রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সততার সাত দৃষ্টান্ত

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

পৃথিবীর ধনকুবেরের একজন ওয়ারেন বাফেট। তাঁর একটি উক্তি সবার মুখে মুখে। উক্তিটি সততা নিয়ে- ‘সততা অতীব

দুর্লভ এক গুণ। ঠুনকো লোকদের কাছে তা প্রত্যাশা করা থেকে বিরত হও।’ সততার মুকুটধারীই পৃথিবীর

শ্রেষ্ঠ মহাজন। এই মহাজন মহৎ জন অর্থে। এমন ৭ জন সম্পর্কে লিখেছেন লিটু খান

বিল্লাই রে হ্যারিস

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যে ক্যানসাস শহরের ঘটনা। জনৈক ভদ্রমহিলা রেস্তেরাঁয় ঢুকলেন। খাওয়া শেষে ভুল করে একটি দামী হীরের আংটি কাপের ভেতর ফেলে চলে গেলেন। বিষয়টি চোখে পড়ল এক গৃহহীন দরিদ্র ব্যক্তির। তাঁর নাম বিল্লাই রে হ্যারিস। হ্যারিস তো হতবাক! দুষ্টবুদ্ধি মাথায় এলো মুহূর্তেই। আংটিটি বিক্রি করলে বেশ কিছু টাকা পাওয়া যাবে। কিন্তু হ্যারিস তা করল না। লোভ সংবরণ করল সে। আংটির খোঁজে ওই ভদ্রমহিলা পুনরায় রেস্তরাঁয় না আসা পর্যন্ত আংটিটি যতœ করে রেখে দিল হ্যারিস। ভদ্রমহিলা হারানো আংটি খুঁজে পেয়ে যারপরনাই খুশি।

পরবর্তীতে ওই ভদ্রমহিলার স্বামী হ্যারিসের নামে বিশ্বব্যাপী একটি তহবিল গড়ে তোলেন। সেখানে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লোকজন অর্থ সহায়তা প্রেরণ করে। প্রায় ২ লাখ ডলার অর্থ সহায়তা পায় হ্যারিস। এখন তার নিজস্ব ঘরও আছে। শুধু কি তাই! দীর্ঘদিন হ্যারিস বিচ্ছিন্ন ছিলেন পরিবার থেকে। এই ব্যতিক্রমী ঘটনার পর হ্যারিসের সাধুতার সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যমেও ফলাও করে প্রচার পায় হ্যারিসের সততার কথা। আর সে সূত্রেই হ্যারিসেকে খুঁজে পায় তার পরিবার।

অশীতিপর এক বৃদ্ধ

২০১১ সালের শেষ দিকের ঘটনা। অশীতিপর এক বৃদ্ধ সেইটেল সিয়ার’স অফিসে গিয়ে একজন ব্যবস্থাপকের খোঁজ করেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় ব্যবস্থাপকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও পান। ওই বৃদ্ধ ব্যবস্থাপকের হাতে একটি খাম দিয়ে অফিস ত্যাগ করেন। ওই খামের মধ্যে ছিল একটি চিরকুট আর ১০০ ডলার। চিঠিটি খুলে অবাক হন ব্যবস্থাপক।

ঘটনার পেছনেও ঘটনা থাকে। সেই ঘটনার জন্য যেতে হবে চল্লিশের দশকে। চিরকুটে ওই বৃদ্ধের সরল স্বীকারোক্তি, তিনি চল্লিশের দশকের কোন একসময় সিয়ার’সের ক্যাশ নিবন্ধন থেকে ২০ কী ৩০ ডলার চুরি করেন। সেই টাকাই সুদসহ ফেরত দেয়ার জন্য দীর্ঘদিন পর এই প্রচেষ্টা। অবশ্য সেইটেল সিয়ার’স কর্তৃপক্ষ ওই বৃদ্ধের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেনি। ওই ব্যবস্থাপকের মতে, ওই ছোট চুরির ঘটনা গত ৬০ বছর ধরে তাঁর বিবেককে কুরে কুরে খাচ্ছিল। মনে হয়, বিবেকের যন্ত্রনায় তিনি এই কাজটি করেছেন।

এ্যাডাম ওল্ডিমারিম

আমেরিকায় ইথিওপিয়ার এক অভিবাসী ট্যাক্সিচালক এ্যাডাম ওল্ডিমারিম। একবার তার ট্যাক্সিতে লাস ভেগাস বিমানবন্দরগামী এক যাত্রী ওঠে। যাত্রীকে ওই বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়ে এ্যাডাম ওল্ডিমারিম গাড়ি পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখেন পেছনের সিটে একটি ব্রিফকেস। সেটা খুলেই চোখ কপালে এ্যাডামের। ব্রিফকেস খুলে দেখেন কাড়ি কাড়ি ডলার। অঙ্কের হিসাবে তা ২ লাখ ডলারেরও বেশি।

এরপর এ্যাডাম তাঁর পরিবহন এজেন্সির কাছে পুরো ঘটনা খুলে বলেন এবং ব্রিফকেসটি পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে বেরিয়ে পড়েন পুনরায় গাড়ি নিয়ে। একঘণ্টার মধ্যে ওই পরিবহন এজেন্সির ব্যবস্থাপক এ্যাডামকে ফোন করে অফিসে আসতে বলেন। অফিসে এসে এ্যাডাম ওই যাত্রীকে দেখতে পান। চলে যাওয়ার আগে ওই যাত্রী তাকে ধন্যবাদ জানান এবং ২ হাজার ডলার পুরস্কার দিয়ে যান। এ্যাডামের সাধুতার কাছে পরাজিত হয় লোভ।

লুইস লোপেজ

অপরাধীরা জেল থেকে ছাড়া পেতে কত কী-ই না করে থাকে। আইনজীবীর দারস্থ হওয়া, সাজা কমানোর জন্য আবেদন করা, এগুলো তো সাধারণ ব্যাপার। আবার কেউ কেউ সুযোগ পেলে দেয় চম্পট। জেল থেকে অপরাধী চম্পটের কথা আমরা হরহামেশাই শুনি। এখন এমন একজনের কথা বলব, যাকে জেল কর্তৃপক্ষ ছেড়ে দেয়ার পর পূর্ণমেয়াদে সাজা না ভোগ হওয়ায় তিনি জেলেই ফিরে এসেছিলেন। বলছিলাম লুইস লোপেজের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারা কর্তৃপক্ষ যখন তাকে জেল থেকে খালাস দিচ্ছিল, তখন তিনি বুঝতেই পারছিলেন না, তিনি বাস্তবে আছেন, না স্বপ্নে। তবু কারা কর্তৃপক্ষ সাজা ভোগ শেষ, এমন যুক্তিতে ছেড়ে দেন। বাসায় ফিরে তিনি তাঁর আইনজীবীকে ডেকে পাঠান। তখন বুঝতে পারেন কারাগারের কম্পিউটারের পদ্ধতিগত ত্রুটির জন্য এই কা-। কোন প্রকার ছলছাতুরী বা শহর ছেড়ে পালানোর মতো পথ অনুসরণ না করে লুইস জেলেই ফিরে যান। খুলে বলেন প্রকৃত ঘটনা।

জিমি জেমস

জিমি জেমস নামের একজন পরিচ্ছন কর্মী তাঁর ময়লার ট্রাকে করে গৃহস্থালির আবর্জনা সরাচ্ছিল। দিনটা ছিল খ্রীস্টানদের পবিত্র দিন বড়দিন। উৎসবের আয়োজন ও ভূরিভোজে স্বাভাবিক নিয়মেই আবর্জনা বেশি হয়। তো এক বাসার সামনের স্তূপকৃত ময়লা ট্রাকে তুলে পরের বাসার দিকে রওয়ানা হল জিমি। পরের বাসার ময়লা তুলতে গিয়ে জিমি দেখল তাঁর ট্রাকের ময়লার স্তূপের ওপরে জেসিপি পেনি গিফট কার্ড (ডেবিট কার্ডের মতো)। কোন কিছু না ভেবেই ওটা কুড়িয়ে নেয় সে।

সারাদিনের কাজ শেষে প্রথমোল্লিখিত বাসায় সে কার্ডটি ফেরত দিতে যায়। কার্ডে অবশ্য অর্থ সামান্যই ছিল। মাত্র ৫০ ডলার। কোন ধরনের টিপসের প্রত্যাশা না করেই জিমি কার্ডটি দিয়ে সোজা চলে আসতে চাইছিল। কিন্তু গৃহস্বামী তাকে খুশি হয়ে ৭৫ ডলার দেন। এবং ওই ডলারের ওপরই লিখে দেন, ‘জিমির প্রতি, তোমার সততার জন্য ধন্যবাদ।’

ববি জোনস

ববি জোনস গত শতকের আমেরিকার বিখ্যাত গলফ খেলোয়াড়দের একজন। জীবনদ্দশায় তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বেশ সাফল্য ও সুনাম কুড়িয়েছেন।

ঘটনাটা ১৯২৫ সালের। বস্টনে আয়োজিত ইউএস ওপেনে অংশ নেন জোনস। একাদশতম গর্তে বল ফেলতে গিয়ে তিনি বলে তার স্টিক দিয়ে নিশানা ঠিক করছিলেন। অসাবধানবশত তার স্টিকের মৃদু আঘাত ঘাসে লাগে। ঘাসের ঈষৎ স্পর্শেই বলটি সামান্য নড়ে যায়। বিষয়টি ম্যাচ রেফারি বা দর্শক কারওই চোখে পড়েনি। তবে বিষয়টি ম্যাচ রেফারির কাছে স্বীকার করেন জোনস। ম্যাচ রেফারি তা মোটেও আমলে নেননি। কিন্তু জোনস তাঁর অবস্থানে অটল ছিলেন। ফলে রেফারি তাঁর ওই বল নড়াকে এক স্ট্রোক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হন এবং ৭৬-এর স্থলে তাকে ৭৭ দেন। ওই ম্যাচে জোনস হেরে গিয়েছিলেন। আর হেরেছিলেন ওই এক স্ট্রোকের জন্যই।

শিরোপা না পেলে কী হবে, এই কর্মকা-ের জন্য তাঁর ঝুলিতে তিনি ক্রীড়া সাংবাদিকদের লেখায় বেশ প্রশংসা পেয়েছেন। ওই সময় তিনি স্বভাবসুলভ ভদ্র ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘এখনও যে ব্যাংক ডাকাতি করেনি, তার জন্যও কিন্তু আমি প্রশংসার দাবিদার!’

জো কর্নেল

পশ্চিমা দেশগুলিতে অর্থ-কড়ি, মূল্যবান সামগ্রী বহনের কাজে ব্যবহার করা হয় ব্রিংক’স (মূলত নামজাদা কোম্পানির নাম) গাড়ি!

২০১৪ সালের মে মাসের ঘটনা। এ রকমই এক চলন্ত ব্রিংক’স গাড়ি থেকে পড়ে যায় একটি ব্যাগ। পেছন থেকে ছুটে আসা এক বাইক আরোহীর চোখে পড়ে ব্যাগটি। গাড়ির চালককে বিষয়টি নজরে আনার চেষ্টা করেন তিনি। চলন্ত বাইক থেকে গলা বাড়িয়ে চিৎকার দেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। কিছুক্ষণের মধ্যে বাইক ও ব্রিংক’স গাড়ি দু’টোই দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়।

পুরো ঘটনাটা ঘটে জো কর্নেলের চোখের সামনে। ব্যাগটির কাছে এগিয়ে যান জো। তিনি তখনও জানেন না, প্রকৃতপক্ষে কী আছে ওই ব্যাগে! কাছে গিয়ে ব্যাগটি খোলেন তিনি। দেখে তার শরীর হিম করার অবস্থা! করবেই না কেন, এ যে টাকাভর্তি ব্যাগ!

কাড়ি কাড়ি টাকা! দুষ্টবুদ্ধিকে প্রশ্রয় দেননি জো। ব্যাগটি নিয়ে সোজা গিয়ে ওঠেন ব্রিংক’স কোম্পানির অফিসে। ফেরত দিয়ে দেন টাকাভর্তি ব্যাগ! ওই ব্যাগে যে অর্থ ছিল তার পরিমাণ ১১৫,০০০ ডলার। টাকার হিসাবে প্রায় ১ কোটি! সৎ কাজের উপহার হিসেবে কোম্পানি জোকে প্রায় ৪ লাখ টাকা উপহার দেন।

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: