কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অবচেতন-অতীন্দ্রিয়বাদের শিল্পস্রষ্টা

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • তৌহিদ ইমাম

বাংলা সাহিত্যের তিরিশের কবিকুল বিশ্বসাহিত্যের যে শিল্পপুরুষ দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন, তিনি ফরাসী লেখক শার্ল বোদলেয়ার। বুদ্ধদেব বসুর অনূদিত বোদলেয়ারের ‘ক্লেজদ কুসুম’ কাব্যটি তো তিরিশের দশক ও তিরিশোত্তর লেখক সম্প্রদায়কে কী গভীরভাবে সম্মোহিত করেছিল, সেটি সর্বজন সুবিদিত। আর সেই বোদলেয়ার যাঁর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, তিনি বিশ্ববিশ্রুত আমেরিকান লেখক এডগার এ্যালান পো। পো কর্তৃক শুধু বোদলেয়ারই প্রভাবিত ছিলেন, তা নয়; আলফ্রেড লর্ড টেনিসন, ফিওদর দস্তয়ভস্কি, স্তেফান মালার্মে, আর্থার কোনান ডয়েল-এর মতো লেখকরাও প্রভাবিত হয়েছিলেন বিপুলভাবে। কেউ কেউ তো সেই অমোঘ প্রভাব থেকে সারাজীবনেও মুক্তি পাননি।

এডগার এ্যালান পো ছিলেন একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক, সাহিত্যতাত্ত্বিক এবং সমালোচক; সেই সঙ্গে তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিচয়- বিশ্বসাহিত্যে প্রথম গোয়েন্দা কাহিনীর জনক তিনি। এই বহুমাত্রিক অনন্যসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন মানুষটির ব্যক্তিজীবন ছিল করুণ দুঃখ, শোক, দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর ব্যর্থ প্রেমের বেদনায় পরিকীর্ণ। মাত্র চার দশকের স্বল্পকালীন জীবন ছিল তাঁর, কিন্তু তিনিই ছিলেন বিশ্বসাহিত্যের কয়েকটি অনন্য বাঁকের অসাধারণ রূপকার।ড়

পো’র জন্ম আমেরিকার বোস্টন শহরে, ১৮০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি। বাবা ডেভিড পো জুনিয়র এবং মা এলিজাবেথ আরনল্ড পো দু’জনেই ছিলেন অভিনয়শিল্পী। এডগার এ্যালান পো ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। পো’র দাদা ছিলেন আমেরিকান বিপ্লবের একজন বিপ্লবী। মাত্র দু’বছর বয়সেই পো বাবা-মাকে হারিয়ে অনাথ হয়ে পড়েন। ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডে নিঃসন্তান জন এ্যালান তাঁকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। ধারণা করা হয়, পো’র নামের সঙ্গে সংযুক্ত এ্যালান পদবীটি পালকপিতার কাছ থেকেই প্রাপ্ত। পো’র শিক্ষাজীবন খুব সমতল ছিল না, ১৮১৫ থেকে ১৮২০ সালের ভেতরে তিনি স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। এরপর রিচমন্ডে এবং ১৮২৬ সালে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বছরখানেকের শিক্ষাগ্রহণকালে গ্রিক, ল্যাটিন, ফরাসী, স্প্যানিশ এবং ইতালীয় ভাষা শিখতে থাকেন। কিন্তু সেখানে জুয়া খেলার নেশায় আক্রান্ত হন তিনি (এখানে দস্তয়ভস্কির সঙ্গে অনেকটা মিল পাওয়া যায়) এবং একবার সে খেলায় বিপুল পরাজয়ের ফলে অভিভাবকদের সঙ্গে মনোমালিন্যের অনিবার্যতায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের সেখানেই ইতি ঘটে। প্রেম ও দাম্পত্যজীবনেও স্থিত হতে পারেননি তিনি; ভার্জিনিয়ায় অধ্যয়নকালে প্রেমিকা সারাহ এলমিরা রয়েস্টার তাকে ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেন। এ প্রেম হারানোর যন্ত্রণা তাঁর ভেতরে সারাজীবন নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রায় সমস্ত কবিতাই প্রচ্ছন্নভাবে এলমিরাকে উদ্দেশ্য করে রচিত। ১৮৩৬ সালের ১৬ মে বিয়ে করেন আত্মীয়া মিসেস ক্লেম-এর ১৩ বছর বয়সী কন্যা ভার্জিনিয়াকে। মাত্র এক দশকের দাম্পত্যজীবন ছিল তাঁদের। দীর্ঘ পাঁচ বছর যক্ষ্মারোগে ভুগে ভার্জিনিয়া মারা যান ১৮৪৭ সালের ৩০ জানুয়ারি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর আক্ষরিক অর্থেই পো হয়ে ওঠেন গভীরভাবে বিষাদাচ্ছন্ন ও উ™£ান্ত এবং তীব্রভাবে পানাসক্ত। যেন নিজ হাতে নিজের চিতা সাজানোর প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অবশেষে ১৮৪৯ সালের ৭ অক্টোবর ওয়াশিংটন কলেজ হাসপাতালে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান তিনি। অবশ্য তার আগেই নিজ দেশ আমেরিকায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বহুল আলোচিত-সমালেচিত লেখক ও সাহিত্যতাত্ত্বিক। পরবর্তীতে বোদলেয়ারের অনুবাদে ইউরোপ তথা সারাবিশ্বেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

এডগার এ্যালান পো’র জীবনকাল স্বল্পস্থায়ী হলেও তাঁর সৃষ্টি সামান্য ছিল না, বরং মোটামুটি বহুপ্রজ লেখকই বলা যেতে পারে তাঁকে। মাত্র আঠারো বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ- টেমারলেন এ্যান্ড আদার পয়েমস। ১৮৩০ সালে বেরোয় দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ- আল আরাফ টেমারলেন এ্যান্ড মাইনর পয়েমস, পরের বছর প্রকাশিত হয় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ- পয়েমস। এছাড়াও তাঁর বহুল আলোচিত কবিতা- ইসরাফিল, টু হেলেন, টু মাই মাদার, দ্য র‌্যাভেন, উলালিউম, ফর এ্যানি, এনাবল ল, এলডোরাডো, এলিওনোরা, দ্য ভ্যালি অব আনরেস্ট, লেনর প্রভৃতি। এডগার এ্যালান পো’র প্রথম দিকের কবিতায় জন মিল্টন ও টমাস মুরের সুস্পষ্ট প্রভাব ছিল। পরবর্তীতে শেক্সপিয়ার, আলেকজান্ডার পোপ, শেলি, কিটস এবং কোলরিজের প্রভাব লক্ষ্যযোগ্য হয়ে ওঠে। পো কবি হিসেবে যতটা আলোচিত, তার চেয়ে অনেক বেশি আলোচিত একজন অসাধারণ গল্পকার হিসেবে। ১৮৪০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ- টেলস অব দ্য গ্রোটেস্ক এ্যান্ড এ্যারাবেস্ক। ১৮৪৫ সালে একসঙ্গে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যসংকলন- দ্য র‌্যাভেন এ্যান্ড আদার পয়েমস ও গল্পসংকলন- টেলস। পো’র বহুল অলোচিত গল্প- ভ্যালডিমারের মৃত্যু, লাল মড়ক, আশার বংশের পতন, কালো বিড়াল, শব্দ, মোরেলা, উইলিয়াম উইলসন প্রভৃতি। বিস্ময়, আতঙ্ক, ভীতিময়তা, বিষাদ এবং অতিপ্রাকৃতিকতা ছিল পো’র অধিকাংশ গল্পের পরিচিত অনুষঙ্গ।

এর বাইরে পো’র অন্যান্য রচনা, যেমন- দীর্ঘগল্প বা নভেলা- দ্য ন্যারেটিভ অব আর্থার গর্ডন পিম ও মহাবিশ্ব সম্পর্কিত এক অধ্যাত্মধর্মী গ্রন্থÑ ইউরেকা। জীবনের একেবারে শুরুতে সেনাবাহিনীতে ও পরে সামরিক একাডেমিতে চাকরির চেষ্টা করলেও সেখানে টিকতে পারেননি পো। প্রায় সারাজীবন বিভিন্ন কাগজের সম্পাদনা করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। পত্রিকার প্রয়োজনে প্রচুর গদ্য লিখতে হয়েছে তাঁকে। সে কারণে তিনি সমকালে কিছুটা সমালোচিত হলেও সাহিত্য সমালোচনায় ভিন্নমাত্রার জন্ম হয়েছিল তাঁর হাতে। সেগুলোর স্বাক্ষর উৎকীর্ণ হয়ে আছে- দ্য লিটারেরি অব ন্যুইয়র্ক ও দ্য পোয়েটিক প্রিন্সিপল সিরিজ দুটির প্রবন্ধগুলোতে। সমকালীন সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে তাঁর মন্তব্য ছিল খুবই গুরুত্ববহ, যদিও যুগপত প্রীতিময়তা ও নির্মমতা সংগুপ্ত ছিল সেসব সমালোচনায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাঁর অসাধারণ কিছু মন্তব্য আছে। যেমন, প্রবন্ধ সম্পর্কে তিনি বলেছেন- ‘প্রবন্ধকে অবশ্যই হতে হবে সাড়াজাগানিয়া; স্বল্পভাষ্য, ঘনবদ্ধ, সুনির্দিষ্ট অথচ সাবলীলভাবে বিস্তৃত।’ কবিতা সম্পর্কে তাঁর মত- ‘কবিতার সৃষ্টি হয় একমাত্র বিশুদ্ধ অনুপ্রেরণা থেকে।’ এবং ‘কবিতায় সত্য ও ঘটনা কেবল প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকতে পারে, ব্যাখ্যাত অবস্থায় নয়।’ অন্যদিকে ছোটগল্পের কলারীতি নিয়ে তাঁর যে অনুসন্ধান, সেটাকেই বলা যেতে পারে ছোটগল্পের ‘প্রথম বিজ্ঞানসম্মত সূত্র’। তিনি বলেছেনÑ ‘বিশেষ একটা ঘটনাকে নির্বাচন করে সেই ঘটনার একটা তাৎপর্য নির্ধারিত পরিসরে আরোপ করতে সক্ষম হলে বাঞ্চিত ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হয়।’ পো’র এই বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই যুগের পর যুগ বিশ্বসাহিত্যকে প্রভাবিত ও আচ্ছন্ন করে এসেছে।

এডগার এ্যালান পো বিশ্বসাহিত্যের আরও একটি শাখার উদ্গাতা, সেটি হলো- ‘গোয়েন্দা গল্প’। তাঁর রচিত মাত্র তিনটি গোয়েন্দা গল্পÑ দ্য মার্ডারস ইন দ্য রু মার্গ, চোরাই চিঠি এবং মারি বোগেতের রহস্যÑ তাঁকে বিশ্বগোয়েন্দা গল্পের জনকের প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এই গল্পত্রয়ে সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র অগাস্ত দু্যঁপোই হলো আর্থার কোনান ডয়েলের গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের পূর্বসূরী। অপরাধীর নিশানা চিহ্নিতকরণে ও রহস্য উদ্ঘাটনে পো এ তিনটি গল্পে যে সূক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসা ও বৈজ্ঞানিক মননের পরিচয় দিয়েছেন, সেটি বিস্ময়কর।

বাংলা সাহিত্যে পো’র প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্যযোগ্য হয়ে ওঠে কবি জীবনানন্দ দাশসূত্রে। এডগার এ্যালান পো’র টু হেলেন ও দাই বিউটির সঙ্গে জীবনানন্দের বনলতা সেন কবিতাটির সাদৃশ্য অনেক আগেই সমালোচকদের দৃষ্টিতে এসেছে। যেমন, কবি ও প্রাবন্ধিক আবদুল মান্নান সৈয়দ একটি প্রবন্ধে তুলে ধরেছেনÑ “জীবনানন্দের কোন কোন কবিতা এ্যালান পো’র ‘স্থানকালাতীত’ সুন্দরচর্যার মতোই অতিক্রম করে যায় পৃথিবীদৃঢ় স্থানকালসীমা : ধূসর, বিজন, রহস্যময়, অদ্ভুত, অতিপ্রাকৃত জগৎ নির্মাণে উভয়ে পরস্পরের উপবর্তী।” এছাড়াও বোদলেয়ারের মধ্যস্থতার বিষয়টিও আমাদের আমলে নিতে হবে। সুতরাং আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আমেরিকান কবি, গল্পকার, সাহিত্য সমালোচক এডগার এ্যালান পো’র গভীর, নিঃশব্দ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও ঋণ অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

প্রকাশিত : ৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৬/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: