আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সালাহ্উদ্দীন আহ্্মদ ছিলেন ইতিহাসের নতুন রূপকার

প্রকাশিত : ১৪ জুন ২০১৫, ০১:৩২ এ. এম.
  • তিন দিনের স্মারক সেমিনার শুরু

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দেশবরেণ্য ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সালাহ্্উদ্দীন আহ্্মদ। ধর্মান্ধতা ও বৈজ্ঞানিক সত্যান্বেষণকে তিনি অনায়াসে সাহসের সঙ্গে পৃথক করে রাখতে পেরেছিলেন। তিনি ইতিহাসের শিক্ষার মধ্য দিয়ে মূলত মূল্যবোধের শিক্ষার প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। আর তিনি শুধু ইতিহাসবিদ ছিলেন না, ছিলেন ইতিহাস-পুরুষ। ইতিহাসের নতুন রূপকার ও আধুনিক বিশ্লেষক। বিকৃত ইতিহাসচর্চার পুরোহিত হননি। তাই বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম ও জাতীয় মনমানসের বিবর্তনকে এমন নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন, যা জাতির বিবেককে জাগায়, সামনের দিকে তাকাতে শেখায়। সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ বাহাত্তরের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চেতনা পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখতেন। প্রয়াত এই জাতীয় অধ্যাপক এ এফ সালাহ্উদ্দীন আহ্মদের চিন্তা ও কৃর্তীর স্মরণে শনিবার থেকে বাংলা একাডেমিতে শুরু হলো তিন দিনব্যাপী ‘এ এফ সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ স্মারক সেমিনার’। যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি, স্কুল অব লিবারেল আর্টস এ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আবদুল আহাদ ও হামিদা খানম স্মৃতি পরিষদ।

সকালে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ধর্মনিরপক্ষেতা ও সামগ্রিক সমাজ বিকাশ শিরোনামের এ সেমিনারের উদ্বোধন করা হয়। এ পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আবদুল আহাদ ও হামিদা খানম স্মৃতি পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেনÑ ফোকলোর গবেষক শামসুজ্জামান খান, বাংলা একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এম ওমর রহমান। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আবদুল আহাদ ও হামিদা খানম স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিশাত জাহান রানা।

আয়োজনের শুরুতেই নিশাত জাহান রানার গ্রন্থনা ও পরিকল্পনায় নির্মিত সালাহ্উদ্দীন আহ্মদের জীবনচিত্র ‘সুন্দরের প্রতিকৃতি’ উপস্থাপিত হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ প্রধানত উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালীর ভাবধারা নিয়ে গবেষণা করেছেন। বিশেষ করে রাজা রামমোহনের ব্রাহ্ম ধর্ম তাঁকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং তা থেকেই মানবতা ও সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করেছেন। রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা অনেক পরে এসেছে কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অনেক আগে থেকেই ধর্মনিরপক্ষায় বিশ্বাস করতেন এবং তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শামসুজ্জামান খান বলেন, ইতিহাসের একটা ধারাবাহিকতা আছে। কেন কিভাবে ধর্মনিরপক্ষেতা এসেছে তার বিচার-বিশ্লেষণের আবশ্যকতা জরুরী। যে কোন এক জায়গা থেকে তুলে দিলে চলে না। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা লাইব্রেরি থেকে বই এনে এসবের চর্চা করেন। সত্যিকার চর্চার জন্য মাঠে-ময়দানে যেতে হবে, মানুষের কাছে যেতে হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে যে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তার বিকাশ হতে দেননি জিয়াউর রহমান ও এরশাদ। তাঁরা নিজেদের মতো করে মনগড়াভাবে তার রদবদল করেছেন। ফলে বাংলাদেশে ধর্মনিরপক্ষেতা মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সভাপতির বক্তব্যে ড. করুণাময় গোস্বামী বলেন, মানুষে মানুষে যে বিভেদ, সম্প্রীতির যে অভাব তা নিয়ে কাজ করেছেন সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ। সকল বিভেদ দূর করে কিভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানে যায় সেটা তিনি করেছেন, যা এ দেশের বহুল আকাক্সিক্ষত ও জন্মজাত।

উদ্বোধনী আলোচনা শেষে শুরু হয় ‘মিশ্র সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আমরা’ শীর্ষক সেমিনার। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পশ্চিমবঙ্গের গবেষক অধ্যাপক ইমানুল হক। মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আবদুল আহাদ ও হামিদা খানম স্মৃতি পরিষদের সহ-সভাপতি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী এবং মফিদুল হক।

প্রাবন্ধিকের বক্তব্যে ইমানুল হক ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে অন্য ধর্ম নির্মূল নয় বরং অন্য ধর্মকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করাকেই বোঝেন বলে বলতে চেয়েছেন। এ সময় তিনি ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের গভীর সম্পর্কের নজির তুলে ধরেন।

আলোচকের বক্তব্যে কামাল লোহানী বলেন, যে অতীতকে ঐতিহ্য মনে করে গর্ব করি তা ধরে রাখতে পারছি না আমরা। আমরা ক্রমশ পিছে চলে যাচ্ছি। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারছি না কিংবা ধারণ করতে পারছি না। অথচ প্রান্তিক পর্যায়ে মানুষের স্বভাবজাত প্রক্রিয়া সেটি বহাল আছে।

সভাপতির বক্তব্যে সেলিনা হোসেন এ রকম একটি অনুষ্ঠানে তথ্যনির্ভর প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পাশাপাশি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের নজির তুলে না ধরে মিশ্র সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান তথা আমাদের দেশের আদিবাসীদের কথা তুলে ধরা যেত বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, বাঙালীর প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ। আর এটির রচয়িতারা কিন্তু বৌদ্ধ সাধক।’

অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় আজ রবিবার সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান মিলনায়তনে রবীন্দ্রচিন্তায় ধর্মনিরপেক্ষতা শীর্ষক সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেনÑ এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ ও এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। সভাপতিত্ব করবেন বিশিষ্ট ফোকলোরবিদ অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।

প্রকাশিত : ১৪ জুন ২০১৫, ০১:৩২ এ. এম.

১৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: