রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলা গানের বেহাল দশা

প্রকাশিত : ৫ মার্চ ২০১৫
  • মূল ফিচার

গান কি পণ্য যে ব্যবসার মতো করে বাজার চিন্তা করতে হবে? : হায়দার হোসেন (সঙ্গীতশিল্পী)

আমরা সহজেই সবকিছু পেতে চাই। ভাল গান করা তো সহজ না! এখন কেউ একজন গাইতে না পারলেও গান গাচ্ছে, কিছু বাজাতে না পারলেও সঙ্গীতায়োজক হয়ে যাচ্ছে, গান লিখতে না পারলেও লেখা আরম্ভ করে দিচ্ছে। এত সহজ সবকিছু!

মানুষের আবগকে নাড়া দেয়াই গানের কাজ। কিছু কিছু আবেগ আছে, যেমন- দেশপ্রেম, সততা, মানবতা; এগুলো নাড়া দেয়া কঠিন। এগুলো লিখতে গেলে চিন্তা করে লিখতে হবে। আর কিছু কিছু আবেগ আছে, যেগুলো এমনিতেই নড়ে। যেমন, সেক্সুয়ালিটি। একটা ছেলেকে যদি নগ্ন পোস্টার দেখান, ওর আবেগ এমনিতেই নড়াচড়া আরম্ভ করে দেবে। আপনি নাড়াবেন কী? এটাই সস্তা জিনিস। যত সস্তা, তত এটার স্থায়ীত্ব কম।

আমরা বাংলার চর্চা করি না। যারা গান লেখে, দায় তো তাদের আছেই; সঙ্গীতায়োজকদের দায়টাও অনেক বেশি। তারা কারা হচ্ছে এখন? সেটাও দেখতে হবে। বাসায় যে একটা হোম স্টুডিও দিয়েছে, সেও তো নাকি সঙ্গীত পরিচালক!

আসলে সঠিক লোকের কাছে যদি সঠিক জিনিস না থাকে, তাহলে এসব হয়। তারা বাজার চিন্তা করে। আমরা বাজার তৈরি করি। এই মেধা যখন থাকবে না, তখনই সে বাজারের পেছনে দৌঁড়াবে। গান কি পণ্য যে ব্যবসার মতো করে বাজার চিন্তা করতে হবে?

একজন সঙ্গীতায়োজক, গীতিকবির উচিত তার নিজের বাজার তৈরি করা। বাজার যেটা চায়, সেটা যদি আমি দিই, তাহলে তো সেটা সংস্কৃতি হলো না। বাজার এখন বাজে জিনিস চাচ্ছে বলেই কি আপনি দেয়া আরম্ভ করে দেবেন? আপনার সংস্কৃতি তো এটা নয়!

অপ্রয়োজনীয় জিনিসকে সময় ধারণ করবে না : পথিক নবী (সঙ্গীতশিল্পী)

যেসব শিল্পী-সুরকার-সঙ্গীতায়োজক বলে যে ভাল গান চলে না, তারা মিথ্যা বলে। তাদেরই ভাল লাগে না আসলে। যদি গানের ভেতর জীবনের কথা থাকে, সময়ের দাবি থাকে; তাহলে সেটা সময়ই গ্রহণ করবে। কিন্তু যদি অপ্রয়োজনীয় কথা থাকে, তাহলে সেটা সময়ই ফেলে দেবে। অপ্রয়োজনীয় জিনিসকে সময় ধারণ করবে না।

গান কঠিন জিনিস। শব্দের ভেতরেই মহাশক্তি লুকিয়ে আছে। তেমন শব্দ সবার ভেতরে আসবে না। কথা তো সবাই-ই বলতে পারে, কিন্তু সবার কথা তো সবার মনে ধরে না। গান লেখাটও ওই রকমই একটা বিষয়। নয়-ছয়-কয় মিলিয়ে যদি গান লেখেন, সেটাও গান। কিন্তু গানের বিষয়টা অনেক সূক্ষè থাকতে হবে, নয়-ছয় না মিলুক। যিনি গান লিখছেন, তার ভেতরটা যেন আকাশের মতো হয়। নতুবা সে সবকিছুকে ধারণ করতে পারবে না।

আসলে জীবনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কমে গেছে। যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক বেড়েছে। মানুষ নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আপামর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক কম। সৃষ্টিশীল মানুষরা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত বেশি। এজন্যই এমনটা হচ্ছে।

আমার গানের মূল উৎসও কিন্তু প্রেম : প্রীতম আহমেদ (সঙ্গীতশিল্পী)

শিক্ষকতা সবাই পছন্দ করে না। শিক্ষক ছাড়া কিন্তু চলেও না। শিক্ষক হতে হলে অনেক জানাশোনার দরকার আছে। এটাই অপছন্দের কারণ। শিখতে চাইছে কম লোকই।

জীবনমুখী গানগুলোও তাই। আপনি যদি জীবনের চর্চা করতে চান, তাহলে আপনাকে নিয়মিত জানতে হবে, বুঝতে হবে। এতকিছুর মধ্যে মানুষ আসলে যেতে চায় না, যে কারণেই বোধহয় তারা সস্তা জিনিসগুলোই চায়।

যারা শ্রোতা, তাদের একটা দায়বদ্ধতা আছে তার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে। কোন ধরনের গান বাঁচল না বাঁচল, সেটা কিন্তু শ্রোতার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সম্পূর্ণভাবে শিল্পীর শিল্পকর্মের ওপর। শ্রোতা হয়ত সেই চর্চাটা তার মতো করে সংগ্রহ করে করবে।

জীবনমুখী গানের কাজ হচ্ছে জীবনের গল্প বলা। আমি আমার গানের ক্ষেত্রে নানারকম মানুষের গল্পগুলো নিজের মতো করে উপস্থাপন করছি। এগুলো বিষয়ভিত্তিক গান। সবাই-ই হয়তো প্রেমটাকে নির্ভর করে চলে। আমার গানের মূল উৎসও কিন্তু প্রেম। কিন্তু সেই প্রেমটা মূলত দেশ বা মানুষের প্রতি প্রেম।

সংস্কৃতিগতভাবে আমরা সহজ আর সস্তার পূজারী হয়ে যাচ্ছি : ইশতিয়াক আহমেদ (গীতিকবি)

এই দায়টা বৃত্তাকারে আসলে সবার ওপরেই বর্তায়। কেউ কম, কেউ বেশি। সবচেয়ে বেশি বর্তায় শ্রোতাদের ওপর। কলকাতায় এখন যে মাপের গান হচ্ছে, সে মাপের গান লেখার ক্ষমতা কিন্তু বাংলাদেশের গীতিকারদেরও আছে। শ্রোতারা তা তেমন একটা নিচ্ছে না।

সংস্কৃতিগতভাবে আমরা এতটা সহজ আর সস্তা জায়গার পূজারী হয়ে যাচ্ছি, যে কারণে হয়তো গীতিকাররাও চিন্তা করে- আমি যে গানটা লিখলাম, সেটা যদি শ্রোতারা গ্রহণ না করল! সেক্ষেত্রে তারাও গানের ভাষাটা একটু সহজ করে ফেলে।

কিছু কিছু শিল্পীও চিন্তা করে, আমি যদি একজন ভাল সঙ্গীতায়োজক দিয়ে সঙ্গীতায়োজন করাই এবং আমার সুরটা যদি সুন্দর হয়, হয়তো যে কোন লিরিকেই আমি জনপ্রিয়তা পাব। সাময়িক এই জনপ্রিয়তার মোহে আসলে তারা সাহিত্যের জায়গাটা ভাবছে না।

আর একটা ব্যাপার হচ্ছে, আমি-তুমির বাইরে তো আসলে কিছু বলারও নেই। কিন্তু উপস্থাপনার জায়গাটা ভিন্ন হবে, যদি শ্রোতার রুচি পাল্টায়।

ফোক গানও আমি গাইতে পারি না : বাঁধন সরকার পূজা (কণ্ঠশিল্পী)

একই রকমের গান হয়ে যাচ্ছে অনেক বেশি, এটা ঠিক। দায়টা সবারই। তবে যে গান লিখছে, তার বেশি। সেজন্য গান লেখার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত।

আমি সহজ ধরনের প্রেমের গান বেশি গাই। এগুলো আমার কণ্ঠে মানায়। জীবনমুুখী বাদ দেন, ফোক গানও আমি গাইতে পারি না। গাইলেও ভাল লাগে না শুনতে।

একটা এ্যালবামে দশটা গান থাকলে সবগুলো একই রকমের হয় না। আমি কিন্তু আমার এ্যালবামে দেশের গানও করেছি।

প্রকাশিত : ৫ মার্চ ২০১৫

০৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: