আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আদিবাসী মৌসুমী খেলার বয়সে সন্তানের মা

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

অল্প বয়সে বিয়ে করে বড় ভুল করেছি। বাল্যবিয়ের কুফল যে এত ভয়ানক হতে পারে তা আগে জানলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতাম, আর অকালে বিয়ের পিঁড়িতে বসে জীবনের স্বাদ-আহলাদকে নষ্ট হতে দিতাম না। রোগ-শোক, দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত আদিবাসী বধূ মৌসুমী রানী বাড়ির উঠোনে কলিজার ধন দু’সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে এভাবে মনের আক্ষেপ প্রকাশ করছিলেন।

মৌসুমীর বাবার বাড়ি জয়পুর উপজেলার জামতলী গ্রামে। তার বাবার বাড়ির অবস্থা ভাল ছিল না। জমিজমা এমনকি ভিটে বাড়ি না থাকায় অন্যের জায়গায় ছোট্ট কুঁড়েঘরে থাকতেন সবাই। তিন ভাই-বোনের মধ্যে মৌসুমীই বড়। ২০০৭ সালে ১১ বছর বয়সে ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ার সময়ে নাটোর সদরের দরাপপুর গ্রামের অশ্বিনী কান্ত রায়ের ছেলে তরুণের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

বিয়ের বছর পেরুতেই মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের জন্ম দেন তিনি। বাচ্চার বয়স ৬ মাস না হতেই অস্বাবধানতাবশত পুনরায় গর্ভবতী হয়ে পড়ায় জীবন নিয়ে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে সে। মৌসুমী জানায়, দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর পালাকরে দুই সন্তানকে একসঙ্গে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করে সে। এতে করে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য খেতে না পারায় বুকের দুধের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। এতে সন্তানের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তারা নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। স্বামীর স্বল্পআয় দিয়ে সংসারের নিত্য নৈমত্তিক চাহিদা মিটিয়ে সন্তানদের চিকিৎসা, ভাল খাবার সরবরাহ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

এমনিতেই প্রথম সন্তানের গর্ভধারনকালে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য, চিকিৎসা সেবা-যতœ না পাওয়ায় শরীরে স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিয়েছে মৌসুমীর। এরমধ্যে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেয়ার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে আঁতকে ওঠে সে। অপরিপক্ব সময়ে পরপর দুবার সন্তান জন্ম দেয়া ও পুষ্টিকর খাদ্য, চিকিৎসা সেবা না পাওয়ায় মা ছেলে উভয়েই আজ পর্যন্ত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগে চলেছে।

তার বিয়ের সময় বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল কিনা জানতে চাইতে সে বলে, আমাদের কোন ধারণা ছিল না। সেখানে (বাবার বাড়ি) এ নিয়ে প্রচারণার কথা তেমন একটা মনে পড়ে না। তবে বাল্যবিয়ে করে তার মতো অকালে জীবন নষ্ট না করার জন্য মেয়েদের প্রতি অনুরোধ জানায় সে।

মৌসুমীর বর্তমান বয়স ১৯ বছর। শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও সংসারের চাহিদা মেটাতে ছেলে দুটোকে বাড়িতে রেখে স্বামীর মতো সেও অন্যের জমিতে মজুরি খাটতে চলে যায়। এই বয়সেই সে আর আগের মতো হাসতে, কথা বলতে, চলাফেরা করতে পারে না। প্রতিনিয়ত মাথা ব্যথা ও মাথা ঘোরা, বুক ব্যথা, পা কামড়ানোসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত শরীর নিয়ে মজুরি খাটে।

যে বয়সে অন্য সবার মতো স্কুলে যাওয়ার কথা, হেসে খেলে বেড়ানোর কথা, ভবিষ্যত গড়ার সময়, ঠিক তখনই তার মেয়েবেলাকে হত্যা করা হয়। যৌতুকবিহীন বিয়ের প্রস্তাব পাওয়ায় মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তা না করেই তাকে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হন বাবা সুনিল পাহান।

Ñকালিদাস রায়, নাটোর থেকে

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

০৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: