মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইয়েমেনে সৌদি বোমাবর্ষণ

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫
  • নাদিরা মজুমদার

ইয়েমেনি-সঙ্কটে আন্তর্জাতিক মাত্রার সংযোজন এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করল। ইয়েমেন-সঙ্কটকে অনুধাবন করতে কিছু তথ্যাদি জানা দরকার। অতি প্রাচীন দেশ ইয়েমেন, বিশ্ব-সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে এককালে ‘সৌভাগ্যবান আরব’ নামে নন্দিতও হয়েছিল এবং ভাষাগত ও নৃতাত্ত্বিক দিক দিয়ে ‘এক্সক্ল¬ুসিভ সেমেটিক’ই রয়ে গেছে। ৬৩০ সালে হযরত মুহাম্মদ (স) বিশেষ দূত হিসেবে হযরত আলীকে (রা) ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন। বর্তমানে ছাব্বিশ মিলিয়ন জনসংখ্যার আধুনিক ইয়েমেন, মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্রতম ও সহিংসতম দেশের দলে পড়ে। আবার ভৌগোলিক অবস্থান তথা স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব তাকে আঞ্চলিক-খেলোয়াড়ের রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করেছে, ইউরোপ থেকে এশিয়ায় নৌ-পথে আসা-যাওয়ার প্রধান রুট বরাবর ইয়েমেনের অবস্থান, লোহিত সাগরের ব্যস্ততম বাণিজ্যপথও নাগালের মধ্যে। প্রতিদিন লাখ লাখ তেলভর্তি ব্যারেল, সৌদি শোধনাগারের ব্যারেলও, ভূমধ্যসাগর, স্যুয়েজখাল অতিক্রম করে এশিয়ার বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেন পৃথিবীর ব্যস্ততম বন্দরের একটি। পৃথিবীর ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী দলের আখড়াও এখানে।

বয়সের বিচারে ইয়েমেন প্রবীণ (কয়েক হাজার বছর) বটে কিন্তু আধুনিক ইয়েমেন যথেষ্ট নবীন। দেশটির বর্তমান সীমান্তের সৃষ্টি ১৯৯০ সালে, উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের একীভবনের পরে। পূর্বে, দুই ইয়েমেনের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই থাকত। অবশেষে, দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধের পরে, ১৯৭০ সালে সৌদি ও পরে মিসরের সমর্থন নিয়ে উত্তর ইয়েমেন প্রথমে প্রজাতন্ত্র রূপে আবির্ভূত হয়, আলী আবদুল্লাহ সালেহ হন প্রেসিডেন্ট। ১৯৯০ সালে একীভবন ঘটলেও, উত্তর ও দক্ষিণ নতুন করে আবারও গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, প্রচুর হতাহতও হয়, সালেহ অবশ্য ক্ষমতাসীনই থাকেন। তদুপরি, অসংখ্য উপজাতির (ট্রাইব) দেশ ইয়েমেনে, স্বায়ত্তশাসিত উপজাতীয় এলাকাগুলো যার যার মতো করে ছোট্ট ছোট্ট ‘সিটি স্টেট’ হয়ে বিরাজ করছে। অসামরিক জনগোষ্ঠীর প্রায় সবারই অস্ত্র রয়েছে, অন্যভাবে, জনসংখ্যার তুলনায় অস্ত্রের সংখ্যা বেশি। প্রত্যেক উপজাতির রয়েছে নিজস্ব মিলিশিয়া এবং এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো হুতি মিলিশিয়া।

হুতিরা জায়দি উপজাতিভুক্ত এবং হযরত আলীর (রা) পুত্র ইমাম হোসেনের নাতি জায়েদ ইবনে আলীর নামানুসারে ‘জায়দি শিয়া’ নামে পরিচিত, নিবাস ইয়েমেনের সুদূর উত্তরে সৌদি আরবের সীমান্তের অতি কাছে, সাদা নামক পাহাড়ী প্রদেশে। মোট জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশই জায়দি শিয়া। ‘হুতি’ নামকরণ হয় ধর্মীয় নেতা ও ইয়েমেনি সংসদের প্রাক্তন সদস্য হুসেন বদরুদ্দিন আল-হুতির নামানুসারে। ২০০৪ সালে রাজনৈতিক অংশদারিত্বের দাবিতে (হুতি) বিদ্রোহ পরিচালনা এবং ইসরাইল ও মার্কিনবিরোধী আন্দোলনের জন্য সরকার আল-হুতিকে অভিযুক্ত করে এবং ধাওয়া করার নির্দেশ দেয়। ফলে, আল-হুতি ও তাঁর কয়েকজন সমর্থক নিহত হন এবং কয়েকশ’ জন বন্দী হয়। সেই থেকে হুতিরা সরকারের ও রাজনীতিতে অধিকতর প্রভাবের দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সক্রিয় বিবাদে লিপ্ত হয় এবং জাতীয় উন্নয়নকে ও ঐতিহ্যবাহী জায়দি উপজাতিদের প্রয়োজনকে অবহেলা করে ওয়াহাবি সৌদি আরবের সঙ্গে মিত্রতার জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করে।

সৌদি আরবে অভিবাসনের পূর্বে ওসামা বিন লাদেনের পরিবার দক্ষিণ ইয়েমেনে বসবাস করত। জঙ্গী আল-কায়েদা ২০০৯ সালের মধ্যেই ইয়েমেনে শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে এবং ইয়েমেনি ও গোয়ান্তানামো থেকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সৌদি আল কায়েদাভুক্ত সদস্যরা অঙ্গীভূত হয়ে তৈরি করে ‘আরবীয় উপদ্বীপের আল-কায়েদা (একিউএপি বা আকাপ)।’ যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায়, আকাপদল পৃথিবীর বৃহত্তম সন্ত্রাস রফতানিকারকদের একটি এবং আল কায়েদার বিপজ্জনকতম শাখাও একটি। ২০০৭ সাল থেকেই মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয় আকাপ দমন ও বিনাশে নিয়োজিত রয়েছে। প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বহুল বিতর্কিত চালকবিহীন বিমান তথা ড্রোন। ফলে, প্রচুর নিরীহ মানুষও মারা যাচ্ছে, পাকিস্তানে যেমনটি ঘটছে। একাধিক মার্কিন ক্রুজ মিসাইলে আল কায়েদার বদলে নিরীহ অসামরিকরা ও শিশু নিহত হয়। বা ২০০৯ সালে, ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট সালেহ, ভাল আচরণের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ১৭৬ জন আল কায়েদা সন্দেহভাজনকে মুক্তি দেন কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মতৎপরতা অব্যাহতই থাকে।

অপরদিকে একই বছর (২০০৯) সৌদি বাহিনীর সহায়তায় ইয়েমেনি বাহিনী শিয়া-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে নতুন করে দমন পরিচালনা করে। অসংখ্য মানুষ স্থানচ্যুত হয়, হতাহতের সংখ্যাও হয় অনেক। ২০১০ সালে যুদ্ধবিরতি হয়। জায়দি দমনে সালাফি-দলকে সহায় সাহায্য প্রদানের জন্য শিয়া-বিদ্রোহীরা সৌদি আরবকে অভিযুক্ত করে। আবার ভাবাদর্শগত কারণে আল কায়েদাও হুতিদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন বিধায়, হুতিরা জঙ্গী আকাপের সঙ্গেও যুদ্ধরত হয়।

২০১১ সালের আরবীয় বসন্ত ইয়েমেনকেও উদ্বেলিত করেছিল। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, দুর্নীতিসহ শাসনতন্ত্রের সংশোধন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্টগিরিকে উত্তরাধিকার প্রথায় পরিণত করার সরকারী উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভের ঢল নামে। ফলস্বরূপ, যথারীতি পুলিশী ¯œাইপারে অসামরিকরা হতাহত হয়, সেনাবাহিনী ও উপজাতীয় যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সহিংসতার নিন্দা করে এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানায়। নবেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট সালেহ রিয়াদে পালিয়ে যান, ক্ষমতার ক্রান্তিকাল সংক্রান্ত উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার প্ল্যান সই করেন এবং ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান। দুই বছরের জন্য নতুন প্রেসিডেন্ট হন আবদুর রব মনসুর হাদি। কিন্তু প্ল্যানটি বাস্তবায়িত আর হয়নি। জায়দি উপজাতিদের দাবি-দাওয়াও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অবশেষে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বাসিন্দা পদত্যাগ করেন এবং প্রেসিডেন্ট হাদি, জাতিসংঘের প্রতিনিধি জামাল বেনোমার ও হুতিসহ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ‘ঐক্য সরকার বা ইউনিটি গবর্নমেন্ট’ গঠনের চুক্তি হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঘটনার দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। হুতিরা উত্তর থেকে রাজধানী সানামুখী নেমে আসে এবং সাধারণ ‘মবিলাইজেশনে’র ডাক দেয়। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট হাদিকে পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করে তারা। মার্কিন দূতাবাস স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। শিয়া-বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ‘তাইজ’ দখল করে নিলে, আল কায়েদা দমনে নিয়োজিত মার্কিন দূতাবাসের অবশিষ্ট স্পেশাল ফোর্স এবং কর্মচারীরা ইয়েমেন থেকে অতি দ্রুত চলে যায়। পদচ্যুত হাদি বন্দর শহর এডেন থেকে পালিয়ে চলে যান সৌদি আরবে।

একাধিক যুদ্ধরত বাহিনী- সরকারী, হুতি এবং আকাপ নৈরাজ্যের যে উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে, কার সাধ্যি যে সেখানে চরমপন্থার সহজ প্রসব ঠেকায়! এই সুযোগে আইসিস-আইসিলের অধিভুক্তরা ইয়েমেনে বেশ গুছিয়ে বসেছে, সেনাবাহিনী ও অসামরিকদের উপরে একহাত দেখে নিতেও শুরু করেছে। ২০ মার্চ, শুক্রবার, রাজধানী সানার এক শিয়া-মসজিদে যে আত্মঘাতী বোমা আক্রমণে একশ’জন মারা গেল এবং দু’শত পঞ্চাশজন আহত হলো, আইসিস-আইসিলের দাবি অনুযায়ী তারা সেই আক্রমণটি ঘটিয়েছে।

বর্তমানে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার ও সংস্থার অন্তর্ভুক্ত নয়, সর্বমোট নয়টি দেশ, (সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, জর্দান, মিসর, পাকিস্তান, সুদান ও মরোক্কোকে নিয়ে সৌদি আরব সামরিক কোয়ালিশন গঠন করেছে। আল-আরাবিয়ার খবর অনুযায়ী, সৌদি আরব একশ’টি যুদ্ধ প্লেন ও দেড়লাখ ‘বুটস অন দি গ্রাউন্ড’ বা পদাতিক বাহিনী মজুদ রেখেছে। সৌদিরা সর্বশেষ সরাসরি যুদ্ধ করেছিল ১৯২৪-২৫ সালে, হেজাজের হাশেমাইট কিংডমের বিরুদ্ধে। সেটি ছিল তলোয়ারের যুদ্ধ, ইবনে সৌদ হাশেমীদের পরাজিত করেন এবং মক্কা ও মদিনা শহরের প্রদেশ হেজাজ দখল করেন। অনেক অনেক বছর বাদে তারা আবার সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে, জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই সৌদি নেতৃত্বে ২৫ মার্চ থেকে ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ শুরু হয় এবং অব্যাহত রয়েছে।

হধফরৎধযসধলঁসফধৎ@মসরষ.পড়স

প্রকাশিত : ৪ এপ্রিল ২০১৫

০৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: