মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

অদ্ভুত দাঁড়কাক ॥ পানামার গর্ব গ্লোরিয়া গার্ডিয়া

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

গ্লোরিয়া গার্ডিয়া জন্মেছিলেন ভেনিজুয়েলায়। বাবা পানামার অধিবাসী। মা নিকারাগুয়ান। লেখাপড়া করেছেন আমেরিকা ও স্পেনে। ঘুরেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। চাক্ষুস করেছেন বিচিত্র সব ঘটনা। দেখেছেন অন্ধকারের ভেতরের গহীন অন্ধকার। আলোর ভেতরের প্রজ্বলিত আলো। অর্জন করেছেন অভিজ্ঞতা। নানাবিধ বিচিত্র কিন্তু অতীব বাস্তব সব অভিজ্ঞতা। আর সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ। ফলে তাঁর রচিত সাহিত্যে হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যতায় পরিপূর্ণ। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনধারার মাঝে, জীবন দর্শনের মাঝে পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন তিনি। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে দেখেছেন বৈসাদৃশ্য। লোভ, অহমিকার মতো কুপ্রবৃত্তি মানুষকে কিভাবে তাড়িয়ে বেড়ায়, কিভাবে মানুষ আটকা পড়ে হীন স্বার্থের নাগপাশে, তা তিনি দেখেছেন দিব্য চোখে। আর সেই দেখাকেই তুলে ধরেছেন রচিত সাহিত্যে। জীবনের অন্ধকার দিক দেখে তিনি শুধু যে হতাশায় ব্যক্ত করেছেন, তা কিন্তু নয়। স্বপ্নালু চোখে সম্ভাবনাময় মানুষ আর নব কিরণে সজ্জিত পৃথিবীকে দেখেছেন তিনি। সেই স্বপ্নই তাঁর লেখায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে বার বার।

গ্লোরিয়া গার্ডিয়ার লেখক হয়ে ওঠার পেছনে পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণার সঙ্গে বিখ্যাত স্প্যানিশ লেখক রুবেন দারিয়োর লেখার ভূমিকা রয়েছে। গ্লোরিয়ার ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা খ্যাতিমান প্রকৌশলী কার্লোস এ গার্ডিয়া যিনি আমেরিকান এ্যাসোসিয়েশন অব স্যানিটারি এ্যান্ড এনভায়রেনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহ প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং মা রামিরেজ জেলডন ছিলেন নিকারাগুয়ার জাতীয় বীর বেঞ্জামিন এফ জেলডনের মেয়ে। বাবা-মা দু’জনেরই সাহিত্যের প্রতি ভালবাসা ছিল। তাদের এই ভালবাসা গ্লোরিয়াকে লেখালেখিতে উদ্ধুদ্ধ করেছে। উনিশ শতকের পানামার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ডন ভিক্টর ছিলেন তাঁর দাদার দাদা। আর এটা নিয়ে গ্লোরিয়ার বাবার গর্বের অন্ত ছিল না। সবসময়ই তিনি ডন ভিক্টরের কথা গ্লোরিয়াকে বলতেন। এই বলাটা গ্লোরিয়ার মাঝে সাহিত্যিক হওয়ার সুপ্ত বাসনা সৃষ্টি করেছিল। তবে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছেন তাদের আত্মীয় সম্পর্কিত খ্যাতিমান লেখক রুবেন দারিয়োর লেখা পড়ে। সেই শিশু বয়সে তিনি যখন দারিয়োর কবিতা পাঠ করতেন তখন তাঁর মতো হতে চাইতেন। তাঁর কাছে দারিয়ো কখনও ছিলেন হিরো কিংবা কখনও দরবেশ। দারিয়োর লেখাই প্রকৃত অর্থে তাঁর মাঝে সাহিত্যের প্রতি প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল।

গ্লোরিয়ার বাবার পেশাটাই এমন ছিল যে সব সময় এক দেশ হতে অন্য দেশে তাঁকে ছুটতে হতো। পরিবার-পরিজন নিয়ে আজ এদেশ তো কাল অন্যদেশে যেতে হতো। এ কারণে গ্লোরিয়ার বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পরিবেশে হয়েছে। তবে স্কুলজীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে আমেরিকার ইলিনিয়স রাজ্যের ইভান্সটোন প্রেপ স্কুলে। আর কলেজের লেখাপড়া নিউইয়র্কের ভাসার কলেজে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া ম্যানহাটনের কলম্বিয়া ইউনির্ভাসিটি এবং মাদ্রিদ ইউনির্ভাসিটিতে। তাঁর পড়ার বিষয় ছিল দর্শন ও স্প্যানিশ সাহিত্য। তিনি সাহিত্যের ওপরই পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। তাঁর মাঝে সাহিত্যের যে বীজ সুপ্ত অবস্থায় ছিল, সেটাকে জাগিয়ে তুলেছিল সাহিত্যের ওপর তাঁর পড়াশোনা। স্কুলের পাঠ্যে শেক্সপিয়ার পড়তে পড়তে ইংরেজী সাহিত্যের প্রতি তাঁর যেমন আগ্রহ সৃষ্টি হয় আবার ফ্রেঞ্চ শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় হুগো, ভার্লেইন, ভ্যালেরি প্রমুখ ফ্রেঞ্চ সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্মের প্রতিও আগ্রহ তৈরি হয়। তবে স্প্যানিশ সাহিত্যই তাঁকে সবচেয়ে বেশি কাছে টেনেছিল। মাত্র বিশ বছর বয়সে স্প্যানিশ ভাষায় লিখে ফেলেন পুরস্কারজয়ী উপন্যাস ‘হোয়াইট ডার্কনেস।’ এই উপন্যাস লেখার পেছনে তাঁর মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল।

গ্লোরিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য তাঁর মা এসেছিলেন মাদ্রিদে। মা-মেয়ে মিলে ইতালিতে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। হঠাৎ পত্রিকার এক বিজ্ঞাপনে আটকে যায় মায়ের চোখ। পঁচিশ বছরের কম বয়সীদের জন্য স্প্যানিশ ভাষায় সাহিত্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে সোসাইটি অব স্প্যানিশ ও আইবেরিয়ান আমেরিকান রাইটার্স নামক সংগঠনটি। সেই বিজ্ঞাপন দেখে মেয়েকে উপন্যাস লেখার জন্য চাপাচাপি করেন তিনি। হাতে সময় মাত্র পনেরো দিন। এত অল্প সময়ে কিভাবে উপন্যাস লিখবেন, তা তিনি ভেবে পাননি, তাছাড়া তখন তাঁর চিন্তা-চেতনায় ছিল শুধু ইতালি ভ্রমণ। কিন্তু মায়ের পীড়াপীড়ি আর উৎসাহে ঘরের দরজা আটকিয়ে লেখা শুরু করেন উপন্যাস। যথাসময়ে তা কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠিয়ে তারা বেরিয়ে পড়েন ইতালি ভ্রমণে। সেখানে অবস্থানকালেই টেলিগ্রামের মাধ্যমে জানতে পারেন প্রতিযোগিতায় তিনি জয়ী হয়ে অর্জন করেছেন স্বর্ণের মেডেল। এই পুরস্কার প্রাপ্তি গ্লোরিয়াকে সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করে। এই উপন্যাসটি ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় এবং যথারীতি সাড়া ফেলে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, তিনি উপন্যাস লেখার বদৌলতে প্রবন্ধ লেখায় মনোনিবেশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলতেন, গ্লোরিয়ার বিশ্লেষণ ক্ষমতা ভাল। কোন একটি বিষয়কে বিভিন্ন দিক দিয়ে যথোপযুক্ত পর্যালোচনা করার অপূর্ব দক্ষতার অধিকারী গ্লোরিয়া। আর এ বিষয়টি তাকে প্রবন্ধ রচনায় উৎসাহিত করে। টানা পনেরো বছর অসংখ্য প্রবন্ধ লিখে গেছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও বইতে।

এ সময়কালে তিনি পানামার অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো আলফারোর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রিকার্ডোর অনুপ্রেরণায় ১৯৬৬ সালে পনেরো বছর পর আরেকটি উপন্যাস লেখেন। এক সাহিত্যে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য স্বামীর অনুপ্রেরণায় লেখেন ‘দ্য লাস্ট গেম’ নামক এক ইতিহাসভিত্তিক রাজনৈতিক উপন্যাস। যথারীতি প্রতিযোগিতায় উপন্যাসটি বিজয়ী হয়। এরপর এই বইটির আরও দুটি খ- বের হয়। এই ত্রিখ-ের জন্য তিনি সেন্ট্রাল আমেরিকান প্রাইজ লাভ করেন। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি লা প্রেনসা, পানামা আমেরিকা, ক্যাম্বিও ইত্যাদি ম্যাগাজিনের সিন্ডিকেট কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেন। অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো তিনিও কয়েক বছর নিকারাগুয়ার ন্যাশনাল সান্ডিনিস্তা লিবারেশন ফ্রন্টের কর্মকা-ের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। পানামার এবিসি নিউজের প্রতিনিধি হিসেবে এবং চ্যানেল ফাইভের পরার্মশক হিসেবেও তিনি কাজ করেন। তিনি ডিকশনারি অব দ্য স্প্যানিশ রয়েল এ্যাকাডেমির একুশতম সংস্করণের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া কলম্বিয়ান এ্যাকাডেমির জন্য ডিকশনারি অব কলম্বিয়ানিসমসের দ্বিতীয় সংস্করণে কাজ করেন। পানামার পেন ইন্টারন্যাশনালের (লেখকদের সংগঠন) শাখার প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ১৯৯৭ সাল থেকে পাঁচ বছর তিনি পেন ইন্টারন্যাশনালের সাতজন নির্বাহীর একজন হিসেবে কাজ করেন। তিনি বর্তমানে পেন ইন্টারন্যাশনালের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আইবেরিয়ান আমেরিকান পেন ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলোÑ হোয়াইট ডার্কনেস (১৯৬১), ওয়াকিং রুটলেস (১৯৬৬), দ্য লাস্ট গেম (১৯৯৬), ফ্রিডম অন ফায়ার (১৯৯৯), উলফস ইন দ্য ইভেনিং (২০০৬), দ্য গার্ডেন অব এ্যাশেস (২০১১), এ্যাট দ্য হার্ট অব দ্য নাইট (২০১৪)। গল্পের বইগুলো হলো দ্য বিল (১৯৯৭), এ্যাপোক্রিপাল লেটারস (১৯৯৭)। উল্লেখযোগ্য গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ও নিবন্ধগুলো হলো অরিজিনস অব মর্ডানিজম (১৯৬৬), সার্চ দ্য ফেস (১৯৮৪), ঔম্যান ইন দ্য একাডেমি (১৯৮৯), এ্যাপ্রোচ টু ফ্রি এ্যান্ড ক্যাপটিভ অব স্টেলা সিয়েরা (১৯৯০), এ্যা ক্রিটিক্যাল রিফলেকশন অন দ্য কন্ট্রিবিউশন অব দ্য বুক ওয়েব টু পানামা পয়েট্রি অব দ্য সেঞ্চুরি (১৯৯৪), আস্পেকটস অব ক্রিয়েশন ইন দ্য সেন্ট্রাল আমেরিকান নোবেল (১৯৯৮), চেঞ্জেস অব দারিয়েন : ফাউন্ডিং পোয়েম অব নিউ রিয়েলিটি (২০০১), পাবলো এন্টোনিও ব্লক : পোয়েট এ্যান্ড ক্রিস্টিয়ান থিংকার (২০০৪), দ্য লুক অব অরপেয়াস ইন দান্তে এ্যান্ড দারিয়ুস (২০০৭), ইন লাইট অব নিউ প্রোপজালসা অন দ্য লাতিন আমেরিকান ফিকশন রিভিউস (২০০৭) ইত্যাদি।

ইতিহাস ও রাজনীতিকে আশ্রয় করে তিনি বেশিরভাগ উপন্যাস রচনা করেছেন। উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন পানামার বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস। দ্য গার্ডেন অব দ্য এ্যাশেস বইটিতে পারিবারিক কাহিনী বর্ণনার মধ্যে দিয়ে বিংশ শতাব্দীর পানামার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে সেই সময়কার পানামার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা, সামরিক আগ্রাসন, কমিউনিজম ও সোশালিজমের দাপট, নৈরাজ্য সৃষ্টি ইত্যাকার পরিস্থিতি উপন্যাসের ছলে তুলে ধরা হয়েছে। এ্যাট দ্য হার্ট অব দ্য নাইট বইটি ইতিহাসধর্মী বই। গুর্য়েনিকার ট্র্যাজেডি দিয়ে বইটির কাহিনী শুরু হয়েছে। পিরিনিজ পর্বতমালা অধ্যুষিত অঞ্চলে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ যেমন বোমাবর্ষণের কারণে প্রেসিডেন্ট জোসে এ্যান্টোনিয়ল এ্যাগুয়েরে এবং তার নিরাপত্তা রক্ষী জিনের জীবনে যে দুর্ভোগ নেমে আসে এবং এতে সাধারণ মানুষের মাঝে দৈহিক, মানসিক এবং নৈতিক যে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে, তা বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। দ্য লাস্ট গেমের কাহিনীতে আমরা খুঁজে পাই রবার্টো গেরিডোর মানসিক দ্বন্দ্ব, মারিয়ানো পেনিজার ট্র্যাজেডি এবং গুপ্ত হত্যা, ষড়যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক ডামাডোল। উলফস ইন দ্য ইভেনিং নামক ইতিহাসভিত্তিক বইটিতে সিআইএর ষড়যন্ত্র, মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদির মধ্য দিয়ে পানামা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

গ্লোরিয়া গার্ডিয়া তাঁর সাহিত্যেকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। হোয়াইট ডার্কনেস বইয়ের জন্য সোসাইটি অব স্প্যানিশ এ্যান্ড লাতিন আমেরিকান রাইটার্স কর্তৃক গোল্ড মেডেল পান। অরিজিনিস অব মর্ডানিজম প্রবন্ধ আর ওয়াকিং রুটলেস উপন্যাসের জন্য রিকার্ডোর মিরো ন্যাশনাল লিটেরেচার কনটেস্টে বিজয়ী হন।

এ্যাপোক্রিপাল লেটারস ছোট গল্পের বইয়ের জন্য বোগাটাতে ন্যাশনাল শর্ট স্টোরি প্রাইজ লাভ করেন। নিকারাগুয়ার সরকার তাঁকে সিটিজেন অব দ্য সেঞ্চুরি উপাধিতে ভূষিত করেন। এখন তাঁর বয়স পঁচাত্তর বছর। কিন্তু বয়সের ভারে তিনি ন্যুব্জ হয়ে পড়েননি। এই বয়সেও নিয়ম করে প্রতিদিন আটঘণ্টা লিখে চলছেন তিনি।

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২০/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: