আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এগিয়ে যাচ্ছে প্লাস্টিক শিল্প

প্রকাশিত : ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
এগিয়ে যাচ্ছে প্লাস্টিক শিল্প
  • এস এম মুকুল

প্লাস্টিক শিল্প এখন একটি সম্ভাবনার নাম। সাশ্রয়ী, সহজ ব্যবহারযোগ্য, কম ঝুঁকি, ডিজাইন, টেকসই, দৃষ্টি নান্দনিকতার কারণে আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গী হয়ে বিশ্বে প্লাস্টিক সামগ্রী বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এ খাতে বার্ষিক টার্নওভার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। সরকার প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করছে প্লাস্টিক শিল্প খাত থেকে। বলা হচ্ছে কয়েকটি সমস্যার সমাধান হলে এ শিল্প আগামী এক দশকে দ্বিতীয় একক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। পর্যাপ্ত সরকারী সহযোগিতা ও অবকাঠামোগত সুবিধা পেলে তৈরি পোশাক শিল্প খাতের পরই প্লাস্টিক শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় বৃহত্তম রফতানিখাত হিসেবে গড়ে ওঠার অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

যেখান থেকে শুরু

এ শিল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সাল থেকে প্লাস্টিক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছে। এ শিল্পের প্রায় ৯৯ শতাংশই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থিত। এরমধ্যে প্লাস্টিক কারখানার ৮০ ভাগই পুরনো ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। দেশে বর্তমানে ক্ষুদ্র-মাঝারিসহ ৫০০০ প্লাস্টিক কারখানার ৮০ ভাগই পুরনো ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। বাংলাদেশে বেশ কিছু কর্পোরেট হাউস যেমন আর এফ এল, বেঙ্গল, গাজী, বিআরবি, বসুন্ধরা, ন্যাশনাল প্রভৃতি কোম্পানিসহ অসংখ্য ছোটখাটো প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেশের আনাচে কানাচে এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান এ শিল্পের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলছে।

দেশীয় চাহিদা-দেশের বাজার : এক তথ্যে দেখা যায়, প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শতকরা ৬৫ ভাগই ঢাকায় অবস্থিত। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২০ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জে ১০ শতাংশ ও বাকিগুলো খুলনা, কুমিল্লা, বগুড়া ও রাজশাহীতে অবস্থিত। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক এ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) তথ্য উপাত্তে, বর্তমানে দেশে পাঁচ হাজার ৫২টি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৫০০টি ছোট, মাঝারি এক হাজার ৫০০টি ও বড় মাপের ৫২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্লাস্টিক সামগ্রীর দেশীয় বাজার ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণভাবে বর্তমানে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে। এ শিল্পের পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে।

রফতানি বাজারের হাতছানি

প্লাস্টিক পণ্য রফতানি দেশের অর্থনীতি এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। প্লাস্টিক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। পোশাক ও খাদ্যপণ্যের পরেই এ শিল্পের অবস্থান। বিশ্বের ২৩টি দেশে প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, কানাডা ও মালয়েশিয়ায়। এর বাইরে সার্কভুক্ত দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হয়। বর্তমানে বছরে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হচ্ছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে রফতানির পরিমাণ বিলিয়নের পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক এ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) মতে, প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি রফতানিতে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার প্লাস্টিক রফতানি হয়। গার্মেন্টস এক্সেসরিজ হিসেবে হ্যাঙ্গার, বোতাম, পলিব্যাগ, ফিল্ম ব্যাগ, ক্লিপ ইত্যাদি প্রধানত আমেরিকা, কানাডা ও রাশিয়ায় বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার ওপর প্লাস্টিকপণ্য রফতানি হচ্ছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ওপর প্লাস্টিকের খেলনা, ফার্নিচার, ক্রোকারিজসামগ্রী সরাসরি রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৭৫ শতাংশ প্লাস্টিক পণ্য অন্যান্য পণ্যের সহজাত পণ্য হিসেবে রফতানি হচ্ছে। ২০১৩ সালে সামগ্রিক রফতানি ৩৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও সরাসরি রফতানি হয়েছে ৮৫ মিলিয়ন ডলার। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পণ্য বহুমুখীকরণসহ সরকার বিভিন্ন ধরনের নীতিসহায়তা দিলে প্লাস্টিক পণ্যের রফতানি আয় ২০২১ সালের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে। এসব দেশে প্লাস্টিক রফতানির দিকে বেশি নজর দিলে এ শিল্পের সম্ভাবনা আরও অনেকগুণ বেড়ে যাবে।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ

প্লাস্টিক শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ। শিল্পটি শ্রমঘন হওয়ায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যবহারের ক্ষেত্র বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যোগ হচ্ছে উৎপাদনের নতুন নতুন মাত্রা। ফলে বাড়ছে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। এ শিল্পের উৎপাদন, রফতানি প্রক্রিয়া, বিপণন ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখাত থেকে প্রতিবছর সরকারের রাজস্ব আদায় হয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে সাড়ে পাঁচ হাজার প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১২ লাখ মানুষের। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখের বেশি জনশক্তি এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এ শিল্পে দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। শিল্প যত বিকাশ হবে তত আমাদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ফলে দেশের বিপুল বেকার সমস্যার সমাধান হবে।

প্রয়োজন শ্রমবান্ধব পরিবেশ

ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) এর নির্দেশনা মতে প্লাস্টিক শিল্প শ্রমঘন শিল্প। সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। অন্যথায় পোশাক শিল্পে দুর্ঘটনাজনিত ও পরিবেশ অবকাঠামোগত আমরা যে ধরনের বিধি নিষেধের সম্মুখীন হচ্ছি এ শিল্পের ক্ষেত্রেও তা হতে পারে।

দৃষ্টির আড়ালে সম্ভাবনার ক্ষেত্র

ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের পানির বোতল, কোমল পানীয়র বোতল, ওষুধের কৌটাসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক সামগ্রী এখন টোকাইদের নিকট আয় রোজগারের প্রধান অবলম্বন। বাংলাদেশ প্রতিবছর পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সামগ্রী রফতানি করে আয় করছে কোটি কোটি টাকা। দি ইকোনমিক এ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া এ্যান্ড প্যাসিফিকের (এসক্যাপ) প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরি নয়, রি-সাইক্লিংয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে প্লাস্টিক বর্জ্য বিদেশে রফতানি করে আয় হয়েছে ৪ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে প্লাস্টিক বর্জ্য রফতানির পরিমাণ ছিল ৩ কোটি মার্কিন ডলার। বাতিল সামগ্রী ব্যবহারের পর নির্দষ্ট স্থান থেকে এনে রফতানি করতে পারলে এ খাতের আয় বছরে ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বর্তমানে প্রতিদিন ১৩০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং এর ৭০ শতাংশ (প্রায় ৯০ টন) রিসাইকেল হয়ে নতুন পণ্য হিসেবে বাজারে ফিরে আসছে। রিসাইক্লিংয়ের ফলে বর্তমানে প্রতিবছর ডিসিসি এলাকায় ০.৫ কোটি ১০ লাখ ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে প্লাস্টিক আমদানি হ্রাস পাওয়া ছাড়াও মহানগরীতে ৩০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।

প্লাস্টিক শিল্প ইনস্টিটিউট

ঢাকার পার্শ্ববর্তী আমিনবাজার, মাতুয়াইল ও কেরানীগঞ্জে দু’টি অটোমোবাইল এবং একটি প্লাস্টিক শিল্পনগরী গড়ে উঠছে। দেশে প্রথমবারের মতো বেসরকারী উদ্যোগে চালু হয়েছে প্লাস্টিক শিল্প ইনস্টিটিউট- বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি)। এ খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ার লক্ষে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য সামগ্রী প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) উদ্যোগে উদ্বোধন হলো প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।

প্রয়োজন সরকারের প্রণোদনা

বাংলাদেশে প্লাস্টিক রফতানি একটি বড় শিল্প খাত হয়ে উঠেছে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অবরোধে অন্যান্য খাতের মতো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে প্লাস্টিক খাত। অবরোধ হরতালে দৈনিক ১২ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। উৎপাদন কম হচ্ছে। ভাবনার বিষয় হলো- এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত সংযোগ শিল্পের উন্নতি না হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা কমছে না। ছোট কারখানাগুলো বিদেশী বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত হতে পারছে না। বিশ্ববাজারে অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অকাঠামো খাতের সমস্যা, কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা, দক্ষ জনশক্তির অভাব, প্লাস্টিক পল্লী ও ইনস্টিটিউট না থাকার কারণে প্লাস্টিক শিল্পের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব হচ্ছে না। অভিজ্ঞ মহলের মতে, এ শিল্পের বিকাশে খাতভিত্তিক নীতিসহায়তা, প্রযুক্তির উন্নতি, স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি ও সার্বিক সহায়তা পেলে প্লাস্টিক খাত থেকে ১০০০ কোটি টাকার ওপর আয় করা সম্ভব।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক

inbox mukul2015gmail.com

প্রকাশিত : ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: