কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশেষ বন্ধুত্ব কি দাম্পত্যে সমস্যা?

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • সালমা লুনা

বিথি (৩৬), কাজ করেন একটি প্রতিষ্ঠিত মোবাইল ফোন কোম্পানিতে। আইটি বিভাগের সবচেয়ে চৌকস ইঞ্জিনিয়ার আশেক যখন তাঁকে বললেন, আমরা ভাল বন্ধু হতে পারি, তখন একটু কেঁপেই উঠেছিলেন। একমুহূর্তে মনে পড়েছিল তাঁর স্বামীর কথা। ভালবেসে যাকে তিনি বিয়ে করেছেন দশ বছর আগে। তাঁর একটি সন্তানও আছে ক্লাস টু-তে পড়ে। সুখের সংসার। এ কী করে সম্ভব! এখন তাঁর কি কারও সঙ্গে আবার একটি সম্পর্কে জড়ানো সম্ভব! ভেবেছিলেন তিনি। আজ মনে হলে হাসি পায়। আশেক আর তাঁর বন্ধুত্বের প্রায় দেড় বছর চলছে। বেশ ভাল বন্ধুত্ব, আশেকের বউ জানে। জানে বিথির স্বামীও। এর মধ্যে অন্য কোন গল্প নেই। তাঁরা একসঙ্গে অফিসে লাঞ্চ করেন, শপিংয়ে যান, ভাল মুভি এলে চলে যান সিনেপ্লেক্সে। মাঝে মধ্যে তাঁদের সঙ্গী হন তাঁদের জীবনসঙ্গীরাও। কখনও বা বেশ বড় একটা গেটটুগেদার হয়ে যায় যে কারও বাসায় যে কোন উপলক্ষে। আমাদের এই সমাজে যা অচল বলা যায় সেই রকমের একটি সম্পর্ক, বিথি আর আশেকের বন্ধুত্ব। বিথির ভাষায় যা বিশেষ বন্ধুত্ব। আশেক তাঁর বিশেষ বন্ধু।

সায়মা সুলতানা (৪১)। ফেসবুকে জয়েন করেছেন আজ প্রায় চার বছর। আপনমনেই লেখালেখি করেন। কারও কারও লেখায় লাইক করেন। ভাল লাগলে কমেন্টও করেন। কিন্তু কারও সঙ্গেই চ্যাট করেন না। বলতে গেলে চ্যাট করা পছন্দই করেন না। কখনও কখনও কেউ চ্যাটে এলেও তাকে ভদ্র ভাষায় না করে দেন। বিশেষ করে পুরুষ বন্ধুদের। আবার মেয়ে বন্ধুরাও তাঁর কাছে তেমন পাত্তা পায় না। কিন্তু একজন তাকে বেশ কিছুদিন ধরেই বেশ আকর্ষণ করছেন। তাঁর লেখা, তাঁর শেয়ার করা গান, কবিতা তাঁকে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অবশ্যই তিনি একজন পুরুষ। সেই ব্যক্তিটিই যখন তাঁকে চ্যাটে বারবার নক করেন, ভালমন্দ খবর নেন কিংবা তাঁর স্ট্যাটাসে অনেক সুন্দর কমেন্ট করেন বা তাঁর সদ্যই পোস্ট করা প্রোফাইল পিকচারের জন্য ইনবক্সে এসে ভদ্র মার্জিত ভাষায় প্রশংসা করে যান, তখন তাঁর বেশ অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়। সেই থেকেই শুরু। সায়মা খেয়াল করেছেন, তাঁর সেই ব্যক্তিটির সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছে। বেশ সময় নিয়ে কথা বলছেন তাঁর সঙ্গে। এমনকি তিনি যখন বললেন তাঁকে তুমি করে বলতে সায়মা নির্দ্বিধায় তাঁকে তুমি বলা শুরু করলেন। ফোন নম্বর আদানপ্রদানও হলো। সায়মার জন্মদিনে যেদিন বেশ বড় একটি গিফট প্যাক এলো, সেদিন সায়মা তাঁর স্বামীকেও জানালেন ঘটনাটি। সায়মার স্বামী শুধু জানলেন, তাঁরা ফেসবুকে তাঁদের বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছেন। হঠাৎ কখনওসখনও তাঁদের কথাও হয়।

তারপর সময় অসময়ে ফোন, ক্ষুদে বার্তা আদানপ্রদান ছোটখাটো মান-অভিমান এসব পেরিয়ে সম্পর্ক বেশ গভীর হলো। অনেকেই এটাকে প্রেম বলবেন। কিন্তু সায়মা এটাকে প্রেম বলতে রাজি নন কিছুতেই। তাঁর কাছে এটা একটা বন্ধুত্ব, স্র্রেফ বন্ধুত্ব। তার ভাষায় সেই ব্যক্তিটি তাঁর বিশেষ বন্ধু। প্রেমিক নয়।

তাই কি?

হ্যাঁ, এটা হতেই পারে। শুধু ফেসবুক না, এটা রিয়েল লাইফেও ঘটা সম্ভব। বাস্তবেও আমাদের কারও কারও সঙ্গে এমনটা হতেই পারে। কর্মক্ষেত্রে, পারিবারিক বন্ধুমহলে কেউ হতেই পারেন বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু। কিন্তু প্রচলিত অর্থে ঠিক প্রেমিক নয়। বিপরীত লিঙ্গ বলে আমাদের কপাল কুঁচকে ওঠে হয়ত বা। আমাদের সাধারণ সামাজিক ধ্যান-ধারণায় এটা বেশ জাঁকিয়েই বসেছে যে দুজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব থাকতে পারে না। তাদের মধ্যে একটাই সম্পর্ক হবে, তা হচ্ছে প্রেমের। আর বিবাহিত হলে তো কথাই নেই, এক্ষেত্রে সবার ধারণা হয়েই যায় যে এটা অবশ্যই পরকীয়া।

আর এটাও ঠিক যে, এক্ষেত্রে সবার আগে যে সমস্যাটি দেখা দেয় তাহলো দুজনারই দাম্পত্য জীবন। উপরোক্ত ঘটনাটিতে সায়মা কিন্তু তাঁর স্বামীকে জানিয়েছেন। তবে অবশ্যই একটু রেখেঢেকে। কেন এই রাখঢাক? সে কি তাদের সম্পর্কের অজানা কিছু গোপন করার জন্যই। তা নয় মোটেও, বললেন সায়মা। ‘আসলে এটুকু আড়াল থাকা ভাল। তাতে কমপ্লেক্স তৈরি হয় না। আমার স্বামীকে আমি চিনি। সে কতটুকু এলাউ করবে আমি জানি। আমি এটা জেনেবুঝেই করছি। আমি জানি আমি কী করছি। আমার তাঁর সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগে কারণ তাঁর রুচি-পছন্দের সঙ্গে আমার অনেক মিল আছে। আমরা গান ভীষণ ভালবাসি, দুজনেরই টুকটাক লেখালেখির অভ্যেস আছে, মূলত এসবই আমাদের কাছাকাছি এনেছে। দাম্পত্যে বিশ্বাস ও আস্থা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কিন্তু নিজের ভাললাগা মন্দলাগা বিসর্জন দিয়ে শুধু দাম্পত্য সঙ্গীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমি আমার বন্ধুত্বের জায়গাটাকে নষ্ট করতে চাইনি। তাই কিছুটা রাখঢাক রয়েছে আমার মধ্যে। হয়ত সেও করছে তাঁর স্ত্রীর কাছে। তাই বলে কিন্তু সম্পর্কটা অন্যরকম নয় মোটেই।’

বিথি বললেন একটু ভিন্নভাবে। আশেকের প্রবল ব্যক্তিত্বই আমাকে তাঁর প্রতি উৎসাহী করেছে। সে যখন অন্য অনেক সহকর্মীর মধ্য থেকে আমাকেই তার বন্ধু হওয়ার আহ্বান জানাল, তখন আমি নিজেকেই সম্মানিত ভেবেছি। একটুখানি অন্য ভাবনা মনে এলেও আশেকের উদার আচরণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারে তা মন থেকে মুহূর্তেই চলে গেছে। আমাদের মধ্যে খেলাধুলা থেকে শুরু করে গান, নাটক, বাজার দর থেকে শুরু করে সেক্সের মতো সেন্সিটিভ বিষয় নিয়ে পর্যন্ত সবই খোলামেলা আলোচনা হয়। তবে সব আলোচনা আমরা সবার সামনেই করি না। কে জানে হয়ত সবাই বুঝতে পারবে না। ভুল ভেবে নিতে পারে। ফলে ঝড় উঠতে পারে দাম্পত্যে, আমাদের চারপাশেও। আমরা জানি কিভাবে কতটুকু সবার সামনে শেয়ার করতে হয়।

হ্যাঁ, অনেক নারীই জানেন, তিনি যার সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করছেন তিনি তাঁর বিশেষ বন্ধু, কিন্তু প্রেমিক নয়। তারপরও তাঁরা জনসমক্ষে এটা প্রকাশ করতে চান না। কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারবে না। অন্যরা এই সম্পর্ককে নিয়ে উলটাপালটা ভাববে এই ভাবনায় সহজ সম্পর্কটি হয়ে যায় তিক্ত বা পরিত্যক্ত। যা হয়ত দুজনকেই দিত খোলা হাওয়া, নির্মল বন্ধুত্বের পরশ। তা এক নিমেষেই হয়ে যায় অচেনা। স্বামী মেনে নিতে পারবে না ভেবে অনেক স্ত্রীই তার স্কুল-কলেজের পুরনো বন্ধুকেও ত্যাগ করেন। কিন্তু এটা সমাধান নয় মোটেই। প্রতিটা সম্পর্কের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। কিন্তু কজন পারেন চিনে নিতে সেই আলাদা জায়গাটি? বিবাহিত নারী-পুরুষ তাদের নিজেদের দাম্পত্যে জায়গা অবশ্যই রাখবেন তবে সেটা নিজের মনের দরজা-জানালা বন্ধ করে নয়। নিজেদের একটুকরো আনন্দ উপভোগ বাদ দিয়ে নয়।

কিন্তু স্বামীরাও নিশ্চয়ই কিছু ভাবেন? তাঁরা কিভাবে দেখেন স্ত্রীর এই বিশেষ সম্পর্ককে?

সৈকত (৪৫), প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বেশ জোরালো গলায় বললেন, ফেসবুকের বন্ধু ফেসবুকেই থাকা ভাল। ভার্চুয়ালকে টেনে রিয়েলিটিতে আনলে সমস্যা হয়। আর বাস্তবে সহকর্মী বা অন্য কারও সঙ্গে স্ত্রীর বন্ধুত্ব না মানার কোন কারণ নেই। সে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং বিবেকসম্পন্ন একজন মানুষ। সে যা করবে নিশ্চয়ই বুঝে শুনেই করবে, তার প্রায়োরিটি ঠিক রেখেই করবে। তবে সেটা একটা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম না করাই ভাল।

কফিশপে বসে সময় কাটানো যেতেই পারে কিংবা শপিং মলে কেনাকাটাÑএসবে কোন সমস্যা নেই। তবে একসঙ্গে মুভি দেখাতে আমার আপত্তি আছে। বাসায়ও আসুক, আপত্তি করব না। তবে মনে কষ্ট হলেও স্ত্রীকে বাধা দেব না, কারণ আমার তার প্রতি আস্থা আছে সম্পূর্ণ।

কী করে সেটা সম্ভব?

হ্যাঁ, সেটাও প্রশ্ন বটে। এক্ষেত্রে সহায়তা কাউকেই করতে হবে না। নিজেই যথেষ্ট, নিজেকে চিনে নিতে। আপনি নারী বা পুরুষ যেই হোন, এমন একটি সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গেলে প্রথমেই জানুন আপনি তার সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে ঠিক কতটুকু এগোবেন। আপনি কি তার কথা আপনার পার্টনার বা জীবনসঙ্গীকে জানাতে পারবেন? তাকে সর্বসমক্ষে প্রয়োজনে এনে দাঁড় করাতে পারবেন? তার সঙ্গে সম্পর্কটিকে আপনি কি শুধু মানসিক সম্পর্কের সীমানায় সীমাবদ্ধ করে রাখতে পারবেন? যার সঙ্গে আপনার এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক তিনিও কি একই ধারণা পোষণ করেন আপনার সম্পর্কে? তিনিও কি আপনার মতো করেই ভাবেন? নাকি আরও এক ধাপ এগিয়ে চিন্তা করেন। আপনার সঙ্গে সম্পর্কটি তিনি বন্ধুত্বের জন্যই করছেন। নাকি বাজিয়ে দেখে নিচ্ছেন আপনি ঠিক কতটুকু আন্তরিক এই সম্পর্কে।

ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবে অবশ্যই আপনি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেই আছেন। আপনার সঙ্গীর জেন্ডার আপনার জন্য কোন বিশেষ ফ্যাক্টর না। সেক্ষেত্রে আপনি অবশ্যই আপনার দাম্পত্য সঙ্গীর কাছে বিষয়টি নিয়ে লুকোছাপা করবেন না। কারণ আপনার মন কতটুকু পরিষ্কার ওই সম্পর্কটিকে নিয়ে, তা জানার অধিকার আপনার দাম্পত্য সঙ্গীর আছে। দাম্পত্য একটি কমিটমেন্ট। এখানে জবাবদিহিতা থাকে। থাকে কিছু সীমাবদ্ধতাও। সবকিছু ডিঙ্গিয়ে আপনি আপনার বন্ধুত্বকে কিভাবে টিকিয়ে রাখবেন সেটা আপনার বিষয় হলেও, প্রায়োরিটি পাবে এক্ষেত্রে আপনার সংসার, আপনার দাম্পত্য অবশ্যই। কারণ দাম্পত্য কেবল একটি সম্পর্ক নয়। এটা একটা কমিটমেন্ট, উভয়ের। আর আপনি যার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন তার বিষয়টিও অবশ্যই ফ্যাক্টর। তারও যদি ঘর সংসার থেকে থাকে তাহলে দুজনার জন্যই এটা গুরুত্বপূর্ণ যে একে অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই সুন্দর টিকিয়ে রাখা যেখানে একটি স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া বিদ্যমান থাকে। সমাজে, পরিবারে প্রত্যেকটি সম্পর্কের রয়েছে আলাদা জায়গা। যা থেকে আমরা চাইলেই বেরিয়ে যেতে পারি না। তাই নারী-পুরুষের সম্পর্ককে চিরন্তন প্রেমের গ-িতে না বেঁধে আমাদের উচিত এই সমাজের অচলায়তন ভেঙ্গে দেয়া, যেখানে দুজন নারী বা দুজন পুরুষের মধ্যে সম্পর্ককে কেবল একটি প্রেমের সম্পর্ক মনে করা হয়। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যকার স্বাস্থ্যকর সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কেন হতে পারবে না সুখী দাম্পত্যকে টিকিয়ে রেখে?

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: