কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিউটনের আপেলতত্ত্ব

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • তাপস মজুমদার

ছেলেবেলায় শুনতাম এবং শিক্ষকরাও বলতেন, পৃথিবীতে দুটো জিনিসে ভুল নেই- এর একটি বাইবেল আর দ্বিতীয়টি অক্সফোর্ড অভিধান। এটা সত্য যে, সাহেবরা খুবই যতœ করে ছেপে থাকে বাইবেল। মুদ্রণশিল্পের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মুদ্রিত গুটেনবার্গ বাইবেল তো এখনও পর্যন্ত আদর্শস্থানীয় ও ঈর্ষণীয় সর্বোত্তম মানের মুদ্রণের উজ্জ্বল উদাহরণ। অন্যদিকে অক্সফোর্ড অভিধানেও ভুল খুঁজে পাওয়া সত্যিই মুশকিল। একেবারে যথাসম্ভব নির্ভুল, পরিপাটি ও সুন্দর করে ছাপা- এক কথায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট- যে কোন প্রকাশকের কাছে ঈর্ষণীয়। অবশ্য ওয়েবস্টার, ক্যামব্রিজেরটিও বেশ ভাল। নিরন্তর প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বিন্দ্বতার ফলে যে সর্বোত্তম মানের জিনিস পাওয়া সম্ভব- অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজের ডিকশনারি এর অন্যতম উদাহরণ, যেগুলোর নিত্যব্যবহারকারী পাঠক রয়েছে বিশ্বজুড়ে। তারপরও বলতেই হয়, অক্সফোর্ডের প্রচলন ও প্রভাব কিছুটা হলেও বেশি। তো এতদিনে, বলা যায় দীর্ঘদিন পর অক্সফোর্ড অভিধানে একটি সামান্য ভুল খুঁজে পেয়েছেন একজন বিজ্ঞানী- আরও সঠিক অর্থে পদার্থবিজ্ঞানী। তবে এটি কোন লিটারারি বা সাহিত্যসংক্রান্ত ভুল নয়, বরং ভুলটি জটিল পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কিত।

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিফেন হিউজ ‘সাইফন’ সম্পর্কে একটি লেখা তৈরি করতে গিয়ে ধরতে সক্ষম হন ভুলটি। মূলত সাইফন শব্দটির অর্থ, অনেকটা ইংরেজি ‘ঁ’ আকৃতির একটি বাঁকা নল বা টিউব, যে নলের মাধ্যমে এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে তরল পদার্থ ঢালা হয়। অভিধান বলছে, অভ্যন্তরস্থ গ্যাস অর্থাৎ বায়ুচাপে এ কাজটা সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে এটি ভুল। বরং যে শক্তির বলে তরল পদার্থ সাইফনের সাহায্যে এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে স্থানান্তরিত করা হয়, তাতে কাজ করে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। অক্সফোর্ড অভিধানে শব্দটি সংযুক্ত হয় ১৯১১ সালে। অর্থাৎ সুদীর্ঘ শতাধিক বছর ধরে শব্দটির ভুল ব্যাখ্যা চলেছে বিশ্বখ্যাত অভিধানটিতে। স্টিফেন হিউজ সঙ্গে সঙ্গে ই-মেইলে তা জানিয়েছেন অক্সফোর্ড অভিধান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তারা তা শুধরে নিতেও সম্মত হয়েছেন। হয়ত শব্দটির সঠিক ব্যাখ্যা ইতোমধ্যে সংযোজিতও হয়েছে। বিনয় করে তারা এও বলেছেন, সে সময়ে যে বা যারা অক্সফোর্ড অভিধান সংকলিত করেছিলেন, তারা কেউ বিজ্ঞানী ছিলেন না। আজকাল অবশ্য বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষায়িত অভিধান ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ টিমকে নিয়ে গঠন করা হয় অভিধান সংকলন কমিটি। এর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলছি, সম্প্রতি জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীরা গ্রহচ্যুত করেছেন সৌরম-লের নবম গ্রহ প্লুটোকে। সেক্ষেত্রে বিজ্ঞান, ভূগোল এবং অভিধানেও সংশোধনী অনিবার্য। অতঃপর ইংরেজীতে প্লুটো থেকে হয়েছে প্লুটোডÑ অর্থাৎ গ্রহচ্যুতি। স্বস্থানচ্যুত অথবা পদাবনতির ক্ষেত্রেও দিব্যি ব্যবহৃত হচ্ছে শব্দটি। তবুও একটা কথা থেকে যায়, তৃতীয় বিশ্বভুক্ত গরিব দেশগুলোতে যে কোটি কোটি অভিধান বছরের পর বছর ব্যবহৃত হয়ে আসছে ও হবে, সেগুলোর কী হবে? এসব দেশে তো আর প্রতিবছর অন্তত অভিধানগুলোর সংকলন ও সংস্করণ হয় না। সেক্ষেত্রে ভুলটি কি চলতেই থাকবে?

সাইফন থেকে এবার নিউটন প্রসঙ্গ। স্যার আইজ্যাক নিউটন, যাকে বলা যায় আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনকÑ মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, মহাকর্ষ বল ও সূত্র আবিষ্কারের জন্য। প্রকৃতপক্ষে যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের এই মহাপৃথিবী, বিশ্বব্রহ্মা- ও অন্তহীন গ্যালাক্সি বা নীহারিকাপুঞ্জ। তবে সাইফনও কিন্তু কাজ করে থাকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ওপর ভিত্তি করেই! নিউটনের বহুকথিত আপেলের গল্পটি প্রায় সবার জানা। তাই নতুন করে বলা নিষ্প্রয়োজন। নিজের বাগানে বসে গাছ থেকে অকস্মাৎ খসে পড়া আপেলকে ভূলুণ্ঠিত হতে দেখে প্রশ্ন জেগেছিল বিজ্ঞানীর মনে, আচ্ছা, আপেলটি ওপরের দিকে না গিয়ে মাটিতে পড়ল কেন? প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা নিউটন যদি কোন তুলোর বল কিংবা শিমুলের ফলের ফেটে যাওয়া তুলোর আঁশ ভেসে যেতে দেখতেন ওপরের দিকেÑ তাহলে কী হতো?

আসলে গল্প তো গল্পই। নিউটনের আপেলতত্ত্ব এসেছে মূলত দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের সূত্র ধরেই। মনে রাখতে হবে, এর আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহান কেপলার আবিষ্কার করেছেন ঘূর্ণনগতির সূত্রাবলীÑ যে কারণে গ্রহগুলো আবর্তিত হয় সূর্যের চারপাশে। তার আগেও ছিল টলোমতত্ত্বÑ যেখানে বলা হয়েছে, পৃথিবী হচ্ছে মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং একে কেন্দ্র করেই চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা আবর্তন করে থাকে জটিল কক্ষপথে। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত টলেমিতত্ত্ব কার্যকর থাকলেও, ষোড়শ শতাব্দীতে কোপার্নিকাস একে চ্যালেঞ্জ করেন। এরপর টাইকো ব্রাহে, কেপলারের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের সূত্র ধরে গ্রহ-উপগ্রহের ঘূর্ণনগতি এবং অনতিপরেই নিউটনের মহাকর্ষ বল ও সূত্রের আবিষ্কার। কী ধরনের বলের প্রভাবে গ্রহগুলো সর্যের চারপাশে ঘোরেÑ সে সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না কেপলারের। অতঃপর দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও তথ্যাদি সংকলনের মাধ্যমে নিউটনের আপেলতত্ত্বে বেরিয়ে এলো, পৃথিবী সব বস্তুকেই আকর্ষণ করে নিজের দিকে। পাশাপাশি সৌরজগতের গ্রহগুলোর সূর্যের চারপাশে ঘোরার কারণ বোঝার জন্য নিউটন পরস্পর যোগসূত্রহীন দুটো বস্তুর মধ্যে একটি আকর্ষণ বলের কল্পনা করেন। যে কোন বস্তুকণার মধ্যকার এ আকর্ষণ বলই হলো মহাকর্ষ। প্রকৃতপক্ষে এখান থেকেই আধুনিক জটিল জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানসহ মহাকাশ বিজ্ঞানের অভিযাত্রা শুরু। পরে আইনস্টাইনসহ আরও অনেক বিজ্ঞানী এ তত্ত্বকে আরও সম্প্রসারিত ও উন্মোচিত করেনÑ যে প্রবণতা এখনও প্রবহমান। অধুনা তাবড় তাবড় পদার্থবিজ্ঞানীর অপার ও অদম্য কৌতূহল হলোÑ ব্রহ্মা- সৃষ্টির ইতিহাস জানা এবং একে একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বের আকারে রূপ দেয়াÑ বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে যার সর্বশেষ সংষ্করণ হলো স্ট্রিং থিওরি। কাজটি সহজ নয় মোটেওÑ তবে এ আবিষ্কারের বাস্তবিক মহড়া চলছে সুইজারল্যান্ডের আল্পসের ভূগর্ভে নির্মিত লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার, তামিলনাডুর নীলগিরি পাহাড়ের ভূতল গবেষণাগার, যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসাডোনা ও অন্যত্র। লেখা বাহুল্য, নিউটনের সামান্য একটি আপেলতত্ত্বের সূত্র ধরেই কিন্তু এতসব এলাহী প্রচেষ্টা!

তবে স্বীকার করতেই হবে, নিউটনের উত্তরসূরিরা যথেষ্ট দূরদর্শী ছিলেন। অন্তত আমাদের মতো হাভাতে ছিলেন না। তারা কথিত আপেল গাছটি সংরক্ষণ করেছিল সযতেœ এবং এরই একটি অংশ দান করেছিলেন রয়্যাল সোসাইটি অব সায়েন্সে। তো সোসাইটির ৩৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাসার বিজ্ঞানীরা সেই আপেল গাছের চার ইঞ্চি একটি টুকরো এবং নিউটনের একটি ছবি সঙ্গে করে নিয়ে যান মহাশূন্যে। ২০১০ সালের ১৪ মে নভো খেয়াযান আটলান্টিক যাত্রাও করেছে। সঙ্গে যান পিয়ার্স সেলার্স নামের একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত নভোচারীও। ১২ দিনের অভিযান শেষে তারা ছবি ও গাছের অংশ ফেরত দেন সোসাইটিকে। সেখানে তা রাখা আছে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য। আধুনিক বিজ্ঞান ও মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের আবিষ্কারক স্যার আইজ্যাক নিউটনের প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায় আর কী হতে পারে!

সবশেষে, পাঠকের কৌতূহল তো হতেই পারে, গাছের কা- অথবা আপেলটি মহাশূন্যে পৃথিবীর কক্ষপথে নিক্ষিপ্ত হলে কী হবে? সেটি কী ফিরে আসবে পৃথিবীতে? না, আসবে না। বরং আপেলটি ভাসবে একটি শূন্য ভরবিশিষ্ট নিরপেক্ষ অভিকর্ষ অবস্থানে। আর এ অন্তহীন ব্রহ্মা-ে কোথাও কোনখানে যদি স্বর্গোদ্যান বলে কিছু থেকে থাকে, তবে সেখানে বসে নিউটন স্বয়ং তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করবেন এ দৃশ্যটিÑ তার একদার প্রিয় আপেল মাটিতে না পড়ে মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতে মুচকি হাসছে তাঁরই দিকে তাকিয়ে।

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: