কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জরিনা বিবির তিন যুগ

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • মিজানুর রহমান সাতক্ষীরা থেকে

ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্র আসছে। দরবেশ বসে আছে ধ্যানে। সতী বেহুলার সাপ ছুটে আসছে বিনের টানে। এত সব কিছু একই সঙ্গে অদৃশ্য সুতায় গাঁথা। কল্পকাহিনীর চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছে দর্শকদের সামনে। সতী বেহুলা, বেদ কন্যা, বেদের মেয়ে জোৎস্নাসহ আরও নানা গল্প নিয়ে প্রায় তিন যুগ ধরে দেশজুড়ে পুতুল নাচ দেখিয়ে চলেছেন জরিনা বিবি। স্বামীর কেনা দি নিউ নিজাম পুতুল নাচ দলের স্বত্বাধিকারী জরিনা বিবি ছেলে-মেয়ে, জামাতাদের নিয়ে পুতুল নাচ দেখিয়ে বেড়ান এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সম্প্রতি তিনি থাইল্যান্ডে পুতুল শো করে এসেছেন। সেখান থেকে সনদ পেয়েছেন। তিন বছর আগে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে পুরস্কার ও সনদ পেয়েছেন। এরপরও তাঁর সংসারের দৈন্যতা কাটেনি। সাতক্ষীরার পাথরঘাটা গ্রামে টিন আর টালি দিয়ে ঢাকা তাঁর ছোট ঘরটি বলে দেয়Ñ পুতুলের মাধ্যমে বিভিন্ন জনপ্রিয় পালা দেখিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষদের মনোরঞ্জন করে ফিরলেও দীর্ঘ ৩ যুগ পরেও তার ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। স্বামীর কেনা দি নিউ নিজাম পুতুল নাচের লাইসেন্সে চলে জরিনা বিবির পুতুল নাচের দল। জীবনে স্কুলের গ-িতে পা রাখেননি জরিনা বিবি। অথচ প্রায় ১৫ থেকে ২০টি যাত্রাপালার সব কাহিনী তাঁর মুখস্ত। তিনি নিজেই এখন এই পুতুল নাচের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। কোন চরিত্রের পর কোন চরিত্র কথা বলবে, এই ডায়ালগ তিনি নিজেই বলে যান পুতুলের মুখে মুখে। স্বামী মারা যাওয়ার পর ৫ মেয়ে আর ১ ছেলেকে নিয়ে চলে তাঁর পুতুল নাচের দল। দলে রয়েছেন তাঁর জামাতারাও। ১৫ বছর বয়সেই স্বামীর হাত ধরে যাত্রা দলে যোগদান করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি হাল ধরেন পুতুল নাচ দলের। গত বছর ১ নবেম্বর থেকে ১০ নবেম্বর পর্যন্ত জরিনার দল ব্যাঙ্ককে হারমোনি ওয়ার্লড পাপেট কার্নিভালে পালা করে আসেন। সেখানে তাঁর দল ‘বেদ কন্যা’ পালাটি পরিবেশন করে প্রশংসা পেয়েছেন। সেখান থেকে একটি সনদও পেয়েছেন তিনি।

জরিনা বিবির দল এখন বরিশালের বানারীপাড়ায় পালা করছেন। এর আগে তিনি ফরিদপুরের জসিম উদ্দিন মাঠে পালা করেছেন। জরিনা বিবি জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের মানুষ এখন স্বস্তিতে নেই। পুতুল নাচ দেখিয়ে এখন সংসার চলে না। লোক সমাগম হয় কম। মাঠ ভাড়া করে কমিটির টাকা দিয়ে যা উপার্জন হয় তা দিয়ে সংসার খরচ চলে, সঞ্চয় হয় না। মেয়ে, জামাতা, আর ছেলেসহ তাঁর দলে এখন প্রায় ২০ জন সদস্য রয়েছেন। দুই মেয়ে আঁখি আর সাবানা পুতুল নাচায়। ছেলে গোলাম মোস্তফা, জামাতা জাফরান আর নজরুল মিউজিক পরিচালনা করে। আর জরিনা পালা পরিচালনা করেন।

পুতুল নাচের মাধ্যমে জরিনা বিবি প্রায় ২০টিরও বেশি পালা পরিবেশন করে থাকেন। সতী বেহুলা, সাত ভাই চম্পা, বেদের মেয়ে জোৎস্না, আলোমতি, সাগর ভাসা, জরিনা সুন্দরী, বেদ কন্যা, রাজা হরিশচন্দ্র, শ্মশানে বিসর্জন, নিমাই সন্যাসীসহ নানা জনপ্রিয় পালার মাধ্যমে পুতুল নাচ দেখান জরিনা বিবির দল। যাত্রা মঞ্চে পুতুল নাচ দেখালে একটি পালা চলে রাতভর। আর বারুনি মেলায় একটি পালা খ- খ- করে পরিবেশন করা হয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা গ্রামবাংলার পুতুল নাচ শিল্প এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। একেকটি পালার একেকটি চরিত্রের জন্য তৈরি করতে হয় নানা রঙ আর নানা চরিত্রের পুতুল। এই পুতুল তৈরিতে এখন খরচ অনেক বেশি।

প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৪/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: