আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিচিত্র পাঠাগার

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫
  • কাঠের বাক্সে বই

ছাপা কাজের উপযোগিতা ফুরিয়ে যায়নি এখনও। তাই একুশ শতকে এসেও দিনকে দিন ভিন্নরূপে উপস্থাপিত হচ্ছে পাঠাগার। এমনই এক বিচিত্র রকমের পাঠাগার নির্মাণ করেছেন সাংবাদিক এলেক্স জনসন পুলস্্। তাঁর নির্মিত এ পাঠাগারটির দেখা মিলবে ফোন বুথ, যাত্রীছাউনি এবং বিমানবন্দরে। এর সূচনালগ্নে জনসন বলেছিলেন, পাঠাগারের চিরায়ত রূপটি পাল্টে গেছে বর্তমান সময়ে এসে। এখন আর মানুষকে সুনির্দিষ্ট স্থানের পাঠাগারে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পাঠাগারে গিয়ে বই পড়তে হবে না। তাছাড়া এজন্য আপনাকে কোন সদস্যপদ কিংবা পরিচিতিমূলক উপকরণ জমা দিতে না। এমনকি কেউ আপনাকে বই ফেরত দেয়ারও তাড়া দেবে না। পাখির বাক্সের মতো এমন একটি পাঠাগারের দেখা মেলে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ার একটি পার্কে। অন্যদিকে ২০০৯ সালে উইসকনসিনে প্রতিষ্ঠা করা হয় এমনই এক মুক্ত পাঠগার। এলেক্স জনসনের মস্তিষ্কপ্রসূত এ পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন থ্যামস এ্যান্ড হাডসন।

পরশ্রীকাতরতার তাক

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিনে আসবাবপত্র নক্সাকার সেলি ট্রটের বাড়িতে আছে এক বিচিত্র পাঠাগার। ১২ মিটার (৪০ ফুট) উচ্চতাসম্পন্ন এই ঘরোয়া পাঠাগারটি তিন তলা বিশিষ্ট স্তরে ভাগ করা। এর নিচের স্তরটি ঘরটিকে আলোকিত করতে কাজ করে। কিন্তু বিষয় হলো, এ পাঠাগারটির ওপরের দিকে কেবল একজনই উঠতে পারেন। এজন্য আছে বিশেষ এক ধরনের চেয়ার, যা রিমোর্টের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমেরিকার আরেক অধিবাসীর ঘরেও আছে এমন এক পাঠাগার। নৃবিজ্ঞানী এবং লেখক ওয়াড ডেভিস তাঁর বাড়িতে ৫ মিটার উচ্চ (১৬ ফুট) যে পাঠাগারটি স্থাপন করেছেন, তা তাঁর লেখার ঘর থেকে স্টোর রুম পর্যন্ত রিমোর্টের মাধ্যমে স্থান বদল করে চলে ক্রমাগত।

তাঁবু ঘেরা বই

ক্রমাগত বেড়েই চলছে বাহারি রকমের পাঠাগার। গল্পের নগরী লাটভিয়াও এর থেকে পিছিয়ে নেই। সেখানে নির্মিত হয়েছে এমনই এক গণপাঠাগার, যা সময়ে সময়ে স্থানান্তরিত করা সম্ভব। কেননা সেটি তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী তাঁবু দিয়ে। হাইতিতে ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর এই পরিকল্পনাটি আসে একদল সৃজনশীল মানুষের মাথায়। কারও কারও লক্ষ্য আরও সুদূরপ্রসারী। ২০১১ সালে নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিটে যে বিক্ষোভ সংঘটিত হয়েছিল, তারই ব্যাপ্তিকে ছড়িয়ে দিতে একরকম নিদর্শন রাখা হয়েছে এ গণপাঠাগারে। প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বই নিয়ে এই তাঁবু-পাঠাগারটি স্থাপিত হয়। এটির অর্থায়ন করেন সঙ্গীতশিল্পী পেটি স্মিথ। তবে সেসময় ওই পাঠাগারটি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল পুলিশি হামলায়।

নীলাকাশ ভাবনা

পূর্ব জার্মানির লাকেনওয়ার্ল্ডের একটি জীর্ণ রেলস্টেশনকে রূপান্তর করা হয়েছে অনন্য সুন্দর একটি পাঠাগার-বাড়িতে। স্বর্ণোজ্জ্বল তামা ও এ্যালুমেনিয়াম দিয়ে তৈরি করা এ পাঠাগারটি ঝলমল করে ওঠে সূর্যের আলোতে। এছাড়া ওই শহর থেকে ১৪০ কিলোমিটার (৯০ মাইল) দূরের পশ্চিমাঞ্চলে ম্যাজবার্গে এক মনোরম পরিবেশে স্থাপন করা হয়েছে এমনই একটি পাঠাগার। সেখানকার পরিত্যক্ত একটি জায়গাকেই বেছে নেয়া হয়েছে পাঠাগার স্থাপনে। প্রকৌশল-প্রতিষ্ঠান ক্যারো এ পরিকল্পনাটির নামকরণ করেছেন ‘সামাজিক কাঠামো’ হিসেবে। তিনদিক খোলা এই পাঠাগারের কাঁচঘেরা শেলফে প্রায় ২০ হাজার বই রাখা আছে। ব্যক্তি মানুষের সততার ওপর নির্ভর করে দিনের ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে এই পাঠাগারটি। এর তদারকিতে নেই কোন ব্যক্তি। এর দেখভাল করেন সেখানে আগত পাঠকরাই।

ভেতর এবং বাহির

বিনামূল্যে বইপড়া কর্মসূচীর লক্ষ্যে বর্তমান সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১২ হাজার পাঠাগার আছে। এ প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুসারেÑ সত্যিকারের মানুষ মাত্রই তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের মানুষদের শিক্ষিত ও আনন্দ দিতে তাদের প্রিয় বইটি পরস্পরের মাঝে বিলিয়ে দেন। আর তা কোন পুরনো বইয়ের আদান-প্রদান নয়; এখানে আছে কৌতূহল সৃষ্টিকারী বেশকিছু চমৎকার সংগ্রহ। ২০১৩ সালে নিউইয়র্ক এ মুক্ত পাঠাগারটি স্থাপন করা হয়। এটির নক্সা করে স্টেরিওটেঙ্ক কোম্পানি। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে টেলিফোন কোম্পানি বিটি-ও কাজ করে এই পরিকল্পনা নিয়ে। তবে এজন্য আপনাকে খরচ করতে হবে মাত্র এক পাউন্ড। রাতেও এই পাঠাগারে গিয়ে বইপড়া সম্ভব। কারণ এই পাঠাগারটি দিনের বেলা সূর্যরশ্মি ধরে রাখতে পারে পর্যাপ্ত পরিমাণে। ফলে রাতের আঁধারে ঝলমলে হয়ে ওঠে সেটি।

জ্ঞানের শাখা-প্রশাখা

ডিডিয়ার মুলারের পাঠাগারটি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে এবার। এটি একটি বিস্ময়কর পাঠাগার। গাছের শাখা-প্রশাখায় ঝুলন্ত পাঠাগারটিতে দর্শনার্থীরা বইয়ের পাতা ওল্টাতে পারবেন, তাদের পছন্দমতো বই সংগ্রহ করতে পারবেন, এমনকি তাঁরা তাঁদের মতো করে বই পরিবর্তনও করতে পারবেন। ঝুলন্ত এ বাক্সগুলো এক অনন্য শিল্পও বটে। এটি প্রতিদিন ঝুলিয়ে রাখা হয় বইপ্রেমীদের জন্য। নিউজিল্যান্ডে এবং ক্যান্টাবেরিতে অবস্থিত এ ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারটি ভূমিকম্পকে মাথায় রেখে গড়ে তুলেছেন পর্তুগালের শিল্পী মার্তা উয়েনগরোভিয়াস। তবে এ কথাও বলে রাখা ভাল, একটি পাঠাগার ব্যবহার করতে পারবেন কেবল একজন মাত্র পাঠকই।

বইয়ের বাইরে

বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়, প্রকৌশলীরা ভবনের ভেতর ইটের গাঁথুনি এবং তার ভেতর হামানদিস্তার মতো করে এক নতুন আঙ্গিকে পাঠাগারের নক্সা করেছেন। জাপানের সেইকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারটি ঠিক তেমনই। প্রিজৎকার পুরস্কারজয়ী লেখক শিজেরু বানের মতে, এ পাঠাগারটি যেন শব্দ-প্রতিরোধক এক পুকুরের মতো, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক ভাববিনিময়ে উৎসাহী করতে রয়েছে বসার জায়গা ও সময় অতিবাহিত করার অবাধ সময়। ২০১৩ সালে একই প্রকল্প চালু হয়েছে বার্মিংহামে। পাঠাগারটির পাশে আছে ঔষধি গাছের বাগান, চিত্রশালা এবং স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রÑ অনেকটা বইয়ের শেলফের মতো করে। এই পাঠাগারের মূল নক্সাকারী হলেন ফ্রান্সিন হোবেন। ডেনমার্কের প্রকৌশলী স্টুডিও মিকানোর মতে, আধুনিক পাঠাগার কখনই বইয়ের রাজ্য থেকে বড় হতে পারে না।

কুঁজের ওপর

একদিনেই একটি পাঠাগারকে নিয়ে আসতে পারবেন নিজের কাছে। চারপায়া বিশিষ্ট এই পাঠাগারটির একটি অন্যতম সুবিধা হচ্ছে, এটি বই বোঝাই করে বিশ্বে যে কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াত করতে সক্ষম। গাধায় টানা এই পাঠাগারের সন্ধান পাওয়া যায় জিম্বাবুইয়ে, ইথিওপিয়া এবং কলম্বিয়ায়। অন্যদিকে লাওসে এক্ষেত্রে গাধার পরিবর্তে দেখা যায় হাতিকে বই টানতে। এছাড়া লেখক জাম্বিন ডাসডনডগ গত ২০ বছর ধরে মঙ্গোলিয়ার গোবি মরুভূমিতে শিশুদের বই বিতরণ করে আসছেন উটের পিঠে চড়ে। উটনির্ভর এমন ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার কেনিয়াতেও দেখা যায়, যা খরায় আক্রান্ত অঞ্চলগুলোতে বই বিলি করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: