রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রতিভার দ্রোহ আর প্রেম

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫
  • জয়দেব চক্রবর্তী

‘মধ্যরাতে বেয়নেটবিদ্ধ বিপন্ন মানবতার বিশাল ক্রন্দনে’ যে ব্যক্তি-মানুষের ঘুম ভেঙে যায়, স্বপ্ন ভেঙে যায়, বিশ্বাস ভেঙে যায়Ñ সে ব্যক্তিমানসে অবধারিতভাবে অঙ্কুরিত হবে দ্রোহের বীজ। মধ্যরাতের এই ক্রন্দন ইতিহাসের এ এক নির্মম সত্য। সেই সত্য যে কঠিন এবং সেই কঠিন সত্যের ভার বহন করা যে আরও দুরূহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু অকস্মাৎ কেন কেঁদে উঠলো মধ্যরাত? এই প্রহরে কোন বাঁকের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল জীবন? তার গভীরে আর কী লুকিয়ে ছিল? যে ব্যক্তিমানস এই কঠিন সত্যের ভার থেকে মুক্তি পেতে দ্রোহের দিকে ছুটে যাচ্ছিল অবিরামÑ সেই পথ তাকে কী দিচ্ছিল? প্রণোদনা, হতাশা? শব্দরা কি কোলাহল করছিল খুব? চারপাশে নেমে এসেছিল অন্ধত্ব? নিঃশ্বাসের শব্দও কি নিষিদ্ধ হচ্ছিল? মিনার মনসুরের কবিতা পড়তে এই নির্মম ইতিহাসের প্রেক্ষাপট জানা খুবই জরুরি।

১৯৭৫ থেকে ২০১৩, প্রায় তিন যুগ ধরে দ্রোহে ও প্রেমে মাতোয়ারা এক কবির প্রতিটি চলাচলের পথ, স্মরণচিহ্ন বুঝতে এই দীর্ঘ সময়-সরণির শুরুর দিনগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতেই হবে। জননায়কের হত্যা, বাঙালীর আত্মপরিচয়ের সংকট, দু-দুটি সামরিক অভ্যুত্থান, অনেক ধর্মীয় উš§াদনা, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করতে রাষ্ট্রীয় অনাচার, দুর্ভিক্ষ এবং স্বাধীনতার মূল আদর্শকে বাস্তবায়িত হতে না দেয়ার মধ্যে ‘অদ্ভুত উটের পিঠে চলছিলো স্বদেশ।’ এই অন্ধ আবহেই মিনারের বেড়ে ওঠা। ফলে এক যুদ্ধ শেষ হবার অনতিকাল পরেই মিনারের মনেও জেগে উঠল, ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’Ñ এর রণডংকা।

এই সময় বাংলাদেশের কোন সৎ, প্রগতিশীল এবং মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির স্বাধিকার রক্ষার প্রশ্নে অগ্রগামী যুবকের সাধ্য ছিল না কবিতা ও সংগ্রামী লড়াইকে পৃথক করে রাখার। মিনারও পৃথক করতে চায়নি, তাই ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানলে পড়ে। কিন্তু ঘাতকের হাতে নিহত জননায়কের শোকে যে আক্রান্ত, প্রেমকে দ্রোহের রূপ দিয়ে আর দ্রোহকে আকুল প্রেমে জড়িয়ে যে তার কাব্যভুবন নির্মাণ এবং শোককে শক্তিতে পরিণত করে যে কাব্যভ্রমণ চালাবে বলে স্থির করে নিয়েছে পূর্বাহ্নেই, তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা প্রকৃত অর্থে চ্যালেঞ্জের। আর এই অতিক্রমণের পথেই মিনার শব্দ, ছন্দ, ছন্দহীনতা, বাক্য, উপমা, স্ফুর্তি সবকিছুকে চালনা করতে থাকেন। লেখা হতে থাকে একের পর এক কাব্যগ্রন্থ। চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করে বাংলা কবিতার মূল অঙ্গন ঢাকায় চলে আসেন। ব্যাপ্ত হয় পরিসর। রচনায় সম্পৃক্ত হতে থাকে প্রগাঢ় রাজনৈতিক বোধ, আন্তর্জাতিকতা। সুদূর ইথাকার সঙ্গে বাংলাদেশের সাযুজ্য খুঁজে পায় তাঁর কবিতা।

‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’, ‘অনন্তের দিনরাত্রি’, ‘অবিনশ্বর মানুষ’, ‘আমার আকাশ’, ‘জলের অতিথি’, ‘মা এখন থেমে যাওয়া নদী’ এবং ‘শবিতাসংগ্রহ’ থেকে বিষয় অনুযায়ী দ্রোহ ও প্রেমের কবিতা বেছে নিয়ে দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছে এ্যাডর্ন পাবলিকেশন এবং আগামী প্রকাশনী। এরকম দুটি কাব্যগ্রন্থের স্বরূপ ও বাস্তবতা বোঝাতে গিয়ে মিনার দুই বইয়ের ভূমিকাতে দুটি অনুপম গদ্য লিখেছেন। কবিতা সম্পর্কে আগাগোড়াই তার মতÑ ‘নিজের মধ্যে কয়েকটি মহাবিশ্বের অজানা রহস্যকে ধারণ করতে পারে কবিতা। বস্তুত কবিতার লাগাম বলে যদি কিছু থাকে তার নিয়ন্ত্রণ সময়ের হাতে। এমনকি শেষ পর্যন্ত সময়কেও ছুড়ে ফেলে কবিতার বুনো ঘোড়া ক্ষিপ্রবেগে ছুটে যেতে পারে তার নিজস্ব পথে।’ আবার আরেক জায়গায় লিখছেনÑ ‘মজ্জাগতভাবে আমি সহজতার সাধক। আবহমান কাল ধরে বাংলার হƒদয় থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে সুরটি ধ্বনিত হয়ে চলেছেÑ নিত্য-অনিত্যের যুগলবন্দী যার সহজাত এবং চর্যাপদ, বৈষ্ণবকাব্য এবং পুঁথিসাহিত্য হয়ে হাছন-লালনের হাত ধরে আজও যা অভিভূত করে রেখেছে জনচিত্তকেÑ আমার হƒদয়ের স্পষ্ট পক্ষপাত সেদিকেই।’ অর্থাৎ মিনারের কাব্যপ্রয়াসে খণ্ড কোন ধারণার অবকাশ নেই। তার চিত্তে চাঞ্চল্যমান মহাকবিতার ধারা। ফলে দুটি গ্রন্থই আসলে একক যাত্রায় শামিল।

এরকম সুদৃশ্য দুটি গ্রন্থ সৈয়দ ইকবাল ও ঢালী আল মামুনের মতো দু’জন বিশিষ্ট শিল্পীর প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে পাঠকের কাছে অসামান্য আলোকস্বরূপ হয়ে ধরা দেয়। তাছাড়া বিষয়ীভূত হয়ে দুই গ্রন্থই যেন মিনারকে দুদিক থেকে একদিকে ফেরার দিক নির্দেশিত করে। ‘মধ্যাহ্নের কাক’, ‘অন্তর্যাত্রা’র সংখ্যাসূচিত ১৪ কবিতাক্রম জীবনভাষ্যের এক অনুপম উপলব্ধি, যা সমস্ত কবিতা পাঠকের কাছে এক চূড়ান্ত নজির। এই কবির মননই যেহেতু প্রধান, তাই তাঁকে সম্পূর্ণ পাঠ করে, নিজস্ব অনুভূতিমালার সঙ্গে মিনারের কাব্যবৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করার সর্বতো খেলাতেই কবিতা পাঠকের আসল মজা। একককে খণ্ড করলে যে অপচয়ের সম্ভাবনা থাকেÑ এসব কাব্যগ্রন্থেও তার কিছু আভাস রয়েছে। মিনার নিজেও অকপটে তা স্বীকার করেছেন। খণ্ডমুখীনতা কখনও একঘেয়ে ঠেকে। বিশেষত ‘দ্রোহের কবিতা’য় পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বিস্তর। প্রেমকে যেহেতু ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষায় পর্যবসিত করেননি, তাই এ গ্রন্থের ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি কম, কিন্তু সারল্য কষনও কখনও তরলতার মাত্রা স্পর্শ করেছে। সৌন্দর্য দর্শনের ক্ষেত্রে এ এক ঘাটতি বই কী।

দুটি বইয়েই কিছু অগ্রন্থিত এবং সদ্য লেখা কবিতা সঙ্কলিত হয়েছে। শেষ লেখার তারিখ ১৫ জুলাই ২০১৩। ছন্দ নিয়ে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সম্প্রতি লেখা কবিতায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি এক বাঁক বদলের ইশারা। অনেক অন্ধকাল পেরিয়ে এসে বিগত সময়কে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা এসব লেখালেখিতে পরিস্ফুট। এই বাঁক বদল তার আগামী কাব্যপ্রয়াসে ‘বেহতর’ হবে কিনা তা আগামী সময়ই বলবে। কিন্তু যাত্রাপথের আনন্দগান তাকে দিয়ে যে আরেক নব নির্মাণের সূচনা করবেÑ সে ভরসা করাই যায়।

লড়ুফবাথপযধশৎড়নড়ৎঃু@ুধযড়ড়.পড়স

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫

২৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: