মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

শিক্ষা ॥ পরীক্ষায় সাফল্য ॥ মান প্রশ্নবিদ্ধ

প্রকাশিত : ১ জুন ২০১৫
  • জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা ঢাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম নম্বরও পায় না পরীক্ষা পদ্ধতি ও গ্রেডিং সংস্কারের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
  • পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিলের সুপারিশ
  • সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৭৫% শিক্ষার্থীই বাংলায়ও দক্ষ নয়
  • র‌্যাংকিংয়ে কোন তালিকায়ই স্থান পায় না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিভাষ বাড়ৈ ॥ বিগত কয়েকটি বছর যেভাবে পাসের হারের অব্যাহত উর্ধগতি চলছে এভাবে চলতে থাকলে আগামী দু’এক বছরের মধ্যেই শতভাগে পৌঁছে যাবে পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষার সাফল্য! অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি ও জেডিসির অবস্থাও প্রায় একই। পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে এসএসসি ও এইচএসসিও। কিন্তু শিক্ষার মানের চিত্রটা কী? এ প্রশ্নে এখন উদ্বিগ্ন দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক দাতা ও গবেষণা সংস্থাগুলো। একদিকে পাবলিক পরীক্ষায় গণহারে পাস, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও একাডেমিক শিক্ষায় সেই ‘উত্তীর্ণ মেধাবীদের’ মানের ভয়াবহ দুর্বলতা এখন স্পষ্ট। শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার মানে এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। গুণগত মানোন্নয়নের বিষয়টি বছরের পর বছর উপেক্ষিত হওয়ায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। আন্তর্জাতিক দাতা ও গবেষণা সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছে, ভর্তির হার বাড়লেও কমছে শিক্ষার মান। সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের শতকরা ৭৫ জন বাংলাতেই দক্ষ নয়।

এদিকে মানের সঙ্কটের এখানেই শেষ নয়। গেল বছর উচ্চ মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বরই না পাওয়া বিষয়টি যেন মানের সঙ্কটকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা ছিল আরও করুণ। গত বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম পর্ব পরীক্ষায় ৪৬ শতাংশই ফেল করেছে, যাদের অর্ধেকেই ফেল করেছে অন্তত পাঁচ বিষয়ে। এক সময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাতি নিয়ে সুনাম অর্জন করলেও এখন র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের কোন তালিকাতেই স্থান পাচ্ছে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দ্রুত এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেয়ার আহ্বান জানিয়ে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষদান ও সকল পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় হয়েছে। ভাবার সময় হয়েছে শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও। প্রচলিত পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার অধিকাংশ সূচকেই যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না মন্তব্য করে শিক্ষাবিদরা বলছেন, পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার করা উচিত। ভাবার সময় হয়েছে গ্রেডিং পদ্ধতি নিয়ে। পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনীর আগে শিশুদের সব পরীক্ষা ও অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি পরীক্ষাও তুলে দেয়া উচিত। আর নতুন কোন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারী মেডিক্যাল অনুমোদনও দেয়া যাবে না। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, ফালতু প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ধার করে শিক্ষকদের মাত্র দু’দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে না। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যাবে না। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে পিএসসির আদলে আলাদা শিক্ষা কর্ম কমিশন করে সরকারীভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষকের উপযুক্ত বেতনও দিতে হবে, অন্যথায় মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসবে না।

মান নিয়ে প্রশ্ন প্রাথমিকেই ॥ প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এখন পাসের হার শতভাগের কাছাকাছি। গত কয়েক বছরের ফলাফলের চিত্র বলে দিচ্ছে আগামী দুটি পরীক্ষার পরই হয়ত ফেল করবে না কোন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ পাসের হার হবে শতভাগ। প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির হারও চলে এসেছে প্রায় শতভাগে। তবে সংখ্যাগত সূচকে মেধার বিস্ফোরণ ঘটলেও প্রশ্নের মুখেই পড়ে আছে এ স্তরের শিক্ষার মান। গুণগত মানোন্নয়নের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে বছরের পর বছর। প্রাথমিকের শিক্ষার মান নিয়ে বিশ্বব্যাংক গত বছর এক রিপোর্টে বলেছে, ভর্তির হার বাড়লেও কমছে শিক্ষার মান। সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ৭৫ শতাংশ বাংলাতেই দক্ষ নয়। ইংরেজী, গণিতের অবস্থা করুণ। বাংলাদেশের শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে কিছু প্রকল্পে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে আরো বলছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সফল হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ সালে প্রাথমিকে সামগ্রিক ভর্তির হার ৯৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০০০ সালে ৬৩ শতাংশ ছিল।

পাশাপাশি মাধ্যমিকেও ২০১০ সালে ভর্তির হার ৯২ শতাংশে এসে ঠেকেছে। কিন্তু ২০০০ সালে তা ছিল ৫২ শতাংশ। তবে শিক্ষার মান নিয়ে আছে প্রশ্ন। শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এক মূল্যায়ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণীর মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর দক্ষতা রয়েছে বাংলা বিষয়ে এবং ৩৩ শতাংশের দক্ষতা রয়েছে গণিতে। প্রায় একই চিত্র অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে। নিচের শ্রেণীর যেসব শিক্ষার্থীর শিখনের মাত্রা নিচু তাদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করেই ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেশি। ঝরে পড়ার পর তারা সাধারণত অনানুষ্ঠানিক কর্মবাজারে ঢুকে পড়ে। মধ্যম আয়ের দেশ হতে শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে সুপারিশ করে বিশ্বব্যাংক বলছে, উচ্চ মানসম্পন্ন শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া শিশুকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শক্তিশালী মৌলিক জ্ঞান ও আচরণগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলেছে বিশ্বব্যাংক। বালাদেশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী পাস করা শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা বাংলা পঠন দক্ষতা সন্তোষজনক নয় বলে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা রুম টু রিড বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষার প্রথম ধাপে শব্দ বুঝে মাতৃভাষা উচ্চারণ করে পড়তে পারার হার মিনিটে ৪৫ থেকে ৬০টি শব্দ। তবে বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণী উত্তীর্ণ শিশু শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩২ শতাংশই মিনিটে একটি বাংলা শব্দও উচ্চারণ করে পড়তে পারে না। আর দ্বিতীয় শ্রেণী উত্তীর্ণদের প্রায় ১৬ শতাংশই বাংলা একটি শব্দ উচ্চারণ করে পড়তে সক্ষম নয়। সারা পৃথিবীতে যেখানে শিক্ষার প্রথম ধাপে শব্দ বুঝে মাতৃভাষা উচ্চারণ করার হার মিনিটে ৪৫টির ওপর সেখানে বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণী শেষে একজন শিক্ষার্থী মিনিটে মাত্র ১৬টি বাংলা শব্দ পড়তে সক্ষম। দ্বিতীয় শ্রেণী শেষে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় মিনিটে ৩৩টি। রুম টু রিডের প্রতিবেদন প্রাথমিক শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছে তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। রুম টু রিড বলছে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যার বৈশ্বিক মান নির্ধারণ করা হয়েছে মিনিটে ৪৫ থেকে ৬০টি শব্দ এবং এই পথ ধরে বিভিন্ন দেশ গবেষণার মাধ্যমে তাদের পঠন দক্ষতার হার বের করেছে। রুম টু রিডের গ্লোবাল অফিস এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক প্রভাত করিম বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশুদের পড়ার সক্ষমতা তৈরি না হলে বোঝার ক্ষমতাও বাড়বে না। এ জন্য শিশুদের রিডিং ফ্লুয়েন্সি বাড়াতে হবে। শিশুদের কমপক্ষে মিনিটে ৬০টি শব্দ পড়ে বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন শুধু গবেষণা সংস্থারই নয়, সাধারণ মানুষের মনেও মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, স্কুলগুলোয় মানসম্মত পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, শিক্ষা উপকরণের অভাব, সরকারের দেয়া বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে নোট-গাইডের ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়া, স্কুলের চেয়ে কোচিং সেন্টারের প্রতি বেশি আকর্ষণ অনুভব করাসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন এখন সবার। এত কিছুর পরও দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ছে। এমনকি আগে যেসব স্কুল ও মাদ্রাসা থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করত না, এখন সেসব প্রতিষ্ঠান জিপিএ-৫ পাওয়ার ছড়াছড়ি। পরীক্ষায় পাসের হার বেড়ে যাওয়ায় আশান্বিত মানুষ। কারণ পরীক্ষায় ভালো ফল করে সবাই পাস করবে, এটা সব অভিভাবকই চান। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষায় কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তা দিয়ে যেমন পরীক্ষার ফলের পরিমাণগত দিক বোঝায়, তেমনি যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করছে তারা শিক্ষাক্রমে বর্ণিত শিখন অভিজ্ঞতা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছে কিংবা আদৌ অর্জন করতে পারছে কি-না, সেটাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখার স্বার্থেই। পরীক্ষায় পাসের হার বাড়লেই যে গুণগত মান বাড়বে, এ কথাকেই কেবল সব সত্য বলে ধরে নেয়া যায় না।

রাজধানীতেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বেহাল ॥ ঢাকার বাইরে অবস্থিত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয় প্রায়ই। মাঝে মাঝেই দেখা যায় ভবন নেই, ‘শিশুরা ক্লাস করছে খোলা আকাশের নিচে’। আবার দেখা যায় ‘একজন শিক্ষক শিক্ষার্থী কয়েকজন’। কয়েক কিলোমিটার নৌকায় পাড়ি দিয়েও স্কুলে শিশুদের যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। এখানেই শেষ নয়। এই মুহূর্তেও দেশের দুই হাজার গ্রামে নেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। যদিও সরকার ইতোমধ্যেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়বিহীন দুই হাজার গ্রামের জন্য দেড় হাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। যার অর্ধেকেরও বেশির কাজ শেষ পর্যায়ে। এসব এলাকায় ইতোমধ্যেই বিকল্প হিসেবে বাড়ছে কেজি স্কুলসহ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান। তবে প্রাথমিক শিক্ষার এ সঙ্কটের চিত্র দেখাতে গ্রামে যাওয়ার প্রয়োজন নেই কারও। খোদ রাজধানীর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থাই করুণ। সরকারী পর্যায়ে বহু অনুদান ও প্রণোদনা দেয়া সত্ত্বেও বিদ্যালয়গুলোর অবস্থায় কোন পরিবর্তন নেই। বিদ্যালয়ে শিক্ষক সঙ্কট যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্য। এমনকি রয়েছে পানি, বিদ্যুতসহ টয়লেট সমস্যা। গত কয়েকদিন ঢাকার অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে জানা গেছে, গত এক দশকেও এ বিদ্যালয়গুলোতে উন্নয়নের কোন ছোঁয়া লাগেনি। মোহাম্মদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অভাব। খিলগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে বিক্রি হয় মাদক দ্রব্য। শান্তিনগর কো-অপারেটিভ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই ঝাড়ুদার ও পিয়ন। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ঝাড়ু দেয় ক্লাসরুম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খোদ ঢাকায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতিই নিম্নমানের। রয়েছে চরম শিক্ষক সঙ্কট। শিক্ষকদের মান নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই। তার ওপর সারাদেশের মতো এখানকার শিক্ষকদেরও শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন সরকারী কর্মসূচীতে নিযুক্ত করা হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী, শিশু জরিপ কর্মসূচী এবং নির্বাচনী ভোটার তালিকা তৈরিসহ নানা সরকারী কাজে ব্যস্ত রাখা হয় শিক্ষকদের। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার গুণগত মানের অভাব, শিক্ষার্থীদের আয়মূলক কাজে যুক্ত থাকা, শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ করতে না পারা, বিদ্যালয়ে অনিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে না আনা, জবাবদিহিতার অভাব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মান নেমে যাওয়ার জন্য দায়ী।

ঢাকা মহানগরীতে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২৯৫টি। মোট শিক্ষার্থী ছয় লাখ ৯১ হাজার ৯২৮ জন। যার মধ্যে বালক তিন লাখ ২৭ হাজার ৬১০ জন। বালিকা তিন লাখ ৩৪ হাজার ৩১৮ জন। প্রধান শিক্ষক ২৯৫ জন, সহকারী শিক্ষক আছেন দুই হাজার ৭২ জন। এদিকে ভূমিদস্যুরা কেবল বসতবাটি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমিই দখল করে না। স্কুলের জমিও দখলে নেয়। সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে ঢাকার অন্তত ১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। চলছে মামলা, দেন দরবার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

মেধার বিস্ফোরণের বিপরীতে মানের চিত্র করুণ ॥ পাসের হারের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার মানের করুণ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে খোদ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার দিকে তাকালেই। এখন যেখানে এসএসসি ও এইচএসসিতে সর্বোচ্চ গ্রেড নম্বর পেয়ে ভর্তি পরীক্ষার যোগ্য হতে হয়; সেখানে গত তিন বছরে পরীক্ষায় ৮০ শতাংশেরও বেশি পরীক্ষার্থী ন্যূনতম পাস নম্বরও পায়নি। মাত্র ২০ শতাংশ বা এর চেয়েও কমসংখ্যক শিক্ষার্থী ন্যূনতম পাস নম্বর অর্জনে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরাই হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, যেখানে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রতিবছর পরীক্ষার্থীদের রীতিমতো যুদ্ধে নামতে হয়। এরপরও ন্যূনতম নম্বর না পেয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, এটা খুবই আশঙ্কাজনক। বিষয়টি উদ্বেগজনক এ কারণে যে, এই পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সারাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল করেন। দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী মনে করা হয় তাদের। এর অর্থ দাঁড়ায়, দেশের সর্বোচ্চ ফলাফলের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মেধাবী এই শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। ভাল ফলাফলের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান যে বাড়ছে না, তা সন্দেহাতীত।

একই সঙ্কট দেশের সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থীর আশ্রয়স্থল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও। গত বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১১ সালের অনার্স পার্ট-১ পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মানের করুণ চেহারাটি। ওই পরীক্ষায় শতকরা ৪৬ ভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে, যারা দ্বিতীয় বর্ষেই ওঠার অযোগ্য হয়। যাদের বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী পাঁচটিরও বেশি কোর্সে ফেল করেছে। তবে একপর্যায়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা প্রমোশনের জন্য আন্দোলন শুরু করলে পরীক্ষায় অবতীর্ণদের মধ্যে যারা সর্বোচ্চ ৫টি কোর্সে শতকরা ৪০ নম্বরের নিচে অর্থাৎ ‘এফ’ গ্রেড পেয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিশেষ বিবেচনায় শর্তসাপেক্ষে দ্বিতীয় বর্ষে প্রমোশন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের প্রায় ২৭ হাজার কলেজের আশ্রয়স্থল এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী ডিগ্রী নিয়ে বের হলেও তাদের জন্য কোথাও ক্রেডিট ট্রান্সফার করে পড়ালেখার সুযোগ নেই। নেই দেশ-বিদেশের কোথাও ক্রেডিট সমন্বয়ের সুযোগ।

অথচ আজকাল বহু অখ্যাত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়েও আছে এ সুবিধা। দেশের বিভিন্ন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অরাজকতা বিরাজ করছে। কী শিক্ষার মান, পরীক্ষা পদ্ধতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা আর সুশাসনÑ সব ক্ষেত্রেই একই পরিস্থিতি। আর এ কারণে এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই। যে কারণে সম্মিলিতভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্নাতকদের ওপর। অধিকাংশ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন’ (ইউজিসি) এমন পর্যবেক্ষণই তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট প্রকাশিত দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ‘হাই ইউনিভার্সিটি এনরোলমেন্ট, লো গ্র্যাজুয়েট এমপ্লয়মেন্ট’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে গত এক দশকে উচ্চশিক্ষার হার বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সরকারী মনোযোগ এর কারণ। প্রতিবছর সরকারী-বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হন। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে স্নাতক ডিগ্রীধারীর ৪৭ শতাংশই বেকার। ব্রিটিশ কাউন্সিলের জন্য তৈরি ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চশিক্ষার প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দক্ষ জনবলের তীব্র সঙ্কট রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ইংরেজী ভাষায় দখল কম, মৌলিক জ্ঞানের অভাব, কারিগরি জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানে দক্ষতার দুর্বলতা থাকায় তারা জনবল সঙ্কট পূরণে অবদান রাখতে পারছেন না।

সুপারিশ শিক্ষাবিদদের ॥ সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বসেছিল দেশের শিক্ষাবিদদের পরামর্শ নিতে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের উদ্যোগেই বসেছিল এ বৈঠক। যেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয় দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের। বৈঠকে দেশের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশিষ্টজনরা। পাসের হার বাড়ছে, কিন্তু মান পড়ে যাচ্ছেÑ মন্তব্য করে তারা বলেছেন, পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার করা উচিত। ভাবার সময় হয়েছে গ্রেডিং পদ্ধতি নিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলছিলেন, শিক্ষাবিদদের পক্ষ থেকে শিক্ষার মান বাড়ানো, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, মাদ্রাসা শিক্ষা, পরীক্ষা পদ্ধতিসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আইটির (ইনফরমেশন টেকনোলজি) ব্যবহার এবং সাজাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আউটলাইন এসেছে জানিয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, টেকনোলজি ব্যবহার করে কিভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস এড়ানো যায় তা আলোচনা হয়েছে। আমাদের দেশের প্রশ্ন প্রণয়ন পদ্ধতি এনালগ থাকলেও, চোরের প্রশ্ন ফাঁসের পদ্ধতি ডিজিটাল হয়েছে। এটা নিয়ে ভাবা জরুরী।

এদিকে শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ জনকণ্ঠকে বলছিলেন, শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে এখন সবচেয়ে বড় অন্তরায় আর্থিক নয়, শিক্ষা প্রশাসন। প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করা না হলে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বদলি ও অন্য প্রয়োজনে শিক্ষকদের সারাক্ষণ সচিব-মন্ত্রীদের কাছে দৌড়াতে হয়। তাহলে শিক্ষাদান কার্যক্রম কে চালাবেন? ড. খলীকুজ্জমান শিক্ষার মানোন্নয়নের নামে অপচয় বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, ফালতু প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ধার করে শিক্ষকদের মাত্র দুই দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে না।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো যাবে না বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এমএম আকাশ। তিনি বলেন, মান বাড়াতে হলে পিএসসির আদলে সরকারীভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষকের উপযুক্ত বেতনও দিতে হবে। তিনি বলেন, গরিবরা মাদ্রাসায় পড়বে, বড়লোকরা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়বে, আর মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা পাবলিক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। এই তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রেখে জাতীয় ঐক্য গড়া যাবে না।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলছিলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান মাধ্যমিককেও নিয়ন্ত্রণ করে এবং এই দুই স্তরের শিক্ষায় দুর্বলতা উচ্চশিক্ষায় প্রভাব ফেলে। প্রাথমিক থেকেই গলদটা রয়ে যাচ্ছে। যে পরীক্ষা হচ্ছে তাতে শিক্ষার্থীর দক্ষতার সকল মানদ- যাছাই করা হচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবীর বলছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলের পর মান নিয়েতো প্রশ্ন আসছেই। তবে একই সঙ্গে আমার মনে হচ্ছে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত ভর্তি পরীক্ষাকে আয়ত্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সৃজনশীল হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বিষয়টিতে ভালভাবে জানছে। নিজের মতো করে উত্তর দিচ্ছে তা ঠিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে তারা তাল মেলাতে পারছে না। তাই ভাবার সময় হয়েছে শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও। ন্যাশনাল কারিকুলাম এ্যান্ড এ্যাসেসমেন্ট কনসালটেন্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. সিদ্দিকুর রহমান মনে করেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ ও স্বচ্ছতা জরুরী। আমাদের এখন তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো আকর্ষণীয় ও সন্তোষজনক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও সুষ্ঠু করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের বর্তমান ধারার সংস্কার করতে হবে। তিনি আরও বলছিলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সমস্যা হলোÑ আমরা পরীক্ষা বাড়াচ্ছি, অথচ দুনিয়ার সব দেশে কমানো হচ্ছে।

প্রকাশিত : ১ জুন ২০১৫

০১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: