আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বই-খাতা-কলমের বদলে বগলে ঝুলছে সন্তান

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

আমি স্কুলের ভাল ছাত্রী ছিলাম। ভাল ফুটবল খেলতে পারতাম। আন্তঃস্কুলের খেলায় অংশগ্রহণ করে অনেক পুরস্কার পেয়েছিলাম। এজন্য শিক্ষকরা আমাকে খুব ভালবাসতেন। তারা আমাকে বড় হয়ে নারী ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন। আমি নিজেও এক সময় সে স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু মাত্র ক্লাস ফোরে ওঠার পরই বিয়ে হওয়ার কারণে আমার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার। যদি এই বয়সে বিয়ে না হতো, তাহলে পড়ালেখা করে হয়ত আরও বড় হতে পারতাম। এমনকি ভাল খেলোয়ারও হতে পারতাম। এসব ভাবলে এখন কান্না পায়। যে কান্না আর কোনদিনই শেষ হওয়ার নয়।

কথাগুলো নাজমুন নাহার জবা নামের এক বালিকাবধূর। তার বাড়ি নেত্রকোনা শহরতলীর খতিবনগুয়া গ্রামে। চার বছর আগে স্থানীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবা-মা তার বিয়ে দেন। তখন তার বয়স মাত্র ১২। বাল্যবিয়ের খবর পেয়ে বাড়িতে পুলিশ আসে। পাড়া-প্রতিবেশীরাও শিশু মেয়েটিকে বিয়ে দিতে বাধা দেন। কিন্তু বাবা-মা সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত আর বিয়েটি বন্ধ হয়নি। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ করুণ। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় সে এক ছেলেসন্তানের মা হয়। এ বয়সে স্বামী-সন্তান, শ্বশুর-শাাশুড়ি, ননদ-দেবরসহ যৌথ পরিবারের ধকল সামলাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ে কিশোরী মেয়েটি। পরিবারের সবার মন যোগাতে না পেরে এক সময় সে উপেক্ষার পাত্রী হয়ে দাঁড়ায়। তার ওপর শুরু হয় অকথ্য গালাগাল, অত্যাচার-নির্যাতন। কয়েকবার দরবার-শালিসি হয়। কিন্তু নির্যাতন বন্ধ হয়নি। উপরন্তু নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। একদিন স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সুস্থ হয়ে কোলের সন্তান নিয়ে একাই বাবার বাড়িতে চলে আসতে হয় তাকে।

নাজমুন নাহারের বাবা আনিছুর রহমান রতন এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। এ প্রতিবেদকের কাছে ভুল স্বীকার করে বলেন, ‘বাল্যবিয়ের কী ক্ষতি তা জানতাম না। সুখের চিন্তায় পড়ালেখা বন্ধ করে মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সুখের বদলে মেয়েটা আজ দুঃখের সাগরে ভাসছে। এজন্য আমিই দায়ী। তাই আমি বলবÑ কেউ যেন তাদের মেয়েকে আর অল্প বয়সে বিয়ে না দেয়।’

আরেকজন সাল্পনা বেগম। বয়স ১৫ বছর। বাড়ি খালিয়াজুড়ি উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে। প্রায় দু’বছর আগে জগন্নাথপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছরের মাথায় একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেয়। এরপর কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিবারে জেঁকে বসে অশান্তি। আর দশ নারীর মতো কিশোরী সাল্পনার পক্ষে স্বামী, সন্তানসহ শ্বশুড়বাড়ির ধকল সামলানো সম্ভব হয় না। দিনে দিনে পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ চিরস্থায়ী রূপ নেয়। একপর্যায়ে তাকেও অসহায় অবস্থায় ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়িতে। একই গ্রামের আরেক বালিকাবধূর নাম শাহানা। তার বর্তমান বয়স ১৮ হলেও বিয়ে হয় আরও প্রায় পাঁচ বছর আগে। এই সময়ে সে চার সন্তানের মা হয়। এর মধ্যে তিনটিই মারা যায়। অপুষ্টি, স্বাস্থ্যহানি, রোগবালাই আর নানা জটিলতায় তার জীবনও এখন দুর্বিষহ। নাজমুন নাহার, সাল্পনা, শাহানা ও রোকসানার মতো এমন আরও অসংখ্য বালিকাবধূ আছে নেত্রকোনায়, যাদের বিয়ে কী ব্যাপার তা বুঝে ওঠার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। এদের অনেকের হাতে এখন বই-খাতা-কলম থাকার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এদের অনেকে সন্তানসহ স্বামীর সংসারের বোঝা টানছে। আবার অনেকে অত্যাচার-নির্যাতন, রোগবালাই আর শারীরিক জটিলতার শিকার হয়ে অসহায়ত্বকেই জীবনের করুণ ভাগ্য (!) বলে মেনে নিচ্ছে।

Ñসঞ্জয় সরকার

নেত্রকোনা থেকে

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

০৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: