মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কৃষি জমি রক্ষার উদ্যোগ ॥ উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমি ব্যবহার সীমিত হচ্ছে

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • মাঠ পর্যায়ে বহুতল ভবনে একাধিক সরকারী অফিস স্থাপন

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ জমি রক্ষার কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জমির ব্যবহার সীমিত করা হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন ভূমি রক্ষা পাবে, অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয়ও কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে চারটি বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে ইতোমধ্যেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে কৃষি জমি হারাচ্ছে। বিগত দিনে নগর পরিকল্পনায় শহরের কলেবরই কেবল বৃদ্ধি করা হতো। এতে জমির মূল্য বৃদ্ধির কারণে কৃষি জমি তার নিজস্ব চরিত্র হারিয়েছে। বর্তমানে সুষ্ঠু নগরায়নে নিবিড় লোকালয় তৈরি ও অবকাঠমো নির্মাণ করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভূমি সম্পদের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এ বিষয়টি সামনে রেখেই নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি ব্যবহারে সতর্ক অবস্থান নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সিনিয়র সদস্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, এ নির্দেশনা আন্তরিকভাবে অনুসরণ করা উচিত। কেননা দ্রুত কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা আজ হুমকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, জমি ব্যবস্থাপনার সার্বিক নীতিমালা দ্রুত করা উচিত। যে যেখানে ইচ্ছা বাড়িঘর তৈরি করবেÑএমনটা চলতে দেয়া যায় না। সেক্ষেত্রে গ্রামে যারা পাকা বাড়ি তৈরি করবে তাদের একতলা- দোতলার অনুমতি না দিয়ে ফাউন্ডেশন চারতলার নিচে অনুমোদন দেয়া উচিত নয়। উপজেলা পর্যায়ে ছয়তলার নিচে অনুমতি দেয়া ঠিক নয়। সেই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অবশ্যই এসব নির্দেশনা গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়ন করতে হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ভূমি রক্ষায় যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছেÑ প্রথমত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণের প্রবণতা বাদ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সময় যথাসম্ভব ইতোপূর্বে অধিগ্রহণকৃত কিন্তু অব্যবহৃত জমি (যা অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতায় হলেও) ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, মাঠ পর্যায়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করে সেখানে বিভিন্ন সরকারী দফতর স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে প্রকল্প প্রণয়ন ও প্রক্রিয়াকরণের সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এবং প্রকল্প অনুমোদনের সময় পরিকল্পনা কমিশন লক্ষ্য রাখবে। চতুর্থত, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতাধীন সরকারী জমির রেকর্ড সংরক্ষণপূর্বক জমির দলিল সংরক্ষণের বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। জরিপ পরিচালনাকালে সরকারী প্রতিষ্ঠানের জমি যাতে যথাযথ রেকর্ড হয় সে জন্য সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ঢাকায় বর্তমানে ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বসবাস করছে। দেশে যেভাবে হাট বাজার ও রাস্তাঘাট তৈরি হচ্ছে তাতে করে কৃষি জমি শেষ হয়ে যাবে। এ অবস্থা বিবেচনা করে আমরা পল্লী জনপদ প্রকল্প হাতে নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে ৮ গ্রামে পল্লী প্রকল্প নেয়া হয়েছে। মন্ত্রী দেশের উপজেলাগুলোতে সুষ্ঠু নগরায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বর্তমানে আমাদের উর্ধমুখী সম্প্রসারণ মডেল নিয়ে কাজ করতে হবে। উন্নত সব দেশেই এই মডেলটি সফল হয়েছে। তবে আমাদেরকে উপযোগী করে গবেষণা কার্যক্রম চালাতে হবে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে নগরায়ন ও অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের সর্বত্র অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে কৃষি জমির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। কোন ধরনের উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রস্তাবনা প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গেই নতুনভাবে কৃষি জমি অধিগ্রহণ, খোলা জলাভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভরাট করে উন্নয়ন কর্মকা- চালানো হয়। প্রতিবছর দেশের ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর চাষাবাদযোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। গত ৩৮ বছরে এ জমির পরিমাণ কমেছে ১ দশমিক ২৪২ মিলিয়ন হেক্টর। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের জন্য কৃষিজ মি অকৃষিতে পরিণত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমি কমতে কমতে প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে কৃষি জমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে। সূত্র মতে, বাংলাদেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৭৬ লাখ ৮০৪। তাদের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক। কৃষি জমি অকৃষিতে রূপান্তরিত হওয়ায় এ প্রান্তিক কৃষকরা সংসারের হিসাব মেলাতে পারছেন না। বিভাগওয়ারী অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অন্যান্য বিভাগের বেলায় দেখা যাচ্ছে রাজশাহী বিভাগে ১৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, ঢাকায় ১৫ হাজার ১৩১ হেক্টর, খুলনায় ১১ হাজার ৯৬ হেক্টর, রংপুরে ৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর, বরিশালে ৬ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমি প্রতিবছর অকৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে। কৃষি জমি অকৃষি জমিতে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ। আর কিছু জমি অকার্যকর হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষাবাদের কারণে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমি রয়েছে মাত্র ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর এক-চতুর্থাংশই এখন হুমকির মুখে।

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: