আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কুমির রফতানির হাতছানি

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫
  • এস এম মুকুল

বাংলাদেশের রফতানি তালিকায় নতুন আরেক সম্ভাবনার নাম কুমির। বিশ্ববাজারে চাহিদার আলোকে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে কুমির চাষ। এই কুমির এখন নতুন সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত রফতানি পণ্য হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার এবং বন বিভাগের সহায়তায় এ খাতে উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা গেলে, আগামী ২০২১ সাল নাগাদ শুধু কুমির রফতানি করে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব।

কুমিরের কিছুই ফেলনা নয়। কুমিরের পাকা চামড়ার চাহিদা রয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ উন্নত বিশ্বে। কুমিরের চামড়ার ব্যাগ আন্তর্জাতিক বাজারে কম-বেশি প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছে। কুমিরের হাড় দিয়ে প্যারিসে তৈরি হচ্ছে দামী সুগন্ধি। দাঁত থেকে তৈরি হচ্ছে মূল্যবান গহনা। চীন, থাইল্যান্ড, জাপান, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কুমিরের মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব দেশে প্রতিকেজি প্রক্রিয়াজাত কুমিরের মাংস প্রায় ১৭৫ মার্কিন ডলার থেকে ২০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশে রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড প্রথম বাণিজ্যিকভাবে কুমির চাষ শুরু করে। এছাড়াও ৫০টি কুমির দিয়ে গত বছর আকিজ গ্রুপ বান্দরবানের নাইক্ষাংছড়িতে আরও একটি কুমিরের বাণিজ্যিক খামার শুরু করেছে।

ভালুকায় কুমিরের খামার

ভালুকা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাতিবেড় গ্রামে রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড নামে ১৩.৫৬ একর জমি ক্রয় করে ২০০৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ৭৪টি কুমির দিয়ে একটি বাণিজ্যিক কুমির খামার গড়ে তোলেন অতি সাহসী তরুণ উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদ। মালয়েশিয়ার সারওয়াত থেকে সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৫টি কুমির আনেন তিনি। খামারের ১৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫ একর জমির ২০ হাজার বর্গফুট পুকুর এলাকায় ছেড়ে দেন এ সকল কুমির। পুকুরের চারদিকে সীমানা প্রাচীর টেনে দেয়া হয়। আমদানিকৃত কুমিরের মধ্যে ১৫টি পুরুষ রয়েছে। ফার্মে ৬-৭ বছর বয়সের একটি স্ত্রী কুমির বছরে একবার (এপ্রিল-মে মাসে) ৩০ থেকে ৪০টি করে ডিম দেয়। ডিম ফুটতে সময় লাগে ৭০ থেকে ৮০ দিন। এখানে কৃত্রিম উপায়ে ডিম ফোটানোর ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে খামারে ৪০টি পুকুর রয়েছে। ২০০৮ সালে ১৭টি কুমির থেকে ডিম পাওয়া যায় ৯০০টির মতো। এগুলো থেকে বাচ্চা ফোটে প্রায় ২৪০টি। ২০০৯ সালে এসে ২৩টি কুমির থেকে ডিম পাওয়া যায় প্রায় ১ হাজার ১৫০টি। এই খামারে এখন কুমিরের বাচ্চা লালন-পালন হচ্ছে প্রায় ৮০৫টি। এর মধ্যে রফতানিযোগ্য হয়েছে প্রায় ১৪১টি বাচ্চা। দ্বিতীয় ব্যাচে রফতানির তালিকায় আছে প্রায় ২৪০টি।

জাপানে যাচ্ছে কুমিরের চামড়া

রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড থেকে জাপানের হরিউঁচি ট্রেডিং কোম্পানি নামে একটি ট্যানারিতে ৪৩০টি কুমিরের চামড়া বাণিজ্যিকভাবে রফতানি করা হয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। কুমিরের মাংস, দাঁত ও হাড় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এগুলোও রফতানির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। কুমিরের মাংস শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে রফতানি করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালের জার্মানির একটি ইউনিভার্সিটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬৭টি কুমির ১ কোটি টাকায় বিক্রি করে।

ঘুমধুমের কুমির চাষ প্রকল্প

কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তের ঘুমধুমে প্রতিষ্ঠিত এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমির চাষ প্রকল্পে উৎপাদন শুরু হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা থেকে ৭০ কিলোমিটার ও উখিয়া উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরত্বে ঘুমধুম পাহাড়ী এলাকায় ২৫ একর জায়গার ওপর এ কুমির চাষ প্রকল্পটি গড়ে তুলেছে আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম লিমিটেড। ঘুমধুম নামের অবহেলিত একটি ইউনিয়নে কুমির চাষ প্রকল্পের মতো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় এলাকার অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০০৯ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটিকে ২০১০ সালের শুরুতেই পরীক্ষামূলকভাবে ৫০টি কুমির উন্মুক্ত জলাশয়ে ছাড়া হয়। এর মধ্যে ৩টি কুমির মারা গেলেও বর্তমানে ৪৭টি কুমির সুস্থ রয়েছে। এ প্রকল্পে থাকা ৩১টি মাদি কুমির সম্প্রতি ৩০০ বাচ্চা প্রসব করে। এর মধ্যে ১১টি বাচ্চা মারা গেলেও ২৮৯টি বাচ্চা সুস্থ আছে। আগামী ৪ বছর পর এসব কুমির মালয়েশিয়ায় রফতানি করলে প্রায় হাজার কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় কুমির

দেশীয় এবং স্থানীয়ভাবে কুমির খামারগুলো দর্শনীর বিনিময়ে বিনোদন এবং আয়ের উৎস হতে পারে। পাশাপাশি এ খাতে হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। দেশের অপ্রচলিত পণ্য রফতানির তালিকায় নাম লেখাচ্ছে কুমির। কুমির রফতানি করে প্রতিবছর এক শ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব। তবে এ জন্য চাই যথাযথ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ।

inbox.mukul@gmail.com

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫

২৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: