আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মধুর অতীত যৌথ পরিবার

প্রকাশিত : ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
মধুর অতীত যৌথ পরিবার
  • রেজা ফারুক

বাঙালীর জীবন থেকে যৌথপরিবার শব্দটাই যেন মুছে যেতে বসেছে। কালের অতলে হারিয়ে যেতে বসেছে। সম্ভবত সংসার জীবনের মধুর অতীত। গুনুত্তরণশীল জয়েন্ট ফ্যামেলির একসঙ্গে বসবাসের মুখর সিম্পনি।

চোখ ঝাপসা হয়ে আসা সেসব দিনের সাদাকালো ছবিগুলো এ্যালবামের পাতায় পাতায় যেন কান্নাভেজা কণ্ঠে স্মরণ করিয়ে দেয় সেসব দিনের গল্পগাথা। কেউ আর এখানে নেই জীবনের প্রয়োজনে একে একে সকলেই ছিটকে গেছে। ছিন্ন হয়ে গেছে সম্পর্কের সকল বন্ধন। সঙ্কুচিত হয়ে গেছে পরিবারকেন্দ্রিক জীবনের স্পন্দনগুলো। একা, নিঃসঙ্গের অসীমতায় ডুবে গেছে বাঙালীর জীবনবোধের সবচেয়ে প্রত্যাশিত সেই রক্তের বাঁধনের সুতো। বিলুপ্ত বা অবলুপ্ত আজ জয়েন্ট ফ্যামেলির মধুর কনসেপ্ট। জীবনের তাগিদে জীবনই যেন হয়ে পড়েছে একচিলতে ছায়ার মতো। যে ছায়ায় সববাস করে কেবল বাবা-মা এক, এক বা দুটি ছেলে-মেয়ে। এইতো এখনকার জীবন, যে জীবন যন্ত্রের মতো, নিরানন্দ নিঃসঙ্গ।

একটা সময় ছিল যখন পরিবারের সবাই মিলে এক বাড়িতে থাকা, এক হাঁড়িতে রান্না আর এক বৈঠকে খাওয়া পর্ব হতো অপরিসীম আনন্দ ভাগ করে। সেটা কবে? তিন দশক, চার দশক কিংবা পাঁচ দশক আগের কথা। তখন বাড়ির কর্তার অদেশ-নির্দেশেই পরিবারের নৌকাটি কখনও ধীরলয়ে কখনও দ্রুতলয়ে দিন আর রাত্রির নদীটা অতিক্রম করত। যেখানে থাকত ভালবাসার উপচানো টান, অনুশাসনের রাঙা চোখ, মায়ের বকুনি, মুরব্বিদের খবরদারি। এখন সেখানে পড়ে আছে ফড়িঙের ছিন্ন পালকের করুণ বিবর্ণ ছন্দ। যে ছন্দে নেই গীতলতা, নেই ধারা বহমান কুল্কুল্ শব্দ-পুঞ্জ।

এখন ‘সেল্ফ ফ্যামেলি ম্যানারিজম’ সবাইকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। বাঙালী যেন ভুলতেই বসেছে জয়েন্ট ফ্যামেলি তথা একান্নবর্তী পরিবারের জাদুময় সেসব দিনের কথা। শহুরে নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির অপূর্বময়তার সংস্পর্শ থেকে যেমন আজ বঞ্চিত।

কখনও তেমনভাবে তারা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়নি। ফলে ঈদ কিংবা অন্যান্য ছুটির সময় শুধু শহুরে জীবন-জীবনের প্রচ- ঝুঁকি নিয়ে একরত্তি বউ-বাচ্চার সংসার লাগেজ গুছিয়ে-মুছিয়ে ছোটে লঞ্চ, ট্রেন, বাস, স্টিমার, নিজেদের গাড়িতে করে শেকডের টানে গ্রামের পথে। যে পথের ধুলো আর ঘাসে রোদ আর শিশিরের এক অদ্ভুত কার্নিভাল ফুটে ওঠে। যে পথে যেতে যেতে শিরিষ, বাবলা-বট, আম-জাম, হিজল আর নানা বৃক্ষরাশির মায়াবি ছায়ার চাদর থাকে ছড়িয়ে। সেই পথের এক পাশে ক্ষীণধারা নদী আর ধু-ধু মাঠ কিংবা বিল-পুকুর, খাল-জলাশয় রূপালী ধূসর সনির্বন্ধ কোমল অনুরণন গুঞ্জরিত হয়। সেই দু’দিন-তিন দিনের ছুটি কাটাতে সকলেই ছুটে যায় ওই একান্নবর্তী সমুদ্রের কাছে। যে সমুদ্রে সূর্যাস্ত নেই। দিবস এবং রাত্রির মধ্যে নেই সীমারেখা, নেই ভিন্নতা। ছুটি-ছাটায় সকলেরই তাই একটু দম নিতে ছুটে যাওয়া দিগন্ত ছোঁয়া মৃত্তিকা আর অখ- সবুজের কাছে। গ্রামের সেই নৈসর্গিকতাও সবাইকে পরম আদরে কোলে তুলে নেয়। দিন কয়েক পর ছুটি শেষে সকলেই রুদ্ধশ্বাসে ফিরে আসে শহরে। একচিলতে নগর জীবনে। আগের মতোই পড়ে থাকল জীবনসায়াহ্নে পরিচর্যাহীন একাকী সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-পরিজনহীন বয়োবৃদ্ধ বাবা-মা। কিন্তু ফ্রেমে বাঁধা প্রিয় ছবিওয়ালা আয়নাটা ভেঙ্গে গিয়ে একান্নবর্তী পরিবারের সকরুণ চিত্রবীথিতে যে বেদনার নীল বিষন্ন দাগ অঙ্কিত হলো, সেই দাগ মুছে গিয়ে ফিরে কি পাবে কেউ একান্নবর্তী পরিবারের সেই অফুরন্ত আনন্দঘন স্বাদ।

প্রকাশিত : ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৯/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: