কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রো ড টু মে ল বো র্ন

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট-৯

১১তম বিশ্বকাপে অংশ নিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এখন অস্ট্রেলিয়ায়। যদিও বাংলাদেশ দল নিয়ে দর্শক-পাঠকদের মধ্যে রয়েছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশ দলে ৯ নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি হওয়ায় এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। দলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের যে কমতি রয়ে গেছে সেটা সবাই স্বীকার করবেন। এক দলনেতা মাশরাফি বা ডেপুটি সাকিব অথবা তামিম-মুশফিক-রিয়াদের ওপরই বেশি ভরসা করতে হবে। ফলে তাদের ওপর চাপটাও থাকবে একটু বেশিই। পর্দা উঠবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। প্রস্তুত আইসিসি, প্রস্তুত অংশগ্রহণকারী ১৪ দল, প্রস্তুত স্টেডিয়াম, আম্পায়ার, মাচ রেফারিসহ সবাই। দর্শকরাও উন্মুখ বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়। ইতোমধ্যে বিশ্বকাপের দল ঘোষণাও শেষ। এবারে বিশ্বকাপে খেলা হবে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে সে কথা আগেই বলা হয়েছে। অংশ নেবে ১৪টি দল সেটাও কারও অজানা নয়। অষ্টম বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা থাকছে আজকের পর্বে। লর্ডস থেকে মেলবোর্ন। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ৪০ বছর। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ৪০ বছরের পথচলা নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন ‘রোড টু মেলবোর্ন’। লিখেছেন : কথা সাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক : সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

অস্ট্রেলিয়ার হ্যাটট্রিক শিরোপা

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের অষ্টম তথা নতুন শতাব্দীর প্রথম আসর বসে ২০০৩ সালে। আর বিশ শতকের প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেল আফ্রিকা। আফ্রিকার ৩টি দেশ দ. আফ্রিকার সঙ্গে সহ-আয়োজকের দায়িত্ব পায় জিম্বাবুইয়ে ও কেনিয়া। বলা হয় দ. আফ্রিকার কিংবদন্তি ও অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার ইচ্ছের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আইসিসি আফ্রিকায় বিশ্বকাপ আয়োজনে উদ্যোগী হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা চাইছিলেন আফ্রিকা বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজন করুক। ক্রিকেটের মতো ফুটবলেও ম্যান্ডেলার ইচ্ছের প্রতি সম্মান জানিয়ে ফিফাও ২০১০ সালে দ. আফ্রিকায় বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন করে।

অষ্টম বিশ্বকাপের প্লেয়িং কন্ডিশন বা নিয়ম-কানুন মোটামুটি আগের মতোই একই রকম থাকে। এবারেও বিশ্বকাপে ৫০ ওভার করে খেলার নিয়ম বহাল থাকে। অষ্টম বিশ্বকাপে ১৪টি দল অংশগ্রহণ করে। এবারের বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বাধিক ৫৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দ. আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুইয়ে, বাংলাদেশ, কেনিয়া, নেদারল্যান্ড, কানাডা ও নমিবিয়া এবারের বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার সুযোগ পায়। দ. আফ্রিকার ১২টি, জিম্বাবুইয়ের ২টি ও কেনিয়ার ১টিসহ মোট ১৫টি স্টেডিয়ামে এ বিশ্বকাপের খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। স্টেডিয়ামগুলো হচ্ছেÑ দ. আফ্রিকা : জোহান্সবার্গ, পিটার মরিসবার্গ, পোর্ট এলিজাবেথ, সেন্সুরিয়ান, পচেফস্ট্রম, কেপ টাউন, ব্লমফন্টেইন, ডারবান, কিম্বার্লি, বেনোনি, পার্ল ও ইস্ট লন্ডন। জিম্বাবুইয়ে : হারারে ও বুলাওয়ে কেনিয়া : নাইরোবি।

সপ্তম বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ১৪টি দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়। গ্রুপ পর্বের শীর্ষ ৬টি দল সুপার সিক্সে ওঠে। সুপার সিক্সে সেরা ৪ দল সেমি-ফাইনাল ও সেমি-ফাইনাল বিজয়ী দুই দল ফাইনাল খেলে। ফাইনালে বিজয়ী দল চ্যাম্পিয়ন হয়। গ্রুপ এতে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, জিম্বাবুইয়ে, নেদারল্যান্ড ও নমিবিয়া এবং গ্রুপ বি তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দ. আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, কেনিয়া ও কানাডা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ৯ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনী ম্যাচে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ক্রিকেটের চমক স্বাগতিক দ. আফ্রিকা। যদিও এ বিশ্বকাপে দ. আফ্রিকাকে হট ফেবারিট ধরা হচ্ছিল। তবে তারা সেটা মাঠে প্রমাণ করতে পারেনি। উদ্বোধনী ম্যাচে হেরে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে। তারা উদ্বোধনী ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাত্র ৩ রানে হেরে বসে। এ বিশ্বকাপে জয় দিয়ে শুভ সূচনা করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এ জয়ের পেছনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান ব্রায়ান লারার ১১৬ রানের অনুপম ইনিংসটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর এই পরাজয় দ. আফ্রিকার জন্য সুপার সিক্সে ওফার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এ বিশ্বকাপেও খেলতে না যাওয়া বিষয়টি শিরোনামে উঠে আসে। নিউজিল্যান্ড নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে জিম্বাবুইয়েতে এবং ইংল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে যেতে অস্বীকার করায় জিম্বাবুইয়ে ও কেনিয়াকে ওয়াক ওভার দেয়া হয়। আর এই হারের কারণে নিউজিল্যান্ড টেনেটুনে সুপার সিক্সে উঠতে পারলেও ইংল্যান্ড সেটাও পারেনি।

এ বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বে আরও অনেকগুলো অঘটন ঘটে। এই অঘটনগুলোর জন্মদাতা ছিল টেস্ট ক্রিকেটের নিচের সারির দল জিম্বাবুইয়ে এবং আইসিসির সহযোগী সদস্য কেনিয়া। গ্রুপপর্বে কেনিয়া নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও কানাডাকে হারিয়ে কেনিয়া বি গ্রুপে রানার্স আপ হয়ে সুপার সিক্সে উঠে সবাইকে চমকে দেয়। অপরদিকে টেস্টের ছোট দল জিম্বাবুইয়ে ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড ও নমিবিয়াকে হারিয়ে এ গ্রুপের তৃতীয় দল হিসেবে সুপার সিক্সে উঠে জিম্বাবুইয়েও কম চমক দেখায়নি। এ বিশ্বকাপের টপ ফেবারিট দ. আফ্রিকা, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো বাঘা বাঘা দলগুলো সুপার সিক্সে উঠতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে দ. আফ্রিকার বাদ পড়াটা ছিল দুঃখজনক। ভাগ্য কোনভাবেই সহায় হচ্ছে না এ দলটির। এ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব অনেক বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকবে। নমিবিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তান রেকর্ড ৫টি এলবিডব্লু পায়। যা বিশ্বকাপ তো বটেই, ক্রিকেটেই নজিরবিহীন। বিশ্বকাপের সর্বনিম্ন ৩৬ রানের ইনিংসটিও আসে এ মাচেই। কম ওভারে (৪.৪) জয় পাওয়ার ঘটনাও ঘটে এ বিশ্বকাপে। নমিবিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার উইকেট-কিপার এডাম গিলক্রিস্ট এক ইনিংসে ৬টি ক্যাচ ধরে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। নেদারল্যান্ডের ক্লোপেনবার্গ এক ম্যাচে শতরান ও ৪ উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়েন। এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ গ্রুপপর্বে কোন ম্যাচ জিততে পারেনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে প- হওয়ায় বাংলাদেশ ১ পয়েন্ট পেলেও এ ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর কারণে ক্যারিবীয়দের সুপার সিক্সে ওফার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

অস্ট্রেলিয়া এ গ্রুপে ৬ ম্যাচের ৬টিতেই জিতে পুরো ২৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে গৌরবের সঙ্কে সুপার সিক্সে ওঠে। এ গ্রুপের অপর দল ভারত ৬ খেলায় ৫ জয়ে ২০ পয়েন্ট নিয়ে রানার্স আপ হয়। বি গ্রুপে শ্রীলঙ্কা গ্রুপের ৬ ম্যাচে ৪টিতে জিতে ও ১টি পরিত্যক্ত হওয়ায় ১৮ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ও কেনিয়া ৬ ম্যাচের ৪টিতে জিতে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্স আপ হয়। কেনিয়া ও জিম্বাবুইয়ে বড় দলগুলোকে টপকে সুপার সিক্সে উঠে সবাইকে চমকে দেয়। সুপার সিক্সে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে জিম্বাবুইয়ে বাদ পড়লেও কেনিয়ার জয়রথ থামে সেমিফাইনালে। প্রথম সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়া আবারও ভাগ্যের কৃপা পায়। বৃষ্টিবিঘিœত ম্যাচে তারা ডার্কওয়ার্থ লুইসে ৪৮ রানে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। অস্ট্রেলিয়ার ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ২১২ রান তাড়া করে জয় তুলে নিতে পারেনি শ্রীলঙ্কা। তাদের জয়ের পথে ভিলেন হয়ে দাঁড়ায় বৃষ্টি। বিজয়ী দলের এন্ডু সাইমন্ডস করেন অপরাজিত ৯১ রান।

অপর সেমিফাইনালে কেনিয়া থারতের বিপক্ষে দাঁড়াতেই পারল না। ভারতের ২৭০ রানের জবাব দিতে গিয়ে ১৭৯ রানে দম ফুরিয়ে গেল ওদুম্বে-টিকোলোদের। ভারত ম্যাচ জিতল ৯১ রানে। সৌরভ করলেন অপরাজিত ১১১ রান।

২৩ মার্চের ফাইনালে ভারত অস্ট্রেলিয়ার মোকাবেলা করে। ফাইনালে এক অন্য অস্ট্রেলিয়াকে দেখল ভারত। অস্ট্রেলিয়ার ২ উইকেটে ৩৫৯ রান তাড়া করতে হিমশিম খেয়ে গেল ভারত। ১০ ওভারেরও বেশি থাকতে দম ফুরিয়ে গেল ভারতের। ৩৯.২ ওভারে ২৩৪ রানে অলআউট হলো ভারত। হেসে খেলে ১২৫ রানের সহজ জয় পেয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া। টানা তৃতীয়বারের মতো ও হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন। এর আগে ১৯৮৭ ও ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপের শিরোপা জয় করে অসিরা। ফাইনালের স্কোর : অস্ট্রেলিয়া (৫০ ওভারে ২ উইকেটে ৩৫৯ রান) ১২৫ রানে পাকিস্তানকে (৩৯.২ ওভারে ২৩৪ রান) হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের এবং হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের স্বাদ পায়। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক রিকি পন্টিং অনবদ্য ১৪০ রানের এক অনুপম ইনিংস খেলে ‘ম্যান অব দ্য ফাইনাল’ হন। ১১ ম্যাচে ৬১.১৮ গড়ে ৬৭৩ রান করে ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ’ এবং সর্বাধিক রান সংগ্রহকারী হন ভারতের শচীন টেন্ডুলকর। এটি বিশ্বকাপে কোন ব্যাটসম্যানের সংগৃহীত সর্বাধিক রানের রেকর্ড। শ্রীলঙ্কার চামিন্দা ভাস ১০ ম্যাচে ১৪.৩৯ গড়ে ২৩টি উইকেট নেন। এটিও এক ব্বিকাপে কোন বোলারের সর্বধিক উইকেট লাভ। অষ্টম বিশ্বকাপের ভিলেন ছিল বৃষ্টি। বৃষ্টির কারণে অনেক সুন্দর খেলার অপমৃত্যু ঘটে। অনেক দল ন্যায্য বিজয় থেকে বঞ্চিত হয়। এ বিশ্বকাপের চমক ছিল অবশ্যই কেনিয়া। তাদের সুন্দর খেলা দর্শক অনেকদিন মনে রাখবে। তবে বাংলাদেশের হতাশাব্যঞ্জক পারফর্মেন্স সবাইকে হতাশ করেছে। বাংলাদেশ কেবলমাত্র যে জিততে পারেনি তা নয়। তারা শ্রীলঙ্কা ও দ. আফ্রিকার বিপক্ষে ১০ উইকেটের লজ্জাজনক ব্যবধানে পরপর দুইবার হেরেছে। নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরেছে ৯ উইকেটে। কেনিয়া ও কানাডার কাছেও হেরেছে। বাংলাদেশের এই পারফর্মেন্স কেউ মেনে নিতে পারেনি।

চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া দলের নেতৃত্ব দেন রিকি পন্টিং এবং রানার্স আপ ভারতের দলের সৌরভ গাঙ্গুলি। অষ্টম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্টিভ বাকনার এবং ইংল্যান্ডের ডেভিড শেফার্ড। অষ্টম বিশ্বকাপে যে যোগ্য দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়া কাপ জয় করেছিল এ কথা অনেকেই মানবেন। তারপরও এ বিশ্বকাপে সেরা দল ছিল দ. আফ্রিকা বা পাকিস্তান উঠে আসলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না।

(চলবে) e-mail :syedmayharulparvey@gmail.com

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৪/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: