হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ওপার বাংলার বইমেলা

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • ইমদাদুল হক সূফী

১৯৭৫ সালে প্রকাশক বিমল ধর ও প্রবীর দাশগুপ্তের উদ্যোগে ‘পাবলিশার্স এ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়। তার পরের বছর ১৯৭৬ সালের ৫ মার্চ গিল্ডের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে কলকাতা বইমেলা। শুরুতে বইমেলা ছিল কলকাতার ময়দানে। বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, বিশেষ করে ভেন্যু নিয়ে অনেক সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ করে ২০০৯ সালে কলকতা বইমেলা বর্তমান ভেন্যু সায়েন্স সিটিসংলগ্ন মিলনমেলা প্রাঙ্গণে স্থানান্তরিত হয়।

১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত কলকাতায় আরও একটি বইমেলা আয়োজিত হতো। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ গ্রন্থমেলা’ নামে আয়োজন করত সেই বইমেলাটি। কিন্তু ‘পশ্চিমবঙ্গ গ্রন্থমেলা’ পাবলিশার্স এ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড আয়োজিত কলকাতা বইমেলার মতো এত জনপ্রিয়তা পায়নি। ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ গ্রন্থমেলা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে কলকাতায় একটি বইমেলারই আয়োজন হচ্ছে আর সেটি হচ্ছে ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা’।

‘কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা’য় প্রতিবছর ভারতের কোনও একটি রাজ্য বা বহির্বিশ্বের কোনও একটি রাষ্ট্রকে ‘থিম কান্ট্রি’ নির্বাচিত করা হয়। শুরু থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ দু’বার থিম কান্ট্রি হওয়ার সম্মান অর্জন করেছে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশকে প্রথম থিম কান্ট্রি হিসেবে নির্বাচিত করা হয় এবং সে-বার কবি শামসুর রাহমান মেলার উদ্বোধন করেন। দ্বিতীয়বার ২০১৩ সালে বাংলাদেশ পুনরায় থিম কান্ট্রি নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ড. আনিসুজ্জামান মেলার উদ্বোধন করেন।

সম্প্রতি ২৭ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা-২০১৫’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। ২৭ জানুয়ারি বিকেল ৪টায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী মেলার উদ্বোধন করেন। ২৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য মেলা উন্মুক্ত ছিল। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রায় ২৫ লাখ বইপ্রেমী মেলায় এসেছিলেন। এ বছর ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা’র থিম কান্ট্রি ছিল গ্রেট বিটেন। বইমেলা উপলক্ষেই এবার আমার কলকাতায় যাওয়া।

মেলায় যখন পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা ৭টা। পৌঁছেই প্রথমে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে গেলাম। সেখানে বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রসহ ১৫টি বইয়ের ও বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের একটি স্টল দেখলাম। প্যাভিলিয়নে ঢোকার মুহূর্তে নজরুল ইনস্টিটিউটের স্টলের কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলাম মেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন বা বাংলাদেশ থেকে আগত স্টল সংশ্লিষ্ট বা অতিথিদের সমন্বয়কারী কে? তিনি কোথায় বসেন? ভদ্রলোক আমাকে তাঁর পাশের একটি স্টল দেখিয়ে দিলেন। সেটি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টল। সেখানে পরিচয় হলো জনাব ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে। এককথায় কেউ বলতে পারলেন না কে তাঁদের সমন্বয়কারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। সেখান থেকেই আমি জানতে পারি কর্নারের একটি রুমে কর্মকর্তাবৃন্দ বসেন।

বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন থেকে রাত ৮টায় বেরিয়ে লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে গেলাম। মেলা আজকের জন্য ভেঙ্গে যাচ্ছে। লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক ও প্রকাশকরাও উঠি উঠি করছেন। এরই মধ্যে একনজর দেখে নিলাম পুরো এলাকাটি। বিশাল একটি প্যাভিলিয়ন। চারিদিক উন্মুক্ত। এরমধ্যে প্রায় শ’পাঁচেক লিটল ম্যাগাজিন স্টল। সবাই একটি করে টেবিল নিয়ে বসেছেন। লিটল-ম্যাগ চত্বরে এসে পশ্চিমবঙ্গের লিটল-ম্যাগ চর্চা সম্পর্কে লেখিকা নীলা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আমার মনে পড়ল। তিনি জানান, ‘এখানে অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক-লেখিকা রয়েছেন, যাঁরা তাঁদের লেখা প্রকাশের ব্যাপারে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পত্র-পত্রিকার চেয়ে লিটল ম্যাগাজিনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।’ তিনি আরও বলেন ‘এখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা দল থেকে পূজা-পার্বণে লিটল-ম্যাগ প্রকাশ করে থাকে। একটি পারিবারকে কেন্দ্র করে, একদল বিশিষ্ট চিকিৎসককে কেন্দ্র করে, এমন কী ট্রেনে নিয়মিত কলকাতা যাতায়াকারী প্যাসেঞ্জাররাও তাঁদের একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে একটি লিটল-ম্যাগ বের করে থাকেন।’ এদিকে ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে মেলার সময় শেষের দিকে। আগামীকাল এসে ঘুরে ঘুরে দেখব। তবে আজকে দেখা কয়েকটি লিটল-ম্যাগ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য এখানে দিচ্ছি। স্বল্প সময়ের পর্যবেক্ষণে মেলায় আসা অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে বিস্তারিত বলা একটি কঠিন কাজ। তারপরও কিছু না বললেই নয়। আফিফ ফুয়াদ সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনের নাম ‘দিবা রাত্রির কাব্য’ বইমেলা সংখ্যাটি বিভূতিভূষণ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘অশোকনগর’ নামে বিভূতিভূষণের জীবন ও কর্মের ওপর আরও একটি ম্যাগাজিন ছিল বইমেলায়। ‘নতুন শতক’ ম্যাগাজিনটি বইমেলা সংখ্যার বিষয় করেছে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে নিয়ে। ‘বিনির্মাণ’ নামে পত্রিকাটি বিশেষ সংখ্যা করেছে মেলায় আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ লিটল ম্যাগাজিন ফারুক আহমেদ সম্পাদিত ‘উদার আকাশ’। ‘নৌকো’ ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে বিশেষ কবি ও কবিতা সংখ্যা। ‘বাতিঘর’ ম্যাগাজিনটিও সুন্দর হয়েছে। কবিতা নিয়ে বইমেলা সংখ্যা করেছে ‘শুধু বিঘে দুই’ পত্রিকা। ওরহান পামুককে নিয়ে ‘সমান্তরাল’ বইমেলা সংখ্যা করেছে। আরও তিনটি লিটল-ম্যাগ আমার হাতে এসেছে- সুদর্শন সেনশর্মা সম্পাদিত কারুকথা এই সময়, রণজিৎ অধিকারী সম্পাদিত পূর্ব ও নরেশ ম-ল সম্পাদিত ‘সব্যসাচী’।

লিটল-ম্যাগ চত্বর থেকে পাশেই ৪৪৭ নম্বর স্টলে গেলাম। স্টলটি মাসিক ‘আরম্ভ’ সাময়িকীর। সেখানে পরিচয় হলো শ্রী পিনাকী দত্তের প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী শ্রী পিনাকী দত্তের সঙ্গে। অমায়িক ভদ্রলোক। প্রথম দেখাতেই আপন করে নেন মানুষকে। এখানে বলে রাখছি, তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে আমার কন্যাসম শিল্পী সুমনা বিশ্বাস। পরিচয় হলো আরম্ভ সম্পাদক বাহার উদ্দিন ও অন্য আরও অনেকের সঙ্গে। কিছুক্ষণ আরম্ভের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত কবি-সাহিত্যিক ও প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করলাম। তাঁদের বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘দেশ প্রসঙ্গ’ দিলাম। তাঁরা সবাই মনোযোগ দিয়ে ম্যাগাজিনটির পাতা উল্টে দেখলেন এবং প্রশংসা করলেন। ভাল লাগল। ‘দেশ প্রসঙ্গ’ নিয়ে বইমেলায় যোগদানের কষ্ট কিছুটা হলেও কমছে মনে হলো। আরম্ভ ম্যাগাজিন কর্তৃপক্ষ তাঁদের স্টলে ‘দেশ প্রসঙ্গ’ রাখার আগ্রহ দেখালেন।

শুক্রবার মেলার চতুর্থ দিন। শনি ও রবি এখানে ছুটির দিন। সবাই আশা করছেন অনেক লোকসমাগম হবে এবং ভাল বিক্রিও হবে। রাত ৯টার দিকে মেলা থেকে হোটেলমুখী হলাম।

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: