আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইন্দিরা-নিক্সন ॥ কূটনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • কাওসার রহমান

(২৬ মার্চ সংখ্যার পর)

এতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ব্যাহত হতো। তাই বাংলাদেশ অর্জনে ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক অবদান অন্যান্য অবদানের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে জেনে নিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা ও বাংলাদেশ সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের বহু দেশে বিশেষ দূত পাঠান। বাংলাদেশের অনুকূলে বিশ্বের জনমত ও বিবেক জাগ্রত করার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ঝানু কূটনীতিকদের বিশেষ দায়িত্ব দেন। এজন্য তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে তিনি বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেন। ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ দূত হিসেবে সিদ্ধার্থ শংকর রায় থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া সফর করে বাংলাদেশ সমস্যার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন।

জুন মাসের মাঝামাঝি ভারতের শিল্পমন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরী বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের মনোভাব তুলে ধরার জন্য অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, হল্যান্ড, ইতালি, সুইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরন সিং ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রামও বাংলাদেশ প্রশ্নে বিভিন্ন দেশ সফর করেন এবং বাঙালী শরণার্থীদের আগমন ও পাকিস্তান সরকারের বর্বরতার বিবরণ তুলে ধরেন।

বিদেশে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার জন্য শিক্ষামন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়কে পাঠিয়ে গান্ধী বসে থাকেননি। তিনি নিজেও একজন পেশাদার কূটনীতিকের মতো ভূমিকা পালন করে বিদেশীদের বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানিয়েছেন। ১৯৭১ সালের ১৩ মে বেলগ্রেডের রাজধানী বুদাপেস্টে বিশ্বশান্তি কংগ্রেসের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। এ সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন। ৮০টি দেশের ৭০০ প্রতিনিধির এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারত নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি বার্তা পাঠান। বার্তাটি সম্মেলনে পাঠ করা হয়। বার্তায় তিনি বলেন, প্রায় ২০ লাখ উদ্বাস্তু ভারতে চলে এসেছে। এতে ভারতের ওপর প্রচ- চাপ পড়েছে। উদ্বাস্তুরা যাতে নিরাপদে দেশে মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে পারে তেমন অবস্থা সৃষ্টির জন্য পাকিস্তানকে বাধ্য করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যাতে তাদের শাসন করতে পারেন, সে অবস্থা সৃষ্টির জন্য ভারত কাজ করছে। তিনি এই কাজে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা চান।

২৩ মে ইন্দিরা গান্ধী মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের কাছে এক কূটনৈতিক পত্রে বাংলাদেশ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ করার জন্য উদ্যোগ নিতে তিনি মিসরের প্রেসিডেন্টকে ওই পত্রে অনুরোধ করেন। পত্রে তিনি বাংলাদেশ সমস্যা শুধু ভারতের জন্য সমস্যা নয়, এ সমস্যায় বিশ্বশান্তি বিঘিœত হতে পারে বলেও মিসরের নেতাকে জানান।

১ জুলাই গান্ধী লন্ডনের টাইমস পত্রিকার প্রতিনিধিকে সাক্ষাতকার দেন। তাতে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানের নতুন পরিকল্পনা বাংলাদেশের অবস্থা আরও ভয়াবহ করে তুলবে।’ ৮ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কাছে বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষা ও মুক্তির দাবি জানিয়ে পত্র দেন। পত্রে তিনি ইয়াহিয়া খান কর্তৃক প্রহসনমূলক বিচারের নামে শেখ মুজিবকে হত্যা করার চক্রান্ত তুলে ধরে তা প্রতিহত করার জন্য বিশ্বনেতাদের অনুরোধ করেন এবং ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানান।

১১ আগস্ট মিসেস গান্ধী বিশ্বের ২৪জন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে বঙ্গবন্ধুর প্রাণ রক্ষায় তাদের প্রভাব খাটানোর আবেদন করেন। ১২ আগস্ট তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে অন্যান্য দেশের অনীহা সবচেয়ে দুঃখজনক।’ জাতিসংঘের মহাসচিবের বাংলাদেশ সংক্রান্ত ভূমিকায় তিনি বলেন, তার যা করা উচিত ছিল তিনি তা করেননি, যা খুবই দুঃখজনক। ইন্দিরা গান্ধীর এসব কূটনৈতিক কর্মকা-ের ফলে ১৭ আগস্ট জেনেভায় আন্তর্জাতিক আইন সমিতির পক্ষ থেকে, পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে প্রেরিত তার বার্তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি করা হয়। ২০ আগস্ট হেলসিংকি থেকে বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দাবি করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে। ৩০ আগস্ট ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্রকে সাক্ষাতকার দেন। তাতে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির বিবরণ দেন এবং বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের ভূমিকার যৌক্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে ইন্দিরা গান্ধী তার কূটনীতির অংশ হিসেবে সোভিয়েত রাশিয়া সফরে যান। ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি ক্রেমলিনে সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভ, প্রধানমন্ত্রী কোসিসিন ও প্রেসিডেন্ট পদগোর্নির সঙ্গে বাংলাদেশ প্রশ্নে ছয় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করেন। তাঁর সম্মানে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিসিন-প্রদত্ত ভোজসভায় শ্রীমতী গান্ধী বলেন, বাংলাদেশ সমস্যা ভারত-পাকিস্তানের সমস্যা নয়, এটা এখন আন্তর্জাতিক সমস্যা। তাঁর কূটনৈতিক ভূমিকার কারণে ২৯ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত-ভারত যুক্ত ইশতেহার প্রকাশিত হয়। তাতে বাংলাদেশ প্রশ্নে এশিয়া পরিস্থিতিতে অভিন্ন মতামত ব্যক্ত করা হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নে ইন্দিরা গান্ধীর সফর ও নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার কারণে ‘ভারত-রাশিয়া’ যুক্ত ইশতেহারে বাংলাদেশ প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, যা বাংলাদেশ অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। ইন্দিরা গান্ধীর রাশিয়া ভ্রমণের অল্প কয়েকদিন পরই, ৩ অক্টোবর সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি দিল্লী সফর করেন। রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক শেষে দিল্লী থেকে হ্যানয়ের উদ্দেশে যাত্রাকালে তিনি বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। ১৬ অক্টোবর দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধী যুগোসøাভিয়ার প্রেসিডেন্ট যোশেফ টিটোর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মিসেস গান্ধী বাংলাদেশ পরিস্থিতি যোসেফ টিটোর কাছে তুলে ধরেন।

এদিকে ১৯ অক্টোবর ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাতকারে শ্রীমতী গান্ধী বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে।’ ২১ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও টিটোর এক যুক্ত বিবৃতিতে বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে সাবধান করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। ২৪ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন সময় হয়েছে বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে জানানো।’ ওই দিনই তিনি ১৯ দিনের বিশ্ব সফরে বের হন। এবার তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েকটি দেশ সফর করেন এবং রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। একই সঙ্গে ভারতের অবস্থান যুক্তিসহ তুলে ধরেন। তার এই সফর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

২৫ অক্টোবর ব্রাসেলসে রয়েল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এ্যাফেয়ার্সে ভাষণ দেন ইন্দিরা গান্ধী। ভাষণে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ৯০ লাখের বেশি মানুষ পকিস্তানী সৈন্যদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ভারতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করায় সামরিক জান্তা বাংলাদেশের জনগণের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে।

২৬ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী ব্রাসেলসে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, পরিস্থিতির জন্য দায়ী পাকিস্তানী সামরিক শাসক ইয়াহিয়া। তিনি সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু করার আহ্বান জানান। একই দিনে তিনি বেলজিয়াম থেকে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় পৌঁছান এবং প্রেসিডেন্ট ফ্রংক ও চ্যান্সেলর ড. ব্রুনে ক্রাকির সঙ্গে আলোচনা করেন।

২৮ অক্টোবর ভিয়েনায় অস্ট্রিয়ান কোয়ালিটি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভারত নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সমস্যা সৃষ্টিতে পাকিস্তানী শাসকদের ভূমিকা তুলে ধরেন। ৩১ অক্টোবর তিনি ব্রিটেনে এক ভাষণে বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচনে প্রদত্ত রায় বানচাল করে পাকিস্তানী সেনা শাসকদের গণহত্যার বিবরণ দেন। এই ভাষণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ওই সমস্যার সমাধানকল্পে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এ্যাডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রশ্নে প্রায় দু’ঘণ্টা আলোচনা করেন। তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আলেক ডগলস হিউসের সঙ্গেও আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলনে ভাষণ দেন। শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ও শরণার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখার জন্য ব্রিটিশদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

২ নবেম্বর ইন্দিরা গান্ধী বিবিসির সাংবাদিক মার্কটালির সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেন। তিনি ২৫ মার্চে ঢাকাসহ বাংলাদেশের শহরগুলোতে পাকিস্তানী সৈন্যদের বর্বরতার কথা বলেন। বাংলাদেশ প্রশ্নে তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, এ বিষয়ে আলোচনার একমাত্র ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমান। ৩ নবেম্বর শ্রীমতী গান্ধী লন্ডন থেকে ওয়াশিংটন পৌঁছান। ৪ নবেম্বর তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে বৈঠক করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের অবস্থানের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছিলেন। তাই নিক্সনকে বাংলাদেশ সমস্যার প্রকৃত ধারণা ও ভারতের অবস্থান যুক্তিসহ তুলে ধরার জন্য পরের দিন (৫ অক্টোবর) ইন্দিরা গান্ধী প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা ১২৫ মিনিট স্থায়ী আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট নিক্সন বাংলাদেশ প্রশ্নে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে যুদ্ধের সম্ভাবনা এড়ানোর ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।

৬ নবেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভাষণে বাংলাদেশের নির্বাচন, নির্বাচনের রায় বানচাল ও পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যার বিবরণ ও ভারতে ৯০ লাখ শরণার্থী আগমনের প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করেন। তিনি শেখ মুজিবের নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্ব প্রসঙ্গে বলেন, শেখ মুজিব একজন অসাধারণ নেতা। তাঁর সঙ্গে অন্য কারও তুলনা চলে না।

৭ নবেম্বর ইন্দিরা গান্ধী চারদিনের সফরে ফ্রান্সের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন। যাত্রার মুহূর্তে সাংবাদিকদের তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে তাঁর আলোচনার কিছু নেই। শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনাই বর্তমান সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি প্যারিস পৌঁছান। প্যারিস সফরকালে তিনি প্রেসিডেন্ট পম্পিদু, প্রধানমন্ত্রী সেবান দেলমাস ও ফরাসী সাহিত্যিক আন্দ্রে মালরোর সঙ্গে বৈঠক করেন। প্যারিসে এক টেলিভিশন সাক্ষাতকারে বলেন, ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত। কিন্তু বাংলাদেশ প্রশ্নে নয়, কারণ এটা পাকিস্তানীদের সঙ্গে বাঙালীদের সমস্যা। একই দিনে তিনি বেতারে এক সাক্ষাতকার দেন। তাতেও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠে আসে। তিনি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে উল্লেখ করেন। ফরাসী প্রেসিডেন্টের ভোজসভায়ও শ্রীমতী গান্ধী একই মত পোষণ করে ভাষণ দেন।

১০ নবেম্বর শ্রীমতী গান্ধী প্যারিস থেকে পশ্চিম জার্মানি যাত্রা করেন। তিনি পশ্চিম জার্মানির চ্যালেন্সর উইলি ব্র্যান্টের সঙ্গে বাংলাদেশ ও দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে দীর্ঘ আলাপ করেন। পরের দিন (১১ নবেম্বর) জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ট ইন্দিরা গান্ধীর সফর উপলক্ষে সংবাদ মাধ্যমে এক সরকারী বিজ্ঞপ্তি জারি করে, বাংলাদেশ বিষয়ে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এছাড়া তিনি ভারতে আশ্রয়প্রাপ্ত শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য ১৪০ কোটি ডলার প্রদানের ঘোষণা দেন। সেদিন বিকেলে ইন্দিরা গান্ধী উইলি ব্র্যান্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে তিনি আশা করেন।

১২ নবেম্বর তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন। তিনি আবারও বাংলাদেশ বিষয়ে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। প্রায় আড়াই সপ্তাহের ওই সফরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশের নেতাদের বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা ও ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে সক্ষম হন। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বাংলাদেশ প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রতিই সমর্থন ব্যক্ত করেন।

১৪ নবেম্বর তিনি দিল্লী ফিরে আসেন। তাঁর এই সফরের পর পাকিস্তানীরা বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে আবারও আলোচনার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর একই জবাব, ‘বাংলাদেশ’ বিষয়ে আলোচনার একমাত্র প্রতিনিধি শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে মুক্তি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান এখনও সম্ভব বলে তিনি জানান। প্রয়োজনে ভারত সামরিক অভিযান পরিচালনা করে বাংলাদেশ সমস্যা সমাধান করতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানিয়ে দেন।

অবশ্য ইন্দিরা গান্ধীর আড়াই সপ্তাহের ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের ফল খুব একটা ইতিবাচক হয়নি। কারণ ওই সফরকালে তিনি অধিকাংশ ইউরোপীয় সরকারের কাছ থেকে তেমন কোন সহানুভূতি লাভ করেননি। নবেম্বর মাসের ৪ ও ৫ তারিখ নিক্সন আর কিসিঞ্জারের সঙ্গে তাঁর দুটি বৈঠক হয়। নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীকে বেশ ঘৃণাই করতেন এবং তাতে কোন রাখঢাক ছিল না। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে একজন ‘ডাইনী’ বলে আখ্যায়িত করতে পছন্দ করতেন। কিসিঞ্জার তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘হোয়াইট হাউস ইয়ার্সে’ লিখেছেন, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার আগে নিক্সন ওভাল অফিসে অনেকটা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে পায়চারী করছিলেন। এদিকে ইন্দিরা গান্ধী ওয়েটিং রুমে প্রায় কুড়ি মিনিট অপেক্ষা করতে থাকেন, যা ছিল এক কথায় শিষ্টাচারবহির্ভূত। অন্যদিকে মিসেস গান্ধী ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মহিলা এবং সব সময় নিজ দেশের স্বার্থকে সব কিছুর ওপর স্থান দিতেন। ৪ ও ৫ তারিখে অনুষ্ঠিত এই দুই সরকারপ্রধানের মধ্যে বৈঠক ছিল তার দেখা কোন বিদেশী অতিথির সঙ্গে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং অনেকটা অসৌজন্যমূলক আলোচনা। শুরুতে মিসেস গান্ধী ভিয়েতনাম ও চীনে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ নীতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনের ধরন দেখে মনে হচ্ছিল তিনি স্কুলের শ্রেণী কক্ষের পেছনে বসে থাকা কোন এক নিম্ন মেধার ছাত্রকে পড়া বোঝাচ্ছিলেন। আর ওই সময় নিক্সনের অনেকটা বিরক্তিকর চেহারা ফুটে উঠছিল। মিসেস গান্ধী চলে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট তাঁর কাছে তাঁর বিরক্তির কথা গোপন না করেই বলেন, ইন্দিরা গান্ধী হচ্ছেন একজন ঠা-া মাথার রাজনীতিবিদ যিনি ক্ষমতার রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত।

বৈঠক প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারের মন্তব্য হলো, ‘মিসেস গান্ধী পরদিনের বৈঠকে নিক্সনের সব দুর্বলতাকে বেশ দক্ষতার সঙ্গে উন্মুক্ত করে দেন। তারা উভয়েই রাজনৈতিক পরিপক্বতা আর দূরদর্শিতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে ইন্দিরা গান্ধী ওই বৈঠকে তাদের দুজনকেই সহজে বোকা বানিয়েছিলেন।’

আসলে ইন্দিরা ছিলেন গ্রেট লিডার। কারণ তিনি তার ক্ষমতার বাইরে গিয়েও বড়সড় কোন পদক্ষেপ নিতে পিছপা হতেন না। গ্রেট লিডার সম্পর্কে অক্সফোর্ডের দার্শনিক আইসাইয়া বার্লিনের একটি সংজ্ঞা আছে। তিনি বলেছেন, ‘যারা নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়েও যে কোন বড়সড় পদক্ষেপ নিতে পিছপা হন না, শুধু বৃহৎ অংশের মানবসমাজের সঙ্কট সমাধানে এবং যে পদক্ষেপ ইতিহাসের গতিপথকেও ইতিবাচক দিকে পাল্টে দিতে পারে স্থায়ীভাবে, তারাই গ্রেট লিডার।’ এই সংজ্ঞা শুনে মনে হয়, ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। গোটা পৃথিবী যখন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের আগ্রাসী নিধনযজ্ঞের নীরব সাক্ষী ছিল, তখন ইন্দিরা গান্ধী ভারতের সীমিত সামরিক ও আর্থিক ক্ষমতার কথা ভেবে নীরব থাকেননি। তিনি শুধু শরণার্থী সমস্যার কথা রাষ্ট্রসংঘে পৌঁছে দিয়েই চুপ করে থাকতে পারতেন। কারণ রাষ্ট্রসংঘ সেটা স্বীকার করে দেশে দেশে বার্তা পাঠিয়েছিল সহায়তার জন্য। কিন্তু সেখানে থেমে থাকেননি ইন্দিরা।

অবশ্য ইন্দিরা গান্ধী যখন বিদেশ সফরে ব্যস্ত বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনী তখন দেশের অভ্যন্তরে বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুক্ত করে ফেলেছে। তাদের সহায়তা করেছে ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী। নবেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপতি জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী উত্তর বঙ্গের বেশ কয়েকটি সেনা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং সেখানকার সেনা সদস্যদের সাহস যোগান। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর উপর্যুপরি আক্রমণের ফলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ততদিনে অনেকটা পর্যুদস্ত।

৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কলকাতার রাজভবনে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে গুণীজনরা এসেছিলেন আলাপচারিতায়। শান্তিনিকেতনের দিনগুলোর কথা ইন্দিরা হাসতে হাসতে বলছিলেন। একটু পরেই চা-নাশতা আসবে। একজন জানতে চাইলেন, আজকাল আপনি কী পড়ছেন? ইন্দিরা হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘এখন সব থেকে বেশি যেটা পড়ি, সেটা হলো ফাইল।’ হঠাৎ এক আর্মি অফিসার একটি চিরকুট এনে প্রধানমন্ত্রীর হাতে দিলেন। সামান্য কয়েকটি লাইন। পড়তে বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু সেই কয়েকটি লাইনের দিকেই একদৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে রইলেন। উত্তম কুমার কিছু একটা প্রশ্ন করেছিলেন। তার জবাবও দিলেন। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘জেন্টলম্যান, আপনারা প্লিজ স্ন্যাকস না খেয়ে যাবেন না। আমরা হঠাৎ একটি জরুরী কাজ পড়ে গেছে। এক্ষুণি যেতে হবে।’ এ কথা বলে তিনি ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে গেলেন।

বেলা ৫টায় পাকিস্তান বিমানবাহিনী পশ্চিম সীমান্তে ভারতের কয়েকটি অগ্রবর্তী বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ করে বসেছে। তাই ইন্দিরা গান্ধী তাঁর আড্ডা সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত দিল্লী ফিরে গিয়ে লোকসভার জরুরী অধিবেশন ডেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানী বিমানবাহিনীর শক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। একই রাতে বাংলাদেশে প্রথমে আক্রমণের সূচনা করে সদ্যগঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের তেল ডিপো। এরপরই শুরু হয় বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনীর ঢাকা দখলের সর্বাত্মক যুদ্ধ। আর ৬ তারিখে ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান ঢাকা দখলকে ত্বরান্বিত করে।

ডিসেম্বরের ৯ তারিখ নিয়াজি রাওয়ালপিন্ডিতে এক তার বার্তা পাঠিয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও ইয়াহিয়া খানকে জানান ‘পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ পর্যুদস্থ। শক্রু পক্ষ আকাশ ও স্থলপথ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলেছে। স্থানীয় জনগণ আমাদের প্রতি চরমভাবে বৈরীভাবাপন্ন। রাতের বেলায় আমাদের চলাচল সম্পূর্ণ অসম্ভব কারণ বিদ্রোহীরা (মুক্তিবাহিনী) আমাদের চতুর্দিক হতে আক্রমণ করে বেকায়দায় ফেলেছে। তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। সকল জেটি, নৌযান ইতোমধ্যে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং বিমান আক্রমণের কারণে আমাদের ভারি অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমাদের সৈন্যবাহিনী গত বিশ ঘণ্টা নির্ঘুম সময় কাটিয়েছে।’ নিয়াজির এই তার বার্তায় বোঝা যায়, ঢাকা দখলের আগেই বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কী এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। বাংলাদেশে পাকিস্তানের পতন হয়ে উঠেছিল শুধু সময়ের ব্যাপার।

ইয়াহিয়া খান বুঝতে পেরেছিলেন তার সময় শেষ হয়ে আসছে। তিনি অনেকটা তড়িঘড়ি করে শেষ চেষ্টা হিসেবে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে জাতিসংঘে পাঠালেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে পাকিস্তানের উভয় অংশে একটি যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের তিন বার ভেটো প্রয়োগের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তারা বাংলাদেশ হতে সকল পাকিস্তানী সৈন্যের অপসারণ ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ওপর জোর দিচ্ছিলেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশ ইস্যুতে পাকিস্তান ও ভারতের প্রতিনিধিদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয়। পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর টিমে পূর্ব পাকিস্তান থেকে শাহ আজিজুর রহমানসহ কয়েকজন যোগ দিয়েছিলেন। ভুট্টো বাংলাদেশ ইস্যুতে আলাপ-আলোচনা যাতে না হয়, সে চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হন তখন হাতের কাগজপত্র দুমড়ে-মুচড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। অপর দিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরন সিংহ ও জাতিসংঘে ভারতের প্রতিনিধি সমর সেন যুক্তিসহ ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন।

৪ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে হেনরি কিসিঞ্জার নিরাপত্তা পরিষদের আহূত অধিবেশনে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের দাবিসংবলিত মার্কিন প্রস্তাব পেশ করার প্রস্তুতি নেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এক বিবৃতিতে উপমহাদেশের সংঘাতের জন্য মুখ্যত ভারতকে দায়ী করে। নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা, ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্য নিজ নিজ সীমান্তের ভেতরে ফিরিয়ে নেয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ মহাসচিবকে ক্ষমতা প্রদান করার জন্য এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সোভিয়েত প্রতিনিধি এই প্রস্তাবকে ‘একতরফা’ বলে অভিহিত করে ভেটো প্রয়োগ করেন। পোল্যান্ডও প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। ফ্রান্স ও ব্রিটেন ভোট দানে বিরত থাকে। পরদিন ৫ ডিসেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদে আবার যে অধিবেশন বসে, তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক প্রস্তাবে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানে এমন এক রাজনৈতিক নিষ্পত্তি প্রয়োজন যার ফলে বর্তমান সংঘর্ষের অবসান নিশ্চিতভাবেই ঘটবে এবং পাক-বাহিনীর যে সহিংসতার দরুন পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে তাও অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। একমাত্র পোল্যান্ড প্রস্তাবটি সমর্থন করে। চীন ভোট দেয় বিপক্ষে। অন্যসব সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। ওইদিন আরও আটটি দেশের পক্ষ থেকে সোভিয়েত সরকার পূর্ব বাংলার জনগণের আইনসঙ্গত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানান। এই সংঘর্ষ সোভিয়েত সীমান্তের সন্নিকটে সংঘটিত হওয়ায় এর সঙ্গে সোভিয়েত নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত উল্লেখ করে পরিস্থিতির অবনতি রোধকল্পে বিবদমান পক্ষদ্বয়ের যে কোনটির সঙ্গে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য বিশ্বের সব দেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

সিআইএ আগেই খবর দিয়েছিল, পাকিস্তানের সহায়তায় চীন এগিয়ে আসবে না। কারণ ইতোমধ্যে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। কিসিঞ্জার নিক্সনকে অবহিত করেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ভারতের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দু’দিনের বেশি টিকতে পারবে না। কিসিঞ্জারের আশঙ্কা ছিল ভারত পশ্চিম পাকিস্তানকে খ- বিখ- করে দিতে পারে। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। তাই নিক্সন দ্রুত মস্কোয় তাঁর প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুরোধ করেন যাতে ভারত পাকিস্তানকে খ- বিখ- করার উদ্যোগ গ্রহণ না করে। সকলের মনে কিছুটা ভীতি আর পাকিস্তানকে কিছুটা অভয় দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তার সপ্তম নৌবহরের বিমানবাহী জাহাজ ‘এন্টারপ্রাইজ’ ভারত মহাসাগরে প্রেরণ করে। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নও ভূমধ্য সাগরে অবস্থিত তার একটি আস্ত নৌবহর আরব সাগরের দিকে প্রেরণ করে। হঠাৎ মনে হলো, যে যুদ্ধটা একান্তভাবে উপমহাদেশে সীমিত ছিল তা দুটি পরাশক্তির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করে, পশ্চিম পাকিস্তান দখল করার কোন অভিপ্রায় ভারতের নেই।

বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতের সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গড়া মিত্রবাহিনী দ্রুত এগিয়ে যায় ঢাকার দিকে। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে ঢাকাকে। ফলে পরাজয় ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না পাকিস্তান সেনাবাহিনীর। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনারা ঢাকা ঘেরাও করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান জানায়। গবর্নর হাউসে (বর্তমান বঙ্গভবন) বোমা ফেলার কারণে গবর্নর মালেকের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের পদলেহী সরকারও ইতোমধ্যে পদত্যাগ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান আবার ইন্টারকন্টিনেন্টাল) আশ্রয় নেয়। সময় থাকতে শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে আকাশ থেকে অনবরত লিফলেট ফেলা হতে থাকে।

অবশেষে নিয়াজির অনুরোধে ১৫ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে পরদিন সকাল সাড়ে ন’টা পর্যন্ত ভারতীয় বিমান আক্রমণ স্থগিত রাখা হয়। পরদিন সকালে বিমান আক্রমণ বিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার কিছু আগে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী জাতিসংঘের প্রতিনিধি জন কেলির মাধ্যমে ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষকে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আরও ছ’ঘণ্টার জন্য বাড়িয়ে দিয়ে ভারতের একজন স্টাফ অফিসার পাঠানোর অনুরোধ জানান, যাতে অস্ত্র সমর্পণের ব্যবস্থাদি স্থির করা সম্ভব হয়। এই বার্তা পাঠানোর কিছু আগে অবশ্য মেজর জেনারেল নাগরার বাহিনী কাদের সিদ্দিকী বাহিনীকে সঙ্গে করে মিরপুর ব্রিজে হাজির হন এবং সেখান থেকে নাগরা নিয়াজিকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। নিয়াজির আত্মসমর্পণের ইচ্ছা ব্যক্ত হওয়ার পর সকাল ১০.৪০ মিনিটে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে নাগরার বাহিনী ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করার জন্য ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জেকব মধ্যাহ্নে ঢাকা এসে পৌঁছান। বিকেল চারটার আগেই বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর দুটি ইউনিটসহ মোট চার ব্যাটালিয়ন সৈন্য ঢাকায় প্রবেশ করে। সঙ্গে কয়েক সহস্র মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকার জনবিরল পথঘাট ক্রমে জনাকীর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে ‘জয় বাংলা’ মুখরিত মানুষের ভিড়ে। বিকেল চারটায় ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম-কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, বাংলাদেশের ডেপুটি চীফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খোন্দকার এবং ভারতের অপরাপর সশস্ত্রবাহিনীর প্রতিনিধিরা ঢাকা অবতরণ করেন।

১৬ ডিসেম্বরের পড়ন্ত বিকেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার রমনা রেসকোর্সে যৌথ বাহিনীর সেনাপ্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে প্রকাশ্যে হাজারো জনতার সামনে আত্মসমর্পণ করে। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক লে. জেনারেল এএকে নিয়াজি হাজার হাজার উৎফুল্ল জনতার সামনে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। প্রায় ৯৩,০০০ পাকিস্তানী সৈন্য আত্মসমর্পণ করে, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহৎ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের মানুষের বহু আকাক্সিক্ষত বিজয় ধরা দেয় যুদ্ধ শুরুর নয় মাস পর। তবে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও সারাদেশে সব পাকিস্তানিকে আত্মসমর্পণ করাতে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিনই সপ্তম নৌবহর প্রবেশ করে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণতম প্রান্তে। কিন্তু বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের দখল থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত।

অনেক রক্তক্ষরণ আর ত্যাগের বিনিময়ে জন্ম হয় এক নতুন দেশ-বাংলাদেশ। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণের পরদিন ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সীমান্তে একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। এ যাত্রায় বেঁচে যায় পাকিস্তানের অবশিষ্ট অংশ।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: