রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সাগরে ২০ হাজারের বেশি অবৈধ নৌযান

প্রকাশিত : ১ জুন ২০১৫

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ॥ মানব পাচার ও চোরাচালানের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে সাগরপথ নিরাপদ হয়ে উঠায় বেআইনী তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরদারির অভাব, অবহেলা এবং নানা অনিয়মের জের হিসেবে দেশে সাগর ও নৌপথে অবৈধ নৌযানের সংখ্যা এখন ২০ সহস্রাধিক। বর্তমানে রেজিস্টার্ড ইঞ্জিনচালিত ফিশিং বোট, কার্গো বোট ও ফিশিং ট্রলারের সংখ্যা ৩ হাজার ১৪৭। এর মধ্যে ১২শ’ ফিশিং বোট, ১৮শ’ কার্গো বোট এবং ১৪৭ ফিশিং ট্রলার। নৌ-বাণিজ্য অধিদফতর ও মেরিন ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের (এমএফডি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, ইঞ্জিনচালিত ফিশিং বোট ও ফিশিং ট্রলারের রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ব রয়েছে নৌবাণিজ্য অধিদফতর। যা চট্টগ্রামে অবস্থিত। এর একটি শাখা অফিস রয়েছে খুলনায়। আর এগুলোর মধ্যে ট্রলার আর ফিশিং বোটের লাইসেন্স দিয়ে থাকে এমএফডি। এ দফতরও চট্টগ্রামে অবস্থিত। বাংলাদেশের খুলনা থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকা, গভীর সাগর এবং নদীপথে এসব নৌযান চলাচলে রেজিস্ট্রেশন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা না মেনে প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক নৌযান চলাচলযুক্ত হচ্ছে লাইসেন্সবিহীন অবৈধ পথে। সূত্র মতে, দায়িত্বপ্রাপ্ত দফতরের একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের হাতে রেখে অবৈধ নৌযানগুলো চলাচলের ক্ষেত্রে পার পেয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে সাগরপথে মানব পাচার, মাদকসহ চোরাচালান স্থলপথের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদকের মধ্যে বিশেষ করে ইয়াবার চোরাচালান এখন সাগরপথ কেন্দ্রিক। সাম্প্রতিক সময়ে সাগরপথে মানব পাচার রুটে ভয়াবহ ট্রাজেডি সারাবিশ্বের নজর কেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মানব পাচার ও মাদকসহ নানা চোরাচালানে ব্যবহৃত হচ্ছে বৈধ, অবৈধ নানা জাতের ছোট ছোট নৌযান। সাগরে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, স্থলে বিজিবি, পুলিশ প্রহরাকে পাশ কাটিয়ে চোরাচালানের এসব পণ্য বিভিন্নভাবে পাচার হয়ে আসছে। বিশেষ করে আনরেজিস্ট্রার্ড নৌযানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে মানব পাচার ও মাদক চোরাচালানের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এক শ্রেণীর নৌযান মালিক ও এর মাঝিমাল্লারা এ অবৈধ তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।

সূত্র মতে, সমুদ্রে চলাচলরত বৈধ অবৈধ ফিশিং ও কার্গো বোট দিয়ে গত দেড় বছরে প্রায় এক লাখ নরনারী ও শিশু পাচার হয়েছে আন্দামান সাগর সন্নিহিত দেশগুলোর উপকূল এলাকায়। যার মধ্যে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া অন্যতম। সাগরে নৌযান চলাচলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের নিয়মিত কোন নজরদারি না থাকার ফাঁকে ইঞ্জিনবোট ও মাঝিমাল্লারা মানব পাচার ও মাদক চোরাচালানের কাজে লিপ্ত হয়েছে। যা বর্তমানে সরকারের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামে নৌ-বাণিজ্য অধিদফতর সূত্রে জানানো হয়, তারা ট্রলার ও কার্গো বোটের রেজিস্ট্রেশন দিয়ে থাকে। আর মেরিন ফিশারিজ ডিপার্টমেন্ট দেয় লাইসেন্স। কিন্তু বিশাল সাগর এলাকায় অবৈধ নৌযান চলাচলে নজরদারিতে তাদের কোন লজিস্টিক সাপোর্ট নেই। উপকূলীয় এলাকায় চোরাচালানসহ বেআইনী বিভিন্ন অপকর্ম রোধে কোস্টগার্ড তৎপরতা যেহেতু রয়েছে, সেক্ষেত্রে অবৈধ নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে তারা নজরদারি আরোপ করতে পারে। অন্যরূপ বক্তব্য দিয়েছে, মেরিন ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকেও। এ দফতরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, এত বিপুল পরিমাণ অবৈধ নৌযান চলাচল করছে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে। যা থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে যে, ৩ হাজার ১৪৭ রেজিস্ট্রার্ড ফিশিং ও কার্গো বোট ও ফিশিং ট্রলার রয়েছে এর নবায়নসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের রাজস্ব আয় সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা। অথচ, চলাচলরত সকল নৌযানকে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্সের আওতায় আনা গেলে সরকারী কোষাগারে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব জমা পড়বে।

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ের মানব পাচারের উদ্বেগজনক ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত নানা প্রস্তাবনার মধ্যে সাগরে চলাচলরত নৌযানগুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা এবং মাঝিমাল্লাদের আইডি কার্ড প্রদানের ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ প্রস্তাব গুরুত্বসহকারে আমলে নিয়ে শীঘ্রই মাঝিমাল্লাদের পরিচয়পত্র প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ঘোষণাও দিয়েছেন। কিন্তু এ ঘোষণা কবে নাগাদ কার্যকর হবে এবং তা আদৌ কার্যকর হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার ১৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সাইফুল আলম রবিবার জনকণ্ঠকে জানান, রেজিস্ট্রেশনবিহীন নৌযানগুলো চোরাচালান কাজে যে ব্যবহৃত হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এর পাশাপাশি রেজিস্টার্ড নৌযানগুলোর কিছু কিছু এতে সংযুক্ত রয়েছে। তিনি জানান, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় বিজিবির পক্ষ থেকে দফায় দফায় এ ধরনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, বর্তমানে এ বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারক মহল নড়েচড়ে বসেছে এবং এতে এসব অবৈধ কর্মকা- অনেকাংশে কমে যাবে বলে তাদের বিশ্বাস।

আরও ৩ দালাল গ্রেফতার ॥ শনিবার রাতে কক্সবাজার সদর, টেকনাফ ও মহেষখালি থেকে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত আরও ৩ দালালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হচ্ছে শহরের রোমালিয়ার ছড়ার আমান উল্লাহ, টেকনাফের উনচি প্রাং এলাকার সৈয়দ আহমদ ও ছোট মহেষখালির গোলাম মোস্তফা। পুলিশ জানিয়েছে, এদের বিরুদ্ধে মানব পাচার কাজে জড়িত থাকার আইনে মামলা রয়েছে।

মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে গ্রেফতার ॥ মিয়ানমার থেকে প্রাপ্ত সংবাদে জানা গেছে, সে দেশের নৌবাহিনী মানব পাচার কাজে জড়িত থাকার দায়ে ২ ট্রলার মালিককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। গত শনিবার এদেরকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে একজনের নাম জানা গেছে। তাকে রাজধানী ইয়াঙ্গুন থেকে গ্রেফতার করা হয়। ৫৩ বছর বয়সী এ ট্রলার মালিকের নাম নারিংনাট প্যাটার্ন সাংকান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে অবস্থানকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে মানব পাচারে জড়িত। এছাড়া মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে থাইল্যান্ডে এ পর্যন্ত ৫১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে সে দেশের শৃঙ্খলা প্রদেশে মানব পাচার, বন্দী শিবির ও গণকবর ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরদিকে, থাইল্যান্ডের উপ-প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, থাই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানব পাচারের কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে কোন প্রমাণ মেলেনি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, সে দেশের উচ্চ পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এ কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

গডফাদাররা উৎকণ্ঠায় ॥ মানব পাচার ও মাদক চোরাচালানে জড়িত হয়ে দেশীয় যেসব গডফাদাররা রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন এরা এখন চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে। কক্সবাজার অঞ্চলে এরা যেসব দৃষ্টিনন্দন ভবন তৈরি করেছেন তাদের অনেকেই গোপনে এখন তা বিক্রির চেষ্টায় রয়েছে।

মানবপাচার ঘাটের স্থাপনা উচ্ছেদ ॥ রবিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত উখিয়ার চোয়াংখালীর চেংছুরি গ্রামে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে নির্মিত একটি মার্কেটের ৮টি দোকান ও একটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন। কক্সবাজার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ, বিজিবি ও বনকর্মীরা এ অভিযান চালায়। উখিয়ার ভারপ্রাপ্ত সহকারী বনসংরক্ষক রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, মাহমুদ উল্লাহ ও আব্দুস শুক্কুর সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে বনভূমির জায়গা দখল করে একটি অবৈধ মার্কেট নির্মাণসহ স্থানীয় আমিনুল ইসলামের পুত্র নুরুল হক একইভাবে বিশাল স্থাপনা গড়ে তুলে।

আইএমওর তথ্য ॥ এদিকে, অভিবাসন নিয়ে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থা আইওএম-এর (ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব মাইগ্রেশন) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগর দিয়ে আন্দামান সাগর হয়ে ২০১৪ সালে প্রায় ৫৮ হাজার মানুষ পাচার হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের তিনমাসে পাচার হয়েছে আরও ২৫ হাজার। সবমিলে এ সংখ্যা ৯৩ হাজার বলে জানানো হয়েছে। এদের অধিকাংশ দেশান্তরি, রাষ্ট্রহীন ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অভিবাসী।

প্রকাশিত : ১ জুন ২০১৫

০১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: