কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রাচ্য-পুরাণের নবরূপায়ণের কবি

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

কবি নূরুল হুদার পঞ্চাশ বছর বয়সে ‘সময়মানুষ’ নামে প্রকাশিত হয় একটি সংবর্ধনাগ্রন্থ। গ্রন্থ-ভূমিকায় কবির সাহিত্যসৃষ্টির পরিচয়কে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সেটি উদ্ধৃত করে এই লেখকের সব্যসাচী স্বরূপটি বিশদ করা যেতে পারে– ‘মুহম্মদ নূরুল হুদা কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, কাব্যনাট্য, গান ইত্যাদি। কিন্তু সর্বত্রই তাঁর কাব্যরুচি ও কাব্যিক শাসন যুক্ত হয়ে পড়ে, যার কারণে অনিবার্যভাবেই তাঁর রচনায় তৈরি হয় স্বকীয়তা ও ভাবনার একটি নতুন প্রান্ত। মুহম্মদ নূরুল হুদার সৃষ্টিশীলতায় দ্বৈত সত্তা বিরাজমান। প্রথম সত্তায় আমরা তাঁর কবিতায় হই আকৃষ্ট, হৃদয়াবেগ দিয়ে তা গ্রহণ করি; আর তাঁর কবিতার দ্বিতীয় সত্তায় আমরা লাভ করি বহুমাত্রিক চিন্তা-উদ্রেককর বিচিত্র অনুষঙ্গ, যা পাঠ করতে আমরা হই আচ্ছন্ন ও সম্মোহিত। সৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ কবি’র কবিতা শুধু আকৃষ্ট করে না, আকৃষ্ট স্তর পার হয়ে তা বিশেষ আচ্ছন্নতা বিস্তার করেÑ যেখানে তাঁর রচনায় বহুমাত্রিক জ্যোতিবলয়ের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। মুহম্মদ নূরুল হুদার অধিকাংশ রচনায় আমরা এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করি।’ মূলত বাঙালীর নেতৃত্বকে অবলম্বন করে ইতিহাস ও পুরাণাশ্রিত দ্রবিড় জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় বাংলা সাহিত্যে তুলে ধরেছেন তিনি। এই বিষয়টি নিয়ে এর আগে কাজ করেনি কেউ। প্রান্তিক পর্যায়কে তুলে ধরার পেছনে কারও উৎসাহ বা প্রেরণা বা অন্য কোন কারণ ছিল কিনা জানতে চাইলে নূরুল হুদা বলেন, আলোকিত বোধটার পরিপূর্ণ সচেতন প্রকাশ হলো কবিতা। আর সচেতন প্রকাশের জন্য ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা বা চিত্রকল্প ইত্যাকার আলঙ্কারিক কৌশল অর্জনের স্বার্থে যথাসাধ্য অধীত জ্ঞান প্রয়োজন। তবে অনুপ্রেরণার ভূমিকাও কম নয়। সেটা ভেতর থেকে আসুক কিংবা বাহির থেকে আসুক, অনেক বড় একটা কাজ করে। মূলত ষাট-এর মাঝামাঝি সময়ে আমি লিখতে শুরু করেছি, মোটামুটি সচেতনভাবেই। আবার এর আগে যে লিখিনি, এমনটাও নয়। আমার প্রথম কবিতার বই ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’। আমার প্রথম পর্যায়ের বিস্তর খসড়া কবিতা বাদ দিয়েই বইটা প্রকাশ করেছি। অনেক খসড়ায় সচেতন অভিব্যক্তির প্রকাশ ছিল না। ওগুলো সচেতন নির্মাণও নয়। আমি যে সময় থেকে লিখছি সে সময় বাঙালী জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালীর জাতিসত্তাভিত্তিক চেতনা খুব দ্রুতগতিতে স্ফুরিত হচ্ছিল। এই বিষয়টি তখন বাঙালীর মন-মানসিকতাকে সাংঘাতিকভাবে নাড়া দিচ্ছিল। সেদিন বাঙালীরা কিন্তু ব্যক্তি ও সামষ্টিক যাত্রায় সেই আরাধ্য জাতীয়তাবাদের দিকেই এগোচ্ছিল। তার পথ ধরেই এলো স্বাধীনতার স্বপ্ন, তারপর বাস্তবতা। অর্থাৎ স্বাধীনতার আগে-আগে, ১৯৬৯-এর সময়ে এসেই আমরা বুঝে গেলাম বাঙালী বিশ্বে একটা নতুন জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। তখন ব্যক্তি-আমিও শিখতে শুরু করলাম জাতিসত্তার উপকরণগুলো। বাঙালীর ভাষাচিন্তা, বাঙালীর সংস্কৃতিচিন্তা, বাঙালীর আত্মানুসন্ধান। আরও বলতে পারি, আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে আমার সংগ্রামী আদিপুরুষরাই।

তাহলে কি জাতিসত্তা নিয়ে কাজ করাটা আপনার সচেতনভাবেই করা? এমন প্রশ্নে উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা হলো এক ধরনের আলোকিত বোধ থেকে সচেতন নির্মাণ। প্রথমে এটা আমার বোধ থেকেই এসেছে। আসার পর চলমান সমাজ, ইতিহাস ইত্যাদি পাঠ করেছি। তারপর বুঝলাম জাতিসত্তার মর্মার্থ উপলব্ধি করা দরকার। কারণ, জাতিসত্তা ছাড়া কোন জাতির কাঠামো দাঁড়াতে পারে না। সেই জন্য ৬৯-এর আন্দোলনের পর আমি আমার দীর্ঘ কবিতা ‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’-তে বলেছিলাম, এই বঙ্গীয় ভূখণ্ডের মধ্যেই একটা নতুন জনপদ একটা নতুন জাতির উন্মোচন ঘটবে।

আপনার ছেলেবেলার কথা শুনতে চাই, শুনতে চাই বিশেষ কোন অনুপ্রেরণার কথাও। কবি শোনালেনÑ ‘আমি যে স্কুলে পড়তাম, তার পাশে একটা নদী ছিল, নাম ঈদগাঁও ছরা। আমি নাম রেখেছি ফুলেশ্বরী। ছোট একটা নদী। ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।’ রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতা। হঠাৎ করে শুনি আমার স্কুলেও একজন কবি আছেন। তিনি আমার শিক্ষক কাশেম স্যার। তখন মনে মনে ভাবলাম, আরে এঁরা যদি কবিতা লিখতে পারেন তাহলে আমি কেন পারব না? শুরু হলো আমার কাব্য সাধনা। আমি প্রথম ‘মিথ্যা কথার ফল’ নিয়ে পদ্য লিখলাম। বাঘ আসছে বাঘ আসছে এটা নিয়ে কবিতা। স্যার দেখে বললেন, বাহ্ তুমি তো কবি হয়ে গেছ। আমি অনুপ্রেরণা পেলাম। আমাদের স্কুলে একজন শ্যামাঙ্গিনী ছিল। আমি তার দিকে তাকাই, সে আমার দিকে তাকায়, কেবল ভালো লাগা না-লাগা কাজ করে, এটা নিয়েও একটা কিছু লিখেছিলাম। মাঝে মাঝে স্কুল শেষে চলে যেতাম বাইরের মাঠে। মধ্যাহ্নের সূর্য, মাঠ, তার ভিতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। তখন গ্রীষ্মকাল। মাঠের মাঝখানে সামান্য একটু ডোবা আছে। সেই ডোবায় কিছু জল। জল কাদায় একটা শামুক হাঁটছে। যখন শামুককে একটা দিয়ে খোঁচা দেই, শামুক থেমে যায়। এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকি, সে নড়েচড়ে না। হঠাৎ মুখ থেকে বেরিয়ে আসে : ‘গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলেই সুখ/রোদ-দুপুরে পুড়বে না আর বুক/বুকের তলে হৃদয় নামক আঁখি/টের পাবে না তির-শিকারি পাখি/ গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলেই ভালো/গহন সুখে জ্বলবে জ্বলুক আলো’। এছাড়া দুপুর বেলা পশ্চিম দিকে তাকিয়ে আছি। আমার বাড়ির ঠিক পশ্চিম দিকে মহেশখালি পাহাড়। পাহাড়ের ওপর আদিনাথের মন্দির। মন্দিরের পাশে বিশাল একটা গাছ। গাছের পশ্চিম দিকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মনে হলো, এ গাছের পাতা তো আলো দিয়ে তৈরি। আমি লিখলাম আলোকবৃক্ষ। আদিনাথ মন্দির, পাহাড়, তরঙ্গ– এগুলো সবই আমার কবিতা শেখার অনুপ্রেরণা। এর বাইরেও আরও কিছু ব্যাপার আছে আমার কবিতা লেখার পেছনে। সে সময় আমাদের গ্রামে শীতকালে কবির লড়াই হতো। কবিয়াল রমেশ শীলের মতো বড় বড় কবিয়াল আসতেন। সাথে থাকত তাঁদের শিষ্যসহ অনেকেই। মজার ব্যাপার হলো রমেশ শীলের সাথে দাঁড়িয়ে আমিও দু-চার লাইন গেয়ে দিয়েছি। তাঁর অর্থ এই যে, প্রচলিত লোক-সংস্কৃতি, লোককথা, পুঁথিপাঠ ইত্যাদিও আমাকে উৎসাহিত করেছে। আসলে সৃষ্টিশীল কল্পনা এবং বাস্তবতা যখন এক জায়গায় এসে দাঁড়ায় তখনই সাহিত্য হয়ে ওঠে চিরস্থায়ী।

আর বাবা-মায়ের ভূমিকা? মুহম্মদ নূরুল হুদা’র উত্তর, ‘আমাকে নিয়ে আমার বাবার আলাদা কোনো স্বপ্ন ছিল কিনা জানি না। আমি আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পাই। আমার গ্রামে এটাই প্রথম। ফলে বিশেষ এক অর্জন। আমি কোন গৃহশিক্ষকের কাছে পড়িনি। আমার শিক্ষা জীবনের সেই সফলতা আমার ক্ষেত্রে বেশ কাজে আসে। সেই সফলতা দেখে আমার আব্বা আমার কোন কাজে বাধা দিতেন না। হাই স্কুলে এসেও আমার রেজাল্ট ভালো হতে লাগল। অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষায় আবার বৃত্তি লাভ করি। তারপর ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডে আমি সেকেন্ড হয়েছিলাম। ফার্স্ট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু উচ্চতর গণিতে আমার রেজাল্ট খারাপ হয়। যে ছেলেটি প্রথম হয়েছিল তার অন্যান্য বিষয় থেকে আমার মার্কস ভালো হলেও ওই বিষয়টিতে আমি অনেক কম নম্বর পাই। সে যাই হোক, ওই সময় আমি প্রচুর ফুটবলও খেলতাম। আর যখন-তখন কবিতা লিখতাম। আমার বাবা বলতেন সরকারী আমলা হলেই ভালো হয়। কিন্তু আমি যখন গল্প-কবিতা লিখতাম তখন বাধা দিতেন না। সাহিত্য প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন সময়ে পুরস্কার পেতাম, তখন বাবা আরও উৎসাহ দিতেন। আসল কথা মা-বাবা কেউ আমাকে হতাশ করেননি।

কবিতা প্রকাশের শুরুটা সম্পর্কে বলুন। তিনি বললেন, এক্ষেত্রে কবি আহসান হাবীবের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। প্রথম যখন আমি তাঁর কাছে যাই কবিতা ছাপানোর জন্য, তিনি বললেন, কবিতা ভালো। কিন্তু ছন্দে একটু সমস্যা আছে। আমি বললাম মিলের সঙ্গে মিল দেয়া আছে। সমস্যা কোথায়? উনি বললেন, ওটা ছন্দ নয়। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সেসময় তিনি আমাকে একটা ছন্দের বইয়ের কথা বললেন। এই মুহূর্তে বইটির নাম মনে নেই। ছন্দের বই পাঠ করে আমি বুঝলাম, আসলে আমি ছন্দের কিছুই জানি না। এরপর প্রায় দু’বছর আমি তাঁর কাছে যাইনি। এই দুই বছরে আমি ছন্দ শিখতে থাকলাম। ছন্দ নিয়ে বিস্তর লেখাপড়া করলাম। এরপর ইত্তেফাকে, সংবাদে, পূর্বদেশে কবিতা ছাপিয়েছি; কিন্তু ভয়ে আহসান হাবীবের কাছে যাইনি। একদিন হঠাৎ দেখা হলে বললেন, তোমার কবিতা তো অনেক জায়গায় দেখছি। ভালো হচ্ছে। তুমি এসো। আমি বললাম, আপনার কাছে ভয়ে যাওয়া হয়নি। অর্থাৎ তিনি যদি আমাকে প্রথম আঘাতটা না দিতেন আমার ভেতর কখনও ঐ পরিবর্তন আসত না। আরও বলব, সিকান্দার আবু জাফরের কথা, হাসান হাফিজুর রহমানের কথা। একসময়ে হাসান ভাই সমকাল অফিসে বসতেন। তিনি আমার কবিতা ‘আমরা তামাটে জাতি’ পড়ার পর বলছিলেন, তুমি জান না তুমি কি লিখেছ। এছাড়া শওকত ওসমান আমার শিক্ষক ছিলেন। ‘আমরা তামাটে জাতি’ পড়ে একদিন তিনি বললেন, ‘হুদা, তুমি বাংলা কবিতায় এমন একটি পঙ্ক্তি উচ্চারণ করেছো যা কখনও বিস্মৃত হবার নয়’। তাদের এই উৎসাহ আমাকে বড় হতে সাহায্য করেছে।

আপনার কাছে কবিতা মানে কী? কবির উত্তর, ‘কবিতার সুনির্দিষ্ট কোন একক সংজ্ঞা নেই সত্য। তবে দেখবে, পৃথিবীর সব বড় কবিই আত্মরক্ষার্থে কোন না কোন সংজ্ঞা দাঁড় করিয়ে গেছেন। এজরা পাউন্ড এসে সংজ্ঞা দিয়েছেন। প্রাচীন ভারতীয় নন্দনতত্ত্বেও সংজ্ঞা দেয়া আছে। পূর্বে যা বলা হয়নি অথবা পূর্বে যা বলা হয়েছে তা হুবহু না বলে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন হলো কবিতার ধর্ম। কবিতা হলো মূলত উপমা ও তার সম্প্রসারণ। কবিতায় যখন কোন উপমা দাঁড় করানো হয় তখন অনেকেই তাকে মিথ্যা বা অসত্য বলে ভাবেন। কিন্তু একজন প্রকৃত কবি সেই আপাত মিথ্যাকে এমনভাবে নির্মাণ করেন যে তাকে আর মিথ্যা মনে হয় না। তখন ‘সে-ই সত্য যা রচিবে তুমি’। ধরা যাক একটি উপমা : ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন’। ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ এর আগে তো কেউ বলেনি। সেই মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করলেন জীবনানন্দ। তখন আমরাও বুঝলাম, বাংলা কবিতায় একটি নতুন কাব্যপ্রতিমা তৈরি হয়েছে। ইংরেজী সাহিত্যের পরিভাষায় বলি, কবিতা হচ্ছে ‘রিষষরহম ংঁংঢ়বহংরড়হ ড়ভ ফরংনবষরবভ : অর্থাৎ তুমি যা বিশ্বাস করতে চাও না, পড়ার পর মনে হবে তা-ই তো সত্য; আর এটাই কবিতা।

কবির রচিত কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’। এ নিয়ে একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। আমাদের সমসাময়িক পঞ্চাশের দশকের উল্লেখযোগ্য কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ। তিনি ছিলেন আমার খুব কাছের লোক। তখন তিনি দৈনিক বাংলায় চাকরি করেন। তিনি আমার কবিতা খুব পছন্দ করতেন। এই বইয়ের কবিতা পড়ে আমাকে উচ্চ প্রশংসা করলেন। বইটি নিয়ে তিনি দীর্ঘ অলোচনাও করেছিলেন। কিন্তু, নাম নিয়ে যে তার ভেতরে একটা দ্বিমত আছে, তিনি সেটাও আমাকে বললেন। তিনি বললেন, নামটা ‘সমুদ্রে শোণিতপাত’ হলেই ভালো হতো। আমি তাকে বললাম, আমি সচেতনভাবেই ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’ নামকরণ করেছি। বিশাল সমুদ্র। সেই সমুদ্রে এক ফোঁটা রক্ত বা শোণিত পড়তেই পারে। কিন্তু, আমি যদি বলি, ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’, তাহলে, রক্ত কত বিশাল হলে পুরো সমুদ্র একটি ফোঁটা হয়ে তার ওপর পড়তে পারে! এটি একটি হাইপারবোলিক চিত্রকল্প। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালী জাতি আত্মবলিদানের মাধ্যমে যে সীমাহীন শোণিত-সাগরের সৃষ্টি করেছে, এটি তারই দ্যোতক। আমি বলব এটা একটা উৎপ্রেক্ষা। এর ভেতরে আছে অতিকথনজাত সত্য। ওই যে বললাম, আগে যা বলা হয়নি অর্থাৎ মিথ্যাকে সত্যে প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করেছি। এটা হলো একধরনের নান্দনিক নিরীক্ষা। আমি সব সময় এই রকম কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আমার সশস্ত্র শব্দবাহিনী’– এখানে কেবল প্রথাগত যুদ্ধের কথা বলিনি। সঙ্গে সঙ্গে আমার শব্দ, আমার ভাষা, আমার অভিব্যক্তি ও শব্দসংগ্রামের কথা বলা হয়েছে। আমরা বাঙালীরা যদি আমাদের জাতিসত্তাবোধের পুনর্জাগরণ ঘটাতে না পারতাম তাহলে আমরা আমাদের দেশটাকে পেতাম না। ‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’ সম্পর্কে নূরুল হুদা বলেন, ‘আমার ‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’ বইয়ের কোন কোন দীর্ঘ কবিতায় দার্শনিকতার আবহ ও মিশ্রণ আছে। ‘নদী, তুমি নেবে কত দূর?’। এখানে নদী প্রবহমান জল, মাটি, প্রকৃতি, মানুষ, সময়, বিবর্তন, রূপান্তর ও নবায়নের প্রতীক। বাঙালীর নদী এবং বাঙালীর হৃদয় অবিচ্ছেদ্য। এ দুয়ের সম্পর্ক চিরকালীন। আমার চিন্তাস্রোত মূলত ব্যক্তি, সমষ্টি, প্রকৃতি, ভূগোল, সময়ের খ-তা ও অখ-তা নিয়ে। এগুলো নানাভাবে আমার লেখায় যুক্ত। আমি আরও চেষ্টা করেছি বোধ আর অভিব্যক্তি দিয়ে আমার সৃষ্টিকর্মের একটি ভিন্নতা তৈরি করতে।

বর্তমান সময়ে অনেকে কিন্তু এখন আপনার ‘দরিয়ানগর’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। কবির প্রতিত্তোর, ‘হ্যাঁ, এটা ক্রমেই সকলের কাছে গ্রণনীয় ও প্রিয় হয়ে উঠছে। ‘দরিয়ানগর’ নামকরণের পর ওখানে পর্যটনকেন্দ্র, এমনকি কবিতা-চত্বরও হয়ে গেছে। কবিতা বিশ্ববিদ্যালয় হবে, এই ঘোষণাও দিয়ে রেখেছি। আমি বিশ্বাস করি, আমি না থাকলেও ওখানে এই অভিনব বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে। পরবর্তীকালে কোন কবি কিংবা নান্দনিক সমাজের অন্য কেউ হয়ত বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করবে। আমার স্বাপ্নিক উপলব্ধি আমাকে এই ঘোষণা দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমি মনে করি নানাভাবে নিজেকে নির্মাণ করতে হবে। জীবনানন্দ দাশ বাংলার মুখের কথা বলেই খ্যাত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানব হয়েছেন ভারতের কথা বলেই। ইয়েটস তাঁর জন্মভূমি আয়ারল্যান্ডের কথা বলেই আজ পৃথিবীখ্যাত। বাংলা ও বাঙালীর কথা বলে কাজী নজরুল ইসলাম আজ সর্বমানবিক কবি। আর আমিও আমার এলাকাকে চিনি, তার মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে চিনি। আমার কাজ হলো তাদেরকে তুলে ধরা। বাংলা সাহিত্যে কক্সবাজারের উপকূলীয় জীবন নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ নেই। এর কারণ হলো অভিজ্ঞতার অভাব। বেশিরভাগ সাহিত্যিকেরই এই জীবনযাত্রা নিয়ে অভিজ্ঞতা কম। আমি যেহেতু সেখানে আছি, আমার প্রথম কাজ হচ্ছে এটাকে তুলে ধরা। এই জীবন নিয়ে আমার দুটো উপন্যাস : একটা ‘জন্মজাতি’, আরেকটা ‘মৈনপাহাড়’। তাই আমি বলি, আমার বৈশ্বিক হওয়ার চেয়ে আঞ্চলিক হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বলি বাঙালীর কথা, অর্থাৎ আমাদের এলাকার জাতিমানুষের কথা। এটা আমাদের জিওগ্রাফিকাল অবস্থান। আমার এলাকার মানুষ দ্রাবিড় মানুষ, অনার্য মানুষ। আমরা যদি আফ্রিকা যাই, দেখা পাই চিনুয়া আচেবে-র মতো লেখকের। যখন তিনি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ লেখেন, তখন নিজের ‘ইগবো’ আদিবাসী নিয়ে লেখেন। মার্কেজের ‘হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’-এ একটা পরিবারের কাহিনী থেকে শুরু করে একটা বিশেষ অঞ্চলের কাহিনী রয়েছে। এভাবেই তারা একইসঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক।

আবার কবিতা প্রসঙ্গে আসি। অনেকেই বলে, কবিতা আধুনিকতাকে অতিক্রম করে উত্তরাধুনিকতায় পৌঁছে গেছে। এ সম্পর্কে কবির অভিমত, বাংলা কবিতায় উত্তরাধুনিক কাল শুরু হয়েছে ষাটের দশকেরও পরে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বাংলা কবিতায় তার আগেও অসাধারণ একটা টেক্সট আছে। সারা পৃথিবীর মানুষ যখন আধুনিকবাদ করছে, সেই সময়ে, অর্থাৎ ১৯২১-২২ সালে, নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখলেন। টিএস এলিয়ট লিখছেন ‘দি ওয়েস্টল্যান্ড’, যা আধুনিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্য-নিদর্শন। অর্থাৎ ইউরোপে যখন আধুনিক কবিতার শুরু হচ্ছে, তখনি বাংলা ভাষায় উত্তরাধুনিক কবিতার এক শ্রেষ্ঠ নমুনা তৈরি হলো। কেননা কাজী নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি এমন নতুন একটি টেক্সট তৈরি করেছে, যা আমরা বলতে পারি প্রান্তমুক্ত (ঙঢ়বহ-বহফবফ)। উত্তরাধুনিকের আরেকটা স্বর হলো হাজার বার হাজার রকমে বলা। এটাকে বলে পলিফোনিক ভয়েস, যা নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আছে।

কবি’র পাশাপাশি আপনি একজন অনুবাদকও। বাংলা সাহিত্য প্রসারে অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু বলে মনে করেন? নূরুল হুদা বলেন, অনুবাদ হলো তথ্যগুলো অন্যভাষায় রূপ দেয়া। অনেকে ভাবে, অনুবাদ হলো কেবল অর্থটা দেয়া। তবে অর্থটা দিতে গেলে মাথায় রাখতে হবে অনেক কিছু: শব্দসম্ভার, কনটেক্সট, রেফারেন্স, ঐতিহাসিক সূত্র, সামাজিক সত্য, সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ ইত্যাদি। যেমন, বাউল শব্দটিকে কীভাবে অনুবাদ করা যায়? এটাকে সহজে অনুবাদ করা যায় না। বরং তার তাৎপর্যটা বুঝিয়ে দেয়া যায়। আক্ষরিক অনুবাদ করলে, এক বাক্যের সাথে আরেক বাক্যের যে অন্তর্গত রিলেশন তা আর থাকে না। তবে অনুবাদ করার জন্য শতভাগ যোগ্য অনুবাদক পাওয়াও মুশকিল।

বর্তমানে রচিত গদ্য কবিতা সম্পর্কে নূরুল হুদা’র অভিমত, ‘বাংলাদেশের সব পাঠক কিন্তু প্রকৃত কবিতার একরৈখিক পাঠক নয়। তাদের অনেকেই মন দিয়ে কবিতা পাঠ করতে যতটা আগ্রহী, কান দিয়ে শুনতে তার চেয়ে কম আগ্রহী নয়। তবে ছন্দমুক্তি অবশ্যই প্রয়োজন। যুগে যুগে ছন্দের পরিবর্তন হয়েছে। আমি যদি ছন্দে পরিবর্তন আনতে চাই, সেক্ষেত্রে এ যাবৎকাল বাংলা সাহিত্যে যত ছন্দ আছে সবগুলোকে জানতে হবে। অর্থাৎ না-জেনে নয়, জেনেই ছন্দকে ভাঙার সাহস দেখাতে হবে। তাছাড়া কবিতা যে শুধুমাত্র শব্দ দিয়ে লেখা হয় বা যায় এমন নয়। বর্তমানে যে নিরীক্ষা হচ্ছে, তাতে আলো দিয়েও কবিতা লেখা যায়। আলো দিয়ে যখন সৌন্দর্য বয়ান করা হয় তখন এমন এক ধরনের সৌন্দর্য প্রদর্শন করা হয়, যা তুলনারহিত। চার কিংবা পাঁচটা ছবি এক জায়গায় রেখে সেটাকে বলতে পার চিত্র কবিতা। আমার মতে, পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর তাঁর আগাগোড়াই কবিতা বা কবিতার মতো। অর্থাৎ তুমি চিত্রকলায়, স্থাপত্যে কিংবা তোমার যে কোন নান্দনিক সৌন্দর্যে যাকে আকর্ষণীয়ভাবে সৃষ্টি করো তা-ই কবিতা।

আপনার কবিতা-আন্দোলন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। কবি বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিচিত্রী কবিতা নিয়ে আন্দোলন করছি আমি। কবি তাঁর বোধে ‘সময়’-এর যে কোন পরিপ্রেক্ষিতকে স্বাধীনভাবে ধারণা করে কবিতা লিখতে পারবে। আর তার প্রকাশ হবে ‘প্রতিচিত্র’ শীর্ষক বিরোধাভাসজাতীয় বয়ানে। এই কবিতাবলির নাম হবে ‘প্রতিচিত্রী কবিতা’।

প্রকাশিত : ৩ এপ্রিল ২০১৫

০৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: