কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ব্রিকস ব্যাংক ও আমাদের প্রস্তুতি

প্রকাশিত : ১২ এপ্রিল ২০১৫
  • এসএম শাহীনুজ্জামান

নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে বিশ্বব্যাপী পরিচালিত আট দশকেরও বেশি সময়ের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থব্যবস্থার একটির। ফলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার মূল খুঁটি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের একচেটিয়া প্রেষণ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশে দেশে এই উপলব্ধির উন্মেষ ঘটায় যে, অর্থবাজার নিয়ন্ত্রক এই দুটি সংস্থার সংস্কার এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর অংশগ্রহণ আরও বেশি কার্যকর হওয়া উচিত। বেশ কয়েক বছর থেকেই এই দাবি জোরালো হলেও সংস্থাগুলোর মূল নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে পরিবর্তন বা সংস্কারের বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহুমুখী নিয়ন্ত্রণ বিশ্বের উদীয়মান অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসকে (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা) নতুন আরও একটি ব্যাংক গঠনের পথে উদ্যোগী করে।

মূলত রাশিয়া, চায়না, ভারত, ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকাÑ এই পাঁচটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ব্রিকস নেশন। এ জোট বিশ্বের মোট অর্থনীতির ৩০ ভাগ, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪২ ভাগ, বিশ্বের মোট স্থল ও জলভূমির ৪৭ ভাগ দখল করে আছে। বিরাট এই অংশের কার্যকারিতাহীন প্রতিনিধিত্বকে বস্তুত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রাসঙ্গিকতায় অঙ্গুলি নির্দেশই করছে এবং উপরন্তু বিশ্বের বৃহৎ একটা অংশকে বিকল্প প্রস্তাবনার দিকেই ঠেলে দিয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রস্তাবনায় নতুন ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ ধারণার সূত্রপাত, যার মূল লক্ষ্য হলো সদস্য রাষ্ট্রসমূহের অবকাঠামো উন্নয়নে সরাসরি অংশগ্রহণ। ২০১০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার পার্লামেন্ট স্টেট ডুমায় বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ এবং বিশ্বব্যাপী পরিচালিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের এই বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নতুন ব্যাংকের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। নীতিগতভাবে একটি সর্বজনীন ব্যাংক স্থাপনে সহযোগী সদস্যসমূহের সঙ্গে প্রস্তাব করা হয় আলোচনার।

২০১২ সালে লস কাবোসে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন বিশ্বের দেশসমূহের জন্য বিশ^ব্যাংক এবং আইএমএফের বিকল্প ঋণদানকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গ্রহণ করে। পরবর্তী কিছুকালের মধ্যেই উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত অনেক দেশেই এই প্রস্তাবনায় তাৎপর্যপূর্ণ সাড়া দেয়। যেমন, এই প্রস্তাবনার অব্যাহতির পরেই আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য অনেক দেশ এই সংস্থায় যোগদানে জানান দেয় তাদের প্রস্তুতির কথা। ২০১৪ সালের বেইজিং ঘোষণার মাধ্যমে সাংহাইতে এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ১০০ বিলিয়ন ডলার মূলধন নিয়ে শুরু করা এই ব্যাংক যে বহুমুখী উন্নয়ন সহযোগী সংস্থায় অচিরেই অবদান রাখতে শুরু করবে, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ তাহলে কি এই ব্যাংকের উত্থানে বর্তমানে প্রচলিত বৈশি^ক অর্থকাঠামোর প্রভাব বলয়ের পরিবর্তন ঘটবে? বিশ^ব্যাংক এবং আইএমএফ কি তার গুরুত্ব হারাবে? নরড-ক্যাপিটালের এ্যানলাইটিক্যাল ডিপার্টমেন্টের পরিচালক ভøাদিমির রোজেনস্কির মতে, ‘আমি মনে করি না এটা বিশ^ব্যাংক এবং আইএমএফের সঙ্গে অনেক বড় বা বিশাল কোন প্রতিযোগিতা তৈরি করবে। কারণ আইএমএফ কোন অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করে না। আইএমএফের একটি সার্বভৌম কাঠামো আছে। আমরা যা জানি, এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর রাষ্ট্রসমূহের সঙ্কট উত্তরণের ঋণদানে অংশগ্রহণ করে। বরং আমরা বলতে পারি, ব্রিকস ব্যাংক বিশ্বব্যাপী ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন এ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের যোগ্য ও পরিকল্পিত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। সেই অর্থে ব্রিকস ব্যাংক বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। ব্রিকসের সর্বশেষ ফোরটালেজা সম্মেলনের ঘোষণার দিকে তাকালেই দেখা যায়, সেখানে তারা শুধুমাত্র বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পুনর্গঠনের কথাই বলেননি, এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পুনর্গঠনের কথাও বলেছেন। বলেছেন, বিশ্বব্যাংক পুনর্গঠনের কথা, যা ব্রিকস দেশগুলোর অবকাঠামো এবং পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় তারা কি চায় তারও একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।’

স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বলা হতো বহুমুখী বিশ্বকাঠামোর কথা। কিন্তু তথাকথিত এই বহুমুখী বিশ্ব কাঠামো ধারণার বৈপরীত্য পুরোপুরি দৃশ্যমান। যেমন বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থাপনায় জি-৭, বিশ^ব্যাংক এবং আইএমএফ আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে নতুন উদার বিশ্ব অর্থনীতির কথা বলা হলেও মোড়লিপনা কিন্তু এই সাতটি দেশের হাতেই। আর বিপত্তির উৎসটা এখানেই। মনে রাখতে হবে, আন্তঃস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সম্ভ্রান্ত অর্থনীতি অবশ্যই তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব আন্তর্জাতিক পরিম-লের মধ্যে আরও বেশি সুসংহত করবে সামনের দিনগুলোতে।

২০১৩ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তৎকালীন ইসরাইলের রাষ্ট্রপতির ভাষণ এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘আন্তঃরাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এমন একটি বহুজাতিক ব্যবস্থা, যা বিশ্বে ভোগ্যপণ্য বা পুঁজির আইনত নিয়ন্ত্রক।’ শুধু এই একটি বিষয়ই নয়, বরং সমস্ত মূল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (বিশ^ব্যাংক এবং আইএমএফ) তথাকথিত এলিটরাই বিভিন্নভাবে বিভিন্ন নামে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আবার যদি আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক বা সামরিক সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে এই একই এলিটদের নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়া। আন্তঃরাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দিকে তাকালেই দেখা যায়, এখানেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের নামে নতুন মোড়কে সেই পুরনোরাই। অন্যদিকে এসব আন্তঃরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে চায়না ও ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলোর তেমন ভূমিকা রাখার বা সিদ্ধান্ত কাঠামোর অংশীদারিত্ব নেই বললেই চলে। যদিও চায়না এবং ভারত কোন কোন ক্ষেত্রে এই তথাকথিত এলিটদের অংশ, কিন্তু তাদের ভূমিকাও নির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত। এমন বাস্তবতায় নতুন আধুনিক বিশ্বায়নের ধারণা সারা পৃথিবীকেই অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য, সিরিয়া, ইরান তার বড় উদাহরণ।

বিশ্বের বিদ্যমান এই বাস্তবতায় গ্রুপ-৭ জাতিসমূহ এবং ব্রিকস জাতিসমূহ পরস্পর সার্বভৌম অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক আধিপত্য রক্ষা ও পুনর্প্রতিষ্ঠায় ব্রিকস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক যে বিদ্যমান সংস্থাসমূহের জন্য চ্যালেঞ্জ, এটা অনুমানযোগ্য এবং অচিরেই এর ফলাফল দৃশ্যমান হবে। কথা হলো, এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকরণ কিভাবে হবে এবং আমরা আদৌ তার জন্য প্রস্তুত কিনা? ১৬ কোটি জনসংখ্যা, বিশ্বের ৩৪তম বৃহৎ জিডিপি, যা সামনে আরও অগ্রবর্তী অবস্থান তৈরি করবে। আমরা কি শোষণ প্রক্রিয়ার অংশ হয়েই থাকব, নাকি সময়ের সঙ্গে নিজেদের কথা উচ্চস্বরে বলব বিশ্বে দরবারে।

রাজনৈতিক বিরোধিতা, হানাহানি, বিভেদকে অতিক্রম করে দৃঢ়সংকল্পে অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন, এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারের ‘ব্যালান্স লুক’ বা ভারসাম্যের অর্থনৈতিক কূটনীতি অনুসরণ করছে। একদিকে চীন ও রাশিয়ার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ, অন্যদিকে জাপানী বিনিয়োগ আকর্ষণের সঙ্গে বিতর্কিত বিশ্বব্যাংক নির্ভরতার হ্রাস অনেকাংশে আশু বৈশ্বিক কাঠামোর সঙ্গে মানানসই চাল বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হলো, সামনের দিনগুলোতে এটা আমরা কতটা ধরে রাখতে পারব, সাফল্য বা প্রস্তুতির বীজ এখানেই নিহিত।

লেখক : একজন তরুণ উদ্যোক্তা

প্রকাশিত : ১২ এপ্রিল ২০১৫

১২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: