কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ত্যাগ, সংগ্রাম ও জীবনের আলেখ্য

প্রকাশিত : ১৭ এপ্রিল ২০১৫
  • মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

সেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে, টুঙ্গিপাড়া যার নাম; সেখান থেকে এসে কর্মে, আন্দোলনে, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যিনি বাংলাদেশকে রোদ-জোছনার মায়াবী আলোতে ভরিয়ে দিয়েছেন, শত বছরের প্রাচীন দৈত্য-দানোর কৌটা থেকে তুলে এনেছেন বহুল আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতাকে- তিনি বাঙালী জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর আদর্শের কণ্টকাকীর্ণ পথে হেঁটে তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার প্রত্যয়ী, অঙ্গীকারবদ্ধ। ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থটি শেখ হাসিনার আত্মজৈবনিক রচনা হলেও এতে ‘বঙ্গবন্ধু : তাঁর জীবন ও স্বপ্ন’ উল্লেখিত হওয়ার পাশাপাশি উপস্থাপিত হয়েছে লেখকের রাজনৈতিক আন্দোলন, ত্যাগ ও সোনারঙা শৈশবের টুকরো টুকরো স্মৃতি। ঘুরে ফিরে তিনি লেখায় ধারণ করেছেন তাঁর কাক্সিক্ষত বাংলাদেশকে। যেহেতু শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অধিকন্তু তাঁর আন্দোলন, সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘÑ তাই ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থটি কেবল আত্মজৈবনিক রচনা হয়ে উঠেনি, এতে সহজাতভাবে স্থান পেয়েছে রাজনীতি, অপরাজনীতি, ক্ষমতার লড়াই, দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা। কখনও কখনও এসব কথাই ছাপিয়ে উঠেছে ‘বিশেষ এক উদ্দেশ্যের হাতিয়ার’ হয়ে এবং তা সঙ্গত কারণেই।

আলোচ্য গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে চতুর্মুখী দশটি রচনা। এসব প্রবন্ধ লেখা হয়েছে ১৯৮৩ সাল থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৪ সালের মধ্যে। তাই বিশেষ করে এসব রচনাগুলো ধারণ করে আছে ’৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিচিত্র। কলমের অক্ষরে উঠে এসেছে ধানম-ির ৩২ নম্বর বাড়ি, জেনারেল জিয়াউর রহমান ও স্বৈরাচার এরশাদের শাসন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, অপরাজনীতির নোংরা হস্তক্ষেপ, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, নূর হোসেন প্রমুখের কথা। পাশাপাশি শেখ মুজিব সম্পর্কে বেশকিছু অনালোকিত অধ্যায়ের আলোকপাত করেছেন লেখক। এক্ষেত্রে একটি কথা বলার আছে। যেহেতু শেখ হাসিনা কেবল বঙ্গবন্ধু কন্যাই নয়, বঙ্গবন্ধুর ‘রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গীও’- তাই জাতির জনকের অনেক অনালোকিত বিষয় নিয়ে তাঁর লেখার সুযোগ রয়েছে। হতে পারে আমরা তাঁর বয়ানে এমন তথ্য পেতে পারি, জানতে পারি এমন কোন ঘটনাও- যার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হবে ইতিহাস, অনুপ্রাণিত হবে বর্তমান প্রজন্ম।

লেখক হিসেবে যদিও শেখ হাসিনার পরিচিতি প্রসিদ্ধ নয়, বেশকিছু গ্রন্থের রচয়িতা হলেও; কিন্তু এই স্বল্প আয়তনে তবু এ কথা বলা যায় যে, রাজনীতি সাহিত্যে তাঁর ঘরানা আলাদা। তিনি রাজনীতির কথাগুলো বলছেন একদিকে, অন্যদিকে উদাহরণ, উপমায়, বর্ণনায় তা করে তুলেছেন সুপাঠ্য। মূলত শেখ হাসিনা বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী হলেও তিনি যখন কলম ধরেছেন, সময়ের প্রয়োজনেই ধরেছেন এবং লিখেছেন অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তৎকালীন শাসকদের এতটুকু তোয়াক্কা না করেই। তাঁর প্রতিবাদী লেখনী অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

আলোচ্য গ্রন্থে প্রথম তিনটি রচনা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন এ তিনটি লেখায় স্পষ্টাকারে উঠে এসেছে। উঠে এসেছে শেখ মুজিবের শৈশবকাল, কৈশোর, তাঁর সংগ্রাম, চিন্তা-চেতনা। শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর শৈশবের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : ‘আমার আব্বার শৈশব কেটেছিল টুঙ্গিপাড়ার নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে, মেঠো পথের ধুলোবালি মেখে। বর্ষার কাদাপানিতে ভিজে। বাবুই পাখি বাসা কেমন করে গড়ে তোলে, মাছরাঙা কিভাবে ডুব দিয়ে মাছ ধরে, কোথায় দোয়েল পাখির বাসা, দোয়েল পাখির সুমধুর সুর আমার আব্বাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করত। আর তাই গ্রামের ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গে করে মাঠে-ঘাটে ঘুরে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে বেড়াতে তাঁর ভাল লাগত। ছোট্ট শালিক পাখির ছানা, ময়না পাখির ছানা ধরে তাদের কথা বলা ও শিস দেয়া শিখাতেন।’

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে বন্দী, অন্যদিকে তাঁর পরিবার বন্দী ধানম-ির বাড়িতে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত শেখ হাসিনাসহ সবাই এ বাড়িতেই বন্দী ছিলেন। সে সময়ের বর্ণনা, যাপিত দিনগুলো পাই আমরা ‘স্মৃতির দখিন দুয়ার’ প্রবন্ধে। সে সময়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, পাক হানাদারদের নির্মমতার মাঝে বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রাণের ছোঁয়া এনে দিতো মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম। শেখ হাসিনা লিখেছেন : ‘সমগ্র দেশটাই ছিল এক বন্দীশালা। এরই মাঝে জীবনের ধ্বনি যেন পাওয়া যেত, যখন শোনা যেত কোন মুক্তিযোদ্ধার গুলি বা বোমার শব্দ- মিলিটারি মারার খবর। তাদের যেকোন আক্রমণ বা গ্রেনেড ফোটার বিকট শব্দ হলে- শত্রুপক্ষ সন্ত্রস্ত হতো- মনে হতো আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব, আমাদের অস্তিত্ব এখনও আছে। অমৃতের বরপুত্র এই মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের যেন নতুন করে জীবনদান করে যেত!’

প্রকাশিত : ১৭ এপ্রিল ২০১৫

১৭/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: