মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বগালেকের গল্প

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • গৌরব জি পাথাং

বছর দুই আগে ফাদার বিকাশ, সিস্টার শিল্পী, রোজ ও শিশুদের নিয়ে গেলাম বগালেকে। বান্দরবানের রুমা উপজেলার অনতিদূরে নাইতং মৌজার পলিতাই পর্বত শ্রেণীর এক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত বগালেক। সেখানে যাওয়ার জন্য আমরা কয়েকজন চান্দের গাড়িতে উঠেছি। রাস্তা ধুলোবালিতে পূর্ণ। এতে আমরা সবাই যেন ফর্সা হয়ে উঠলাম। কালো শার্ট সাদা হয়ে গেল। গাড়ি পাহাড়ে উঠতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেল। ধুলার কারণে গাড়ি আর উঠতে পারল না। ভয়ে আমরা মূহ্যমান। একজন তো ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে লাফ দিল। না, কারো কিছু হয়নি। ব্রেক কষে ধীরে ধীরে পেছনে এসে আবার উঠতে শুরু করল গাড়ি। এবার একেবারে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাতাশ’শ ফুট উপরে উঠে গেলাম।

বগালেকের আয়তন পনের একর। এর গভীরতা আটত্রিশ মিটার। বগালেক কোন জল উৎস ধারার সঙ্গে সংযক্ত নয় এবং জল প্রবাহের কোন ব্যবস্থাও নেই। লেকের চারপাশে সবুজ পাহাড় পাহারা দিয়ে রেখেছে। স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস, এখানে ড্রাগন দেবতা বা জলদানব ছিল। এই জল দানব প্রতিদিন মানুষ ধরে ধরে খেত। সেই স্থানে ছিল ম্রো জাতি। একদিন এক বুড়ি তার শিশুকে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে দেখা পায় বিশাল গর্তের। সে ভাবল এ গর্তে কোন অজানা দানব লুকিয়ে আছে। গ্রামবাসী সকলে মিলে তা মারার জন্য প্রস্তুত হয়। এক বিশাল বড়শিতে শুকর গেঁথে সেই দানব মারার চেষ্টা করে। জলদানব বড়শিতে ধরা পড়লেও, মাথা ছাড়া আর কোন অংশই ধরে রাখতে পারেনি তারা। এই মাথার মাংস নিয়ে সবাই ভাগ করে খায় কিন্তু ওই বুড়ি বড়শি বানাতে টাকা দিতে পারেনি বলে মাংসের ভাগ পায়নি। রাতে সেই বুড়ি স্বপ্নে আদেশ পায় যেন স্থান ত্যাগ করে চলে যায়। পরে যারা যারা মাংস খেয়েছে সবাই মারা পড়ে। বিকট শব্দে পাহাড় ধসে পড়ে আর বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। আজ তা লেকে রূপান্তরিত হয়েছে।

আরেকটি লোককাহিনীও শোনা যায়। এক রাজার একমাত্র মেয়ে খুব অল্প বয়সেই মারা যায়। মেয়ের মৃত্যুতে রাজা ঘোষণা দেন যে তাকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবেন তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন এবং অর্ধেক সম্পত্তি দেবেন। সেই সময় খুয়াইতাহামত নামক এক কবিরাজ এগিয়ে আসেন। এক লোক রাজার মৃত মেয়েকে বাঁচিয়ে তুলেন। রাজার কথা অনুযায়ী তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন। কয়েকদিন পর মেয়েটির পুরনো প্রেমিক চলে আসে। গোপনে মেয়েটি তার সঙ্গে প্রেম করতে থাকে। তারা দুজনে স্বামী খুয়াইতাহামতকে হত্যা করার পরিকল্পনা করতে থাকে। এ উদ্দেশ্যে মেয়েটি বুনো শুয়োরের কলিজা খাবে বলে দাবি করে। স্বামী বনে গিয়ে শিকার করে শুয়োরের কলিজা এনে দেয়। তবু স্ত্রীর মন ভরে না। পরের দিন আবার স্বামী শিকার করতে যায় এবং মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। গ্রামের লোকেরা তাকে গ্রামের মধ্যেই কবর দেয়। কবর কালের আবর্তে গর্তে পরিণত হয়। আর খুয়াইতাহামত পরিণত হন ড্রাগনে। এরপর থেকে গ্রামের পশু পাখি, পশু শিশু হারিয়ে যেতে থাকে। রাজা এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটা গর্ত ও ড্রাগন দেখতে পান। রাজা তাকে মারার ফন্দি আঁটেন। একটা বড় বড়শির মধ্যে বড় মুরগি বেঁধে গর্তে ফেলে রাখা হয়। মুরগি খেতে গিয়ে ড্রাগনটি বড়শিতে আঁটকে গেল। গ্রামের লোকেরা বড়শি টানতে টানতে অর্ধেক অংশ পায়। সেইটা তারা সকলে রান্না করে খেল। তবে গ্রামের মধ্যে একবুড়ি মাংস পেয়ে খায়নি। সেদিন এই বুড়িকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলল, তুমি সরে যাও। এ গ্রাম ধ্বংস হবে। বুড়ি সরে গেল আর সবাই পানির নিচে তলিয়ে গেল। সেই থেকে বগালেকের সৃষ্টি হলো।

পাহাড়ের এত উঁচুতে জলাশয় দেখতে পাওয়া সত্যিই বিস্ময়কর। পাহাড় দেখতে দেখতে কবি কাজী নজরুলের মতো আমার বলতে ইচ্ছে হলো ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ।’

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: