কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কে হচ্ছেন চট্টগ্রামের মেয়র

প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল ২০১৫
  • চসিক নির্বাচন-২১৫

রাজধানী ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো আজ ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকারী প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন এ উপলক্ষে তাদের স্ব স্ব যাবতীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে। ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোট গ্রহণের সরঞ্জামাদি ও নির্বাচনী কর্মকর্তারা পৌঁছে গেছেন। সকাল ৮টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে টানা বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে।

১৯৯৪ সাল থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনের সূচনা ঘটে। সে হিসেবে এবার ৫ম দফার এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অবশ্য এর আগে জাতীয় পার্টি ও বিএনপি সরকার আমলে দু’জন দু’দফায় মনোনীত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে এ নগরীর প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও নাগরিক কমিটি মনোনীত প্রার্থী আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি সমর্থিত মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় দফার নির্বাচন। এ নির্বাচনেও আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে পরাজিত করে জয়ী হন। ২০০৫ সালে বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় মহিউদ্দিন চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র নির্বাচিত হয়ে হ্যাটট্রিক বিজয়ের গৌরব অর্জন করেন। ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত ৪র্থ দফার নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলম আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে জয়ী হন। আজ মঙ্গলবার এ কর্পোরেশনের ৫ম দফার নির্বাচন।

এ নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হয়েছেন ১২ জন। নিশ্চিতভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এঁদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও নাগরিক কমিটি মনোনীত আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং বিএনপি সমর্থিত ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলন মনোনীত প্রার্থী এম মনজুর আলমের মধ্যে। এছাড়া আরও ১০ মেয়র প্রার্থী রয়েছেন? তাঁরা হলেনÑ জাতীয় পার্টি সমর্থিত সোলায়মান আলম শেঠ, ইসলামী ফ্রন্ট সমর্থিত এমএ মতিন, ইসলামিক ফ্রন্ট সমর্থিত হোসাইন মোহাম্মদ মজিবুল হক, বিএনএফ সমর্থিত আরিফ মঈনউদ্দিন (জিয়াউর রহমানের প্রথম সরকার আমলের প্রতিমন্ত্রী), ইসলামী আন্দোলন সমর্থিত ওয়ায়েজ হোসেন ভুঁইয়া এবং মোঃ সফিউল আলম, সাইফুদ্দিন আহমেদ রবি, সাজ্জাদ জোহা, আবুল কালাম আজাদ ও ফোরকান চৌধুরী। এছাড়া কর্পোরেশনের ৪১ ওয়ার্ডে ৪১ কাউন্সিলর পদে ২১৭ ও সংরক্ষিত ১৪ নারী কাউন্সিলরের ১৪ পদে ৬২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

৫০ লক্ষাধিক অধিবাসীর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামের ১৮ লক্ষাধিক ভোটার আজ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচিত করবেন একজন মেয়র, ৪১ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ১৪ নারী কাউন্সিলর। সবকিছু ঠিকঠাকভাবে এগিয়ে গেলে আজ গভীর রাতের মধ্যে পুরো নির্বাচনী ফলাফল প্রচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজধানী ঢাকার দুই ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর থেকে শুরু হয়ে যায় আগ্রহী প্রার্থীদের তৎপরতা। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ও অন্য কয়েকটি ছোট দল মেয়র পদে তাদের একক প্রার্থিতার প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলেও, কাউন্সিলর পদে তা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ হাতেগোনা কয়েকটি ওয়ার্ডে এতে সফল হলেও, সংখ্যাগরিষ্ঠ ওয়ার্ডে সক্ষম হয়নি। বিএনপি ১০ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করেছে। অন্যান্য ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের মতো বিএনপির প্রার্থীর আধিক্য নেই। অনুরূপভাবে সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে বিএনপি একক প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে পারলেও, আওয়ামী লীগের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন অরাজনৈতিক হলেও, মূলত রাজনৈতিক সমর্থনের প্রার্থী হওয়ায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে তফসিল ঘোষণার পর থেকে চূড়ান্ত প্রার্থিতার পর দিনরাত প্রচার ও গণসংযোগ চালিয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে ইতোপূর্বেকার মতো দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কমিশন সংক্ষিপ্ত সময় দিয়ে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করায় প্রার্থীদের মধ্যে, বিশেষ করে মেয়র পদপ্রার্থীরা নগরীর অলিগলি বা আনাচে কানাচে গণসংযোগ চালানোর সুযোগ পাননি। তবে কাউন্সিলর প্রার্থীরা তাদের নির্ধারিত এলাকার মধ্যে ঘরে ঘরে প্রচার চালাতে সক্ষম হয়েছেন।

এ নির্বাচনের মূল আকর্ষণ মেয়র পদ নিয়ে। মেয়র পদে ১২ প্রার্থী হলেও, হেভিওয়েট হিসেবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আ জ ম নাছির উদ্দিন ও বিএনপি সমর্থিত এম মনজুর আলমই চিহ্নিত হয়েছেন। তাঁদের পক্ষে ১৪ ও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরাও পৃথক পৃথকভাবে মাঠে নেমে প্রচারণা চালিয়েছে। শুধু তাই নয়, ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় নেতা এবং বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও তাদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালিয়ে গেছেন। জাতীয় নির্বাচনের মতো এ নির্বাচনেও মূল লড়াই আওয়ামী লীগ, বিএনপি তথা ১৪ ও ২০ দলের মধ্যে বিভাজিত হয়েছে। সঙ্গত কারণেই চট্টগ্রামের মেয়র পদের লড়াইটি একদিকে যেমন হবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির, তেমনি অপরদিকে ১৪ ও ২০ দলীয় জোটের প্রেস্টিজ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

সরকারের সহযোগিতা নিয়ে নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম চত্বরে স্থাপিত রিটার্নিং অফিসারের মূল কন্ট্রোলরুম থেকে নির্বাচনের বেসরকারী ফলাফল ঘোষণা করা হবে। চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার হয়েছেন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোঃ আবদুল বাতেন। নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন প্রার্থীর আচরণবিধি ভঙ্গের বিভিন্ন অভিযোগ নির্বাচন কমিশন মোটামুটিভাবে নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া কাউন্সিলর পদে কয়েক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে নিষ্পত্তি হওয়ায় এদের প্রার্থী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এক ব্যাটেলিয়ন সেনা সদস্য স্ট্যান্ডবাই থাকবে। এছাড়া বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ, আনসার সদস্যরা ভোট কেন্দ্রসহ টহলদানে নিয়োজিত থাকবে।

কে হচ্ছেন মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে বরাবরের মতো এবারও প্রধান আকর্ষণ, কে হচ্ছেন নগর পিতা? আ জ ম নাছির উদ্দিন না মনজুর আলম! প্রার্থিতা নিশ্চিত হওয়ার পর নির্বাচনী প্রচারণায় এ দুই প্রার্থীর পক্ষে প্রচার ও গণসংযোগ চলেছে প্রায় সমানে সমান। তবে প্রচারে মনজুর আলমের চেয়ে নাছির উদ্দিন অনেকাংশে এগিয়ে ছিলেন। নাছির উদ্দিনের পক্ষে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ যেভাবে গণসংযোগ করেছেন, সেক্ষেত্রে মনজুর আলমের জন্য তত বেশি ছিল না। আ জ ম নাছির সমর্থকরা দাবি করছেন, চট্টগ্রামের ভোটাররা এ শহরের আগামীর মেয়র হিসেবে নাছিরকেই বিজয়ী করবেন। পক্ষান্তরে মনজুর আলমের সমর্থকরা দাবি করছেন, ভোটাররা নীরব ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে মনজুর আলমকে বিজয়ী করে সরকারের বিরুদ্ধে ভোটারদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটাবে। দু’পক্ষের বক্তব্য যাই হোক না কেন, এ কর্পোরেশনের অধীন ১৮ লাখ ভোটারের মনোভাব কারও পক্ষে একচেটিয়া বা একপেশে হিসেবে পরিলক্ষিত হয়নি। তবে সকলেই আশা করছেন, যাতে ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজ নিজ আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। এ নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে আ জ ম নাছিরের স্লোগান হচ্ছে, ‘স্বপ্নের মেগাসিটি গড়তে চাই।’ এ লক্ষ্যে তিনি ঘোষণা করেছেন উন্নয়নের ৩৬ দফা। অপরদিকে, মনজুর আলমের স্লোগান হচ্ছে ‘সন্ত্রাসমুক্ত নগর, ফরমালিনমুক্ত খাবার ও উন্নত চট্টগ্রাম’। উন্নয়নের জন্য তিনি ঘোষণা করেছেন ৫৪ দফা। দুজনের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষিত হয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে। তাদের এ ইশতেহার সকল ভোটারের কাছে পৌঁছানো গেছে কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। যদিও ইশতেহারের প্রতি কোন শ্রেণী ও পেশার মানুষের তেমন কোন আগ্রহ নেই। কারণ, অতীত প্রমাণ করে ইশতেহার ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার কোন প্রতিফলন ঘটে না। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে বড় ও মাঝারি ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। একেবারে ছোটখাটো দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের অবিরাম নির্বাচনী প্রচারণা এগিয়েছে এবং গত ২৬ এপ্রিল মধ্যরাতে তা শেষ হয়েছে। এ নগরীর ভোটার, নন ভোটারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী ও সাধারণ মানুষ একটি সুন্দর নির্বাচন দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। নির্বাচনে বিজয়ের মালা যিনি বা যারাই পরুক না কেন, হাঙ্গামামুক্ত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে চেয়ে আছে এ নগরীর ৫০ লক্ষাধিক মানুষ এবং তা বাস্তবায়ন হলে গণতন্ত্রের বিজয় হবে বলেই সকল মহলের অভিমত।

প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল ২০১৫

২৮/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: