আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভারতীয় সিনেমার বাণিজ্যিক প্রদর্শন ॥ মুক্তি না ফাঁস

প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী ২০১৫
ভারতীয় সিনেমার বাণিজ্যিক প্রদর্শন ॥ মুক্তি না ফাঁস
  • ইমরান হোসেন

ভারতীয় চলচ্চিত্র বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। বিষয়টি চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যেই ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। অবশ্য এর আগেও একবার ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির চেষ্টা হয়েছিল। তবে সেবার অনুমতি না মেলায় চারটি চলচ্চিত্র বিমানবন্দর থেকেই ফিরে যায়। মূলত সালমান খান অভিনীত ‘ওয়ান্টেড’সহ কয়েকটি হিন্দী সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে হলে প্রদর্শন করা হচ্ছে। তবে এই সব পুরনো হিন্দী সিনেমা দর্শকের মধ্যে খুব একটা আশার সঞ্চার করতে পারেনি। কারণ এসব সিনেমা কয়েক বছর আগেই দর্শক স্যাটেলাইট আর ডিভিডির কল্যাণে দেখে ফেলেছে। মূলত হলো মালিকদের আগ্রহেই সরকার এই সব সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে হলে প্রদর্শনের অনুমতি দিয়েছে। হলো মালিকদের যুক্তি ভাল মানের বাংলাদেশী সিনেমার অভাবে দর্শক হলে আসছে না এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা টিকে থাকতে চাইছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট প্রায় অধিকাংশ লোক এই ভারতীয় সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে হলে প্রদর্শনের বিরুদ্ধে। কয়েকদিন আগে চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পীরা, পরিচালক এবং প্রযোজকদের সংগঠন সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রর্দশন করেছেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে যে সব সিনেমা আসছে তা সবই হিন্দী ভাষার জনপ্রিয় সিনেমা। খোদ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের টালিউডেই হিন্দী সিনেমা প্রদর্শন করলে উচ্চ হারে ট্যাক্স দিতে হয়। এটি করা হয়েছে বাংলা সিনেমাকে টিকিয়ে রাখার জন্য। ভারতের বলিউড, টালিউড , তামিল, মালায়লাম ভাষাভাষীদের নিজস্ব চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। তারা নিজ ভাষার চরচ্চিত্রের বাইরে অন্য ভাষার চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক প্রদর্শনের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে। সেখানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে ঢালাওভাবে হিন্দী সিনেমা প্রদর্শনের যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। বিশেষত ঠিক যে সময়টাতে ডিজিটাল ফরম্যাটে চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে অনেক মেধাবী তরুণ চরচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসছেন তখনই হিন্দী সিনেমা আমদানি অনেকের মধ্যেই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অভিনয় শিল্পীরা এবং পরিচালকরা রাস্তায় মানববন্ধন করেছেন এবং কিছু হলের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন, বিশ্বায়নের যুগে আমরা কেন দরজা বন্ধ করে রাখব? সকলের এটি মনে রাখা দরকার চলচ্চিত্র মাধ্যমটি একটি জাতি গঠনের মূল ভূমিকা পালন করে।

নায়ক ফেরদৌস ভারতীয় চলচ্চিত্রের বানিজ্যিক প্রদর্শনের ব্যাপারে জানান, ‘ভারতীয় সিনেমা আনতে দেব না, আর ঘরে বসে ভারতীয় চ্যানেল দেখব সারাদিন। এমন দ্বৈত নীতিতে বিশ্বাসী নই আমি। আমি মুক্তবাজারে বিশ্বাসী। ভারতীয় সিনেমাগুলো আমাদের সিনেমা হলে প্রদর্শিত হলে হল মালিকরা বাধ্য হয়েই আধুনিকায়ন করবে। প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে একই সঙ্গে আমাদের চলচ্চিত্রগুলোও ভারতের হলে প্রদর্শনের উদ্যোগ নিতে হবে।’

ভারতীয় সিনেমা আমাদের হলগুলোতে চলতে পারে তবে সে ক্ষেত্রে ভারতকেও আমাদের সিনেমা তাদের দেশে সমসংখ্যক হলে চালাতে হবে। সমস্যা আরও রয়েছে। বাংলাদেশে বসে দর্শক চাইলেই স্যাটেলাইটের কল্যাণে কলকাতার তথা হিন্দিভাষী চ্যানেলগুলো দেখতে পারে। কিন্তু খোদ কলকাতাতেই বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো দেখানোর ব্যাপারে একটি অলিখিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাংলাদেশের দর্শক ভারতের সিনেমার বিজ্ঞাপন দেখে এবং সেখানকার নায়ক-নায়িকাদের চেনে। স্বভাবতই তারা ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলোর ট্রেলার এবং প্রমো টিভিতেই দেখে ফেলে। দর্শকদের এসব সিনেমা দেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু কলকাতার টিভি দর্শকদের সেই সুযোগ নেই। সেখানে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখার সুযোগ নেই। ফলে এই অসম ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি থেকে ভারতই লাভবান হবে। বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সুযোগই নেই। অন্যদিকে ভারতীয় সিনেমার বাজেট থাকে গড়পড়তা দশ কোটি টাকা। সেখানে আমাদের সিনেমার বাজেট গড়পড়তা এক অথবা দুই কোটি টাকা। এখানে স্পষ্টতই দর্শক ভারতীয় সিনেমাই দেখতে চাইবে। হল মালিকরা তাদের ব্যবসার কথা মাথায় রেখে ভারতীয় সিনেমা চালাতে চাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা কি জানেন এটি আসলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য ঠিক কী ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে? সেটি তাঁরা মাথায় নেননি বলেই আমি ধরে নিচ্ছি। সেটা তাঁদের নেয়ারও কথা নয়। কারণ তাঁরা বোঝেন ব্যবসা। যেখানে তাঁরা আমাদের চ্যানেলকে তাঁদের দেশে দেখানোর সুযোগই দিচ্ছে না সেখানে আমরা তাঁদের সিনেমা আনতে এতো আগ্রহী কেন? এ হল মালিকদের স্বার্থেই এবং চাপে আমাদের দেশে কাটপিস সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। অনেক সময় হল মালিকরা নিজ থেকে কাটপিস জুড়ে দিয়ে সিনেমা প্রদর্শন করত। সেই সময়ে চলচ্চিত্রের বেহাল দশার পেছনে তাদের অবদানও বড় কম নয়। সিনেমা তথা সংস্কৃতির নানা মাধ্যম থেকে মানুষ আসলে প্রভাবিত হয়। হিন্দি সিরিয়ালের পাখি ড্রেস না পাওয়ার কারণে বাংলাদেশে কিশোরীর আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। পাঠক, ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানিকে সাদা চোখে বিশ্লেষণের সুযোগ নেই। প্রথমে ভারতীয় সিনেমা আসবে। এরপর তাদের পণ্যের প্রসার ঘটবে। এতে করে আমাদের নিজস্ব পণ্যের বাজার মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। আমাদের সিনেমা দুর্বল। মৌলিক গল্প নেই, সেই দৈন্যতাও স্বীকার করে নেই। সে ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হচ্ছে কিভাবে নিজেদের সিনেমার মান উন্নয়ন করা যায়। তা না করে আমরা হাঁটছি উল্টো পথে। ভারতীয় সিনেমা এলে বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভাল সিনেমা নির্মাণ হবে এটা যাঁরা ভাবছেন তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। ভাল সিনেমা তৈরি বানাতে হলে অর্থ লাগে, মেধা লাগে আর সেসঙ্গে লাগে প্রদর্শনের জায়গা। আমাদের সেই সুযোগ আছে? দিন দিন বন্ধ হচ্ছে হল। সেখানে সরকার সিনেমার জন্য মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণের কথা ভাবতে পারে। বড় বড় শপিংমলে এটা হতে পারে। বাংলাদেশের সুদীর্ঘ কালের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই রকম দৈন্যতা আর কখনও প্রকাশ পায়নি। কখনওই ব্যবসা চালানোর জন্য ভারতীয় সিনেমা আমদানি করতে হয়নি। বিনিময় হয় সমানে সমানে। যতদিন পর্যন্ত সমান সমান না হয় ততদিন পর্যন্ত দুর্বল পক্ষকে ইকুইটি দিতে হয়। মানে একটু বেশি সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উল্টোটা।

আমাদের দেশে চলচ্চিত্র যে নির্মাতারা অন্তরের তাগিদ থেকে নির্মাণ করছেন সেটিই বড় কথা। আমাদের দেশে পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম ইন্সটিউটই পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি স্বাধীনতার চার দশকে। তাহলে আমাদের দেশে ভাল সিনেমা হবে কিভাবে? ভারতে বিশ্বমানের চলচ্চিত্র ইন্সটিউট রয়েছে। সেখানে এ বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। তবে বর্তমান সরকার চলচ্চিত্রের উন্নয়নে আন্তরিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের প্রথম টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়নের বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সরকারী ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও নির্মাণের ধারায়। আশার আলো আছে। আমাদের দরকার কিছুটা সময়। ঠিক এই মুহূর্তে ঢালাওভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঅমদানি আমাদের জন্য কোন ভাল ফল বয়ে আনবে না বলেই আমার বিশ্বাস। তবে সীমিত পর্যায়ে সারা পৃথিবীর নানা ভাষার সিনেমা দেশের কিছু হলে প্রদর্শন করা যেতে পারে।

প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী ২০১৫

২৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: