আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারী যখন একক অভিভাবক

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

আনোয়ারা বেগম। বয়স এখন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। থাকেন রাজধানীর কাজীপাড়া। বিয়ের পর থেকে আপাদমস্তক গৃহিণী। বিয়ে হয়েছে অনেক বছর। সেই ক্লাস নাইনে থাকা অবস্থায়ই বিয়ের হলুদ গায়ে পরে। বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় বাল্যবিয়ে হলেও সেই সময়ে এটা তেমন ধর্তব্যের মধ্যেই ছিল না। মেয়ে ‘বড়’ হয়েছে বিয়ে দিতে হবে- এটাই যেন ছিল নিয়ম। বেশ সচ্ছল ও বনেদি পরিবারে তার জন্ম। পাত্র হিসেবে হাশেম সাহেবও সে সময়ের প্রেক্ষিতে ‘দামি’। ইঞ্জিনিয়ার পাত্র হওয়ায় অভিভাবকরা আর বেশি দেরি করেননি। তার ওপর আবার সে সময়ে ঢাকায় পাত্রপক্ষের ছিল বাড়ি। এমন বাস্তবতায় পাত্রের বয়সের দিকে না তাকিয়ে দিয়ে দিলেন বিয়ে। হয়ে গেল বয়সের দিক দিয়ে এক অসম সামাজিক বন্ধন। বেশ ভালই কাটছিল তাদের দাম্পত্য জীবন। পরিকল্পিত পরিবার। এক ছেলে এক মেয়ে তিন বছরের ব্যবধানে। এর মধ্যে বৈষয়িক উন্নতিও হয়েছে হাশেম-আনোয়ারা দম্পতির। বাড়ি হয়েছে চারতলা। পাশেই আরেকটি জায়গা কিনে বানিয়েছেন টিনশেড বাড়ি। ভাড়া দিয়ে বেশ ভালই আয় হয়। স্বামীর আয় তো আছেই। ছেলে তমাল বুয়েটে ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেয়ে তমা একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছে প্রথম বর্ষে। আনোয়ারা বেগম ঘর গৃহস্থালি নিয়েই কাটিয়েছেন এতদিন। সহজ-সরল মানুষ, বাইরের ব্যাপারে কিছুই ভাল বোঝেন না। খোঁজখবর রাখারও প্রয়োজন বোধ করেননি কোনদিন। এত সুখের মাঝে হঠাৎ বজ্রপাত। সুখ বুঝি সইল না। হাশেম সাহেব স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আনোয়ারা বেগম কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কীভাবে একা সামলাবেন এতবড় সংসার!

কেসস্টাডি-২

মাধুরী রানী দত্ত কর্মজীবী। একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন শরীয়তপুর শহরে। স্বামী রাজেন দত্তও চাকরি করেন বরিশাল জেলায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক অফিসে। সাত ও দশ বছরের দুটি মেয়ে, থাকে মাধুরীর কাছে। দু’জনের আয়ে মোটামুটি ভালই চলে সংসার। প্রায় প্রতি সপ্তাহে রাজেন ছুটির দিনে আসেন স্ত্রী ও সন্তানের টানে শরীয়তপুর। এ পরিবারেও ঘটল এক মর্মান্তিক ঘটনা। লঞ্চযোগে স্বামী বরিশাল থেকে শরীয়তপুর আসার পথে ডুবে যায় বাহন। অনেকের সঙ্গেই ঘটে তাঁর সলিল সমাধি। আজীবনের অকহতব্য কষ্ট তাঁর; স্বামীর মৃতদেহটাও পেলেন না, পেলেন না শেষ দেখাটি। মাধুরীও পড়লেন যেন মহাসাগরে। দুটি নাবালিকা সন্তান এখন তাঁর কাঁধে। শুধু ভবিষ্যত নিয়েই চিন্তা নয়, চিন্তা তাঁর ধর্মীয় রীতি অনুসারে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়েও।

দুটি ঘটনাই নিঃসন্দেহে মর্মস্পর্শী। একটি পরিবার থেকে একজন কর্তা না থাকার পরিণতি হয়ত সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করা যায় না। দিন যায়, আর তার অভাব বার বার সামনে এসে দাঁড়ায়। দুটি ঘটনাতেই প্রকারান্তরে নয়, সরাসরি সংসার ও সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং দায় এসে পড়ে নারীর কাঁধে। আনোয়ারা বেগমের কথাই যদি ধরা হয় তা হলে তার দৃশ্যমান দায়িত্বগুলো একটু কল্পনা করলেই দাঁড়ায় এমন- প্রথমত, স্বামীর রেখে যাওয়া সহায় সম্পদ রক্ষায় তাঁকে থাকতে হবে সদাসতর্ক। খাজনা, রাজস্ব, নানাবিধ কর, বাড়িভাড়া তোলা, বাজার থেকে শুরু করে রান্নাঘর তদারকি করা, সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো, নিরাপত্তার বাড়তি চিন্তা, তাদের শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচাদির যোগান ইতকার বাড়তি চাপ কিন্তু তাঁকেই বহন করতে হয়। কিছু কিছু কাজ লোকমারফত করানো গেলেও পরিচালনা বা নেপথ্য কর্মটা তাঁকেই করতে হচ্ছে। এ সবের অনেক কিছুই কিন্তু সংসারে নারী কর্তা না থাকলে পুরুষকে বহন করতে হতো না। এখানে নারীর কাঁধে পড়ছে অধিক ভার।

অন্যদিকে মাধুরীর বিষয়টি একটু জটিল বৈকি। তাঁকে তাঁর চাকরি বাঁচাতে হবে প্রথমত বাঁচার তাগিদেই। অন্যের গলগ্রহ হবে না বলে আত্মপ্রত্যয়ী উচ্চশিক্ষিত মাধুরীর এই চাকরি নেয়া। এরপর সামলাতে হবে দুটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক কন্যাসন্তানকে। কন্যা নিয়ে প্রত্যেক মা-বাবার থাকে বাড়তি চিন্তা। এটা আমাদের সমাজের চরম সত্য ও বাস্তবতা। বাবার চেয়ে মায়ের চিন্তাটাই থাকে বেশি। এ ক্ষেত্রে মাধুরীর ঘাড়ে চাপছে দ্বিগুণ চিন্তা আর দায়িত্ব। নিজেদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিজ ও কন্যাসন্তানের উত্তরাধিকার প্রশ্ন তাঁর মাথায় কুরে কুরে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। দুটি ঘটনাই সমাজের সামগ্রিক চিত্র নয়, আবার কোন খ-াংশ বা বিচ্ছিন্নও নয়। তবে এ ক্ষেত্রে নারীর দুর্দশার চিত্রই ফুটে ওঠে- এ সত্যটা উপলব্ধি করা দরকার। নারী এখানে অনেক বড় দায়িত্ব পালন করছে। কোথাও দৃশ্যমান হচ্ছে, কোথাও হচ্ছে না। এক কথায় বলতে গেলে নারী এখানে একক অভিভাবক। স্বামী বেঁচে থাকতে যেখানে সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব শতকরা ৫০ বা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ বহন করতেন, এখন তাঁকে বহন করতে হচ্ছে শতভাগ। এ সত্যটা সবাইকে স্বীকার করতে হবে। তবে কথা হলো- দ্বিগুণ দায়িত্ব বহন করার শক্তি, সামর্থ্য, নির্বিঘœ পরিবেশ কি চলমান সমাজ নারীকে দিয়েছে, এ প্রশ্নটা অনায়াসেই করা যায়। এমন গুরু ও পূর্ণ দায়িত্ব বহনে নারীর কাঁধ কি বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা শক্ত বা দৃঢ় করতে পেরেছে? নতুন করে ভাবা জরুরী।

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: