কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সর্বোচ্চ কাজটাই করার চেষ্টা করেছি

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • -মুনতাসীর মামুন

মুনতাসীর মামুন। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক। তিনি দু’হাতে লেখেন না- লেখেন দশ হাতে এ রকম কথা প্রচলিত আছে এপার বাংলায় ওপার বাংলায়। তাঁর রয়েছে একাধিক পরিচয়। তিনি তাঁর প্রতিটি পরিচয়ে সফল।

তিনি পূর্ব বাংলার ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় দেশে-বিদেশে প্রশংসিত ও অগ্রবর্তিত। উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গে সমাজ সংস্কৃতি নিয়ে ইতিহাস রচনায় তিনি পথিকৃৎ। তিনি ঢাকা বিষয়ক গবেষণায় পথপ্রদর্শক। পাইওনিয়ার। তিনি প্রবন্ধ, ছোটগল্পে সুনিপুণ। তিনি চিত্রকলা নিয়ে লেখেন। তিনি সমালোচনা সাহিত্যে তুখোড়। তিনি ভ্রমণবিষয়ক লেখালেখিতে সিদ্ধহস্ত। তিনি পূর্ববঙ্গের সিভিল সোসাইটি ও ব্যুরোক্রেসিবিষয়ক গবেষণায় পটু। তিনি সমকালীন রাজনীতি, সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ, মৌলবাদীদের অজানা অধ্যায় লেখায় পারদর্শী। তিনি রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তিনি সমকালীন বিশ্লেষক। এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও লেখক।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর বিশাল রচনা তাঁকে সমসাময়িক সময়ে সবার চেয়ে আলাদা করেছেÑ করেছে স্বতন্ত্র, খ্যাতিমান হয়ে উঠেছেন তিনি মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হিসেবে। তাঁর রচিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ দলিল হিসেবে স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, দু’টি প্রজন্মকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ মনস্ক করে তুলতে অবদান রেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে তাঁর রচনা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। তাঁর কঠোর সমালোচকরাও এ কথা কায়মনোবাক্যে কবুল করে নেন যে, মুনতাসীর মামুন এক জীবনে যতগুলো ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন তাঁর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখালেখি অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে তিনি অসাধারণ, অনবদ্য, মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পাকিস্তানি জেনারেলদের মন, মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধের ছিন্ন দলিলপত্র, রাজাকার সমগ্র, ইয়াহিয়া খান ও মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭১ চুকনগরে গণহত্যা, একাত্তরের বিজয়গাথা, পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেলদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে ১৯৭১, বাংলাদেশ চর্চা, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, বলে যেতে হবে মুক্তিযুদ্ধের গাঁথা, মুক্তিযুদ্ধ কোষ, [১২ খ-] যেসব হত্যার বিচার হয়নি, রাজাকারের মন, সেইসব পাকিস্তানি মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র [২ খ-], বঙ্গবন্ধু কীভাবে স্বাধীনতা এনেছিলেন, ১৩নং সেক্টর, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের কথা, কিশোর মুক্তিযুদ্ধ কোষ, শান্তি কমিটি ১৯৭১, বীরাঙ্গনা ১৯৭১, যে দেশের রাজাকার বড়, আলবদর ১৯৭১, গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ [ ২২ খ-, সম্পাদনা], ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা [২১ খ-; সম্পাদনা]। শান্তি কমিটি ১৯৭১, আলবদর ১৯৭১, গণহত্যা ১৯৭১ ইত্যাদি।

গত চার দশক ধরে উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গ, ঢাকাবিষয়ক গবেষণা, চিত্রকলা, সমালোচনা, গল্প-উপন্যাস, অনুবাদ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ সংবাদ ভাষ্যকার সর্বোপরি অধ্যাপনা এসব নিয়ে তো আপনার প্রচ- ব্যস্ততা-মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও আপনার লেখা আছে। কিন্তু গত দেড় দু’দশক ধরে আপনাকে দেখা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনি একাগ্রভাবে, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

মুনতাসীর মামুন : বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গবেষণার বিষয় ছিল উনিশ, বিশ ও একুশ শতকের পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ ও ঢাকা শহর। সে সময়ের পূর্ববঙ্গের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা ও গবেষণা করতে গিয়ে আমি বেশ রোমাঞ্চিত হই। পূর্ববঙ্গের গবেষণা করতে গিয়ে বিশেষ করে ঢাকাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হয় আমাকে। আমার জন্ম পুরান ঢাকার ইসলামপুরের আশেক লেনে। জন্ম থেকেই এই শহরের প্রতি আমার এক ধরনের ভালবাসা রয়ে গেছে। এখন অবশ্য তা হ্রাস পাচ্ছে। কারণ সবাই মিলে এখন ঢাকাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম শহর করে ফেলেছে। তবুও বলতে হয়, প্রথম প্রেমের রেশ তো সবসময় থেকেই যায়।

পূর্ববঙ্গের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস গবেষণার সময় আমার প্রাসঙ্গিক বিষয় ছিল ঢাকা। পাশাপাশি দেশের সিভিল সমাজ, বৈদেশিক সম্পর্ক, আমলাতন্ত্র সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়েও কাজ করতে হয়েছে। এসব কাজ করতে। আমি সবসময় মনে করেছি মানুষের সামনে অনালোকিত সত্য ও তথ্যকে নতুন করে তুলে ধরতে। নতুন প্রজন্মের সামনে যদি প্রকৃত সত্য ইতিহাস ও ঘটনা না থাকে তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা অপূর্ণ রয়ে যাবে। আর সত্য ও তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস না থাকলে জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথও মসৃণ হয় না।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে এদেশের প্রগতিশীল সুশীল সমাজ ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম থেকে শুরু করে আপনার মতো খ্যাতিমান ইতিহাসবিদও এই তালিকায় রয়েছেন। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন।

মুনতাসীর মামুন : আসলে পঁচাত্তরের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টিকেই আমাদের শাসকরা বিতর্কিত করে তুলেছিল। এই বিতর্কের কাজটা তারা পরিকল্পিতভাবেই করেছে। নতুন প্রজন্মের সামনে বিভ্রান্ত রাজনীতি আর নীতি-নৈতিকতাবিবর্জিত মানুষগুলোকে বড় করে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে তারা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণে অগ্রসর হতে থাকেন। কিন্তু একটা সময় মানুষের কাছে তাদের মনোবাঞ্ছার পূর্বাপর পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা বিএনপির সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ধরে ফেলে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য কথাটা বলেছেনÑ রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তারা প্রকৃত সত্য ইতিহাসটা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। এ জন্য আমি, শাহরিয়ার কবিরসহ আরও বেশ কয়েকজনকে মামলা, হামলা ও কারাভোগও করতে হয়েছে।

বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনার মতো এত বিশাল আয়তনে আর কেউ লেখালেখি করেনিÑ তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই বিশাল পরিমাণ লেখা কী কারণে লিখলেন?

মুনতাসীর মামুন : আমি জীবনে কখনও আদর্শের সঙ্গে সমঝোতা করিনি। আমি যখন সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে চুয়াত্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি তখন বেশ টেনশনের মধ্যে ছিলাম। গবেষণা করার মধ্য দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করবÑ এমন প্রতিজ্ঞা নিয়ে এ কাজে ব্রত হলাম। পূর্ব বাংলা নিয়ে কাজ করতে করতে সামনে চলে এলো নানা বিষয়। বাম রাজনীতি করার কল্যাণে নীতি-আদর্শ নিয়ে কাজ করার অভিপ্রায় তো ছিলই। আমি যখন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি তখন কিছু বৈরী পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল আমাকে। বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম। সে সময় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আমাকে একটা কথা বলেছিলেন যা সবসময় আমি মেনে চলিÑ তা হলো তুমি যদি অধ্যবসায় আর পরিশ্রম কইরা যাও তাইলে দেখবা তুমি একদিন না একদিন সাকসেসফুল হইবাই হইবা। স্যারের সেই কথাটা আমি সবসময় মেনে চলি। আমি বিশ্বাস করি আমি যদি আদর্শ, নীতি ঠিক রেখে কাজ করে যাই তাহলে কোন সমস্যাই সমস্যা হিসেবে আমার সামনে ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি আমার বিশ্বাস থেকে, আদর্শ থেকে সর্বোচ্চ কাজটাই করার চেষ্টা করে গিয়েছি। সত্য ঘটনা, অজানা কাহিনী, অনালোকিত অধ্যায়, সত্য তথ্য সেই সাধারণ মানুষের সামনে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেছি।

একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায় এই বইটি বের হওয়ার পর থেকে সাধারণ মানুষ বেশ সজাগ হয়ে ওঠেন। সোচ্চার হয়ে ওঠেন। মূলত এই বইটি স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের স্তিমিত হয়ে যাওয়া আগ্রহ, কৌতূহল আর তৃষ্ণাকে শতগুণে বাড়িয়ে দেয়। এ বইটি বের হওয়ার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়টি মানুষকে এর প্রতি উসকে দেয়। এ বই প্রকাশের কৃতিত্ব শাহরিয়ার কবিরের। তারই ধারাবাহিকতায় বের হতে থাকে এ সংক্রান্ত নানা ধরনের গবেষণা, ইতিহাস, পর্যালোচনা। আমি যখন সাংবাদিকতা শুরু করি তখন সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ভ্রমণ, সমালোচনার পাশাপাশি আমার পছন্দের বিষয় ছিল অজানা তথ্য আর অনালোচিত অধ্যায়ের উন্মোচন করা। আমি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার অজানা তথ্য আর অনালোকিত অধ্যায়ের ডকুমেন্টেশন করার চেষ্টা করেছি। পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, স্বৈরাচারী সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আমি মনে করেছি আমার একমাত্র প্রধান কাজ হবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রকৃত ঘটনা, সত্যকে আবিষ্কার করা, আমার গবেষণার পাশাপাশি আমি একই পরিমাণ মনোযোগ দিয়েছি এ বিষয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুধু বড়দের বিষয় না বরং তা কোন কোন ক্ষেত্রে ছোটদের জন্য আরও বেশি অপরিহার্য বিষয়Ñ এই বিষয়টা মাথায় রেখে আমি যতটা সম্ভব এ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। জানি না কতটুকু করতে পেরেছি।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনি যে পরিমাণ কাজ আর গবেষণা করেছেন তা রীতিমতো ঈর্ষার পর্যায়ে চলে গেছে বলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক সমালোচকরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?

মুনতাসীর মামুন : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি আর কী এমন কাজ করেছি! অন্যরা আমার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছেন। তবে কৃতিত্ব যদি দিতে হয় তা’হলে একটি কাজের জন্য তা দেয়া যেতে পারে তা’হলো মুক্তিযুদ্ধকোষ । আমি যখন প্রথম এর পরিকল্পনা করি তখন এ নিয়ে সবাই হাসাহাসি করেছিলেন। কিন্তু আমি আমার ছাত্র ও সহকর্মীদের নিয়ে স্বেচ্ছা পরিশ্রমের ভিত্তিতে প্রথমে পাঁচখ-ে কাজটি সমাপ্ত করি। তার বছর পাঁচেক পর ১২ খ-ে প্রায় ৮৫০০ পৃষ্ঠায় কাজটি শেষ হয়। ১২ খ- প্রকাশের ব্যাপারে সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমদকে কৃতিত্ব দিতে হয়। ঝুঁকি নিয়ে কাজটি তিনি করেছেন। বাংলাদেশে এ ধরনের কাজ প্রথম যা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে করার দরকার ছিল। অর্থমন্ত্রী তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রীকে ৫০০ কপি কেনার অনুরোধ করেছিলেন। সে অনুরোধ রাখা হয়নি। শিক্ষা-সংস্কৃতি মন্ত্রাণালয় অনেককে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে আমরা কোন সহায়তা পাইনি। কিন্তু সেই একই মন্ত্রণালয় এশিয়াটিক সোসাইটিকে এখন কয়েক কোটি টাকা দিয়েছে কয়েক খ-ে এ বই বের করার। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু এখানে গবেষণা তা প্রকাশ করতে যে কত কাঠখড় পোড়াতে হয় তার উদাহরণ দিলাম এবং মন্ত্রীরা যে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ভালবাসেন এটি তার প্রকৃত উদাহরণ।

আমি মনে করি যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী তাদেরও মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানা দরকার। রাজাকারের মন, পাকিস্তানি জেনারেলের মন, মুক্তিযুদ্ধে ১৩ নম্বর সেক্টর, ২৩ খ-ে গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, সেইসব পাকিস্তানী লিখে বেশ ভাল লেগেছে।

শাহরিয়ার কবির বলছিলেনÑ আপনি আরও দু’টি বড় কাজ করেছেন। গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা এ বিষয় দুটি সম্পর্কে বলবেন?

মুনতাসীর মামুন : বিএনপি-জামায়াত আমলে যখন স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক, মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের বিকৃতায়ন শুরু হলো তখন আমার মনে হলো সেই সময়ে প্রকাশিত দেশী-বিদেশী পত্রিকার যদি বিষয়ভিত্তিক সংকলন করা যায় তা’হলে তা দলিলপত্র হিসেবে থেকে যাবে। কারণ প্রজন্ম বা যাঁরা গবেষণা করবেন তাঁরা দেখবেন যে, সমসাময়িক কোন বিবরণে জিয়ার নাম নেই। আমি আমার ছাত্র-সহকর্মীদের নিয়ে কাজটি শুরু করি। গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থমালার আমি সম্পাদক তবে এর ২২ খ-ের অনেকগুলো সংকলন করেছেন আমার সহকর্মীরা। তবে সিংহভাগ সংকলন আমার। এই অলাভজনক কাজটি করেছেন অনন্যার মুনিরুল হক। তার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। এই ২২ খ- ও শিক্ষা/ সংস্কৃতি/ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যদি দেশের বিভিন্ন কলেজে পাঠায় তা’হলে সবাই উপকৃত হবেন। আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র সংকলনের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় কাজ।

আপনি বোধহয় জানেন যে খুলনায় আমরা ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর স্থাপন করেছি। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রথম। আমি এর সভাপতি। শাহরিয়ার, হাশেম খান, তারিক সুজাত, ডা. বাহারুল আলম প্রমুখ ট্রাস্টি। যখনই ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতে লাগল তখন আমার মনে হলো এ ক্ষেত্রেও প্রপার ডকুমেন্টশন করা দরকার। নতুন উদ্যোগ নিলাম গণহত্যা ইনডেস্ক বা গণহত্যা নির্ঘণ্ট প্রকাশনের। এ পর্যন্ত ২০টি গণহত্যার ওপর বই প্রকাশিত হয়েছে এবং এগুলোর লেখকরা সবাই নবীন। সরেজমিনে গিয়ে তারা কাজ করেছেন। এ প্রকাশনা নির্ভর করে অনুদানের ওপর। সুতরাং বলতে পারব না কতদিনে তা প্রকাশিত হবে। এ সিরিজের নাম ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা। আমি এর সম্পাদক।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকেই পরিকল্পিতভাবে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে (ভিন্ন মতাবলম্বী, ভিন্ন মতাদর্শী) বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এসব থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

মুনতাসীর মামুন : শুধু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেন, কিছু কিছু জ্ঞানপাপী নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদের মতো করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন তাদের সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই। তারা এটা ছড়াবেই। এখন যে বুদ্ধিজীবী জামায়াত কিংবা বিএনপি সমর্থন করে তাদের কাছে শুদ্ধ ইতিহাস আশা করা বোকামি! আমি এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না।

ডা. জাফরউল্লা চৌধুরীর মতো লোক যখন বলেন, কামারুজ্জামানের মতো আলবদর খুনীর কাছে জাতির মাফ চাইতে হবে তখন বোঝেন অবস্থাটা কী! এইসব ইতরামির কী মানে জানি না। হয়ত এ কথা সত্যি যে, জামায়াত প্রচুর টাকা দিচ্ছে অনেককে এসব বলার জন্য। তবে এটা ঠিক যে অন্তিমে এরা আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হবেন। তবে হ্যাঁ পাঠক এক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা। পাঠককে সত্য জিনিসটা বের করে পড়তে হবে।

আজকাল অনেক অনভিজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অন্যের বই থেকে কেটে ছেঁটে ভুলভাল তথ্য দিয়ে এ বিষয়ে বই লিখছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য বই বিক্রি মুক্তিযুদ্ধের বই বাজারে বেশি বিক্রি হচ্ছে। অসাধু চক্রটি এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে। এতে করে কী ক্ষতি হচ্ছে?

মুনতাসীর মামুন : আমি বিষয়টিকে এভাবে দেখতে চাই। তাহলো যে মানুষটা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেভাবে হোক বই লিখে, বের করে বিক্রি করছে সে তো কোন অপরাধ করে ফেলেনি। মুক্তিযুদ্ধের বই বিক্রি হচ্ছেÑ বিষয়টি তো খুব পজিটিভ। আর যে লেখক এসব করে পাঠকের হাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে দিচ্ছেন তাঁকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে কারণ সে তো আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে চাকরির বয়স বাড়িয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে না কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননার ক্রেস্টে নকল সোনা মিশিয়ে দেশের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে না।

২১ মে, বাংলাদেশে প্রথম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিয়ে কলেজ পর্যায়ে পরীক্ষা হলো। এ ক্ষেত্রে আপনার অগ্রণী ভূমিকা সর্বজনবিদিত। কেমন লাগছে আপনার?

মুনতাসীর মামুন : ইতিহাস বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস সর্বস্তরে অবশ্য পাঠ্য করার আন্দোলন দীর্ঘ দিন আমি করে আসছি। আমার সঙ্গে মেসবাহ কামাল, মো. সেলিম, প্রয়াত আতাহার, মাহবুবর রহমান, বাহার প্রমুখ ছিলেন। বছর তিনেক আগে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী গঠন করে আমরা সংসদীয় কমিটির কাছে আবেদন করি। পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম ইতিহাস পড়ানোর জন্য সংসদীয় কমিটির কাছে আবেদন করা হয়। তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এখনই সর্বস্তরে তা চালু হোক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন তখন উদ্যোগ নিয়ে এটি চালু করেন। এই প্রথমবার ২০ লাখ ছাত্র এ বিষয়ে পরীক্ষ দিচ্ছে। ৫ বছর যদি তা অব্যাহত থাকে তখন ১ কোটি তরুণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়বে। এর অভিঘাত তখন অনুধাবন করবেন। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কখনও সহায়তা করেনি যদিও কাজটি ছিল তাদের।

আপনি তো অনেক বিষয় নিয়ে লিখেছেন যেগুলো সবই স্বীকৃতি পেয়েছে ও বহুলভাবে পাঠকনন্দিত। পাঠকের কাছে আপনি আপনাকে কোন্ পরিচয়ে পরিচিত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন?

মুনতাসীর মামুন : এখানেই আমার বিপদ। আমি তো আসলে অনেক মাধ্যমে কাজ করেছি। কোন্ পরিচয়ে পাঠক আমাকে, আমার কাজকে চিহ্নিত করবে সেটা পাঠকই ঠিক করবেন। এ বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। তবে সব মিলিয়ে আমি একজন লেখক, সেটিই বোধহয় পরিচয়।

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: