কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বাঁকখালীর বাঁকে বাঁকে

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫
  • মো. মনির হোসেন

পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার। এখানে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, ইনানী সৈকত, হিমছড়ি, সেইন্টমার্টিন দ্বীপ, টেকনাফ, সোনাদিয়া দ্বীপ, কুতুবদিয়া দ্বীপ, মহেশখালী দ্বীপসহ আরও অনেক দৃষ্টিনন্দন স্থান। তবে নদী পরিব্রাজক দলের লক্ষ্য ছিল বাঁকখালী নদী। প্রায় শত কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁকখালী নদী মিয়ানমারের একটি পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে দুপছড়ি-গর্জনিয়া হয়ে কুতুবদিয়া-মহেশখালী সাগর চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। এ ভ্রমণে আমার সঙ্গে ছিলেন নদী পরিব্রাজক দলের সদস্য মনোয়ার হোসেন, শিশির সালমান, মাহমুদ, সারোয়ার, আব্দুর রহমান ও আবুল খায়ের। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে কস্তুরা ঘাট জেটিতে চলে গেলাম স্পিডবোট বা ট্রলারের জন্য। সেখানে দেখা গেল মাছ ধরার অসংখ্য ট্রলার এবং বালি হাঁস। ট্রলারগুলোর আকার আকৃতি ও নকশা আর বালি হাঁসের ঝাপটা ঝাপটি দেখে ভ্রমণ পিপাসু মন ভ্রমণানন্দে নেচে উঠল। আর এই আনন্দের খেয়ায় ভেসে আমরাও চরে বসলাম একটা স্পিডবোটে। বোট চলতে শুরু করল তার আপন গতিতে। ঢেউয়ের তাড়নে বোটের নাচনে আমাদেরও নাচন শুরু হয়ে গেল। বোট ৪-৫ ফুট উপরে উঠে পরক্ষণেই ধপাস করে পানিতে আছার খাচ্ছে। আহ! কি রোমাঞ্চকর নৌ-ভ্রমণ। দু’পাশের জলাবন, বিশাল জলরাশি দেখে নদী পাগল মন তৃপ্তি ও আনন্দে ভিজে গেল। মনে হলো কোন এক বিখ্যাত ওয়ালপেপার দেখছি। বাঁকখালী নদী আর বঙ্গোপসাগরের মোহনা পেরিয়ে আমরা চলে এলাম মহেশখালী জেটিতে।

মহেশখালীর উৎপত্তি দ্বীপ হিসেবে নয়। এটি কয়েক শ’ বছর আগেও মূল ভূখ- কক্সবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপটি কক্সবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কক্সবাজার শহরের কস্তুরাঘাট জেটি বা ৬নং জেটি ঘাট থেকে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে বাঁকখালী ও বঙ্গোপসাগর মোহনা পাড়ি দিয়ে স্পিড বোট যোগে মহেশখালী দ্বীপে পৌঁছা যায়। কাঠের বোট দিয়ে কক্সবাজার জেটি থেকে মহেশখালী যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। বিচ্ছিন্ন ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘদিন মহেশখালী ছিল কক্সবাজারের একটি পশ্চাৎপদ এলাকা। অধিবাসীদের পেশা ছিল শুধু পশুপালন, চাষাবাদ ও মৎস্য আহরণ। অরণ্যবেষ্টিত দ্বীপটি হিংস্রজন্তু বাঘ, ভাল্লুক ও হাতির চারণভূমি হিসেবে দীর্ঘদিন অনাবাদী অবস্থায় পড়েছিল। পরবতীকালে কিছু লোক মহেশখালী গিয়ে চাষাবাদ ও মৎস্য আহরণ শুরু করে। মহেশখালী জেটি নির্মিত হওয়ার আগে লোকজন মহেশখালী যাতায়াত ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। দ্বীপে কোন রাস্তা ঘাট ছিল না। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৮২ পিলার বিশিষ্ট মহেশখালী জেটি নির্মাণ করে। বাঁকখালী খালের নাব্য ও ভরাটজাত কারণে জেটিটি কয়েকবার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। জেটি নির্মাণের পর মহেশখালীর জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থা আমূল পাল্টে যায়। এলাকার রাস্তাঘাট, বসতবাটি প্রভৃতি আধুনিকতার ছোঁয়ায় আনন্দময় হয়ে ওঠে। যাতায়াত সাবলীল হওয়ায় ব্যবসাবাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। অধিবাসীদের পেশায় বৈচিত্র্য এবং সৃজনশীল আধুনিকতায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠে। বর্তমানে পর্যটকের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ মহেশখালী। এখানে দেখার মূল আকর্ষণ বিখ্যাত আদিনাথ মন্দির। এছাড়াও এখানে রয়েছে খুবই মনোরম একটি বৌদ্ধ মন্দির। আঁকাবাঁকা সিঁড়ি ভেঙ্গে আদিনাথ পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেই পাওয়া যাবে বিখ্যাত এই আদিনাথ মন্দির। এ দ্বীপের দক্ষিণে রয়েছে বিস্তীর্ণ সাগর আর পশ্চিমে বিশাল বিশাল পাহাড়। দিনের বাকি অংশ নদীতেই কাটিয়ে দিলাম। অবশেষে আবার সেই স্পিডবোট, সেই রোমাঞ্চকর, অনাবিল আনন্দ আর ভ্রমণের স্বাদ নিয়ে ঘরে ফেরা।

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫

০৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: