কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মিথেনের উৎস গাছপালা!

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

পরিবেশবিদরা এক ধরনের সঙ্কটেই পড়েছেন। এতদিন যা জেনে এসেছেন, তা যে সঠিক নয়, জানতে পেরে বেশ বিব্রত। এতদিন যে অঙ্ক কষে এসেছেন, তার সব শুরুর তথ্যই ভ্রান্ত। অথচ অভ্রান্ত ভেবে এতকাল তার জিকির করেছেন। পরিবেশ নিয়ে দুঃশ্চিন্তা বেড়েছে বৈকি। সঙ্কটও সেই সঙ্গে।

জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পরিবেশে মিথেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো সবুজ উদ্ভিদ। গবেষণাগারে তারা প্রমাণ করেছেন, সবুজ উদ্ভিদ শ্বাসকার্যের সময় মিথেন উৎপণœ করে এবং বায়ুম-লে তা মুক্ত করে। বায়ুমন্ডলের মোট মিথেনের এক-তৃতীয়াংশ আসে সবুজ উদ্ভিদ থেকে।

গ্রীন হাউজ গ্যাস হিসেবে মিথেন সুপরিচিত। সংক্ষেপে বলা যায়, মিথেন ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ মহাকাশে ফিরে যেতে বাধা দেয়। একই সঙ্গে বায়ুম-লের তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে। অর্থাৎ পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে উদ্ভিদকে যে একটি সর্বরোগের ওষুধের মতো ভাবা হতো, তা বোধহয় আর ভাবা যাবে না। বৃক্ষরোপণের সময় মাথায় রাখতে হবে, কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের সঙ্গে সঙ্গে ওই গাছ বেশকিছু পরিমাণে মিথেন পরিবেশে মুক্ত করবে।

জার্মান বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত ধারণা ছিল, বায়ুম-লে গ্রীন হাউস গ্যাসের উৎস ও বিনাশস্থল। বিজ্ঞানীদের ভাষায় যাকে বলে সোর্স ও সিংক, তা পরিবেশবিদরা ভালভাবেই জ্ঞাত। কিন্তু গবেষণার ফলাফল পুরো ধারণাটাকেই বদলে দেয়। তাই এখন উদ্ভিদ থেকে নির্গত হওয়া মিথেনকেও ধরছেন হিসেবের মধ্যে পরিবেশবিশারদরা। তার মানে হচ্ছে, পরিবেশে মিথেনের পরিমাণ কমাতে এবং সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে; মানুষের কার্যকলাপ আরও নিয়ন্ত্রিত করা সঙ্গত মূলত আবার নতুন হিসেব, নতুন করে অঙ্ক শুরু হয়েছে তাদের। তবে বিজ্ঞানীরা কিন্তু এটা নিশ্চিত হতে পারেননি যে, সব উদ্ভিদই মিথেন তৈরি করে কি না। না কি বিশেষ কিছু উদ্ভিদ। এতে বাড়তি বোঝা চেপেছে পরিবেশবিশারদদের জন্য। তাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কোন কোন উদ্ভিদ মিথেন উৎপণœ করে তাদের শনাক্ত করা। অবশ্য এটা পরিষ্কার করেননি বিজ্ঞানীরা এখনও যে, উদ্ভিদ কেন মিথেন তৈরি করে, কী পদ্ধতিতে করে, কোন কোন উৎসকে ব্যবহার করে? জানেন না তারাও। আসলে, শ্বাসকার্যের সময় উদ্ভিদের মিথেন উৎপন্ন করার ব্যাপারটাই তো অজানা ছিল এতকাল ধরে। তাই তার খুঁটিনাটিগুলোও জানা নেই। শুধু, জার্মানির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সত্তর ডিগ্রী তাপমাত্রাতেও উদ্ভিদের মিথেন তৈরি অব্যাহত থাকে। যদি নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদ মিথেন তৈরি করে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই গাছগুলো বাদ দিয়ে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে কি বায়ুম-লকে রক্ষা করতে গিয়ে জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা হবে না; না কি মানুষ আগেই নষ্ট করেছে জীববৈচিত্র্য- এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক পরিবেশবাদীদের কাছ থেকে।

মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই উদ্ভিদ জড়িয়ে আছে মানুষের সঙ্গে। তাহলে কয়েক শতক আগে এই সমস্যা হয়নি কেন? সে প্রশ্ন যেমন সামনে এসেছে, তেমনি কৌতূহলও বেড়েছে। এমন কোন উদ্ভিদ কী ছিল বা রয়েছে; যারা মিথেন শোষণ করতে পারত। মানুষ তাদের ধ্বংস করছে কি না। নাকি পরিবর্তিত পরিবেশে অভিযোজিত হয়ে উদ্ভিদ এখন মিথেন মুক্ত করে। তবে কী আগে তা করত না?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত দুশ’ বছর ধরে বায়ুম-লে মিথেনের পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এর জন্য বিজ্ঞানীরা অনেকে দায়ী করেন কৃষিকাজকে। বিশেষ করে যেসব জায়গায় জলাভূমিতে কৃষিকাজ করা হয়। যেমন বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। তাদের দিকেই তোলা হয় অভিযোগের আঙ্গুল। কেননা জলাভূমিতে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ধান গাছের গোড়া পচে মিথেন নির্গত হয়। তৃতীয় বিশ্বের এই দেশগুলোকে পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী করার পিছনে কতটা বিজ্ঞান আর কতটা রাজনীতি আছে, সে কথা অনেকেই অবহিত। তবে কী এই রাজনীতির খেলা এইবার কমবে?

তৃতীয় বিশ্ব বা নিরক্ষীয় অঞ্চলের গাছপালা বেশি থাকার জন্য এই অঞ্চলের বায়ুম-লে মিথেনের ঘনত্ব বেশি হওয়া স্বাভাবিক। এই প্রাকৃতিক কারণের জন্য কেউ নিশ্চয়ই এই অঞ্চলের মানুষদের দায়ী করবেন না। পাশাপাশি আশা করা যায়, তৃতীয় বিশ্বে, গাছ কাটার কথাও কেউ বলবেন না। আর একটু কী নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হবেন শিল্পোন্নত দেশের মানুষেরা? নাকি কমার বদলে শুরু হবে এক নতুন রাজনীতি? এক নতুন অঙ্ক। সময়ই নির্ধারণ করবে বিষয়গুলো কোনদিকে ধাবিত হবে। আশা যেমন থেকে যায়, আশঙ্কাও তেমন।

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫

০৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: