মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভেতরে বিষ ও বালি

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • সুশান্ত মজুমদার

ঘোর মাঘে প্রতিপদ থেকে পূর্ণিমা পক্ষকাল বাতাসে ছিল অবাক করা আরামের পরশ। দ্যাখো কা-, এ সময়ে ওই মাঘের নির্দয় শীত এলো কিনা এবার ফাল্গুনে এসে। এমন উল্টাপাল্টা আবহাওয়ায় কিরণ বসুর অপারেশনে কাটাকুটি ও সেলাই দাগেভর্তি বয়সী শরীর এই ভাল তো এই মন্দ। সর্বক্ষণ সমঝে চলা মুশকিল জেনেও নিজেকে নিজের মতো করে ধরে রাখতে তিনি হুঁশিয়ার। বয়সের আড়াইকাল পার, এ বয়সেরই সুড়ঙ্গ ধরে উঠে আসা আবছা আলো-আঁধারির সঙ্গে জীবন যেন জোড়া লেগেছে। তাঁর অশক্ত কাঠামোর যখন-তখন ঝিমুনি ধরে। তিনতলার তিন রুমের ভাড়া বাসার আটপৌরে ঘরোয়া গ-িতে শুয়ে-বসে কাগজ ভ্রমণের বই পড়ে টিভি দেখে তার দিনক্ষয়। দুই ছেলে যে যার কাজে সকাল সকাল বেরিয়ে যায়। বাসায় তখন স্বামী-স্ত্রী দু’জন। দুপুর থেকে রাত, অফুরন্ত একঘেয়ে সময়Ñ কেমনে যে কাটে। শরীরের জোড়ে জোড়ে ব্যথা নিয়ে স্ত্রী মনোরমা বেডরুমের ছোট টিভিতে বাংলা সিরিয়ালে চোখ ধরে রাখেন। কখনও মোটা পাওয়ারের চশমার মধ্য দিয়ে কাঁথায় রঙ্গিন সুতোর ফোঁড় দিতে তৎপর হন। খনিকক্ষণ পর সেলাইকর্ম ফেলÑ তাঁর হাত থেমে যায়। হঠাৎ মনোরমার হা-হুতাশ বুকের খাঁচা থেকে দীর্ঘশ্বাস হয়ে উঠে এলে করুণ কণ্ঠের চিকন আওয়াজে পুরো রুমই ব্যথিত হয়ে উঠে। যোগ্যবয়সী বড় ছেলে এখনও বিয়ে করছে না। মা-বাবা উভয়েই পুত্রের বউয়ের মুখ দেখতে ব্যাকুল, অথচ কোন অজানা কারণে ছেলে সে বিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে, তা ধরাই কঠিন।

কিরণ বসুর স্মৃতি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে এলেও স্মরণশক্তি এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এত ভুলে যাওয়ার নয়, পরমায়ু নিংড়ে বেড়ে ওঠা, মানে পায়ের নিচে দাঁড়াবার মতো জমিন আর শক্তি না পাওয়া অবধি কষ্টের করাতে তিনি নিশিদিন চেরাই হয়েছেনÑ সে কী দুঃসহ অবস্থা। শৈশবে মা-বাবা হারা এই অনাথকে লালন পালনে নিকটাত্মীয়রা ছিল অনিচ্ছুক। হিতকামী ক’জন মানুষের সহায়, সুনজরে স্কুল-কলেজের দরজা তিনি পার হতে পেরেছেন। অবহেলা ও দৈন্যদশার অসহ্য ঠোকর খেয়ে ধীরে ধীরে বুঝাপড় হওয়ার পর মনের ভেতরের মন, নয়নগোচরের অতল নিমেষ আর প্রখরবোধ তিনি অর্জন করেন। চটজলদি অন্যজনের আচারের আড়ালের চালকথার ভাঁজের গুপ্ত মানে। ভিন্ন মন পড়তে বুঝতে তিনি কুশলী হয়ে ওঠেন। সত্তরের কাছাকাছি পৌঁছে কিরণ বসুর ধারণাÑ মানুষের জন্য এখন মানুষই সমস্যা। তাই মেপে কথাবার্তা বলতে সজাগ তিনি। বলা যায়, নিরেট সহ্য ক্ষমতার ওপর ভালই দখল তাঁর। সচ্ছল অভাবশূন্য জীবন ভোগ কপালে না থাকলেও আফসোস নেই গড়পড়তা ইচ্ছাপূরণ নিয়েই তিনি সন্তুষ্ট।

প্রাত্যহিক মর্নিং ওয়ার্ক করে বাসায় ফিরে আরেক দফা হাত-মুখ ধুয়ে কিরণ বসু ফ্রেশ হন। আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা একমুঠ কাঁচা বাদামের সঙ্গে কালোজিরা পেঁয়াজ রসুনের কুচি, লেবুর রস আর বিট লবণ মিশিয়ে স্ত্রী খাওয়া তৈরি করে দিলে তা ধীরে সুস্থে তিনি মুখে দেন। টিভি অন করে তখন দিনের প্রথম খবরটা দেখেন। কে জানে আজ তাঁর সকালটা খারাপ হবে! দোতলার বেআক্কেল ব্যাক্যবাজ পড়শী এমন ব্যস্ত হাজির যে, জমানো কথার চাপে তাঁর পেট বুঝি ফুলে আছে। দোপেয়ে নির্বোধটা সিঁড়িতে পায়ে থপথপ আওয়াজ রেখে ভেতরে ঢুকেই সোফায় হেলান দেয়। ভাবখানা এ বাসার বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁর এতই মাখামাখি কিংবা নিশ্চিত দাবি আছে যে, তাঁর শরীর এখানে এসে যখন-তখন সে ফেলতে পারে। গায়ের গেঞ্জি আর পরনের পাজামার দোলামোচা পাট দেখে বোঝা যাচ্ছে সালাহ্উদ্দিন রাতের ঘোমানোর পোশাক এখনও পাল্টানটি। Ñ‘এলাম। জানালা দিয়ে দেখি আপনি হাঁটাহাঁটি সেরে ফিরছেন। ভাবলাম যাই দু’চার লাইন গল্পগুজব করি।’ এটা কোন গল্প-গুজবের সময় হলো? হুট করে হাজির হওয়া যেন তাঁর কাছে মহৎ কাজÑ এমন সুখবোধে সালাহ্উদ্দিন বেশ গদগদ। এবার তাঁর ঘরসন্ধানী নজর পড়ে কিরণ বসুর হাতে ধরা চামচে। কাঁচা বাদাম খেতে দেখে চোখেমুখে বিস্ময় ভাসিয়ে সে শঙ্কিত স্বর টেনে যায়Ñ ‘এই বয়সে আপনি বাদাম খান! করছেন কী? ছেড়ে দেন। ফ্যাটফুড।’ নিষেধের অমন তাড়া দেয়া বাক্যে কিরণ বসুর ভাবনায় প্যাঁচ এঁটে যায়। সালাহ্উদ্দিনের আশঙ্কা সত্য হলে এতদিনে কিরণ বসুর তো মোটা হয়ে যাওয়ার কথা। ঘটনা কী! ভাবনা কপালে ভাঁজ ফেললে মন তাঁর মচকে যাওয়ার উপক্রম হয়। তবে কি মাসের পর মাস সে ভুল করছে? জেনে আসছে, ব্যাড কোলেস্টেরল কমিয়ে আনার জন্য বাদাম বেশ উপকারী। বাদামের গুণাগুণ নিয়ে তিনি একাধিক লেখাও পড়েছেন। তাহলে? মাথার ঘোপের মধ্যে পাক শুরু হলে সকালে নিজের বাদাম খাওয়ার অভ্যাসের হিতাহিত নিয়ে কিরণ বসু বিভ্রান্ত হন। অনেক দিনের লালিত ধারণা তাঁর টোল খেয়ে যায়।

এই বিল্ডিংয়ের ওপর নিজ বাকপটু প্রতিবেশীরা কখনই একসঙ্গে যে যার মুখের তোড় নিয়ে এ বাসায় আসেন না। প্রায়শই এ দেশের ঝুটা-নকল-ভেজাল দুর্ব্যাখ্যায় কিরণ বসুর নিজের কান নিজেরই চড়াতে ইচ্ছে হয়। তাঁর সন্দেহ, নামের শেষে সেট করা উদ্দিনরা যোগসাজশে তাঁকে মানসিক শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে বাগ্বিস্তারের জন্য এখানে আসে কিনা। ঠোঁটে মুখে এত খই রাশপাতলা এত রসদ এরা কোথায় পায়! একজন যায় তো আরেকজনের আকস্মিক উদয়Ñ যাতায়াতের এমন সঠিক আন্দাজ এরা কেমনে করে? এরা সিঁড়িতে ওঠানামার পায়ের আওয়াজ ধরেই কে কোন তলার উদ্দিন নির্ভুল চিহ্নিত করে কেমনে? যাই স্বকৌশলে এ বাড়ির বাবু ভাড়াটে থেকে শুনে আসিÑ ওই উদ্দিন কি বলে গেল? তাহলে এরা কি সর্বক্ষণ যে যার বাসাতেই থাকেন? কিন্তু পারলে গর্জন করে এরা যে জানতে চায় তাঁদের বড় চালু ব্যবসা দেখভাল, হিসেবনিকেশ থেকে একগাদা কর্মচারী চড়াতে চড়াতে মাথা ধরে যায়, ক্লান্ত তাঁরা। এক উদ্দিন যাচ্ছেন আরেক উদ্দিন আসছেন, কী অদ্ভুত ছকবাঁধা চলাচল। কিরণ বসু তেতো-বিরক্তিতে মাখামাখি হতে হতে বিস্তৃত বোঝেনÑ এদের কথাবার্তার মধ্যে আগড়ম-বাগড়ম ভর্তি। অথচ দেখা যায়, বাসার শানসেটের নিচে, কী প্রবেশ পথে, কী বায়ে মোচড় নেয়া রাস্তায় কিংবা ডানে ঘুরে ফুটপাথের চায়ের ছাপড়ায় এদের পরস্পরের দেখা হলে কী খাস অন্তরঙ্গতা, রসালাপ; তখন একে আন্যের পিট চাপড়ানিও বুঝি মিঠাই স্বাদের। কে বলবে এরা কেউ কাউকে ভেতরে ভেতরে আদৌ পছন্দ করে না। একজনের আরেকজনকে নিয়ে নাক সিঁটকানো লেগেই আছে।

এক সিঁড়ি উপরে থাকেন শরফুদ্দিন। তাঁর নাদাপেট দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লম্বা ফর্সা মানুষটার গালের ওপর যেন গাল উঠছে। তাঁর চেহারায় ভেসে উঠেছে কেমন ষ-াছাপ। শোনা কথা, মানুষটা খানিক বেয়াড়া কিসিমের, টুকটাক কেনাকাটা নিয়ে ঋণ আছে, হাওলাতের টাকা শোধেও আঙ্গুলের ফাঁক নাকি গলে না। শরফুদ্দিনের চেয়ে কিরণ বসু বয়সে বড়, মাথার চুল সব সাদা হওয়ায় ছদ্মস্বভাবে বা লোক দেখানোর নামে হোক কদর-ভক্তি সে দারুণ করে। তবে শরফুদ্দিনের গালগল্পে খাওয়ার বিষয় থাকে বেশি। গরুর ভুনা গোশত, কাবাব, পুরান ঢাকার অমুক-তমুক রেস্টুরেন্টের বিরিয়ানি দেখলেই তাঁর সারা মুখ নাকি পানিতে ভরে যায়। না খাওয়া অবধি নিজেকে ধরে রাখা তাঁর জন্য কঠিন। শরফুদ্দিন লোকমুখে শুনলেন যে মোহাম্মদপুরের ওদিকে অবাঙালীদের মার্কেটে প্রতি জুমাবার ভাল তাজা গরু জবাই হয়। ব্যস, ওই গোশতের জন্য হোক চরম গরম, কি রাস্তা ডুবানো বৃষ্টি, কী দুঃসহ যানজট, কেউ তাকে বেঁধে রাখতে পারবে নাÑ গাড়ি ভাড়া করে তিনি ছুটবেন। চাউর হওয়া তাঁর পেটুক স্বভাবের এমন সব ঘটনা হাসতে হাসতে শরফুদ্দিনও স্বীকার করেন। মনে হয় তাঁর গলার খোড়ল তখন অতিশয় স্বাদে ভেজা। এমন ভোগাসক্তির মানুষটার ইচ্ছা শিগগির সেও মর্নিং ওয়ার্ক শুরু করবেন। কিন্তু বডি ফিট রাখা নিয়ে মুখর হয়েও শরফুদ্দিন আজও হাঁটাহাঁটি, কি ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম কিছুই শুরু করতে পারেননি। অথচ কারও সুস্থ থাকার জ্ঞান বিতরণে সে ওস্তাদ। শরীর বিষয়ে আলাপ-শালাপ একবার উঠলে ভেতরে অসুখ-বিসুখ কলকব্জা বিষয়ে অনর্গল বক্তৃতা তাঁর কিছুতেই থামে না।

শরফুদ্দিন ঘাগু লোক, নজরও তাঁর পাকা। কিরণ বসুকে বিমর্ষ মনমরা দেখে শুরু হয় তাঁর মনযোগানো কোশেশ। বুঝি তাঁর জিদ চেপে গেছে, যে করেই হোক দাদাকে চাঙ্গা রাখা চাই। তন্নœ তন্ন চাহনি ধরে রেখে সরাসরি এবার সে জানতে চায়Ñ ‘বলেন তো ঘটনা কী! আপনাকে ক্যামন ক্যামন লাগছে। কোন সমস্যা?’ তাঁর আগ্রহের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত উপস্থিত যে বাবু মানুষটার মুশকিল আসান করা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিরণ বসু মাথা নেড়ে বোঝাতে চান বর্তমানে তাঁর কোন ঝক্কি ঝামেলা নেই। কেবল একবাক্যে সকালের ওই মন খচখচি তিনি পেশ করেন। বাদামে ফ্যাট, তাও সালাহ্উদ্দিন বলেছে শুনে আশঙ্কা ফুৎকারে উড়িয়ে দেন শরফুদ্দিনÑ ‘ধুর, ও ব্যাটা হচ্ছে আস্ত গবেট। মাথায় ঘিলু বলে কিছু নেই, ও জানে কি? ওতো একটা ফালতু। ওর ধারণা পাত্তা দেন না তো।’ আস্ত মানুষটাকে নস্যাৎ করে দেয়ার বিজয়ভাবে শরফুদ্দিন সোফায় হেলান রেখে দু’পা ছড়িয়ে দেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ ভঙ্গি দেখে মনে হয়, এই বেলা খাওয়া-দাওয়া না সেরে সে উঠছে না। এ সময় মনোরমা মন্থর পায়ে কোন কাজে বা আলাপের জন্য রুমে ঢুকেই ফের আড়ালে চলে যান। স্বামীর বন্ধু বা এক ছাদের তলে বাসিন্দা খোশগল্পে আসছে। আসুক কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা সস্তা প্যাঁচাল পেড়ে এতো সময় নষ্ট তাঁর অপছন্দের।

শরফুদ্দিনের কৌতূহলের যেন কমতি নেইÑ ‘আচ্ছা, ভাবীর ইউরিক এসিড কি কন্ট্রোলে আছে? অবস্থা কি? কিরণ বসু মৌন থেকে কেবল কাঁধ নাচান। এর মানে হতে পারে, যা ছিল তাই আছে, কিংবা বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে বা শরীরে ইউরিক এসিডের মাত্রা কিছুদিন হলো মাপা হয়নি।

মুখ সচল রাখার জন্য শরফুদ্দিন প্রস্তুত, তাঁর তৈরি করা বিবেচনা রুখবে কে! কি করণীয় সেই হেদায়েত যথারীতি তিনি চালু করেনÑ ‘কখনও মসুরির ডাল চলবে না। পুই-পালংশাক, পিচ্ছিল সব তরকারি নো খাওয়া।’ খাদ্যের নিষিদ্ধ তালিকা কিরণ বসু জানেন। শরফুদ্দিন ভাবীর ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ আগে দিয়েছেন। আবার সেই পুরনো বকবকানি। এখন এর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী। কারও মুখের ওপর সাফ জবাব, স্বর কর্কশ, কিংবা চেহারার আলো ম্লান করে দেয়ার মতো উল্টো আচরণ কিরণ বসু পারেন না। তাহলে? ভাবাভাবির উঠতি চাপের কারণে সহসা তার মাথায় সূক্ষ্ম উপায় ঝিলিক মেরে উঠে। শরফুদ্দিনকে চাপা রাখা তাঁর মেয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয়ই নাখোশ হয়ে উঠে যেতে পারেন। কোন অভিভাবকই তাঁর ছেলে-মেয়ের গোপন বিয়ে নিয়ে সন্তুষ্ট না। এই বিল্ডিংয়েরই সালাহউদ্দিন ফরিদউদ্দিন দুই খল পালিয়ে একটা মেয়ের বিয়ের বিষয় বেশ রসালো পুঁজি মনে করে আড়ালে পরিবেশন করে যাচ্ছেন। জানেন শরফুদ্দিনের মেয়ে ফুট। ও ব্যাটার মেয়ে ভেগে যাওয়ার নেপথ্যের কা- আপনিই পারবেন বের করতে, বলে, এরা কিরণ বসুর কোটে বল ঠেলে দেয়। এই মানুষ দুজন কেমন, নিজেরা ভাল সেজে বা নিজেদের না-জানার ভান বজায় রেখে আরেক জনকে বাজে একটা কাজে উস্কানি দিচ্ছেন। ধুর, পরের মেয়ের প্রেম বিয়ের মধ্যে সে কেন নাক গলাতে যাবে? তাঁকে এতো লঘু হওয়া কী মানায়! কাদায় নামতে যাবে কেন সে? কিন্তু এই মুহূর্তে শরফুদ্দিনের বিরক্তিকর উপস্থিতি, তাঁর বাচালতা থামাতে হলে হোক অপ্রিয় মুখ তো সামান্য হলেও খুলতে হয়।Ñ ‘আচ্ছা, আপনার মেয়ের বিয়ের কথা শুনলাম।’ কিরণ বসুর ভেতরে মুহূর্তে টান পড়েÑ এটা তো অনধিকার চর্চা। রীতিবিরুদ্ধ জানাজানির এই বাসনা নিমিষে মরে যায়।

শরফুদ্দিনের মুখে ক্ষোভ-আক্ষেপের কিছুই ক্রিয়া করে না। তাঁর স্বরে বরং তুষ্টি ‘হ্যাঁ, বাতুল জালোয়ার হঠাৎ আক্দ হয়ে গেল। ছেলেপক্ষের থেকে তাড়া ছিল।’

কিরণ বসু তাজ্জব। ট্যাটন ওই দুই উদ্দিনের চেয়ে এই উদ্দিন সোজাসাপটা, ডোন্টমাইন্ড গোছের মানুষ। কই, মেয়ের পালিয়ে বিয়ে নিয়ে সে তো বিব্রত নয়। মেয়ে চলে যাওয়ায় মন খাঁ খাঁ করা সামান্য মাতমও তাঁর গলায় নেই। কিন্তু বাতুল জালোয়া আবার কি? বোঝা গেল, শরফুদ্দিন কেমন বাহাদুর। লোক ঘাটাঘাটির পোক্ত লড়িয়ে। তাঁর সামনের বাবু মানুষটির স্থির জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিব্যি সে ধরে ফেলেÑ ‘ও, বাতুল জালোয়া, আমার মেয়ে। সত্যি, আমারই ওর বিয়ের ব্যাপরটা আপনাকে বলা উচিত ছিল।’

উচিত-অনুচিত নিয়ে কিরণ বসুর কোন প্রতিক্রিয়া নেই। এ বাসায় শরফুদ্দিনের প্রায়ই যাতায়াত, তাই বলে মেয়ের বিয়ে নিয়ে পূর্বাপর পরামর্শের কী আছে। সে কি তাঁর আত্মীয়-মুরব্বি? এটা তাঁর পরিবারের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু বাতুল জালোয়া, এমন নাম তো আগে শোনেননি। নামেরও মানে থাকে, তা যে ভাষা থেকে নেয়া হোক।Ñ ‘আপনার মেয়ের নামটা বেশ আনকমন। অর্থ কি?’ কিরণ বসু কিছুতেই জানার ইচ্ছা বশে রাখতে পারলেন না।

মেয়ের জন্মাবধি নিষ্কুলুষ গুণপনা আর নামের মাহাত্ম্যে পারলে শরফুদ্দিন চৌকো এই রুমের মধ্যে এখুনি নৃত্য শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠ আবেগে উচ্ছলÑ ‘এই নামটা রাখেন আমার স্ত্রীর নেকবখ্ত এক পীরবাবা। নিশানদিহি যাচাই করার গায়েবি ক্ষমতা তাঁর আছে। উনি অটল ধ্যান করেন। ইনসানে কামিল উনার কথা, এমন নামের মেয়ে ভাগ্যবতী হয়। দ্যাখেন পীরবাবার কথাই ঠিক হলো।’

মধুর এক সোয়াদ নিয়ে শরফুদ্দিন জিহ্বার মিষ্টতা বণ্টন করে যানÑ ‘বরাত দ্যাখেন জালোয়ার। ফতুল্লায় ওর শ্বশুরের তিনি বিঘার ওপর বাড়ি। বনেদী বংশের বাড়ি তো বিরাট। গুলশানেরটাও বড়। গার্মেন্টস আছে তিন-চারটা ঢাকার ম্যানপাওয়ার ব্যবসার চল্লিশ পার্সেন্ট এই ফ্যামিলির কন্ট্রোলে। ছেলে ছিল কানাডায় প্রায বছর তিনেক। বর্তমানে দেশে। ফতুল্লার ওদিকে হিন্দুদের বড় একটা প্রোপার্টি এখন জালোয়ার শ্বশুরের কব্জায়। ওখানে সে নাকি টেক্সটাইল দেবে।’

হিন্দুদের বিষয়-আশয় কব্জায় মানে জোর-জবরদস্তি স্থায়ী দখল। কিসের কারখানা ছল-ছুতো অছিলায় কতগুলো অসহায় পরিবারকে পৈত্রিক ভূমি থেকে চির উচ্ছেদ। মেয়ের বিয়ে নিয়ে দিল আফরোজ এই মানুষটার হুঁশ-জ্ঞানে সম্ভবত ঘাটতি পড়েছে, নচেৎ এক সংখ্যালঘুর কাছে তাঁরই স্বধর্মী হিন্দু তাড়িয়ে তাঁদের জায়গা-জমি অধিকারভুক্তর প্রসঙ্গ অসঙ্কোচে কেমনে বলে। দ্যাখো, কী বিকট, শরফুদ্দিন তাঁর লুকানো খাই খাই রাক্ষুসে স্বভাব প্রকাশ্যে এনে মহাআনন্দে এখন হেসে যাচ্ছেন। তাঁর মেয়ের শ্বশুর যেন বীরত্বপূর্ণ কোন কাজ করেছেন; তাঁর আত্মীয় হিসেবে ওই সাফল্যের তিনিও ভাগিদার। কিরণ বসুর মনে হচ্ছে, তাঁর রুমে শ্বাস নেয়ার মতো পরিষ্কার বাতাসের অভাব হয়েছে, নচেৎ দম নিতে কষ্ট হচ্ছে কেন!

ফরিদউদ্দিন এলেন পড়ন্ত বিকেলে। তখন জানালা-কার্নিশ, বাইরের লাইটপোস্ট জালবদ্ধ বিভিন্ন তার থেকে শেষ ফ্যাকাসে আলো দ্রুত মুছে যাচ্ছে। মানুষটার শরিফ আদল দেখে পয়লা ধারণা হবে, সে সুবোধ-সোজা নিরীহ। দাঁতে সুতো কাটতেও বুঝি দ্বিধা আছে তাঁর। কিন্তু এই বিল্ডিংয়ের নিবাসীদের কাছে এমন উল্টো ধারণা বদ্ধমূল যে লোকটা যথেষ্ট চালবাজ, তাঁর আমিরি ভঙ্গি পুরো ফাঁপা। হয়তো নিজেও ফরিদউদ্দিন তাঁর সম্পর্কে রটা মন্দ কথা ওয়াকিবহাল। আদৌ সে এ-সব যে পাত্তা দেয় না বোঝা যায় চিরাভ্যস্ত চাল-চলনে। তাঁর শীর্ণ শরীর নিয়ে রুমে ঢুকেই চারপাশে এমন সে আঁতিপাতি নজর ঘুরাতে থাকে যে দেয়াল ভেদ করে ওপাশের সবকিছুও দেখতে পারছে।

কিরণ বসু মনে মনে স্থির করেছিলেন বাইরে একপাক ঘুরে ফেরার পথে বাজারে যাবেন। স্ত্রীর একমাত্র আসক্তি পান-সুপারি, সকালে নিজের খাওয়ার টকদই, লালচিড়া, বিকেলে মুড়ির সঙ্গে খেতে এক কেজি শসা কিনবেন। আবহাওয়া বুঝে কোন কোন দিন সকাল-বিকাল দু’বেলা তিনি হাঁটেন। শেষ বেলার হাঁটাহাঁটির সুফল হচ্ছে : তাড়াতাড়ি ঘুম আসে, নিবিড় হয়, বেশ ভোরে তিনি উঠতে পারেন। কিন্তু ফরিদউদ্দিন এসে তাঁর লম্বা চিকন শরীর ফেলে সব গুবলেট করে দিয়েছে। দ্যাখো, শুরুতেই তাঁর জানার জন্য কী ফালতু প্রশ্ন-‘বলেন, কি বের করতে পারলেন?’ কিরণ বসু বুঝেও অবুঝ নজর ধরে আছে দেখে ফরিদউদ্দিন এই বিল্ডিংয়ের সবচেয়ে বয়স্ক ভাড়াটের বুদ্ধি-কৌশল নিয়ে সন্দেহ করেনÑ ‘আপনার মগজ মনে হয় শর্ট। কিচ্ছু হবে না আপনাকে দিয়ে। আপনার সাদা দিল এখন এ জামানায় অচল। ব্যাটা শরফুদ্দিনকে তুড়ি বাজানোর ভঙ্গিতে আমি যেতে দেখেছি। ওর মেয়ের কেটেপড়া নিয়ে পেলেন কোন ইনফরমেশন?’ কিরণ বসুর মেজাজ ভেতরে ভেতরে তেরিয়া হয়ে ওঠে। অনাত্মীয়, উপরন্তু ভিন্ন একটা পরিবারের দোষ ফুটোÑ কেলেঙ্কারি খোঁজাখুঁজির মতো বিধি বিরুদ্ধ ও অনিষ্ট কর্মে সে কেন জড়াতে যাবে? এ-সব ঠেটা-নচ্ছার-নীচ-পরনিন্দুক, দানবদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করা উচিত। উচিত-অনুচিতের টানাটানির মধ্যে নিজের ওপর দখল পেয়ে গেলে কিরণ বসুর স্বর আর উত্তাপ ছড়াতে পারে না। নিস্তারের উদ্দেশ্যে সে বরং জানতে চায়Ñ ‘শুনেছি আপনার ছেলেও নিজে নিজে কিছুদিন হলো বিয়ে করেছে। গোপন আপনিও রেখেছেন। ঘটনা কি?’ কিরণ বসু পাল্টা পাটকেল মারতে পারেন ফরিদউদ্দিন এতো ভাবেনি।

বাব্বা, ব্যাটা কী ত্যাদড়! নিমিষে নিজেকে সামলে নিয়েছে দেখে কিরণ বসুর চোখ বিস্ময়ে জমে যায়। ফরিদউদ্দিন তাঁর পরিবারে গুপ্ত অবস্থান্তর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বুঝি পরোয়া করেন না। শক্ত চোয়াল বলে দিচ্ছে, কথার মারপ্যাঁচে কেউই তাঁকে টলাতে পারবে না। কাউকে নিয়ে ঠাট্টা টিটকারী মারতে তাঁর মতো এই তল্লাটে আর কে আছে! এবার নিজের চরকা ফরিদউদ্দিন চালু করেনÑ ‘আর বলবেন না। ছেলেমেয়ে প্রেম-মহব্বত করলে পয়লা জানে দিল্লাগি মিতারা, পরে পাড়া-প্রতিবেশী, সব শেষে জানে বাপমায়।’

প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার ফন্দি করে মানুষটা আবোল-তাবোল বকছেন বুঝে কিরণ বসুর কণ্ঠ থেকে এবার খানিক বিরক্তি উঠে আসেÑ ‘আপনার ছেলের শ্বশুর কি করেন? বাড়ি কই?’ উষ্মা তৈরি হওয়ার আগেই শোক গেল ফরিদউদ্দিনের সন্তুষ্টির শান্ত স্বরÑ ‘আর বলবেন না। খুব ধার্মিক ওরাÑ পরহেজগার। ছেলে মাসনাদ সানির শ্বশুর বাড়ি যে বার আমি আর আমার স্ত্রী প্রথম যাই, ওরা আমাদের কোরআন শরিফ প্রেজেন্ট করেছে। মোনাফেকি নাফরমানি দু’চক্ষে ওরা দেখতে পারে না। ষোলআনা ঈমানদার।’ দ্যাখো, কি প্রশ্নের কি উত্তর। ছেলের শ্বশুর বাড়ির এটা কোন পরিচয় হলো? ধুর, এদের এখানে আসা-যাওয়ার সুযোগ দেয়া মানে আশকারা দেয়া।

ছুটির দিন ছাড়া রোজ সকালে দুই ছেলে বেরিয়ে যাওয়ার পর কিরণ বসু ভেতরে ভেতরে উদ্বেগে ছটফট করেন। দিনকাল ভালো না, অহরহ রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনা, জীবন বড় তুচ্ছ এখন। দুপুর হেলে গেলে তিনি অস্থির হয়ে উঠেন। দুই ছেলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলা চাই। ছেলেদের কণ্ঠ শোনার পর তাঁর উৎকণ্ঠা কেটে যায়। তাঁর এককথা, সুখের চেয়ে স্বস্তি ভালো।

আজ সন্ধ্যা উতরে যাওয়ার পর কিরণ বসুর মনে হলোÑ দুপুরে দু’ছেলে খাওয়া-দাওয়ার কথা শোনা হয়নি। অফিসের খাওয়া রোজ তো ভালো থাকে না, অভুক্ত আছে কি! না, বাইরে থেকে কিছু একটা কিনে খেয়েছে? তিনি ফোন অন্ করেন। দুই ছেলে যে যার অফিস রুমে বাবার ফোনের উদ্দেশ্য জেনে হাসে। কী ছেলে মানুষী। বাসায় ফেরার সময় হয়ে আসছে আর তখন কিনা লাঞ্চের খবর জানতে চায় বাবা! দুই দুলালের আয়েশ কণ্ঠ কানে নিয়ে ফোনটা কিরণ বসু কেবল নামিয়েছেন, এ-সময় সালাহউদ্দিনকে দিনে দ্বিতীয়বার আত্মীয় অধিকারে ঢুকতে দেখে নাখোশ হওয়ার সুযোগ তিনি পান না। খানিকক্ষণ আগে মনোরমা ধূপদানি ঘুরিয়ে নিয়েছেন, এখনও সামনের রুমে ওই ধূপের হালকা গন্ধ ভেসে আছে। এসব কুচুটে পাজি মন্দ দুরাত্মা থেকে স্থায়ী রেহাই পেতে বাসাটা তাঁকে বদলাতেই হবে। আর ওই কথা, অন্যায় যে সহে, বর্জন উপেক্ষা মজবুত না রেখে নিঃশব্দে সেও কি অনুচিত কাজ করছে না? নিশ্চিত মাথামোটা বলেই তাঁর বিতৃষ্ণা মনে হয়। সালাহউদ্দিন ধরতে পারছে না। আশ্চর্য, মুখে প্রসন্ন হাসি ঝুলিয়ে মানুষটা দেখি এগিয়ে দাঁড়িয়েছে। Ñ‘আপনার জন্য’ বলে, বড় একটা পলিথিন ব্যাগভর্তি কলা-কুল-খিরাই-পেয়ারা-কামরাঙা আরও কি কি আছে, সালাহউদ্দিন টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখে। কোমরের পেছনে হাত আড়াল রাখার কারণে কিরণ বসু মানুষটার সঙ্গে আনা এই ফল সব লক্ষ্য করেননি।

বিষয় কি? জিজ্ঞাসার দরকার হলো না। সালাহউদ্দিন সন্তুষ্টি ভোগের তৃপ্তি নিয়ে কথার বাজনা ছড়িয়ে দেন। সালাহউদ্দিনের মেয়ের বাড়ি হচ্ছে ফরিদপুরের মধুপুরে। ওদিকের বাগানক্ষেত এখন ফল-ফলাদিতে ভর্তি। এর গায়ে কোন রাসায়নিক নেই। কার্বাইড দিয়ে পাকানো না গাছের টাটকা ফলের স্বাদই আলাদা। এগুলো মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নাকি কিরণ বসুর কথা মনে পড়েছেÑ দাদাকে না দিয়ে কিছুতেই খাওয়া যাবে না। যার কাছে মন খুলে কথা বলা যায় সেই মনের মানুষকে সে ফল দিচ্ছে। উপহার বা মুফতে কিছু পেলে মানুষের এমনিতেই খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু কিরণ বসুর মুখে পুলকলাগা তাইরে নাইরে কোন ছাপ ফুটে ওঠে না। বরং কৌতূহলে তাঁর দুই ভ্রু বাঁকা হয়ে আসেÑ ‘আপনার ওপর-নিচ দুই প্রতিবেশীকে দেননি? এক বিল্ডিংয়েই তো থাকি।’ এমন আজব কথা সালাহউদ্দিন যেন ইহজনমে শোনেনি! মানুষ মানুষের মধ্যে দেয়া-নেয়া করে। কিন্তু ওই উদ্দিন আবার মানুষ নাকি? শরফুদ্দিন ফরিদউদ্দিনকে জীববর্গ থেকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে খারিজ করে সালাহউদ্দিনের গলা নিকাশ চুকায়Ñ ‘অসম্ভব। ওদের দেব মেয়ে তাবাসসুমের বাড়ির ফল? কক্ষনো না। ওরা দেয় কিছু? হাড়ে হাড়ে চিনিÑ কিপ্টে, ওরা পারে যার যার ঝোলা ভারি করতে। নিজের বেলায় আঁটিসাঁটি পরের বেলায় দাঁত কপাটি। ও দুটো স্বার্থ-গুলজার সংসারী। ওদের কথা বলবেন নাতো।’

দেয়া-পাওয়ার হিসাব কষে সংস্রব সম্পর্কের এমন ধারণা কিরণ বসুর জানা নেই। সৃষ্টিছাড়া এই অপ্রীতিকর মনোভাবে সে তাজ্জব হবে কি, নিজেকেই নিজে খোড়ল করে ফেলেন- এখনও তাঁর সন্তান বিয়ে না করে ভালোই করেছে। হয়তো এই জামানার রেওয়াজ মোতাবেক তাঁকেও কিছু লুকাতে বা কেচ্ছা বানাতে হতো।

নাহ্, শাহি-কারবারের নামে এদের বাগাড়ম্বর, ডাঁট, দম্ভ, বানোয়াট মুখসাপট দেখে-শুনে তা নিজের মধ্যে জমা রাখতে রাখতে কিরণ বসু বুঝছেন ক্রমশ তাঁর ওপর অন্যায্য চাপ পড়ছে। খামখা ভদ্রতা করার কোন মানে হয় না। দুর্বল, সাহসশূন্য মানুষের কাছে সৌজন্যতা হচ্ছে নিজের অযোগ্যতা ঢাকার সহজ উপায়। নির্ঝঞ্ঝাট থাকার জন্য নিজেকে ক্রমাগত পীড়ন করে যাওয়া। পৌরুষহীন লোক হচ্ছে ভীরু, তাঁরাই অন্যের হিংসুটেপনা, ছল, প্রতারণা মুখ বুজে সহ্য করে।

কিরণ বসুর বোধ থেকে ধিক্কার উঠে এসে মন-স্নায়ু, মজ্জাগত সহিষ্ণুতায় ফাটল ধরালে নিজের আত্মমুখী জড়তা তিনি ভেঙ্গে ফেলেনÑ ‘শোনেন, আমাদের দুই প্রতিবেশীর ছেলেমেয়ের উঁচু বংশেইÑ।’ গর্বিত দুই উদ্দিনের সৌভাগ্য নিয়ে কিরণ বসুর আরও কি বলার ছিল, তার আগেই গলা খুলে যাত্রাই ঢঙে হেসে ওঠেন সালাহউদ্দিন। তাঁর বিকট হাসির প্রতাপে দেয়ালে ঝুলানো ক্যালেন্ডারও বুঝি দুলে ওঠে।- ‘বিয়ে, হা-হা-হা, একজন শিল্পপতির, আরেকজন ধার্মিক ফ্যামিলিতে, হা-হা-হা। নির্ঘাত ওরা আপনাকে এই গল্প দিয়েছে। বোগাস, অল বোগাস। দু’টোরই বিয়ে হয়েছে পাকা রাজাকার ফ্যামিলিটেত।’

মুহূর্তে কিরণ বসুর ভেতর প্রবল ধস নামে। নিস্তারহীন এই জটিল দুর্দশা রোধ করার অনমনীয় ক্ষমতা তাঁর কোথায়! চারপাশে আদিম ভাঙ্গন, কিনার ঘেঁষা পত্তন খসে পড়ার উপক্রম। এসব উপলব্ধি সঙ্গে নিয়ে ধারালো সন্দেহে সে জখম হয়- এই যে সালাহউদ্দিনের আনা ফল, মেয়ের শ্বশুরবাড়ির, এগুলো কোন আলবদরের বাগানের না তার কী বিশ্বাস আছে!

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: