মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মধুর হাটে যাওয়া

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫
  • সুজন বড়ুয়া

মধুদের গ্রামে আজ হাটের দিন। বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে হাট। হাটের নাম বিবিরহাট। এলাকার সবচেয়ে বড় হাট এটি। এ হাটে সব জিনিস পাওয়া যায়।

কিন্তু মধু কোনদিন হাটে যায়নি। বাবার সঙ্গে কতবার হাটে যেতে চেয়েছে। বাবা একবারও নেয়নি।

মধু এবার ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছে। তার স্কুলড্রেস বানাতে হবে। তাই বাবার সঙ্গে হাটে যাচ্ছে আজ। আনন্দে যেন তার হাওয়ায় উড়তে ইচ্ছে করছে।

যাওয়ার পথে উঠোনে বেরিয়ে পোষা কুকুরটার সঙ্গে দেখা। তার গায়ে আলতো হাত বুলিয়ে মধু বলে,

জান, আমি হাটে যাচ্ছি। তোমার জন্য কী আনব বল।

কুকুরটা কী বুঝল কে জানে! মধুর পায়ে মুখটা ঘষে সামনে এগিয়ে দাঁড়াল। যেন শুভ কামনা জানিয়ে বলছে,

আমার জন্য কিচ্ছু আনতে হবে না। তুমি ভালয় ভালয় ফিরে এসো।

বাবার হাত ধরে হাটে ঢুকে মধু অবাক। এত লোক! ভিড় ঠেলে সামনে এগোবার জো নেই। বাবা কোনমতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মধুকে।

অনেক দূর এগিয়ে একটি ছোট্ট দোকানে ঢোকে বাবা। দোকানে আধ বয়সী এক লোক সেলাই মেশিনে বসে কাজ করছে। তার পাশে একটি লম্বা টুল রাখা। বাবা আধ বয়সী লোকটিকে দেখিয়ে বলে, ইনি তোমার দর্জিচাচা। তোমার ড্রেস ইনিই সেলাই করবেন। তুমি এখানে বস। আমি কাপড় কিনে নিয়ে আসি। কোথাও যেও না কিন্তু।

মধু লম্বা টুলটায় বসে পড়ে। বাবা কাপড় কিনতে চলে যায়। দর্জিচাচা সেলাই কাজ করছে। দোকানে আর কেউ নেই। বাইরে রাস্তায় লোকজন গিজগিজ। সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। দোকানের সামনের রাস্তায় কাঁচাবাজারের হাট বসেছে। একটু দূরে গরু-ছাগলের হাট।

মধু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে আর অবাক হচ্ছে। কত বড় হাট! কত মানুষ! হঠাৎ দর্জিচাচা সেলাই মেশিন থেকে উঠে দাঁড়ায়। বলে, কাকা, তুমি বসো। আমি একটু বাজার করে আনি। তোমার বাবা কাপড় নিয়ে এলে আমি তোমার মাপ নেব। বাবাকে একটু অপেক্ষা করতে বল। কেমন?

বলতে বলতে দর্জিচাচা বেরিয়ে গেল।

দোকানে এখন আর কেউ নেই। মধু একা। এত লোকের মধ্যে মধু কাউকে চেনে না। বাবা কাপড় কিনতে গেছে সেই কবে! ফিরে আসার নাম নেই। বাবা কি হারিয়ে গেল? তাহলে বাড়ি ফিরব কী করে?

মধুর কেমন যেন ভয় ভয় লাগতে থাকে। ভয়মাখা চোখে সে ইতিউতি তাকায়। বাবা কেন আসছে না। বাবার কী হলো? বাবা তুমি কোথায়?

হঠাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে মধু। জলে দুচোখ ভেসে যায় তার। ‘উ-উ আমার বাবা, আমার বাবা’Ñ বলে কাঁদতে থাকে হাউমাউ করে।

মধুর কান্নার শব্দ শুনে দুটো লোক দাঁড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। তারা মধুর কাছে আসে। আদর করে বলে, কী হয়েছে খোকা? তুমি কাঁদছ কেন?

মধু বলে, আমার বাবা হারিয়ে গেছে। বাবাকে পাচ্ছি না।

লোক দুটো অবাক। একজন আরেক জনের দিকে তাকায়। ছেলে বলে কী! একজন একটু মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলে, আচ্ছা খোকা, ঠিক করে বলো তো, তুমি হারিয়ে গেছ, না তোমার বাবা হারিয়ে গেছে?

মধু ঝটপট উত্তর দেয়, না, আমি হারাব কেন? আমি তো এখানেই আছি। বাবা সেই কতক্ষণ আগে গেল, এখনও ফিরছে না, হারিয়ে না গেলে তো ফিরে আসত।

লোকটা এবার আমুদে সুরে বলে, তাইতো। তোমার বাবা মনে হয় পথ হারিয়ে ফেলেছে। তাই আসতে পারছে না। মধু এবার আরো জোরে কেঁদে ওঠে।

উ-উ আমার বাবা হারিয়ে গেছে, আমি বাবাকে কীভাবে পাব? উ-উ...

ততক্ষণে ওখানে বেশ লোক জমে গেছে। ভিড়ের মধ্যে একজন বলে, তোমার বাবা দিনের বেলা ভালো দেখতে পায় তো? চশমা পরে?

মধু বুদ্ধিমান ছেলে। সে এবার মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, আমার বাবা চশমা পরবে কেন? চশমা ছাড়াই ভাল দেখতে পায়। আমার বাবা বুড়ো না।

সবাই যেন মজা পেয়ে গেল ভীষণ। মধুকে নিয়ে ভিড়ের লোকরা মেতে উঠল হাসি-তামাশায়। একজন বলে, তোমার বাবার মাথায় টাক? চুল আছে?

মধু বলে, আমার বাবার মাথা ভরা চুল, একটাও পাকেনি, সব কালো চুল।

ভিড়ের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল আবার। এবার একজন বলে, ভাই, কেউ একজন ওকে কাঁধে নেন, রাস্তায় নামেন, হাটের মধ্যে না ঘুরলে ও ওর বাবাকে খুঁজে পাবে না। এভাবে হাসি-তামাশা চলতে থাকে। ভিড়ের মজা আর থামে না। একেক জন একেক কথা বলে আর সবাই হাসতে থাকে। ওদিকে মধুর কান্নাও থামে না। মধু একটানা কেঁদেই চলেছে।

এমন সময় ভিড় ঠেলে উঁকি দেয় মধুর বাবা। কী হয়েছে, কী? বাবাকে পেয়ে কান্না থামায় মধু। দু’হাতে চোখ মুছতে থাকে সে। ভিড়ের মধ্যে একজন বলে ওঠে, ভাই আপনি নাকি হারিয়ে গেছেন, ছেলে তো কেঁদে কেঁদে সারা।

বাবা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে মধুকে। বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আরে কাঁদে না, কাঁদে না। তোমাকে আমি বলে গেলাম না, তোমার ড্রেসের কাপড় কিনতে যাচ্ছি। এই যে দেখো, তোমার ড্রেসের কাপড়। সুন্দর না!

মধু কোন কথা বলে না। সে চোখ মুছতে মুছতে পিটপিট করে তাকায়। এরই মধ্যে দর্জিচাচা ফিরে এসেছে। এসেই মধুর ড্রেসের মাপ লিখে নিল।

দর্জিচাচার দোকান থেকে বেরিয়ে বাবা মধুকে তিলের টফি কিনে দিল এক প্যাকেট। এ দোকান ও দোকান ঘুরে কেনাকাটা করে কিছু। তারপর ফিরে আসে বাড়িতে।

দু’দিন পরের কথা। আজ বৃহস্পতিবার। আজও হাটের দিন। আজ মধুর ড্রেস সেলাই করে দেবার কথা। বাবা হাটে যাওয়ার জন্য তৈরি। মধুকে ডেকে বলে, কই, বাবা এসো। আজ তোমার ড্রেস দেবে। ড্রেস আনতে যাবে না? চলো হাটে যাই।

মধুর আজ সেদিকে কোন আগ্রহই নেই। সে কেমন উদাস হয়ে বলে, না, তোমার সঙ্গে আর হাটে যাব না। হাটে গেলে তুমি হারিয়ে যাও।

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫

১৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: