মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ডানাকাটা পরী

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫
  • রকিবুল ইসলাম লিখন

পর্ব- ০১

ভালবাসার রংগুলো এমন কেন?

আমি ওকে চিনতে পারিনি!

লাল আর নীল এ দু’টি রং ছিল ওর পছন্দ।

সাদা আর কালো। ওরে বাবা ওর সঙ্গে যায় না।

তবে মাঝে মধ্যে কালো যেত, কিন্তু লাল টিপ ছাড়া যেন চলে না।

ভাবা যায়! রমণীর পরনে কালো শাড়ী, কপালে লাল টিপ!

মাঝে মধ্যে ওকে বলতাম, তুই সাদা পরতে পারিস না?

ওহ্ বড্ড বেশি বলিস, ওর ঝটপটে উত্তর।

আমি ওর ছবি যতবার মনের মধ্যে এঁকেছি, সাদা রংয়ে এঁকেছি।

ওকে কি অন্য পোশাকে মানায়, ও যে নিষ্পাপ স্নিগ্ধ লতা।

মনে পড়ে যায় একটি দিনের কথাÑ

আমি বাড়িতে- বৃষ্টি হচ্ছে, কি অদ্ভুত বৃষ্টির শব্দ!

কান পেতে শুনছি, আর দূরের মাঠে দৃষ্টি ফেলেছি ধানক্ষেত শুধুই ধানক্ষেত।

টিনের চালে বুঝি আম পড়ল ধুপ-ধপ্পাস।

আচ্ছা আম কেটে খেতে পারলে কেমন হতো?

চিন্তা করতেই জিভে জল এসে গেল।

বাড়িতে মোট ঘর তিনটে।

একটা টিনের ডোয়া পাকা, আর দুইটা ছনের।

বাড়ির চারপাশেই আম গাছ। বেশ নাম গাছগুলোর, গবদা, সিন্দুরা, কালা গাছ ইত্যাদি।

লেখাপড়ার খাতিরে টিনের ঘরটা আমার জন্য বরাদ্দ।

তবে ঝামেলা একটা আছে।

রাহাল আক্কাছ আমার সাথে থাকে।

যেই খেতে মন চাইল, আর আক্কাছ ঐ সময়েই নাই।

কি আর করা!

লুঙ্গি পরেই বাইরে, পেছনের দরজা দিয়েই বের হলাম।

কে যেন দরজা খোলার সঙ্গে-সঙ্গেই ঘরের অন্য কোণার দিকে গেল।

আমি কিছুটা ভড়কে গেলাম! ভূত-প্রেত নাতো!

কি করব ভাবতে ভাবতে সামনে পা বাড়ালাম।

একটা পরী আমার হাতে বন্দী।

কালো শাড়ী বৃষ্টিতে ভিজে চুপ-চুপ, ভেজা চুলে কপলের জল চিবুক দিয়ে বেয়ে পড়ছে।

লাল টিপের লাল রং মিশ্রিত জল।

আমার হাতে ধরা পড়েছে যে, মানুষ নয় আমার স্নিগ্ধ লতা।

আমি জাপটে ধরাতে জোরে-জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস হচ্ছে।

ভেজা কাপড়ের দরুন বুকের ভাঁজ ফুটন্তময়, যেন কোন শিল্পীর আঁকা।

এই ছাড় কাকীমা দেখবে।

এখানে আসছিলে কেন?

আম কুড়োতে।

কেন তোদের বাগান নাই?

আছে, তবে তোমাদের এই গাছের আমগুলো অনেক মজার।

আমাকে এক ঝাটকা মেরে চলে গেল হাসতে হাসতে।

ওর হাসিটা বুঝি মেঘের অনেক পছন্দ হলো।

যুক্ত হলো বিজলীর চমকানি, যেন হাসিটা দ্যুতি হয়ে ছড়িয়ে দিল পৃথিবীতে।

ভেজা কাপড়েই প্রস্থান।

পর্ব- ০২

কত করে বলেছি বৃষ্টিতে ভিজবা না, এখন বুঝ মজা!

আমি কি আর ভিজলাম, তুই তো দাঁড় করিয়ে রাখলি।

তুমিই তো অপলক চোখে তাকিয়েছিলে।

তাকাবই তো, তুই কালোতে লাল টিপ পরেছিলি কেন?

পরেছিলাম বেশ করেছিলাম, আমার ইচ্ছে।

তোর ইচ্ছে মানে?

আমাকে দেখানোর জন্যই তো এসেছিলি।

আমার দায় পড়েছে বুঝি! তুমি আমার কে হও?

চলে গেল।

সময়ে-অসময়ে চলে যায়, মিছেমিছি রাগ করে। কেঁদে কেঁদে চোখ-মুখ ভার করবে।

আমি জানি ঐ বৃষ্টিতে এসেছিল আমার জন্য।

ওকে বলেছিলাম কালো শাড়ীতে লাল টিপ বেশ মানাবে তোকে।

তাই এসেছিল আম কুড়ানোর নাম করে।

পর্ব- ০৩

এত ঝাল দিছিস কেন?

আমার বাপের ইচ্ছে।

জ্বর কমেছে?

বলব না।

কেন?

আমার বাপের ইচ্ছে।

শাড়ীটা কে কিনে দিছে?

কেন? তুমি।

ফাজলামি করিস না।

ফাজলামি করিস না- ক্যান করলে কি করবা?

আমার কথার ব্যঙ্গ করিস না, ভাল হবে না কিন্তু।

মা কিনে দিছে।

কেন তোর বিয়ে দিবে নাকি?

হ্যাঁ, তোমার ভাল হবে নিশ্চয়ই।

অনেক ভাল হবে, আমি বেঁচে যাব।

ঠিকই তো তোমাকে আর কেউ জ্বালাবে না।

তবে শাড়ীটা সুন্দর, লাল শাড়ী তোর অনেক পছন্দের তাই না?

হ্যাঁ, তাতো ঠিকই তুমি জানো না?

তবে সাদা সালোয়ার কেন পরিস না?

সাদা সালোয়ারের সঙ্গে মাথায় একটা হ্যাট দারুণ মানাবে।

সালোয়ারই পরি না আমি তারপর আবার সাদা!

তোকে বিদেশী মেমের মতো লাগবে।

যেন পরী!

মেমের মতো লাগবে ক্যান আর পরীই বা হব ক্যান?

মেম বাদ, পরী ডানা কাটা পরী যেন সদ্যই মাখা মেলে উড়ে যাবে।

তোমার এত যখন ইচ্ছে একদিন পূরণ করে দিব।

ওষুধ ঠিকমতো খেয়ো, কাল আবার আসব।

পর্ব- ০৪

রাতের বেলা ঢাকের আওয়াজ মাঝে মধ্যে শাঁখের আওয়াজ ভেসে আসে।

জ্বরের ঘোরে কিছুই জানা হয় না।

হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে বুঝতে পারি অনেক সময় আমি অতিবাহিত করেছি আত্মার জগতে।

যখন অনেক জ্বর মনে হচ্ছিল আমি আর পরী যেন আম কুড়াচ্ছিলাম।

আম, কাঁচা-মিঠা আম।

কি অবস্থা?

এখন কিরকম বোধ করছেন?

ভালই- খারাপ না।

আপনাকে বলেছিলাম ঠা-া বাধানো যাবে না।

খুব কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে আমাদের।

যাই হোক সাত দিন নাকি ওঈট-তে ছিলাম

বাপরে! সাত দিন!

আচ্ছা পরী আসেনি?

নিশ্চয়ই কেঁদে কেঁদে মুখটা ফুলিয়ে ডোল করেছে।

এবার নিশ্চয়ই অনেক কেঁদেছে?

নিশ্চয়ই মুখটা বেশি ফোলা?

পরী ডানাকাটা মুখ ফোলা পরী

দু’দিন চলে গেল অথচ আসলো না।

অভিমান! এবার বাড়িতে যাই, দেখব কে আগে কথা বলে?

পর্ব- ০৫

আমার পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে

ওর সেলাই করা বালিশের কাভার।

জল, চোখের জল।

লাল-লাল চোখের জল।

সিঁথির সিঁদুর, পরীর সিঁথিতে সিঁদুর।

জল হয়ে পড়ছে ওরই সেলানো কাভারে।

যেদিকে তাকাই- সেদিকেই ওর প্রতিচ্ছবি।

চালে চান্দানী।

হাতের হাতপাখা।

মুখ মোছার রুমাল, যে রুমালে ঝগড়া হয়।

না-না-না, আমি আর ভাবতে পারছি না।

পর্ব- ০৬

এরপর ওর সঙ্গে আর একবার দেখা হয়েছিল।

আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম।

জীর্ণ-শীর্ণ শুকনো শরীর।

সিঁথিতে সিঁদুর।

ও তাকায়নি।

মুখের কালো নীলাভ দাগ।

গলার নিচে আঁচড়।

প্রশ্ন করেছিলাম এগুলো কি?

উত্তর দেয়নি।

পরে জেনেছিলাম স্বামীটা ছিল লোভী।

লোভে পরীকে বিয়ে করেছিল।

মনে করেছিল পরীর বাবার অনেক টাকা-পয়সা আছে।

আমরাও বুঝিনি পরেশ কাকু গোপনে সবকিছু শেষ করেছে আর বলেছে শহরে বর মাইনের চাকরি করে।

অথচ সব জমি জোয়ার্দারের কাছে জমা দেয়া।

যেদিন আমি শেষ পরীর সাথে কথা বলি, লাল শাড়ীতে ছিল কামনাময়ী।

সেদিনই এক চিল এসেছিল, সবই ছিল কাকাবাবু-কাকীমার সাজানো।

জোর করে ক্লাস নাইনে পড়া মেয়েকে এক রাতেই তুলে দেয় চিলের হাতে।

আমার মা বাধা দিতে গিয়েছিল বলে শুনেছি।

মুসলমান বলে বিয়ের ম-পে ঢুকতে দেয়নি।

অথচ কাকীমা আমার মায়ের সই ছিলেন।

তিনিও নাকি অনেক কটু কথা বলেছিলেন মায়ের যাওয়ার দরুন।

ওর এক সইয়ের কাছ থেকে শুনেছি ওর নাকি জ্ঞান ছিল না।

ওভাবেই জোর করে ওকে সাতপাক ঘুরিয়েছে।

বিয়ের পরেই চিলটা পরেশ কাকু সম্পর্কে সব জেনে যায়।

শুরু হয় যৌতুকের চাপ।

আমার ছোট পরীকে ওরা অমানুষিক নির্যাতন করে যার চিহ্ন ঐ নীলাভ-কালচে লাল আর চিলের তীক্ষè নখের আঁচড়।

পরেশ কাকু মারা গেছেন, কাকীমাও নেই।

একমাত্র মেয়ের কষ্টের জন্য নিজেকেই দায়ী করতেন।

তাই আত্মহত্যা করেছিলেন।

অনেক দিন পর, এক মহিলা এক শিশুকে আমার কাছে নিয়ে আসলেন।

হাতে একটা চিঠি।

রাজ,

আকাশের ভাঁজে ভাঁজে যখন তারাগুলো মিলিয়ে যায়, সূর্যের উদয় হয়, আলোকিত হয় পৃথিবী, হারিয়ে যায় স্বপ্ন পরীরা। আবার রাত আসে, আসে পরীরা। আমি এমন এক পরী, থাকতে চেয়েছিলাম সূর্যের আলোতেও, তাইতো বুঝি ভগবান আমার কাছ থেকে রাতটুকুনও কেড়ে নিল। ওরা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চেয়েছিল। শত আঘাত মুখ বুঝে সহ্য করেছিলাম, এই পিচ্চিটার জন্য। ও বড় হয়ে কাকে বাবা বলবে? কিন্তু ওরা ওকেও মেরে ফেলতে চেয়েছিল যদি আমি বাড়ি থেকে নিজেই না বের হয়ে যেতাম। ওকে তোমার কাছে রেখে তোমার পরীকে আকাশের বুকে তারা হয়ে একটু হাসতে দিও। যদি কেউ বলে ওর জাত? বলবে ‘মানব জাত’। ইতি, পরী

পর্ব- ০৭

বাবা শুধুই কি চেয়ে থাকবে?

বলবে না কেমন লাগছে?

তোকে না বলেছি সাদা পোশাক পরবি না।

কেন? তাহলে কি পরব?

লাল পরবি, লাল শাড়ী আর নীল শাড়ী।

তুমি থাক তোমার লাল আর নীল নিয়ে।

আমার সাদা ভাল লাগে আমি সাদা পরব।

মেয়েটি চটপটে ঠিক তোমার মতো।

আকাশের বুকে তাকিয়ে রাজ মনে মনে বলল।

তবে কি তুমি সত্যিই আমাকে চমকে দিতে চেয়েছিলে?

মেয়েটি যে সাদা ছাড়া আর কিছু পরতেই চায় না, সঙ্গে থাকবে হ্যাট।

তোমার অন্তরটা ওকে দিয়ে গেলে?

চোখ বেয়ে-বেয়ে রাজের জল ঝরে।

অনেক রাত হয়েছে, আকাশের বুকে শুকতারার দেখা মিলল।

না, আর ছাদে নয়, মেয়েটা নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে।

রুমে প্রবেশ করেই রাজ দেখল সেই সাদা পোশাকেই ও ঘুমিয়ে আছে।

জানালা দিয়ে চাঁদের আলো পড়ে জ্বলজ্বল করছে ওর মুখাবয়ব।

রাজ জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ালো।

শুকতারাটা হাসছে।

তবে কি ওটাই পরী?

মনে মনে বলছে, কি এবার খুশি তো?

সাদা পোশাক মাথায় হ্যাট বিদেশী মেম,

না-না-না, ধুৎ ছাই, মেম হতে যাবে কেন?

পরী ডানাকাটা পরী।

মনের অজান্তেই শুকতারাটাকে রাজ বলে ফেলল, ‘তোমাকে আমি ভালোবাসি’, যা কখনই বলতে পারিনি!

আস্তে আস্তে সূর্যের উদয় হয়।

রাজ ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয় আর ভাবতে থাকে- দূরে নয় তার সামনেই- ‘পরী ডানা কাটা পরী’।

=সমাপ্ত=

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

১২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: