বর্ণিল রংয়ে। ছবিগুলো একজন বর্ষীয়ান শিল্পীর মনসিজ পদাবলী হয়ে উঠেছে।

১৯৩৬ সালে ফরিদপুরে জন্ম নেয়া এই শিল্পী অনেক যৌথ প্রদর্শনীতে এবং কর্মশালা ও আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেছেন।

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: