আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মৃত দুপুর ওয়ালিদ ইখলাসি

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০১৫
  • অনুবাদ : অমিতাভ মালাকার

ওয়ালিদ ইখলাসির জন্ম ১৯৩৫ সালে সিরিয়ায়। মৃত দুপুর গল্পটি তার ‘আনতারার হলটা কি’ বই থেকে নেয়া হয়েছে। বইয়ের গল্পগুলো আলেপ্পো শহর নিয়ে। আলেপ্পো সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। নানা রাজনৈতিক সামাজিক দ্বন্দ্বে পড়ে মানুষের কী হাল দাঁড়ায় তাই মূলত ওয়ালিদের বিষয়।

ঘড়িতে পাঁচটা বাজার আওয়াজে বাড়ি গমগম করে উঠল। শহুরে আসমান পেরিয়ে উড়ে চলা চড়াইগুলোকে দেখছিলাম আমি, ঘুরপাক খেয়ে ফেরা কালো ফুটকির মতো হাজার হাজার চড়াই।

সন্ধ্যা নামছে এই নতুন দিনটির বুকে জায়গা পেতে বসার আয়োজন মেতে।

প্রার্থনা সেরে দাদীমা উঠে এলে বললাম, ‘আল্লাহ সকলের মঙ্গল করুন’।

উনি দুঃখিত গলায় জবাব দিলেন, ‘দুপুরের নামাজ সারতে বড্ড দেরি করে ফেললাম।’

‘কোই বাত নেহি, আরও অনেক দুপুরের দেখা মিলবে।’

দাদীমা আমার কথা শুনতে পেলেন বলে মনে হলো না। জানালার কাচের পাল্লার বাইরের দিকে দেখি একটা মস্তবড় মাছি লেপ্টে রয়েছে, একেবারেই পাত্তা না দেয়ার ভঙ্গিতে প্রায় আমার নাকের ডগায় বসে আছে ব্যাটা।

‘মাছিটা আমায় সারা দিন জ্বালিয়েছে’, বললাম আমি, ‘কিছুতেই মারতে পারলাম না ওটাকে।’ দাদীমা কোন জবাব দিলেন না, উনি ফের একবার প্রার্থনায় বসে পড়েছিলেন।

সময় কীভাবে কেটে গেল আমার খেয়ালই নেই, মাছিটা এত সময় নিয়ে নিল। কাচে টোকা দিয়ে ভয় দেখালেও নড়ে না। আঙ্গুলের নখগুলো বড় হয়েছে দেখে কাঁচি দিয়ে সেগুলো কাটতে বসলাম।

নরম মখমলি অন্ধকার আকাশটাকে গিয়ে খাচ্ছিল, হরিণের চামড়ায় মোড়া কেদারায় বসে প্রার্থনারত দাদীমার কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে ওঠে ঘড়িতে ছ’টা বাজার আওয়াজ।

আমার খুকি বোন এলো পাশের ঘর থেকে।

বললে, ‘আজ আমরা কাঠবাদাম দিয়ে কুনাফা খাব।’

‘মোটেই ভালো লাগে না।’

বোন খুব হাসল। ‘আজ সকালেই তো বললে কুনাফা খেতে চাই।’

‘একেবারেই পছন্দ করি না।’

জানালার দিকে ফিরে তাকিয়ে মাছিটাকে তখনও ওখানেই বসে ঘুমোতে দেখে ভয়ানক আশ্চর্য হলাম।

বোনকে খুব খানিকটা আদর করে দাদীমা বললেন, ‘রেডিওটা একটু চালা তো, ফেইরুজের গান শুনি।’

আমি কঠিন গলায় বললাম, ‘এই তো দুপুরেই একবার ওর গান শুনলাম।’ অন্ধকার হয়ে আসায় বাইরে আর চড়াইগুলোকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবুও, এসব কিছু সত্ত্বেও, ফেইরুজের গলা আমি বেশ পছন্দই করি।

‘ফের একবার ওর গান শুনব’, বললেন দাদীমা।

কিছু বললাম না, মন দিয়ে ঘুমন্ত মাছিটাকে দেখছিলাম আমি।

একটা ভয়ানক চিন্তা হঠাৎই আমায় পেয়ে বসল, আমি ঘুমিয়ে পড়লে ওরা ওই রকম নজর রাখবে না তো?

বোন আজ সন্ধ্যায় গীত গাওয়া বুলবুলির গল্প শোনার বায়না ধরলে দাদীমা বললেন, ‘গতকাল ওইটে বলা শেষ হয়নি?

খুকিটি ভয়ানক খিটমিটে চেঁচামেচি জুড়ে দিল। ‘গতকাল! গতকাল তো কবেই শেষ হয়ে গেছে।’ নিজেই নিজেকে ফিসফিসিয়ে ‘তুই আর কোনদিন গীত গাওয়া বুলবুলির গল্প শুনতে পাবি না’, বলে আমার মনটা বিষণœতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।

দাদীমা বললেন, ‘তোদের একটা নতুন গল্প বলব আজকে।’

বোন খিঁচিয়ে উঠে বললে, ‘চাই না নতুন গল্প।’ ‘কিন্তু আগের গল্পটা তো বলা শেষ হয়ে গেছে।’

‘না শেষ হয়নি’, বোন চেঁচিয়ে উঠল।

দাদীমার কোল থেকে লাফ দিয়ে নেমে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় ওর হয়ে সাফাই দেবার চেষ্টা করলেও আসলে আমি নিজেও বেশ চটেছিলাম, আমারও পুরনো গল্পটাই শোনার ইচ্ছে ছিল।

কিছুক্ষণ পরে দাদীমার ইচ্ছে মোতাবেক রেডিও চালিয়ে এদিক-ওদিক স্টেশন খুঁজতে লাগলাম। স্টেশন পেলামও একটা সাতটা নাগাদ।

‘দিস ইজ আলেপ্পো।’ আমি কণ্ঠস্বরটার ওপর একটা নীরবতার পর্দা টেনে দেই। দাদীমা আপত্তি জানিয়ে বললেন, ‘খবরটাই শুনি বরং।’

সকালের খবরের কাগজের পাতা ওলটাতে ওলটাতে বললাম, ‘সবই বাসি খবর।’

নিজের বার্ধক্যের ব্যাপারটা হঠাৎই খেয়াল পড়ায় উনি ঘোষণা করলেন, ‘নতুন নতুন কত কিছুই না ঘটতে পারে বাছা।’

আমি হেডলাইনগুলো জোরে জোরে পড়তে শুরু করি, দুপুরে একবার পড়েছি বলেই ব্যাপারগুলো নিয়ে আমার আর মাথাব্যথা ছিল না।

হঠাৎই ওই ঘরটা ছেড়ে ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে আমাকে পেয়ে বসল, কিন্তু আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে মাথা ঠাণ্ঠা রেখে ওখানেই বসে রইলাম। ছোট খুকিটি বিশাল পুতুল বগলে ফিরে এলো।

দাদীমার দিকে কড়া চোখে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ‘তুমি কি সুজানকে একটা গল্প বলবে?’

বুড়ি হেসে উঠল।

জানালার কাছে ফিরে গেলাম আমি, আকাশের বিশাল ব্যাপ্তিজুড়ে সম্পূর্ণ নিñিদ্র অন্ধকার চেপে বসেছে।

ঘুমন্ত মাছিটাকে খুঁচিয়ে বিরক্ত করার ইচ্ছে আমার মনকে আচ্ছন্ন করে তোলে। শালার বেয়াদবি অবশ্য ততক্ষণে ভুলে রাগ-মাগ জল হয়ে গেছে আমার।

বোন এবার শুধোয়, ‘তুমি সুজানকে একটা নতুন গল্প শোনাবে কি?’

আসলে ব্যাপারটা হলো এই যে, আমি কোন গল্পই জানতাম না। হঠাৎ আমার এক দুপুরে রেডিওতে শোনা একটা গল্প মনে পড়ে গেল। আমি বললাম, ‘তোকে আমি ভালুক আর মধু নিয়ে একটা গল্প বলি শোন।’ আমার বোন চেঁচিয়ে উঠে বললে, ‘কিন্তু ওটা তো একটা পুরনো গল্প।’ সবটা ফের গুলিয়ে যাওয়ায় আমি ফের মাছিটায় মন দিলাম।

জানালার পাশে বসেছিলাম আমি, খুকি সেদিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলে, ‘ওটা কী?’

‘ঘুমন্ত মাছি একটা’।

‘ঘুমন্ত মাছি?’ সে ভুরু কুঁচকে শুধোয়। ‘ওটা কি একটা নতুন গল্প?’

‘ওটা ঘুমোচ্ছে, ক্লান্ত।’

সে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কি এটা সুজানকে বলবে?’

‘ঠিক হ্যায় বলব।’

বোন আমার কাছে ঘেঁষে দাঁড়ায়।

‘তুমি ওই দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কী দেখছ?’ সে জানতে চায়। আমি তাকিয়ে তকিয়ে মাছিটাকেই দেখছি। একটা চেয়ারে চেপে সে ওটাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। তারপর তীক্ষè গলায় ঘোষণা করে, ‘ওটা তো মরা।’ হঠাৎ ওকে প্রায় আমার সমান লম্বা দেখাচ্ছিল বলে আমি খানিকটা অস্বস্তিই বোধ করছিলাম।

‘ওটা গুমোচ্ছে।’

‘ওটা মরা’, আমার অজ্ঞতায় ভয়ানক আশ্চর্য হয়েই সে বলে।

আমি খুব সাবধানে জানালার পাল্লাটা খুলে ওটার গায়ে ফুঁ দিলাম। মাছিটা কাগজের কুচির মতো ঝরে পড়ল।

আমার মনে পড়ল মাছিটা কেমন আমার চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল, কেমন আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম আর তারপর ভালোইবেসে ফেলি মাছটাকে। ‘তুমি সুজানকে ঘুমন্ত মাছির গল্প বলবে না?’ আমি ওর কথার কোন উত্তর দিলাম না, সারা বাড়ি গমগম করে উঠা পেটা ঘড়ির আওয়াজ শুনছিলাম আমি।

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল ২০১৫

১০/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: