কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কিংবদন্তির ইলা মিত্র

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • ডিএম তালেবুন নবী

নারী অধিকার নিয়ে আজও সোচ্চার মানুষ। কারণ একটাই, মানুষ হিসেবে নারীর যে অধিকার ও যোগ্যতা, তা আজও রয়েছে মূল্যায়নের পর্যায়ে। এককথায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে নারী অধিকার। তার পরেও বলা চলে, পুরুষ শাসিত সমাজ নানা টালবাহানার মধ্যে রেখে নারীকে দুর্বল ও অযোগ্য রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বার বার চপেটাঘাত খাবার পরও পুরুষ তার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে না আসার কারণে এখনও সমাজের পিছিয়ে পড়া অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয়নি। তারপরও কিছু ক্ষণজন্মা মহিলার আত্মত্যাগের কাহিনী আজও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রেরণা যোগাচ্ছে। নারী কারও দয়াতে নয়, তার নিজের মতো করেই সামনের দিকে অনেকটা পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এই সাফল্যের পেছনে কারও উৎসাহ বা প্রেরণা না থাকলেও, নারী তার নিজ থেকেই এই অজ্ঞাত শক্তি অর্জন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। খুবই অল্পদিনের মধ্যেই প্রতিযোগিতার মাঠে নারী তার অবস্থান সুদৃঢ় করবে।

নারীর এই এগিয়ে যাওয়ার শুরুটা অনেক আগেই আরম্ভ হয়েছিল। যা এখন অনেকটা গর্ব আর ঐতিহ্যের ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। এ প্রেরণার ইতিহাস এখনও আগামী প্রজন্মকে প্রেরণা দেয়। এমনি এক পরিণত ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন ইলা মিত্র। প্রশ্ন আসতে পারে, কোন্ ইলা মিত্র। একবাক্যে উত্তর, ইলা মিত্রকে চেনার জন্য কারও সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। কারণ ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারক এই মহীয়সী নারী। কারণ এদেশের তে-ভাগা কৃষি আন্দোলন একটি ইতিহাস। আর এই কৃষক আন্দোলনের অগ্নিকন্যা, কিংবদন্তির নেত্রী নাচোলের আদিবাসীদের রানীমাতা ইলা মিত্র। যিনি মহিলা ও বঞ্চিত কৃষকদের একত্রিত করে এক প্লাটফর্মে এনে একটি মহা আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন।

এই ইতিহাস কিন্তু শতবর্ষের নয়। মাত্র ৬০ থেকে ৭০ বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল বরেন্দ্রভূমির লালমাটির দেশ নাচোলে। অনগ্রসর পিছিয়ে থাকা সমাজ থেকে উঠে আসা ইলা মিত্র নারী হয়েও তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সমগ্র বিশ্বকে তে-ভাগা আন্দোলনের সূচনা করে। কিন্তু এই আন্দোলনের অবসান ঘটে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই। ১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি। আদিবাসী সাঁওতালদের রানীমা ইলা মিত্রের গ্রেফতার বরণের মধ্য দিয়ে ওই মহা আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটলেও, তার রেশ ও প্রেরণা কোন দিনও নিশ্চিহ্ন হবে না। যতদিন পৃথিবীতে বঞ্চনা ও দাবিয়ে রাখার খলনায়করা বিদ্যমান থাকবে।

কয়েকশত বছর ধরে, অর্থাৎ ব্রিটিশ বেনিয়াদের দেশ দখলের অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল শোষণের ইতিহাস। মুখ বুজে সহ্য করে আসা বঞ্চিত কৃষকরা খুঁজে ফিরছিল পথ, তাদের এ অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার। ঠিক এ সময়ে ১৯৪৮ সালে এক শিক্ষিত নারী বিবাহের সূত্র ধরে বৌ হিসেবে শ্বশুরের জমিদারির অংশ নাচোলে বেড়াতে আসেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুর হাট এলাকার জমিদার রমেন মিত্র ও তার সুযোগ্য সহধর্মিণী ইলা মিত্র। পড়াশোনার সূত্র ধরেই কলকাতায় পরিচয় এবং সেখানেই বিয়ে। কিন্তু তারা দু’জনেই তৎকালীন মালদহ জেলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। বিবাহের সূত্র ধরে ইলা মিত্রের শ্বশুরবাড়িতে আগমন ও শ্বশুরের জমিদারি এলাকা নাচোলে বেড়াতে যাওয়া। এ সময়ে সমগ্র নাচোল ছিল বিশাল গভীর জঙ্গলে ভরা। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসী সাঁওতালরা প্রচ- পরিশ্রম করে পেটের তাগিদে জঙ্গল কেটে, পরে কোদাল গাইতি চালিয়ে সেই জঙ্গলকে জমি বানিয়ে চাষাবাদ করত। জংলাজমি পরিষ্কার করে ফলাত সোনার ফসল। কিন্তু জমির মালিক হতে পারত না। যে মুহূর্তে জঙ্গলকাটা জমি সোনার ফসলে ভরে উঠত, ঠিক সেই মুহূর্তে লোলুপ দৃষ্টি পড়ত ব্রিটিশদের পেটোয়া চাকর-বাকর মার্কা জমিদারদের। রাতারাতি ব্রিটিশদের আশীর্বাদে জমির মালিক বনে গিয়ে কোন প্রকারের চাষ-বাস বা জঙ্গল কাটার মজুরি না দিয়ে অধিকাংশ ফসলই নিয়ে যেত। আরও একহাত এগিয়ে এসব জমি জমিদারদের নায়েবসহ বিভিন্ন কর্মচারীরা লিজ নিয়ে রাতারাতি বনে যেত জোতদার। এই ধরনের জোতদার শ্রেণী এখনও বিদ্যমান।

এসব জোতদারের অত্যাচার ছিল আরও অমানবিক। তারা সাঁওতালদের উদ্ধার করা জমির মালিক সেজে বাধ্য করত তাদেরই জমি চাষ করাতে। অর্থাৎ যারা জঙ্গল কেটে জমি তৈরি করল, তারাই হয়ে গেল রাতারাতি জোতদারের বর্গাচাষী। যুগের পর যুগ এভাবে বর্গাচাষী সেজে জমি চাষ করলেও, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন না হয়ে জোতদারের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়ে আসছিল। ফলে অসহায় বর্গাচাষীরা ফসলের তিন ভাগ নিয়ে নিজেদের মধ্যে গোপনে কথা বললেও, সাহস ছিল না প্রকাশ্যে বলার ও প্রতিবাদ করার। অর্থাৎ তিন ভাগের এক ভাগ (ফসলের) পাবে জোতদার, আর বাকি দু’ভাগ পাবে বর্গাদার চাষীরা। আর এই অধিকারের নাম ছিল তে-ভাগা।

ইলা মিত্র শ্বশুর ও স্বামীর জমিদারিতে বেড়াতে গিয়ে অনুধাবন করেন চাষীদের বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি। ইলা মিত্র রাতারাতি আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলেমিশে তাদের কষ্টের বিষয়টি পুরোপুরি অনুধাবন করে একেবারে প্রত্যক্ষভাবে স্বশরীরে জমিদার, জোতদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সাঁওতালদের তে-ভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এক ধরনের অধিকার আদায়ের যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আদিবাসী সাঁওতাল কৃষকরা অনেক দিন পর নারী নেতৃত্বের হাত ধরে ফুঁসে ওঠেন সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলে। তিন ভাগ করে ফসলের দু’ভাগ নিজেদের ঘরে ওঠানো শুরু করে। ইলা মিত্রের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে এগিয়ে আসেন চিতল মাঝি, টুটু হেব্রম, সাগরাম মাঝি, শুত্রু মাতাং, শুখ বিলাস ম-ল, ভাগীরথী কর্মকার, কোরামদি, মাতলা মাঝি আর ইলা মিত্রের শ্বশুরবাড়ির পড়শী আজহার ভাই।

আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ইলা মিত্র থেকে আন্দোলন যখন চরম চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন শুরু হয় ষড়যন্ত্র। তৎকালীন পাক সরকার একে ধর্মীয় গোঁড়ামির মধ্যে ফেলে ভূস্বামী অর্থাৎ জমিদার জোতদারদের ইন্ধনে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিয়ে আন্দোলনকে ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। সে সময়ে আন্দোলনে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে নাচোল থানার পাঁচ পুলিশ নিহত হলে তড়িঘড়ি সেনা মোতায়েন করা হয়। সেনাবাহিনী প্রতিশোধ নিতে গ্রামের পর গ্রাম নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়া হয়। আদিবাসীরা প্রাণ নিয়ে এলাকা ছেড়ে এদিক-সেদিক পালিয়ে যায়। শত শত আদিবাসী গ্রেফতার বরণ ও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়। এই সময়ে ইলা মিত্রের স্বামী রমেন মিত্র স্ত্রীর সঙ্গে থেকে আন্দোলনের মাঠে থাকলেও, সেনাবাহিনী ও পুলিশের অমানবিক অত্যাচারের চিত্র স্বচক্ষে দেখার পর নিরাপত্তার কারণে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। একইভাবে ইলা মিত্র দেশ ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তাই ছদ্মবেশে গোমস্তাপুর থানার রহনপুর রেল স্টেশনে অবস্থানকালীন পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। সেদিন ছিল ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি। আর সেই দিন থেকে নেমে আসে যবনিকা তে-ভাগা আন্দোলরে ওপর। স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো আন্দোলন। ইলা মিত্রকে নিয়ে যাওয়া হয় নাচোল থানায়। শুরু হয়ে যায় বর্বর বাহিনীর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। এই নির্যাতনের বর্ণনা দেয়া খুবই কঠিন। বর্ণনা করার মতো নয়। ফলে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে ইলা মিত্রকে ১৯৫০ সালের ২১ জানুয়ারি রাজশাহী কারাগারে প্রেরণ করে। ১৪ দিনের অমানবিক শারীরিক নির্যাতনে সর্বক্ষণ অচেতন থাকলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। একই বছরের নবেম্বরে নাচোল হত্যা নাম দিয়ে মামলা পরিচালনায় নামে সরকার। রাজশাহী প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আহম্মেদ মিঞার কোর্টে শুরু হয় মামলার প্রাথমিক কার্যক্রম। কিন্তু চিকিৎসা না করায় নারী নেত্রী ইলা মিত্র মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছলে ১৯৫৪ সালে প্যারোলে মুক্তি দিলে উন্নত চিকিৎসা নিতে ভারতে চলে যান।

তে-ভাগা আন্দোলনের এই বিপ্লবী নেত্রী রানীমাতা ইলা মিত্র এরপর সুস্থ হয়ে কলকাতা থেকে না ফিরে সেখানে অবস্থান নিয়ে গড়ে তোলেন নিজের অসম্পূর্ণ ক্যারিয়ার। তিনি লেখাপড়ায় মনোযোগ দিয়ে ১৯৫৭ সালে এমএ পাস করেন। এরপর সক্রিয় হয়ে ওঠেন রাজনীতিতে। পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় তিনি চারবার নির্বাচিত হয়ে (মানিকতলা আসন) জনগণের সেবা করেছেন। সিপিআই নেতা হিসেবে ১৯৬৭ ও ১৯৭২ সালে বিধানসভায় কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি লিডার ছিলেন। বিপ্লবী ইলা মিত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবে পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ছিলেন ভারতের মহিলা ফেডারেশনের জাতীয় পরিষদ সদস্য ও পশ্চিমবাংলা মহিলা সমিতির সভাপতি। এছাড়াও তিনি ছিলেন ভারত-সোভিয়েত সংস্কৃতিক সমিতির সহ-সভানেত্রী। ইলা মিত্র সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন ক্রীড়া ক্ষেত্রেও। পাশাপাশি ছিলেন লেখিকা। জেলখানার চিঠি, হিরোসিমার মেয়ে, মনে প্রাণে, লেলিনের জীবনী ও রাশিয়ার ছোটগল্পসহ উল্লেখযোগ্য রচনা প্রকাশিত হয়। এই মহীয়সী নারী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সব ধরনের সহযোগিতাসহ আশ্রয় গ্রহণকারী মানুষকে বড় ধরনের সমর্থন দিয়েছেন। তাদের জন্য মাঠে নেমে কাজ করেছেন। তিনি তার একটি জবাবনবন্দীতে বলেছেন, ‘আমি দুইবার কবর হতে উদ্ধার হয়েছি। একবার বন্ধ শ্বশুরালয় এবং দ্বিতীয় বার পাকিস্তান কারাগার। এ দুটো হতে কবর হতে দু’বার যারা আমাকে উদ্ধার করেছেন, তাঁদের মুক্তি সংগ্রামের পেছনে পড়া থাকার মতো অকৃতজ্ঞ কিভাবে আমি হই।’

এই মহীয়সী নারী, রানীমাতা ১৯৯৬ সালে ৫ ও ৬ নবেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সফরে এলে স্মরণাতীতকালের বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করা হয় নাচোলের মাটিতে। তিনি সংগ্রামের অর্থাৎ তে-ভাগা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো পরিদর্শন করেন। তিনি আরও একবার এখানে অর্থাৎ নাচোলে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৩ অক্টোবর ২০০২ সালে না ফেরার দেশে চলে যান। তার পরেও নাচোলবাসীর কাছে তিনি আজও জীবন্ত কিংবদন্তি। তার জন্ম, মৃত্যু দিবস ও আন্দোলনের অন্তিম দিন ৭ জানুয়ারি পালন করে থাকে ইলা মিত্র স্মৃতি পরিষদ। তাঁর স্মরণে নাচোলের কেন্দুয়াতে নির্মাণ করা হয়েছে তে-ভাগা স্মৃতিস্তম্ভ।

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: