কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পথে

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫
  • এসএম সাজ্জাদ বিন লতিফ

জন্মের পর থেকে জেনে আসছি, মানুষ অর্থাৎ আমরা হচ্ছি বুদ্ধিমান প্রাণী। কিন্তু নিজেকে কখনও কি একবারও আমরা প্রশ্ন করে দেখেছি, কেন আমরা বুদ্ধিমান? বা আমাদের এই বুদ্ধিমান প্রাণী হওয়ার পেছনে কারণই বা কী? প্রশ্ন রেখে শুরু করলাম। এই বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, আমরা বুদ্ধিমান, কারণ তা আমাদের কর্মকা-ে প্রকাশ পায়। সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে তিলে তিলে আজকের এই অবস্থানে এসেছে। মানুষের এই অবস্থানে আসার পেছনে যেটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, সেটা হলো মানব মস্তিষ্ক। মানব মস্তিষ্ক বিবর্তিত হয়ে আজ এমন অবস্থানে এসেছে, যার সুফলে আমরা প্রকৃতির সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। আজ মানুষ কত কি আবিষ্কার করছে। মহাবিশ্বের অনেক বিস্ময়কর সত্য উন্মোচন করে চলেছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমাদের মস্তিষ্কটিই আমাদের কাছে বিরাট একটি বিস্ময় রয়ে গেছে। আমরা এখনও জানতে পারিনি, ঠিক কি ঘটছে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। বিগত শতাব্দীর অনেকটা সময় জুড়েই মানুষের ধারণা ছিল, মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে কি ঘটছে, তা জানা প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানে হিউম্যান এনাটমি যেরকম যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে, ততখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিউরোএনাটমি নিউরোসায়েন্সে রাখতে পারেনি। তার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে পড়ে, মস্তিষ্ক বা নার্ভাস সিস্টেম মানব দেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ, যার ন্যূনতম বিচ্যুতির কারণে মানুষের কার্যক্রমে বড় রকমের প্রভাব পড়তে পারে। তার দরুন বর্তমান সময়ে এসেও আমরা সরাসরি জীবিত মানুষের মস্তিষ্কে কোন ইলেক্ট্রনিক প্রোব বসাতে পারি না। মস্তিষ্কের কার্যক্রম বুঝতে গিয়ে যাতে মস্তিষ্কের ক্ষতি না হয়ে যায়, সেই দিকে সবসময় লক্ষ্য রাখতে হয়। মানবদেহ যতটুকু অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক প্রবাহ সহ্য করতে পারে, সেই সীমার মধ্যে আমাদের এক্সপেরিমেন্টগুলো চালাতে হয়। কারণ মস্তিষ্কের একটি কোষও যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা আর পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। মানদেহের অন্য সব কোষের স্বতঃস্ফূর্ত পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়া থাকলেও, নিউরনের নেই। তাই মস্তিষ্কের আঘাত বা কোন রকম ক্ষতিকে এড়ানোর সর্বোচ্চ চিন্তা মাথায় রেখেই কাজ করতে হয় এখানে। এত প্রতিকূলতার পরেও মানুষ থেমে নেই। অজানাকে জানার এ যেন এক অন্যরকম নেশা মানুষের। আমাদের মনে হয়, এজন্য মানুষ এত এগিয়ে যেতে পেরেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি? এই সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমে বলতে হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শব্দটা মানুষ নিজের প্রয়োজনে নিজেই তৈরি করেছে। জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে মানবের বিবর্তন হয়েছে তার মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে। এই বিকাশের প্রক্রিয়াটা হয়েছে প্রকৃতির নিয়মে। এই বিবর্তনে তার যে জায়গাটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, তা হলো তার চিন্তাশক্তি। বাকি প্রাণীকুল যেখানে প্রকৃতিক নিয়মকে মেনে চলেছে , সেখানে মানুষ চিন্তাশক্তি খাটিয়ে তার সংষ্কৃতি ও প্রযুক্তিকে করেছে আরও উন্নত। এখানেই মানুষ থেমে থাকছে না। সে তার প্রযুক্তি বা যন্ত্রকেও চিন্তাভাবনা করার সুযোগ করে দিতে চায়। এই বিষয়টিই আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বুদ্ধি, চিন্তা, ভাবনা এসব বিষয় আসে একটা জায়গা থেকে, তা হলো মস্তিষ্ক। কাজেই বুদ্ধিমত্তা বিষয়টি বুঝতে গেলে অবশ্যই মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী আগে বোঝা দরকার। মস্তিষ্কে অজস্র স্মৃতি ধরে রাখে নিউরন। এই স্মৃতি থেকে পাওয়া তথ্যাদি মস্তিষ্কে সন্নিবেশিত হয়। তার মধ্যে থেকে মানুষ তথ্য গ্রহণ করে। কিছু তথ্য মস্তিষ্কে রেখে দেয়। সেই তথ্যকে মানব মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে। এখন পর্যন্ত জানা তথ্যমতে, অন্য প্রাণীর মস্তিষ্ক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে পারে না। তারা শুধু সিদ্ধান্ত টানে।

যাই হোক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক হিসেবে যার কথা আসে, তিনি ব্রিটিশ গণিতবিদ এ্যালান টিউরিং। অ্যালান টিউরিং বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা কি তা নিরুপণ করতে চাননি, বা এ নিয়ে কারোর সাথে বিতর্কেও যেতে চাননি। টিউরিং এর ধারণা ছিল, মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে ঠিক কি ঘটছে, তা মানুষ না জানলেও, যন্ত্রের মাধ্যমে বুদ্ধিদীপ্ত কাজ করানো সম্ভব। তার এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ১৯৫০ সালের দিকে গড়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাখাটি। অ্যালান টিউরিং বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা নিরুপণের ঝামেলায় না গিয়ে যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তার অস্তিত্ব প্রমাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন বিখ্যাত টিউরিং টেস্টের মাধ্যমে। এটি এমন একটি পরীক্ষা, যাতে যন্ত্রঘটিত কাজ মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেয়, কাজটি যন্ত্র করেছে নাকি মানুষ করেছে? এক্ষেত্রে একজন মানুষকে নিয়োজিত করা হয় কাজটির বিচারক হিসেবে। তাকে বলতে হবে, কাজটি কে করেছে। মানুষের বিবেচনায় যদি মনে হয়, কাজটি যন্ত্র দ্বারা সম্পাদিত হয়েছে, তার অর্থ হলো, যন্ত্রটির মানুষের অনুরূপ কাজ করার ক্ষমতা নেই আর যন্ত্রের কাজ যদি মানুষকে এই অনুভূতি দেয়, যে কাজটি মানব দ্বারা সঙ্ঘটিত হলেও হতে পারে, সেক্ষেত্রে যন্ত্রটিকে মানুষের অনুরূপ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে। বর্তমানে যারা কম্পিউটার ব্যবহার করছেন, তাদের মধ্যে অনেকে ঊখওতঅ প্রোগ্রামটির সঙ্গে পরিচিত, যাতে কোন প্রশ্ন করলে, প্রোগ্রামটি আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনের মতো পাল্টা প্রশ্ন করে বসে। এভাবেই টিউরিং টেস্ট এবং টিউরিং মেশিনের মাধ্যমে প্রচলিত হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই শাখাটি, যা প্রথম দিকে কম্পিউটিং সায়েন্সের জগতে বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। পরবর্তীতে কিছুটা সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই জগতে কাজ করা গবেষকরা আশাব্যঞ্জক সাফল্য প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন, বিধায় এই শাখাটি আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে যেতে থাকে। তবে পরবর্তীকালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করার প্রবণতা গবেষকদের মধ্যে আবারও বেড়েছে। বর্তমানে এর গবেষকরা যা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, যদি আরও বহুগুণ দ্রুত কম্পিউটার আবিষ্কার করা যায়। অর্থাৎ তারা যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে চান গাণিতিক দ্রুততার মাধ্যমে। এরই ফলশ্রুতিতে বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা এই কৃত্রিম মস্তিষ্ক গবেষণা বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আগামী ১০ বছরের মধ্যেই হয়ত তৈরি করা সম্ভব হবে পূর্ণাঙ্গ এবং কার্যকর কৃত্রিম মানব মস্তিষ্ক। মানুষের মস্তিষ্ক যেভাবে কাজ করে, ওই কৃত্রিম মানব মস্তিষ্কের কার্যক্রমও হবে একই ধরনের। ফলে পার্কিনসন, আলঝেইমার্সসহ নানাবিধ রোগাক্রান্ত মস্তিষ্ক চিকিৎসায় ওই কৃত্রিম মস্তিষ্ক ব্যবহারে সুফল পাওয়া যেতে পারে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যাবে ওই কৃত্রিম মস্তিষ্ক ব্যবহার করে। আর কৃত্রিম মস্তিষ্ক তৈরির এই প্রজেক্টকে বলা হয় ব্লুব্রেইন প্রজেক্ট। ব্লুব্রেইন প্রজেক্টের পরিচালক হেনরি মার্কাম কৃত্রিম মানব মস্তিষ্ক নিয়ে তাদের গবেষণার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারা ইতোমধ্যেই ইঁদুরের কৃত্রিম মস্তিষ্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যার কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে টিইডি গ্লোবাল কনফারেন্সে তিনি বলেছেন, মানসিক যে কোন অসুস্থতা চিকিৎসায় সিনথেটিক মানব মস্তিষ্ক হতে পারে আদর্শ। বিশ্বের অন্তত ২০০ কোটি মানুষ কোন না কোনভাবে মস্তিষ্কের জটিলতায় ভুগছেন বলে তিনি জানান। এ পর্যায়ে মার্কাম বলেন, কৃত্রিম মানব মস্তিষ্ক তৈরি করা অসম্ভব বিষয় নয়। আমরা আগামী ১০ বছরের মধ্যেই হয়ত তৈরি করে ফেলতে পারব এ ধরনের কিছু। এ ব্যাপারে সফলতা এলে পৃথিবীতে ঘটে যাবে বৈপ্লবিক বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন, যার সুফল ভোগ করবে মানুষ। ব্লুব্রেইন প্রজেক্ট শুরু হয় ২০০৫ সালে। এই প্রজেক্টের লক্ষ্যই হলো ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্ক তৈরি করা। এ কাজে সবচেয়ে বেশি জরুরী উপাদানটি হলো নিউরন বা স্নায়ু। তাই মার্কামের গবেষক দলের সদস্যরা এই স্নায়ুর ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন। তারা প্রথমে লক্ষ্য করেছেন, ঠিক কিভাবে মানব মস্তিষ্কের স্নায়ু কাজ করে। তারপর ল্যাবরেটরিতে তা বিশ্লেষণ করেছেন।

তারা দেখেছেন, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মস্তিষ্কের ধরন ও কার্যক্রম ভিন্ন। কারণ এরা বংশ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও বহুবিধ জটিল কাজে নিজেদের জড়িয়ে রাখে। এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয় মস্তিষ্ক দিয়ে। অর্থাৎ মস্তিষ্কের সঙ্কেতের ভিত্তিতেই এরা সাধারণত পরিচালিত হয়। হেনরি মার্কাম বলেন, প্রাণীভেদে মস্তিষ্কের বিবর্তন ঘটে থাকে। ইঁদুরের মস্তিষ্কের যত নিউরন বা স্নায়ু রয়েছে, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি স্নায়ু রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কে। তাই ইঁদুর নিয়ে গবেষণা যতটা সহজ, মানুষের ক্ষেত্রে ততটা নয়। তবে প্রথম সাফল্যের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া যাবে বহুদূর, তা নিশ্চিত। এটা সবাই স্বীকার করবেন, মস্তিষ্ক হচ্ছে দেহের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং জটিল স্থান। তাই তার পূর্ণাঙ্গ রহস্যভেদ খুব সহজ কাজ নয়। মনে রাখা দরকার, মস্তিষ্কের এই বিবর্তন কিন্তু অব্যাহত রয়েছে এবং এটি ঘটছে অতি দ্রুততার সঙ্গে। প্রফেসর মার্কাম এবং তার দলের সদস্যরা গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে মস্তিষ্কের স্নায়ু কলাম বা স্তম্ভের কাঠামো ব্যবচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছেন। মার্কামের বর্ণনায়, এ কাজটি করতে হয়েছে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে। কারণ মস্তিষ্কের প্রতিটি স্নায়ুর চরিত্র বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে। দেখতে হচ্ছে স্নায়ুর যোগাযোগ পদ্ধতি এবং কানেক্টিভিটি। তাই প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে সফটওয়্যার মডেল, যেখানে হাজার হাজার স্নায়ু থেকে প্রতিটি স্নায়ুর ভিন্নতা বের করা সম্ভব হবে। আর এই পৃথকীকরণের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত ফলের ভিত্তিতেই তৈরি হবে কৃত্রিম নিওকর্টিয়াল কলাম। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়টি এখন শেষ হয়েছে। গবেষকরা এর ভিত্তিতে তৈরি করেছেন নিউরোকর্টিক্যাল কলাম। কার্যক্রম এবং চিন্তা-চেতনা মস্তিষ্কের যে অংশটি করে থাকে, ওই কলামটি সেই অংশের। নিওকরটেক্স নামে মস্তিষ্কের ওই অঞ্চলটি পরিচিত। প্রথমে মস্তিষ্কের একটি অংশ নিয়েই কাজের সূচনা করা হয়। একপর্যায়ে পুরো মস্তিষ্ক নিয়েই গবেষণা হবে এবং তৈরি হবে কৃত্রিম মস্তিষ্ক। প্রফেসর মার্কাম মনে করেন, মানব মস্তিষ্কের সিমুলেশন করা এখন কেবল টাকার ওপরই নির্ভর করছে। টাকা পেলেই কাজটি করা যাবে। ইতোমধ্যেই মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র ওই অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। একটি ভার্চুয়াল দেহে ব্লুব্রেইন নামের ওই মস্তিষ্ক স্থাপন করা হয়েছে এবং কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে।

প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হবে আইবিএমের অত্যাধুনিক ব্লুজিন সুপার কম্পিউটার দিয়ে। তখন হয়ত আমরা পৌঁছে যাব কৃত্রিম মানব মস্তিষ্কের আরও কাছাকাছি। জৈবিক বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এখনও পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। জৈবিক বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে মানব মস্তিষ্ক কোন এলগরিদম অনুসরণ করে কাজ করছে, তা আমরা এখনও সঠিকভাবে জানি না। বড়জোর কয়েকটি অনুমান নির্ভর অনুকল্প আছে, যার একটি হলো জেফ হকিন্সের মেমরি-প্রেডিকশন ফ্রেমওয়ার্ক। কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে অনুকল্পের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণসাপেক্ষ। কানেকশন প্লাস্টিসিটি সম্পর্কে সামান্য জানার চেষ্টা করি। একটি মানব শিশুর যখন স্নায়ুতন্ত্র তৈরি হয়ে, প্রাথামিক অবস্থায়, তাতে প্রচুরসংখ্যক নিউরন বা স্নায়ুকোষ আর গ্লিয়াল সেল ছাড়া কিছু নেই, নেই কোন বুদ্ধিমত্তা। এরপর বহির্জগত থেকে একটি একটি করে স্টিমুলেশন, যেমন ধরুন, শব্দ, গন্ধ, আলো ইত্যাদি যেতে শুরু“ করে, আর তার মস্তিষ্কের মধ্যে এই বাইরের স্টিমুলেশন ইলেক্ট্রিক সিগন্যালে রূপান্তরিত হয়ে মস্তিষ্কের মাঝে একটি নিউরন থেকে আরেকটি নিউরনে চলতে শুরু“ করে। একটি ইলেক্ট্রিক সিগন্যাল যে কটি নিউরনের মধ্য দিয়ে চলাচল করে। সেই পথটিকে ধরা যায় ঐ সিগন্যালের জন্য নিউরাল পাথ। মস্তিষ্কে নতুন নতুন নিউরাল পাথওয়ে তৈরি হওয়া যেমন স্বাভাবিক ঘটনা, দীর্ঘদিন অব্যবহারে পুরনো পাথওয়ে দুর্বল হয়ে যাওয়া তেমনি স্বভাবিক ঘটনা। ধরা যাক, হঠাৎ আমি বয়রা হয়ে গেলাম। তাহলে আমার শ্রবণ শক্তির জন্য যে অঞ্চল নিয়োজিত ছিল তাও বেকার হয়ে যাবে। কিন্তু সে এভাবে বেকার থাকবে না। আস্তে আস্তে অন্যান্য নিউরাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যতখানি কার্যক্ষম থাকা যায়, তাই থাকার চেষ্টা করবে। যদি সহজ করে বলি তাহলে, নিউরাল প্লাস্টিসিটি বা কানেকশন প্লাস্টিসিটি বলতে বোঝায় নার্ভ সংযোগগুলোর পরিবর্তনশীলতা।

মানব মস্তিষ্ক ভুল করে, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুল করে না। একটি কাজ করার জন্য যদি তার এক হাজার শর্ত পরীক্ষা করে দেখার দরকার হয়, তবে, তাই করবে। অতঃপর সঠিকতম সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু মানব মস্তিষ্ক মোটেও এত সঠিকের ধার ধারবে না, তাৎক্ষণিকভাবে যে ক’টি সম্ভাব্য পথ এবং শর্তের কথা মনে পড়বে, সেই অল্পকটার মধ্যে যেটা সঠিক মনে হবে, তাই করে ফেলবে। এবং কার্য সমাধা করে ফেলবে। ধরুন, আপনাকে কেউ মারতে আসছে, আপনি কিন্তু তা দেখে তৎক্ষণাত চিন্তা করবেন, মার থেকে বাঁচবেন কিভাবে কিংবা তাকে প্রতিহত করবেন কিভাবে? কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এর থেকে বেশিকিছু চিন্তা করে থাকে। সে সম্ভাব্য সব সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করে কাজ করে। কিন্তু আমরা যদি সেভাবে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেই। তাহলে ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার জন্মকাল থেকেই মানবের কাজের সাহায্যকারী। এর কাজ মানুষের কাজ সহজ করে দেয়া, মানুষের জৈবিক বুদ্ধিমত্তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা নয়।

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

০৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: