কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিশুর নিউমোনিয়া প্রতিরোধে প্রয়োজন সতর্কতা

প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল ২০১৫

মিষ্টির বয়স এক বছর। ক’দিন ধরে খাবার রুচি নেই। সর্দি ও কাশির পাশাপাশি ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে। মা মরিয়মের কাজের চাপে সন্তানকে বেশি সময় দেয়ার সুযোগ নেই। দিনে ২টি বাসায় কাজ করে। বাবা ইদ্রিস আলী ঠেলাগাড়ি চালায়। মিষ্টিকে দেখাশোনার দায়িত্ব বড় ভাই আবুল মিয়ার। আবুলের বয়স ৬ বছর। স্কুলে যায় না। আগারগাঁও বস্তিতে সারাদিন বোন মিষ্টিকে নিয়ে সময় কাটায়। গতকাল মিষ্টির অবস্থার অবনতি হলে মরিয়ম তার স্বামী ইদ্রিস আলীকে নিয়ে হাসপাতালে যায়। ডাক্তার মিষ্টির অবস্থা দেখে দ্রুত ভর্তি করে নেন এবং জানান, সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। একটু দেরি হলেই হয়ত মিষ্টিকে বাঁচানো যেত না। এক সপ্তাহ চিকিৎসার পর সুস্থ হয় মিষ্টি। মা-বাবা নিউমোনিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকলে হয়ত এ কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হতো না।

শিশুকে সুস্থ, সবল ও উপযুক্ত করে গড়ে তোলা প্রতিটি মা-বাবার দায়িত্ব। এজন্য প্রয়োজন শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে বড় করে তোলা। নিউমোনিয়ার সঙ্গে পরিচিত নন এমন মানুষকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা-সুবিধা থাকার পরও শুধু সচেতনতার অভাবেই নিউমোনিয়ায় প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় লাখ লাখ শিশু মারা যায়। বাংলাদেশেও এর সংখ্যা কম নয়। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শিশুর মৃত্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এক সময় বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সের ১ লাখ ৪০ হাজার শিশু মারা যেত। এখন তা অনেক কমে এসেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। অনেকেই হয়ত জানেন না, নিউমোনিয়ার চিকিৎসা অতি সহজ এবং অল্পখরচেই করা সম্ভব। একটু সচেতন হলেই নিউমোনিয়া যেমন প্রতিরোধ করা যায়, তেমনি সময়মতো চিকিৎসা করালে অতি অল্পখরচে শিশুদের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যায়।

নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু গ্রামেই বেশি হয়। অশিক্ষার কারণে মা-বাবা শিশুদের নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলো বুঝতে পারেন না। সঙ্গত কারণেই শিশুর অকালমৃত্যু ঘটে। মা-বাবার নিউমোনিয়ার এ সকল লক্ষণগুলো ভালভাবে জানা থাকলে এ রোগে শিশু মৃত্যুর হার অনেক কমানো যেত।

তবে শিশুর সর্দি, কাশি, জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হলেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই। অন্য কোন কারণেও শিশুর শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে শিশুর নিউমোনিয়া হলে শ্বাস গ্রহণের সময় বুক নিচের দিকে দেবে যায়। শ্বাস নেয়ার সময় বুকে বাঁশির মতো শব্দ হয়, খাবারের প্রতি অনীহা ইত্যাদি। এছাড়া শিশুর শ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া অর্থাৎ ২ বছরের কম বয়সের শিশুর শ্বাস মিনিটে ৪০ বা এর বেশি, এক বছরের কম হলে ৫০ বা এর চেয়ে বেশি, এমন কিছু লক্ষণ দেখা দিলে ধরে নেয়া যায় শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এসব লক্ষণ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক হলে সঙ্গে জ্বর থাকলেও শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া একান্ত প্রয়োজন।

যে কোন বয়সের শিশুর নিউমোনিয়া হতে পারে। নিউমোনিয়ার প্রধান কারণ হলো- ঠা-া, প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস। এর যে কোন একটির কারণেই শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সের শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বেশি হয়। যেসব শিশু অপুষ্ট হয়ে জন্ম নেয়, জন্মের সময় ওজন কম থাকে, মায়ের বুকের দুধ পায় না, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, টিকা সঠিকভাবে দেয়া হয়নি, অস্বাস্থ্যকর ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাসকারী শিশুরা নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হতে পারে।

কিছু নিয়ম মেনে চললে সহজেই শিশুকে নিউমোনিয়ার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। শিশুকে ৬ মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ এবং দু’বছর পর্যন্ত নিয়মিত মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ কমে যায়। শিশুর বয়স ছয় মাসের পর থেকে বাড়তি খাবার হিসেবে সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজি, ডিম, মাছ, মাংস ইত্যাদি ভালভাবে সিদ্ধ করে খাওয়াতে হবে এবং সময়মতো সবগুলো টিকা দিতে হবে। এসব টিকার মাধ্যমে শিশুকে হুপিংকাশি, যক্ষ্মা, হামসহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন কঠিন রোগ থেকে মুক্ত রাখা যায়।

শিশুদের বাসস্থান ধুলাবালিমুক্ত, সহজেই আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে এমন হতে হবে। শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তাই তারা সহজেই অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে শীতের সময় শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধে একটু বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানসহ সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ তথা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা মা ও শিশুর পরিচর্যা এবং নিরাপত্তা বিধানে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ ঘোষিত মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচী বাস্তবায়ন, ডায়রিয়ার কবল থেকে শিশুদের রক্ষা কর্মসূচী বাস্তবায়ন, শিশুকে মায়ের দুধ পান নিশ্চিত করতে এবং মা ও শিশুদের নিরাপদ জীবনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার এখন অনেক কমে এসেছে। শিশুদের প্রতি একটু বাড়তি যত্ন এবং সতর্কতা অবলম্বন করলে নিউমোনিয়ার মতো কঠিন প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আবদুল লতিফ বকসী

(পিআইডি-ইউনিসেফ ফিচার)

প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল ২০১৫

২৮/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: