মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বাজেট-উত্তর অর্থমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলন ॥ ভাগ্য বদলাতে চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত : ৬ জুন ২০১৫
বাজেট-উত্তর অর্থমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলন ॥ ভাগ্য বদলাতে চ্যালেঞ্জ
  • ২ লাখ কোটি রাজস্ব আদায় নিয়ে সমস্যা নেই
  • পাঁচ বছরে ৯৫ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছে এবার হবে ৯৬ শতাংশ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ নানাজন নানা কথা বললেও প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে। রাজনীতির নামে সহিংস প্রতিবাদ দেশে আর হবে না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে শীঘ্রই জ্বালানি তেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

বাজেটের ২ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়ার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন, দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাতে এখন একটি ধাক্কা দেয়ার সময় এসেছে। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে ৯৫ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে। আর চলতি বাজেটে এ হার ৯৬ শতাংশ। এছাড়া যারা রাজস্ব আদায় এবং বাজেট বাস্তবায়নেও সরকার দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, বাস্তবায়ন একটি বড় সমস্যা হলেও বিভিন্ন সংস্কারমুখী কর্মসূচী গ্রহণের ফলে ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়ন হবে।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে বৃহস্পতিবার সংসদে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। বাজেটোত্তর এই সংবাদ সম্মেলনে অনুষ্ঠানমঞ্চে মুহিতের ডান পাশে ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। আর বাঁ পাশে ছিলেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তাদের পেছনে গবর্নর ড. আতিউর রহমান, অর্থ সচিব মাহাবুব আহমেদ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান এবং পরিকল্পনা সচিব কাজী শফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। অর্থমন্ত্রীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবরাও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব ও ব্যাখ্যা দেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা সত্যিই যদি অগ্রগতির পথে যেতে চাই, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই, তাহলে রাজস্ব আদায় অবশ্যই বাড়াতে হবে। আর সেই চ্যালেঞ্জই আমি আমার এই বাজেটে নিয়েছি। সেই চ্যালেঞ্জ সাকসেস করব বলে আমি প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, বাজেটের লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব বাবদ ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা দিতে জাতি প্রস্তুত আছে। আর এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা এনবিআরও প্রস্তুত রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। এ লক্ষ্যে আমরা নতুন করদাতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছি, এই করদাতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে। এ কথা ঠিক যে এই রাজস্ব আদায়ের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা দেয়া দরকার। এই ধাক্কা দেয়ার সময় এসেছে এবং আমরা সেই ধাক্কাটিই দিতে চাই। বর্তমান সরকারের মেয়াদে টানা সপ্তমবারের মতো বাজেট দেয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুহিত বলেন, ২০০৯ সালে তিনি যখন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, তখন দেশে সক্রিয় করদাতার সংখ্যা ছিল ৭ লাখ। এখন তা বেড়ে ১১ লাখ হয়েছে। তিনি বলেন, ইট ইজ ভেরি ভেরি সেøা। এই সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আমাদের এনবিআর একটি জরিপ করেছে, সেই জরিপের ভিত্তিতেই আমরা নতুন করদাতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত এই কর আদায় করব।

মুহিত বলেন, আমরা জানি, আমাদের এই টার্গেট উচ্চাভিলাষী, টার্গেট ইজ ভেরি হাই, তবে আমাদের রেকর্ড আছে, এই সাত বছরে একবার আমরা রাজস্ব আদায়ে ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিলাম। সে বিষয়টি মাথায় রেখেই সরকার ও এনবিআরের পক্ষ থেকে এবার অতিরিক্ত উদ্যোগ নেয়া হবে। দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের স্বার্থেই এ উদ্যোগের প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয়।

সংবাদ সম্মেলনে কালো টাকা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, কালো টাকা নিয়ে বলার কিছু নেই। কারণ এ বিষয়ে আয়কর আইনেই স্পষ্ট করে লেখা আছে। তাই আমি কালো টাকা নিয়ে কোন বক্তব্য দিতে চাই না। তিনি বলেন, কালো টাকা বলে কোথাও কিছু নেই। যে আয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দৃষ্টিগোচরে নেই সেটা হচ্ছে অপ্রদর্শিত অর্থ। এই অর্থ প্রদর্শিত করতে আয়কর আইনে স্থায়ী বিধান করে দেয়া আছে। তাই আগামীতে আরও কখনও বাজেটে কালো টাকা নিয়ে কিছু থাকবে না। সিমকার্ডে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সেক্টর অনেক উন্নতি করেছে। শুল্ক আরোপের ফলে গ্রাহকদের সমস্যা হবে আমার তা মনে হয় না। শিক্ষায় বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ খাতে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনও ৪ বা ৬ শতাংশ বিনিয়োগ না হওয়ায় তা আন্তর্জাতিক মানের হচ্ছে না। ঘাটতি বাজেট প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এটা ঠিকই আছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ৫ শতাংশ ডেফিসিট রাখা হয়েছে। আগে ৪৫ শতাংশ ঘাটতি রেখেও বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘাটতি বেশি হলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। তাই এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, আগামী ১৫ বছরে ১০০টি ইকোনমিক জোন করা হবে। এটা কিন্তু এটি ইপিজেড নয়। যেহেতু দেশে জমির সঙ্কট রয়েছে। তাই সরকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ৩০টি ইকোনমিক জোনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, ৬টির কাজ চলছে। তিনি বলেন, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য জায়গা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভারতের বিনিয়োগ আকৃষ্টেও আলাদা ইকোনমিক জোন করতে জায়গা বরাদ্দ দেবে সরকার।

জেলা বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটা আছে এবং থাকবে। বরং জেলা বাজেট কিভাবে ফলপ্রসূ করা যায় সে বিষয়ে একটি গাইড লাইন প্রণয়ন করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, বাজেট কাঁটছাঁট করতে হয়। এটা বিশ্বের সব দেশেই আছে। এটা থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে এবার ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতির অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। আর তখন বিষয়টি জাতিসংঘে তোলা হবে। এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা রয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। মাথাপিছু ঋণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা এখনও হিসাব করা হয়নি। তবে দেশী ও বিদেশী মিলে চারশ’ ডলারের মতো মাথাপিছু ঋণ রয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেছে। পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ট্যারিফ ভ্যালু রয়েছে। ট্যারিফ ভ্যালুর সঙ্গে সমন্বয় করে আগামীতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হবে।

উচ্চাভিলাষী বলে বাজেট নিয়ে কেউ নাড়ানাড়ি করেন ॥ প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, যারা দেশের অগ্রগতি চান না তারাই বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলে নাড়ানাড়ি করছেন। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নর জবাবে তিনি এ কথা বলেন। শিল্পমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রায়ই অনেক বিষয়কে উচ্চাভিলাষী, স্বপ্নভিলাষী ও কল্পনাভিলাষী বলে আখ্যা দিয়ে থাকি। কিন্তু বর্তমান সরকার তা বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী যখন ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু হবে, তখন দেশের মানুষের সঙ্গে বিদেশীরাও বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু আমরা এখন পদ্মা সেতুর বাস্তব রূপ দেখছি। ভাতা প্রসঙ্গে আমু বলেন, যখন আমরা এটা চালু করার পরিকল্পনা করেছিলাম তখন বিদেশীরাও অবাক হয়েছিল। আমাদের মতো গরিব দেশ ভাতা দেবে এটা তারা বিশ্বাসই করতে পারেনি। কিন্তু এখন দেশে অনেকেই ভাতা পাচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

চাল আমদানি করেছে প্রাইভেট সেক্টর ॥ সরকার কোনদিন চাল আমদানি করেনি, বেসরকারী (প্রাইভেট) সেক্টর চাল আমদানি করেছে। তারা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অনেক নিম্নমানের চাল আমদানি করেছে বলে আমি জানি। রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী। ২০০৮ সালে যখন চাল আমদানির ওপর শুল্ক ওঠে গেল, তখন থেকে প্রাইভেট সেক্টর চাল আমদানি করছে বলে জানান কৃষিমন্ত্রী।

বাজেট বাস্তবায়নে জিপিএ-৫ ॥ তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। আগুন সন্ত্রাস দেশে আর হবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তথ্যমন্ত্রী।

ভুলে চিনি আমদানিতে শুল্ক ॥ নতুন অর্থবছরের বাজেটে চিনি আমদানির ওপর আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব ভুল করে ছাপা হয়েছে বলে জানালেন এনবিআর চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান। অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাজেটপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। বিষয়টি দ্রুত সংশোধন করা হবে বলে জানান তিনি।

প্রকাশিত : ৬ জুন ২০১৫

০৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: