কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নিরাপদ খাদ্য ভোক্তার অধিকার

প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৫
  • আ ব ম ফারুক

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রালফ নাদের নামের একজন প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী সেখানে ভোক্তা অধিকার বিষয়ে সরব আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভোক্তার প্রতিটি ডলারের মূল্য আছে এবং সে এই ডলার দিয়ে যে প্রত্যাশা নিয়ে কোন পণ্য কেনে এবং পণ্যের লেবেলে যে গুণাবলীর উল্লেখ থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের গুণগত মান নিয়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশানো ছিল এক ব্যাপক ও সাধারণ বিষয়। এসব ভেজাল খাবার খেয়ে ভোক্তার মারা যাওয়ার খবর সেখানকার গণমাধ্যমে প্রায়ই প্রকাশিত হতো। দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলনের মুখে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৩৮ সালে ওষুধ-খাদ্য-প্রসাধন-গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য রাসায়নিক সামগ্রীর নিরাপত্তা ও মান রক্ষার জন্য ‘ফুড এ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন’ বা এফডিএ নামে একটি শক্তিশালী সংস্থা গঠন করে। এরপর থেকে সেখানে সংশ্লিষ্ট পণ্যের মান উন্নত ও নিরাপদ হতে শুরু করে। কিন্তু এরপরও অন্যান্য পণ্যের মান গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছায়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে রালফ নাদের ও তাঁর সহযোদ্ধারা দেশজুড়ে পণ্যের মান নিশ্চিত করা ও ভোক্তার অধিকার নিয়ে যে গণ-আন্দোলন শুরু করেন, তা শুধু সে দেশেই নয়, বরং বিশে^র দেশে দেশে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষার এ আন্দোলন এতই জনপ্রিয় হয় যে, হার্ভার্ড বিশ^বিদ্যালয়ের স্নাতক রালফ নাদের যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের আইকনে পরিণত হন।

রালফ নাদেরের প্রতিষ্ঠিত বিশ^ব্যাপী ভোক্তা আন্দোলনের তুমুল জনপ্রিয়তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬২ সালের ১৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডী সে দেশের কংগ্রেসে ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা বিষয়ে দীর্ঘ এক বক্তৃতা রাখতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি ভোক্তার পক্ষে আইনকানুন তৈরি ও তার প্রয়োগ, সেই সঙ্গে ভোক্তা সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ভোক্তাদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। এরপর ১৯৮৩ সালের ১৫ মার্চ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ভোক্তা অধিকার ও এ বিষয়ক সচেতনতার গুরুত্বকে বিশ^ব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাস করে, যাতে ১৯৮৫ সাল থেকে প্রতিবছরের ১৫ মার্চকে ‘বিশ^ ভোক্তা অধিকার দিবস’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানানো হয়। সে বছর থেকে বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতি ১৫ মার্চ দিবসটি পালন করা হয়। এবারও দেশের অনেক জায়গায় ভোক্তাদের পক্ষ থেকে র‌্যালি ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘নিরাপদ খাদ্য ভোক্তার অধিকার’। এবার তাই খাদ্যে ভেজাল মেশানোর বিরুদ্ধেই প্রধানত আলোচনাগুলো আবর্তিত ছিল। সরকারের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদও এ বছরের আয়োজনে ভোক্তা সংগঠনগুলোর সঙ্গে ছিল। দিবসটির প্রতিপাদ্য তুলে সারাদেশে তাদের উদ্যোগে ব্যাপকভাবে পোস্টারিং করা হয় ও সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশে খাদ্যকে নিরাপদ করার জন্য অনেকগুলো আইন আছে কিন্তু এগুলোর কার্যকর প্রয়োগ ছিল না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এবং নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ জারি করেছে। সর্বশেষ ফরমালিনের দাপট প্রতিরোধে এ বছর জারি করেছে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫। এখন প্রয়োজন এগুলোর যথার্থ প্রয়োগ। যে তিনটি আইন সম্প্রতি সরকার করেছে, সেগুলোর শাস্তির বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেখানে ২০০৫ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য (সংশোধিত) অধ্যাদেশে খাদ্যে ভেজাল মেশালে শাস্তির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং/অথবা ৬ মাস থেকে ১ বছরের জেল, সেখানে বর্তমান সরকার ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে তা বাড়িয়ে করেছে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা এবং/অথবা সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত জেল। এরপর সরকার ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইনে শাস্তির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে করেছে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং/অথবা ৪ থেকে ৫ বছরের জেল। এ বছরের ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইনটি আরও কড়া। এখানে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- এবং/অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে অপরাধীরা যাতে পার পেয়ে না যায়, সে জন্য সরকারী কর্তৃপক্ষগুলো যেমন তৎপর থাকবেন, তেমনি ভোক্তাদেরকেও এ বিষয়ে তাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারী উদ্যোগ ও সামাজিক আন্দোলনের যৌথ প্রয়াসের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল নির্মূল, আইন প্রয়োগে শিথিলতা প্রতিরোধ ও প্রতারক ব্যবসায়ীদের সঠিক শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিক্রেতা কর্তৃক ভোক্তা যাতে প্রতাড়িত না হয়, সেজন্য আইনে ভোক্তার জন্য যে সব সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে সরকারী উদ্যোগে বিক্রেতা ও ভোক্তাকে জানানোর জন্য গণ-মাধ্যমগুলোর বাধ্যতামূলক সহায়তা নেয়া প্রয়োজন। বিশে^র অনেক দেশে এ রকম নজির রয়েছে। বাংলাদেশে যে অসংখ্য পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেল রয়েছে, সেগুলোকে সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় এ দায়িত্বটি দিলে তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। যেসব তথ্য তারা বিক্রেতা ও ভোক্তাকে জানাতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক, খাদ্যে মেশানো যাবে না এমন নিষিদ্ধ দ্রব্যাদির তালিকা, ক্ষতিকর দ্রব্যাদির নিরাপদ ও নৈতিক বিকল্প জানানো, ভেজাল খাবার উৎপাদন এবং বিক্রির শাস্তি, পরিচ্ছন্ন প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির নিয়মাবলী, খাদ্যদ্রব্যে মোড়ক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা, মূল্য তালিকা প্রদর্শন, সেবার তালিকা সংরক্ষণ এবং প্রদর্শন, অধিক মূল্যে বিক্রয় না করা, বিজ্ঞাপনে মিথ্যা তথ্য প্রদান না করা, প্রতিশ্রুত মানের পণ্য সরবরাহ করা, ওজন ও পরিমাপে কারচুপি না করা, খাদ্যপণ্য নকল না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি না করা, পণ্যের লেবেলে উৎপাদন এবং মেয়াদের তারিখ উল্লেখ করা, খাদ্যপণ্যটি উৎপাদনে যেসব উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা উল্লেখ ইত্যাদি।

খাদ্য ফর্মুলেশনের সঙ্গে ওষুধ, প্রসাধনী, অন্যান্য গার্হস্থ্য রাসায়নিকের ফর্মুলেশন, পরীক্ষা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মিল রয়েছে। যে ল্যাবরেটরিতে ওষুধ পরীক্ষা করা হয়, সেই একই ল্যাবের যন্ত্রপাতি ও জনবল দিয়ে খাদ্যও পরীক্ষা করা সম্ভব। এ রকম মিল থাকার কারণে খাদ্যে ও ওষুধের নকল-ভেজাল রোধে এবং সরকারী অফিসের দ্বৈততা এড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশের মতো এদেশেও ফুড এ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)-এর মতো একটি একীভূত প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উৎপাদকদেরও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পাবে এবং তাদের প্রযুক্তিগত পরামর্শও দেয়া হবে। আমাদের দেশে ওষুধের নিরাপত্তা ও মান রক্ষার জন্য ‘ওষুধ প্রশাসন’ নামে যে অধিদফতরটি রয়েছে, সেটিকে ‘খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন’ নাম দিয়ে খাদ্যের নিরাপত্তা এবং মান রক্ষার এ দায়িত্বটি তাদের দেয়া যায়। এর ফলে বর্তমানের অনেক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার বদলে পেশাদারদের নিয়ে গঠিত ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মতো একটি সহজ ব্যবস্থাপনা তৈরি হবে এবং খাদ্যের নকল-ভেজাল-নিম্ন মান কমে আসবে।

অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে আমাদের প্রায় সব খাদ্যে ভেজাল থাকায় আজ নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ। পেট্রোলবোমা নিক্ষেপকারীদের মতো খাদ্যে ভেজালকারীরাও এক ধরনের সন্ত্রাসী। এদের বলা যেতে পারে ‘খাদ্য সন্ত্রাসী’। পেট্রোলবোমা সন্ত্রাসীদের মতো এদের হাত থেকেও আমাদের ভোক্তাদের অবিলম্বে মুক্ত হতে হবে। কারণ এরা দু’পক্ষই নিরীহ অসহায় মানুষকে তাদের অজান্তে টার্গেট করছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের দ্বারা খাদ্যে ভেজাল অব্যাহত থাকলে জনগণের মধ্যে হৃৎযন্ত্র, ফুসফুস, পাকস্থলি, কিডনি, অস্থিমজ্জা ইত্যাদির বিভিন্ন জটিল অসুখ ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেড়ে যাবে। ফলে ২০২১ সালের মধ্যে জনস্বাস্থ্য নিয়ে সরকারের যে পরিকল্পনা, তা অর্জন করা অসম্ভব হবে। বাংলাদেশের ভোক্তারা এক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য দেখতে চায়।

অধ্যাপক, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ ও

সাবেক ডীন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

abmfaroque@yahoo.com

প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৫

২২/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: