রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হল আছে, হল নাই

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫

সদ্য প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এই বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় ছিল ব্রাহ্মদের স্কুল। জ্ঞানের আলো ছড়াতে ১৮৫৮ সালে শুরু হয় যার পদযাত্রা। ১৮৭২ সালে এর নাম বদলে রাখা হয় জগন্নাথ স্কুল। পরে তা উন্নীত হয় কলেজে । কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পরিবর্তিত হয় ১৯৪৯ সালে। সর্বশেষ এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ পাসের মাধ্যমে একটি পূর্ণাজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ হাজার শিক্ষার্থী, ৫ শতাধিক শিক্ষক এবং তিন শতাধিক কর্মচারীদের কোন আবাসিক ব্যবস্থা নেই। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে কাগজে-কলমে এক ডজন হল আছে। তাতে শিক্ষার্থীদের স্থান নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একাধিকবার ফুঁসে উঠেছে তাদের জায়গা দখলমুক্ত করতে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সফলতা আসেনি।

শিক্ষার্থীদের মেস জীবন

পুরান ঢাকায় অধিকাংশ এলাকার ভবনগুলো রংচটা, পলেস্তার উঠা, জরাজীর্ণ। ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে আছে একটির গায়ে অন্যটি। নিচতলায় লোহালক্কড়ের কারখানা, চিপা গলি, অন্ধকার সিঁড়ি এখানকার চেনা চিত্র। এমন পরিবেশের সঙ্গে কেবল লেখাপড়ার জন্যই প্রতিনিয়ত লড়াই করে থাকতে হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের।

রায় সাহেববাজার থেকে ধোলাই খাল টং মার্কেটের দিকে এগোতেই রাস্তার দুই ধার দিয়ে সারি সারি পুরাতন দালান। দালানের নিচতলায় মোটরগাড়ির গ্যারেজ। ফুটপাথের ওপর প্রায় একযুগ ধরে পড়ে আছে ভাঙ্গা গাড়ির দেহাবশেষ। কেউ কেরোসিন তেল দিয়ে বিয়ারিংয়ের পোড়া মবিল ধৌত করছে। কেউ হাতুড়ি-হামার দিয়ে পিটিয়ে গাড়ির বডি ঠিক করছে। যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এরই মাঝে এক মার্কেটের নাম হাজী মার্কেট। এর ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় থাকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কামাল, সাদ্দাম, শাহীন, সবুজ, জামাল, জাহিদসহ বেশ কয়েকজন। প্রায় অন্ধকার সিঁড়ি ভেঙে ঘরে উঁকি দিতেই চোখে পড়ল অপরিচ্ছন্ন, ঘিঞ্জি, স্যাঁতসেঁতে একটি রুম। এই মেসের বাসিন্দা শাহীন বললেন, পুরান ঢাকার এ অংশের মতো প্রায় সব বাসার একই হাল। তাও ভাড়া পাওয়া যায় না। অনেক অনুরোধের পর ব্যাচেলরদের ঠাঁই করে নিতে হয় ষষ্ঠ বা সপ্তম তলায়। এতে আমাদের প্রতিদিন ক্লাস করতে, নামাজ পড়তে, বাজার করতে এমন কি যে কোন কাজ করতে ২০ থেকে ২৫ বার সাত তলা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে-নামতে হয়। বিশেষ করে দুপুর বেলা কাঠফাটা রোদে যখন একবার সিঁড়ি বেয়ে ওঠা হয় তখন জীবন যেন যায় আর আসে। প্রতিদিন নিচ থেকে খাওয়া ও ১০-১২ লিটারের পানির বোতল টেনে উঠাতে হয়। না হলে ট্যাবের ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেতে হয়। আমাদের প্রায়ই রোগ-বালাই লেগেই থাকে। কয়েকদিন আগেও আমার বন্ধু সাগর জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। ক্যাম্পাসে হল না থাকায় এমন দুর্ভোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী।

মেসের আরেক বাসিন্দা এরশাদ বলেন, মেসে প্রায়ই নানা রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। স্থানীয় লোকজন প্রায়ই মেসে নানা ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি করে। কারণে-অকারণে প্রায়ই আমাদের সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ করে। মেসের ভেতর জোর করে মাদক সেভন আর জুয়ার আড্ডা বসায়। বাধা দিলে মারপিট করে। মেরে ফেলার হুমকি দেয়। তাদের ভাষ্য, আমগোর মহল্লায় আমরা যা বলুম তাই মানতে হইব। ভাল না লাগলে এলাকা ছাইড়া জাউগা। এছাড়া মেসের পরিবেশও থাকার উপযোগী না। অন্য এক মেসের বাসিন্দা নাঈম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও আমাদের প্রতি মাসে খাওয়া-থাকা বাবদ প্রায় ৬-৭ হাজার টাকা খরচ হয়। এর পর মালিক প্রতিবছরে ১-২ বার ভাড়া বাড়ায়। একরুমে ৫-৬ জন গাদাগাদি করে থাকতে হয় ভাড়ার টাকা কমানোর জন্য। তাতেও হয় না। এখানে কোন রিডিং রুম নাই। কোন বিনোদনের জায়গা নাই। এতে আমরা একাডেমিক পড়ালেখার সুযোগ খুব কম পাই। আর বাড়তি জ্ঞানচর্চা করার প্রশ্নই ওঠে না। রান্নার জন্য কাজের বুয়া পাওয়া কষ্টসাধ্য। যদিও অনেক টাকা বেতন দিয়ে পাওয়া যায় তাতে অধিকাংশ দিন থাকে অনুপস্থিত। এতে প্রায়ই আমাদের অনাহারে অথবা অর্ধহারে দিনযাপন করতে হয়।

ব্যাচেলর ভাড়া হবে না

ব্যাচেলরদের কেউ মেসভাড়া দিতে চায় না। যদিও অনেক তদবিরে মেলে। তাতে সমস্যার শেষ নেই। প্রায়ই পানি থাকে না। সকাল ৯টার পর পানি বন্ধ। রাত ১১টার পর গেট বন্ধ। জানালায় দাঁড়ানো যাবে না। ছাদে ওঠা নিষেধ এমন আরও অনেক প্রতিবন্ধকতার কথা মন খারাপ করে বললেন বাংলার তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রাসেল। নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের ১০ম ব্যাচের ছাত্র মুতালেব বললেন, কমবেশি সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই আবাসিক ব্যবস্থা আছে। অথচ ২৩ হাজার ছাত্রছাত্রীর এ ক্যাম্পাসের কেউ হলে থাকতে পারে না। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারলাম, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন হল নেই।

হল যেভাবে বেদখল হলো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থাকা অবস্থায় এর হল ছিল ১২টি। সরকারের মৌখিক নির্দেশে পুরান ঢাকার ১২টি পরিত্যক্ত বাড়িতে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররা ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বসবাস করতেন। ১৯৮২ সালের পর থেকে দখলে চলে যায় ভবনগুলো। এই বাস্তবতায় ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে জগন্নাথ কলেজ। ততদিনে একটি হলও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেই। হলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেন ছাত্রছাত্রীরা। আন্দোলনের মুখে প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম খান বিশ্ববিদ্যালয়ের বেদখল সম্পত্তির খোঁজ নিতে একটি কমিটিও গঠন করেন। দীর্ঘদিন কাজ করে ২০০৮ সালের ২৯ জুন চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেয় কমিটি। তারা জানায়, ১২টির মধ্যে ছয়টি হলই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তি। বাকি জায়গা খাসজমি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলে থাকায় এগুলোর দখল পেতেও সমস্যা হবে না। রিপোর্টের কপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও জমা দেয়া হয়। এরপর আরও পাঁচবার কমিটি গঠনের পর ২০১৪ সালের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়। তাতেও ভাল কোন ফল আসেনি। এভাবে বার বার আন্দোলন হয় আর উদ্ধার কমিটি গঠন হয়ে থেমে যায়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।

হল নাই-হল চাই

বিশ্ববিদ্যালয়ের আট বছর বয়সেও হল না থাকার দুর্ভাগ্য মেনে নিতে পারেননি কোন ছাত্রছাত্রীই। বার বার আবাসন সমস্যা সমাধানের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন তাঁরা। রক্ত ঝরিয়েছেন। ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি হল দখলমুক্ত করা, নতনি হল নির্মাণ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা স্থানান্তরের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত হন ৩০ জন। হলের দাবিতে আন্দোলনে এ পর্যন্ত চারটি মামলা করেছে পুলিশ। আসামি হয়েছেন সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। অনেককে জেলেও যেতে হয়েছে। প্রতিবছর ‘২৭ জানুয়ারি হল উদ্ধার আন্দোলন দিবস’ পালন করছেন ছাত্রছাত্রীরা। তবে এসব আন্দোলন-আলোচনায় বার বার থেমে যায়। আট বছরে কয়েকজন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিলেও ছেলেমেয়েদের থাকার জায়গা দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়।

এদিকে ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর ড. হাবিবুর রহমান হল উদ্ধার হলেও তা আবাসন উপযোগী করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এক হাজার আসনবিশিষ্ট একটি ছাত্রী হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এক বছর ধরে তার মাটি পরীক্ষার কাজই শেষ হয়নি।

হাসান ইমাম সাগর

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫

২৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: