আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফেসতা দ্য আরাঞ্চা

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

॥ এক ॥

মিলান সেন্ট্রাল স্টেশনের আশপাশের এলাকাগুলো বিদেশীদের দখলে। যদিও এখানটায় বাসা ভাড়া অনেক বেশি, তারপরও বিদেশীরা এখানে ভিড় জমিয়ে থাকে। আমি নিজেও থাকতাাম ওই এলাকায়। আমার এলাকার নাম ভিয়া পিয়েত্রো ক্রেসপি। ভিয়া মানে রাস্তা। একেবারে স্টেশন লাগোয়া। ট্রেন গেলে ঘুম ভেঙ্গে যায়। সপ্তাহখানেক থাকা হয়ে গেলে মিলান স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের শব্দকে ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর সেতার বাদন বলে মনে হবে। অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার একটা ব্যাপার থাকে না! প্রথম কয়েক দিন আমার নিজের ঘুমের অসুবিধা হয়েছিল। পরে ব্যাপারটা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল।

খুব সকালে কাজে বেরিয়ে পড়তে হয়। ক্রেসপি পেরিয়ে লরেত্তো মোড়ে গিয়ে ধরতে হয় মেট্রো। লাল রঙের মেট্রো। তিন ফেরমাতা (স্টপেজ) পরে নামতে হয় সান বাবিলা। সান বাবিলা নেমে মেট্রো চেঞ্জ করে ট্রামে উঠতে হয়। দূর থেকে কাঠের ট্রামগুলোকে যতটা লক্কড়-ঝক্কড় বলে মনে হয়, ভেতরে উঠলে অবাক না হয়ে পারি না। দু’পাশে ঝকঝকে তকতকে কাঠের বেঞ্চি। বেঞ্চির মাঝখানে দাঁড়ানোর প্রশস্ত জায়গা। তাতে দু’লাইনে মানুষজন দাঁড়াতে পারে। তিন-চার হাত দূরে দূরে লোহার মোটা খাম অনেকটা আমাদের পুরান ঢাকার মিউনিসিপ্যালিটির ইলেক্ট্রিক খামের মতো।

ট্রাম থেকে নেমে টের পেলাম ফেব্রুয়ারির ঠা-াটা যতটুকু উবে যাওয়ার কথা ছিল, যায়নি তার কিছুই। একটা শিরশিরে বাতাস। ঠা-া বাতাসের দাপট সামলাতে না পেরে ঢুকে পড়লাম এক বারে। বারের মালিক চিনেজি। মানে চীন দেশীয়। ইদানীং ইতালির বড় বড় শহরের বার, রেস্তরাঁ, ডিসকোটেকা, ম্যাকডোনাল্ড, আলিমেন্টারি শপের বেশিরভাগই কিনে নিচ্ছে নাক বোঁচা চীনারা। এদের শানশওকত আর জেল্লা দেখে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। মনে প্রশ্ন জাগে, এরা এত টাকা পায় কোত্থেকে? ইতালিতে মাফিয়াদের দিনকাল মানে সাম্রাজ্য দিন দিন কমে যাচ্ছে। এখন কি তাহলে ওসবের দখল চলে যাচ্ছে চীনাদের হাতে?

বারে ঢুকতেই কম বয়সী চীনা যুবতী মেয়েটা পুতুলের মতো হেসে দিয়ে বলল, প্লেগো। চীনাদের উচ্চারণগত কিছু সমস্যা আছে। এরা অবলীলায় প্রেগোকে (স্বাগতম) বলে প্লেগো। গ্রাৎসেকে (ধন্যবাদ) বলে গ্লাতসে। ত্রে’কে (তিন) বলে তেলে। এ রকম বহু উচ্চারণ চীনারা ইতালিয়ানদের সঙ্গে নির্বিকারভাবে করে যায়। ইতালিয়ানরা কি নিজেদের মাতৃভাষার এমন অপমান হজম করে? নাকি এর প্রতিবাদ করে না? করে। মন-মেজাজ খারাপ থাকলে চীনাদের ও রকম উচ্চারণের বিপরীতে ইতালিয়ানরা বাজে ভাষায় গালমন্দ করে। চীনারা গালমন্দ খেয়ে হাসে। সহজেই মেনে নেয়। ইতালিয়ানদের মধ্যে অদ্ভুত একটা প্রবণতা আছে যেটা পুরান ঢাকার মানুষদের সঙ্গে মিলে যায়। ইতালিয়ানরা একই সঙ্গে রসিক, আড্ডাবাজ, আন্তরিক আর কথায় কথায় এ ওকে ও একে গালমন্দ করে।

চীনের পুতুল সদৃশ যুবতীর ঠোঁটে তখনও হাসিটা লেগে রয়েছে। হাসিটা সংক্রামক ব্যাধির মতো। ওর দেখাদেখি আমিও আমার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটিয়ে তুললাম। আমি বললাম, নিয়েন্তে (স্বাগতমের কী দরকার), পেরফাভোরে, দাই মে উন কাফফে লাততে আংকে উন ব্রিয়শ (দয়া করে আমাকে এক কাপ দুধ কফি আর একটা ছোট ক্রিমযুক্ত বনরুটি দাও)। বাবেনে (ঠিক আছে) বলে মেয়েটা কফি মেশিনে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। সকালবেলায় কফির তীব্র ঝাঁজালো গন্ধে নাকমুখ বন্ধ হয়ে যায়। বারে কফি মেশিনের গন্ধটা অমার খুব প্রিয়। কফি আর ব্রিয়শ খেয়ে আমি দ্রুত বেরিয়ে পড়ি।

আমি কাজ করি একটা এজেন্সিতে। এই এজেন্সি অনেক রকম কাজ করে থাকে। হোটেল, রেস্তরাঁ, মার্কেট, বড় বড় নাইটক্লাবে নানা ধরনের কাজ থাকে। মাসখানেক ধরে আমি একটা নাইটক্লাবে ক্লিনিংয়ের কাজ করি। ভোর ছয়টা থেকে বেলা এগোরোটা পর্যন্ত কাজ। সারারাত নাচ-গান, পানাহারের পর নাইটক্লাবের বিশাল ফ্লোর, টেবিল-চেয়ার, ডিভান, সোফা ভাল করে পরিষ্কার করতে হয়। আমরা মোট সাতজন এই কাজ করি। তিনজন বাঙালী, একজন শ্রীলঙ্কান, একজন চীনা আর দু’জন সিসিলিয়ান। সিসিলিয়ান হলেও মিকেলে আর ফাবিও কখনও কোন ধরনের ভাব নেয় না। মিকেলে আর ফাবিও ইতালিয়ানের চেয়েও নিজেদের সিসিলিয়ান ভেবে গর্ব করে। মিকেলে আবার গানও গায়- সিসিলিয়ান ফোক গান।

মিকেলের সঙ্গে দেখা হতেই ও আমাকে বলল, রেজা তুত্তো পোস্তো (সব ঠিকঠাক)?

আমি বললাম, পেরকে নো (কেন নয়)?

ফাবিওকে দেখছি না। দোভে ফাবিও (ফাবিও কোথায়) মিকেলেকে জিজ্ঞাসা করতেই ও বলল, ইয়েরি লুই আন্ধাতা ইভরিয়া (গতকাল ও ইভরিয়া গেছে)। দোপো দোমানি ভাদো আংকে ও (দু’দিন পর আমিও ওখানে যাব)।

পেরকে (কেন)?

ফেসতা দ্য আরাঞ্চা (কমলা উৎসব)

ফেসতা দ্য আরাঞ্চা! শুনে আমি বেশ অবাকই হলাম। দশ বছর হলো জীবনের না মেলানো হিসাব মেলানোতে ব্যস্ত মিলানোতে কিন্তু কখনও এ রকম উৎসবের নাম শুনিনি। স্পেনের ফেসতা দ্য টমাটিনোর (টমেটোর উৎসব) কথা শুনেছি। ক্যাটরিনা কাইফ, হৃত্বিক রোশন আর ফারহান আখতারের ‘জিন্দেগী না মিলে দোবারা’ ছবিতে স্পেনের টমেটো উৎসবের চমৎকার পিকচারাইজেশন দেখেছি। ছবির গানগুলো মনে রাখার মতো অসাধারণ।

মিকেলে আমার পেছনে দাঁড়ানো মিংকে দেখে বলল, ফেসতা দ্য আরাঞ্চা- দিম্মি তু।

নাক বোঁচা মিং কোন কথা বলল না। শুধু হাসল। মিং জানে মিকেলে ওর সঙ্গে ফাজলামো করছে। ‘ফেসতা দ্য আলাঞ্চা’ বলে মিং কোন ঝামেলায় পড়তে চায় না। চীনাদের প্রথম দেখায় যে কেউ বোকা বলে ধরে নিতে পারে। চোখে-মুখে একটা গোবেচারা ভাব ফুটিয়ে রাখলেও চীনারা ভেতরে ভেতরে খুব ধূর্ত। ধুরন্ধর। কিন্তু তারা সেটা প্রকাশ করে না।

মিং একটু কাঁচুমাচু খেয়ে যায়। আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেল। নাইটক্লাবের ক্লিনিংয়ের কাজে একটা বাড়তি উপার্জনের সম্ভাবনা থাকে। তা হলো- ফ্লোরে, ডিভানের নিচে, সোফার ওপর, কোনাকাঞ্চিতে নগদ ভাংতি ইউরো পাওয়া যায়। রাতের বেলা যারা নাইটক্লাবে আসে তারা ভুল করে খুচরা কয়েন ফেলে রেখে যায়। প্রতিদিনই তিন-চার ইউরো, কখনও-সখনও বিশ-ত্রিশ ইউরোও পাওয়া যায়। তাতে পুরো মাসের কফি, সিগারেট, বাস-মেট্রো-ট্রামের খরচটা উঠে আসে।

মিকেলেকে আমি কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বললাম, মিও ভলিও সাপেরে দ্য কোয়েস্তা ফেসতা (আমি তোদের এই উৎসব সম্পর্কে জানতে চাই)।

কাজ শেষ হলে মিকেলে আমাকে ফেসতা দ্য আরাঞ্চা সম্পর্কে বেশ হাত-পা-শরীর নাড়িয়ে নাড়িয়ে বয়ান করল। ইতালিয়ানদের হাত-পা বেঁধে দিলে এদের কথা বলা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ ইতালিয়ানরা হাত-পা-শরীর না নাড়িয়ে কথা বলতে পারে না। এটা ইতালিয়ানদের এক নম্বর মুদ্রাদোষ। ইতালিয়ানরা যখন কথা বলতে শুরু করে, তখন এদের মাত্রাতিরিক্ত হাত-পা নাড়ানো দেখে মনে হয় এদের সারা শরীরও বুঝি কথা বলে! মিকেলেও সেই কসরত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারল না।

॥ দুই ॥

ইভরিয়া।

উত্তর ইতালির একটি প্রাচীন শহর। বেশ ছিমছাম। ইউরোপের সব শহরই বেশ গোছানো আর পরিপাটি। দেখলে মনে হয় এক্ষুনি বুঝি কেউ এই শহরটাকে ব্যান্ড-বক্স ধোলাই দিয়ে পরিষ্কার করে গেছে। আর শহরের মানুষগুলোও শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধোপদুরস্ত। ইভরিয়া শহরে ত্রয়োদশ শতক থেকেই এই কমলা উৎসবের সূচনা। ব্যাটল অব দ্য অরেঞ্জ নামে বহির্বিশ্বে এর প্রচার রায়েছে। ঐতিহাসিকদের মধ্যে এই উৎসবের প্রেক্ষাপট নিয়ে মতদ্বৈধতা রয়েছে। তবে এই উৎসব নিয়ে সর্বাধিক প্রচারিত একটি জনশ্রুতি রয়েছে। ত্রয়োদশ শতকের মন্টফেরাটের মারকুইজ উইলিয়াম (সপ্তম) নামের এক স্বৈরশাসক ছিলেন। মূলত তার পতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই উৎসব। উইলিয়ামের হাত থেকে ইভরিয়া শহরকে মুক্ত করার স্মৃতি হিসেবে এই উৎসব পালন করা হয়। সাধারণত ১৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে এই উৎসব। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উইলিয়াম পূর্ববর্তী রাজাদের মতো অত্যাচারী ছিলেন। ছিলেন দুশ্চরিত্রও। উইলিয়াম তার শাসনকালে নিয়ম করে দেন- রাজ্যের সুন্দরী তরুণীদের বিয়ের আগে বাধ্যতামূলকভাবে তার সঙ্গে রাত্রিযাপন করতে হবে। এর এদিক-ওদিক হলে সেই তরুণীর বিয়ে সমাজে গ্রহণযোগ্য হবে না। উইলিয়ামের এই উদ্ভট নিয়মনীতির বিরুদ্ধে কেউ কিছু না বললেও ‘ভায়োলেটা’ নামের এক তরুণী বিদ্রোহ করে বসল। ‘ভায়োলেটা’ উইলিয়ামের কাছে নিজেকে সমর্পণ না করে নিজ বুদ্ধিতে তার শিরñেদ করল। শুধু তাই নয়, উইলিয়ামের প্রাসাদেও আগুন ধরিয়ে দিল। এটাই হলো ফেসতা দ্য আরাঞ্চার নেপথ্যের ইতিহাস।

প্রতি বছর এই উৎসব এলে ইভরিয়াবাসী একজন তরুণীকে বাছাই করে, যিনি ‘ভায়োলেটা’র প্রতিচ্ছবি। ভায়োলেটার অন্য নামও আছে। মুগনাইয়া। ইতিহাসে ভায়োলেটাকে ইভরিয়া শহরের সাধারণ নাগরিক মিলারের কন্যা বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই উৎসবে ইভরিয়াবাসীর পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক, মিডিয়াকর্মীরাও অংশ নেন।

এই উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় আরানচেরি। এর মানে হলো কমলা বহনকারী। এই উৎসবে ধনুক ও পাথরের রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয় কমলাকে। এক সময় এই উৎসবে লৌহবর্ম ও ঢাল দিয়ে একেবারে সমরসাজে একে অন্যের ওপর কমলা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। বড় বড় গাড়িতে থাকা কমলা বহনকারীরা স্বৈরশাসক এবং তার সৈনিক আর হেঁটে চলা মাথায় লাল টুপি পরে সাধারণ মানুষ বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। দিন বদলেছে। বদলেছে উৎসবের সাজসজ্জাও। এখন কমলা বহনকারীরা বিপ্লবী লাল টুপি পরেন না- তার বদলে ছক কাটা দাবা কোর্টের মতো পোশাক পরেন আর মাথায় থাকে মধ্যযুগীয় সৈনিকের সজ্জার বদলে হেলমেট। এই উৎসবে লাখ লাখ কেজি কমলা ব্যবহার করা হয়।

ফেসতা দি আরাঞ্চা উৎসবে একটি নিয়ম বেশ কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। তা হলো- এই উৎসব দেখতে আসা দর্শকরা কোনভাবেই কমলা ছুড়ে মারার অনুমতি পান না।

॥ তিন ॥

দেশে যখন দেখি অসুস্থ রোগীর জন্য তাদের আত্মীয়স্বজনরা খরচের হিসাব কাটছাঁট করে অন্যান্য ফল-ফলাদির সঙ্গে যতœ করে কমলাও নিয়ে যান, তখন ইভরিয়া শহরের কথা খুব করে মনে পড়ে। আর তখনই কেন যেন মনে পড়ে যায় ফেসতা দ্য আরাঞ্চার কথা।

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: