আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জীবন এখন যেমন

প্রকাশিত : ৬ এপ্রিল ২০১৫

বিশ্বায়নের শুভ সময়ে চারদিকে শুনতে পাই ভাঙ্গনের নীরব সুর। বিশ্বাস ভেঙ্গে যাচ্ছে, ভেঙ্গে যাচ্ছে নিয়তিনির্ভরতা, ভেঙ্গে যাচ্ছে সমাজ এবং সংসার নামের মহান বেদী। একেবারে ভেঙ্গে পড়েনি, এখনও টিকে আছে নড়বড়ে-জরাজীর্ণ ও জোড়াতালি দিয়ে প্রথাগত সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে। এখন দিন বদলের পালা। দ্রুত বদলে যাচ্ছে সামাজিক ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধ। ঘটে চলছে ক্রমাগত কাঠামোগত পরিবর্তন। নগর তথা প্রান্তিক সমাজ ও পারিবারিক জীবন-কালের আর্বতনে পরিবর্তিত হয়ে জন্ম নিতে যাচ্ছে নতুন দৃশ্যপটে প্রযুক্তির টানাপোড়েনে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর, আমরা সাজাব প্রযুক্তির মহিমা দিয়ে। উন্নয়ন ও প্রযুক্তির প্রাচুর্যের মধ্যে দাঁড়াব অপসৃয়মাণ ভাস্কর হয়ে। সুসমাচার হলো এসব পরিবর্তন বিবর্তনের মধ্যেও বিস্ময়করভাবে টিকে আছে পারিবারিক পারস্পারিক বন্ধন।

আজন্ম মানুষ হিসেবে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক এ দুটি জীবনের মুখোমুখি হয়ে চলতে হয়। দুটি ধারার এই জীবন একটি আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি অসম্পূর্ণ। এ দুটি জীবনের প্রতি আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। আদর্শিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে সমাজ নামের বিষয়টি আজ পরিণত হয়েছে সৌজন্যতায়। লোপ পেয়েছে মানুষের সামাজিক দায়বদ্ধতা। মানুষ এড়িয়ে চলে সবিনয়ে সমাজকে। চালু হয়েছে একধরনের গা বাঁচিয়ে চলার সংস্কৃতি। তার মধ্যে সংযোজন হয়েছে ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’। এ ধারণাকে মনে পুষে মানুষ পরিবারমুখী বা পরিবারনির্ভর জীবনে অধিকমাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। পারিবারিক জীবনে পরিবার-পরিজনদের ভরনপোষণসহ নানা রকম চাহিদা মেটানোর মধ্যেই সকল দায়বদ্ধতাকে সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ করে ক্ষুদ্র পরিসরে অন্তর্মুখী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। রুটিনমাফিক শান্তিশৃঙ্খলা ও স্ব^াধীনতার মধ্যে অতিবাহিত করে দিব্যি ফাঁপা সুখী জীবন। চারপাশের ছাইপাস জঞ্জাল নিখুঁতভাবে পরিহার করে চলে আপন অজ্ঞতার অন্ধকারে। অধমের প্রতি ঘৃণার আবেগে মন থাকে পরিপাটি। চরিত্রে উদারতার চেয়ে কপট নীতিবোধের আধিক্যই প্রকটভাবে ধরা পড়ে। এ পরিবারনির্ভর মানুষগুলো আজ সামাজিক সুশীল বা স্বতন্ত্র সামাজিক, অচল মুদ্রার মতো। ঐশ্বরিক বেদিতে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে সারে ধর্মীয় আর সামাজিকতার সকল দায়। আর ভদ্রবেশী বিদ্ধান যুবক-যুবতী গা ঢাকা দিয়েছে শামুকের খোলসের ভেতর। এই বিদ্ধানেরা অন্ধের চোখ, বধির কান। এসব দেখে নৈঃশব্দের মধ্যে চলে যাই, করুণায় বিমূঢ় হই। নিজের শ্বাসে নিজেই রুদ্ধ হই।

শহুরে সামাজিক জীবন নব্য অভিজাতদের দ্বারা রূপান্তরিত হয়েছে নৈশক্লাবে, যা প্রকৃত অর্থে আদর্শবিবর্জিত। যেখানে রয়েছে সীমাহীন কামনা-বাসনার তাগিদ, ক্ষমতার প্রতি তীব্র লালসা, যা মানুষে মানুষে তৈরি করে চলেছে প্রভু-ভৃত্যের অসম সম্পর্ক। বিলুপ্ত হচ্ছে নিজস্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতি। শূন্যস্থান দখল করে নিচ্ছে বিদেশী বহুমাত্রিক অপসংস্কৃতি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধারার হ-য-ব-র-ল গোলক ধাঁধার এক বিরল সংস্কৃতির কবলে জীবন চলছে কোনমতে অপরিণত ধারণা নিয়ে। তৈরি হচ্ছে একলা চল নীতি। একলা চল, একলা বিরহ, কেউ নেই কারও পাশে, যেমন খুশি তেমন সাজো। রাজপথে-আমলা-মন্ত্রী, মিসকিনের গাড়িবহর। ফুটপাথে রকমারি হঠকারী। স্কুলে, কলেজে, জিপিএ-৫ এর মহামারী। জীবনের লক্ষ্য আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চকচকে, তকতকা, জীবনের স্বাদ নেয়া। কৃত্রিম শহরে-আরামে-আয়েশে, সুখের-স্বস্তির বিলাসে গৃহকাতর গৃহিণীরা হিন্দি-সিরিয়াল, মার্কেটে-শপিংয়ে আত্মহারা।

এই বৈরী হাওয়ার প্রভাব পড়েছে এখন মফস্বল ও গ্রামভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার ওপরও। মফস্বলের সনাতন সহজ-সরল মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত পেশীশক্তির আস্ফালন, নৈতিকতার প্রশ্নে আপোসহীনতা। আর এরাই এখন গণ্য হচ্ছে সমাজের তথাকথিত বিবেক বলে। এদের শিকড় ছড়িয়ে গেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ফলে নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে গ্রামভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাও প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রান্তিক সমাজ কাঠামোটি পড়ে আছে একটি পরিত্যক্ত ডোবার মতো নামমাত্র। সুসমাচারের মধ্যেও আভাস পাই ভাঙ্গনের গন্ধ।

আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন ব্যবস্থায় চলছে গভীর আদর্শিক/মূল্যবোধ সঙ্কট। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে সেবার মানসিকতা ও জ্ঞানার্জনের পিপাসা নিয়ে। সেবার মানসিকতা ও জ্ঞানার্জনের পিপাসা নিয়ে বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে আজকের প্রজন্মকে এবং অনাগত প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে প্রগতিশীল, বিজ্ঞান ও সাহিত্যমনস্ক সৃজনশীল সুস্থধারার পরিবেশ।

অবস্বাদের কাছে মাথানত নয়। মেটাতে হবে সামাজিকতার দায়। প্রকৃত যে জনÑশ্রম সহিষ্ণু দিয়ে গড়ে তোলে ছোট ছোট নীড়। শোচনীয় সর্বনাশের মধ্যে খুঁজে সমৃদ্ধি। প্রতিদিনের সংসার সংগ্রাম, চড়াই-উতরাই, ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে গড়ে তোলে সম্ভাবনার আঙিনা। সরল-সত্যের সুষমা দিয়ে কুলষিত অন্তঃবৃত্তে জ্বেলে দেয় আলোর দ্বীপ। পতনের গভীরতর স্তর থেকে, নির্বাক নীরবতার স্তব্দ থেকে অধপতিদের মনে বপন করে আশার বীজ। মানুষে মানুষে ব্যবধান ঘুচায় বিশুদ্ধ ভালবাসায়। সেবার সৌরভে উজ্জীবিত করে পরিবেশ-পরিজন। সেবা এবং জ্ঞানার্জনের নেই দেশ-কাল, যার ছায়াতলে সবাই সমান।

দিপ্তী ইসলাম

ছবি : আরিফ আহমেদ

মডেল : সামি, নীহারিকা ও জেনি

প্রকাশিত : ৬ এপ্রিল ২০১৫

০৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: