মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

তেল অপসারণ ও ডুবে যাওয়া জলযান নির্দেশক যন্ত্র আবিষ্কার

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • ইব্রাহিম নোমান

সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেল ট্যাংকার ডুবে যাওয়ার পর তেল ছড়িয়ে পড়ে নদীতে, যা অপসারণে স্থানীয় মানুষকে কাজে লাগানো হয়। নারী ও শিশুসহ সবাই খালি হাতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সেই তেল তোলার কাজ করেন। আবার গত আগস্টে পিনাক-৬ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চটি উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়া যেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এ যুগে কিছুটা বেমানান। এক্ষেত্রে দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে তেল অপসারণ ও ডুবে যাওয়া জলযান নির্দেশক যন্ত্র দুটি আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী মো. ফারুক বিন হোসেন ইয়ামিন।

এটিই এ তরুণ বিজ্ঞানীর প্রথম আবিষ্কার নয়। এর আগে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এক টাকায় ফরমালিন টেস্ট করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। এ আবিষ্কারকে সরকার অনুমোদনও দিয়েছে।

তেল অপসারণ যন্ত্র

যন্ত্রটির রয়েছে দুটি অংশ, নির্দিষ্ট স্তরের তেলশোষক ও পাম্প। নির্দিষ্ট স্তরের তেল শোষণক্ষমতাসম্পন্ন শোষক অংশটি দুই স্তরবিশিষ্ট মুখের মতো কাঠামো, যা তেলের নির্দিষ্ট স্তরকে শোষণ করে ভেতরের দিকে প্রবাহিত করে। প্রবাহিত তেল পাম্পের মাধ্যমে শোষিত হয়ে সংগ্রাহক আধারে জমা হবে। সংগ্রাহক পাত্রে তেল এবং কিছু পরিমাণ পানি জমা হবে। আধারটির নিচের দিকের নিষ্কাশন ভাল্ব খুলে দিয়ে পানির স্তরটি অপসারণ করলে ওই সংগ্রাহক পাত্রে শুধু তেল জমা হবে। এই তেল পরবর্তীতে ড্রামে ভরে ব্যবহারের জন্য অপসারণ করা যাবে।

শোষক যন্ত্রটির প্রতিটি ইউনিট দৈর্ঘ্যে ২০ ফুট। তেলের স্তরের ওপর নির্ভর করে এর প্রস্থ হ্রাস-বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা থাকবে, যাতে শোষক অংশটির মুখ তেলের স্তরের গভীরতা অনুযায়ী পানির ওপরে স্থাপন করা যায়।

প্রতি ২০ ফুটের জন্য আট থেকে ১০ অশ্ব ক্ষমতাসম্পন্ন ডিজেল পাম্প ব্যবহার করতে হবে, যা প্রতিঘণ্টায় ১০ থেকে ১২ হাজার গ্যালন বা ৪০ থেকে ৫০ হাজার লিটার তেল উত্তোলন করতে সক্ষম। এ ক্ষমতা পাম্পের অশ্ব ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। কতটি ইউনিট ব্যবহার করা প্রয়োজন, সেটি নদীর প্রস্থ এবং তেলের পরিমাণের ওপর নির্ভর করবে।

এ যন্ত্রটি কেবলমাত্র আমাদের দেশীয় উপাদান দিয়েই কম খরচে তৈরি করা সম্ভব। ২০ ফুটের একটি শোষক ইউনিট তৈরি করতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ব্যয় হবে। পরীক্ষামূলক যন্ত্রটিতে কর্কশিট ব্যবহার করা হলেও এটি স্টিল দিয়ে বড় আকারে তৈরি করে ব্যবহার করতে হবে।

দুর্ঘটনা ঘটার পর অতি দ্রুততার সঙ্গে নদীর আড়াআড়িভাবে রাবার টিউব অথবা রাবার ডেম দিয়ে তেল বিস্তৃত এলাকা আবদ্ধ করে দিতে হবে। এতে নিচ দিয়ে পানি চলে যাবে কিন্তু তেলের স্তরটি টিউববেষ্টিত এলাকায় আবদ্ধ থাকবে। পরবর্তীতে এ যন্ত্রটি ব্যবহার করে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ তেল অপসারণ করা সম্ভব। যন্ত্রটির পরীক্ষামূলক কার্যকারিতা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পুকুরে জনসমক্ষে সম্পন্ন করা হয়েছে।

লোকেশন ডিটেক্টর

ডুবে যাওয়া লঞ্চ বা জাহাজ সহজে ও দ্রুত শনাক্ত করে উদ্ধারে সহায়ক যন্ত্রটির রয়েছে তিনটি অংশ। যার প্রথমটির নাম জিপিআরএস সিস্টেম, যা লঞ্চ বা জাহাজের মাস্তুলে বসানো থাকবে। জলযান ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ভেসে উঠবে। এতে রয়েছে সোলার প্যানেল বা চার্জযুক্ত ব্যাটারি। এছাড়া যন্ত্রটির ভেতরে রয়েছে ওয়্যারলেস ফোন সিস্টেম, যা ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী তথা কর্তৃপক্ষের সার্ভারে বার্তা প্রেরণ করবে। তাছাড়া সোলার সিস্টেম বা ব্যাটারি অকার্যকর হয়ে গেলেও শনাক্তকরণের কাজটি অব্যাহত রাখতে যন্ত্রটিতে বসানো রয়েছে মিরর বা আয়না, যাতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে জলযানের অবস্থান জানান দেবে। এ অংশটির বাজার মূল্য পড়বে ৫ হাজার টাকা।

প্রযুক্তিটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হাইড্রোসোনার। এটি জাহাজ বা লঞ্চের এক পাশে লাগানো থাকবে, যা নদী বা সমুদ্রে প্রতিকূল অবস্থার পূর্বাভাস দেবে। ডুবে যাওয়ার সময় এতে থাকা মাইকটি ভেসে উঠবে। আবার ডুবে যাওয়ার আগে এটি এ্যাম্বুলেন্সের মতো শব্দ তৈরি করবে। এ অংশটি নদী বা সমুদ্রের তল থেকে শব্দ সংগ্রহ করে জলযানের অবস্থান জানাবে উদ্ধারকারী দলকে। এছাড়া এ যন্ত্রাংশটি পাশাপাশি কোন জলযানের অবস্থান ও সংঘর্ষ এড়াতে সহায়তা করবে। এ অংশটির বাজার মূল্য পড়বে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া তৃতীয় অংশটির নাম লোড ডিটেক্টর। এর মধ্যে রয়েছে লাল, সবুজ আর হলুদ বর্ণের বাতি, যা লঞ্চ বা জাহাজের প্রবেশপথে লাগানো থাকবে। সবুজ বাতিটি যাত্রী বহনের সঙ্কেত প্রদান করবে। হলুদ বাতিটি পর্যাপ্ত যাত্রীর সঙ্কেত প্রদান করবে। আর লাল বাতিটি বিপজ্জনক সঙ্কেত প্রদান করবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে, যা জলপথে যাত্রীদের নিরাপদ চলাচলকে নিশ্চিত করবে।

প্রযুক্তিটির উদ্ভাবক মো. ফারুক জানান, আমাদের দেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে ডুবে যাওয়া জলযানের অবস্থান জানা যায় না এবং সঠিক সময়ে উদ্ধারও করা যায় না। এতে সম্পদহানিসহ ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে থাকে প্রায়ই। কিন্তু এ যন্ত্রটির মাধ্যমে সহজে অল্প সময়ে, দ্রুত ঘোলা বা লবণাক্ত পানিতে যে কোন গভীরতা থেকে জলযানের অবস্থান নির্ণয় করা যাবে। প্রযুক্তিটি প্রতিটি জলযানে স্থাপন করা হলে নদী বা সমুদ্রপথে চলাচলকারী লঞ্চ বা জাহাজ ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। আবার ডুবে গেলেও তা সহজে উদ্ধার করা যাবে। প্রযুক্তিটি আমাদের দেশের জন্য সহজলভ্য করেই তৈরি করা হয়েছে। পুরো যন্ত্রটি কেনা যাবে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকায়। এছাড়া এ যন্ত্রটি পানির নিচে ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

লোকেশন ডিটেক্টরের উদ্ভাবক মো. ফারুক বিন হোসেন ইয়ামিন রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) কৃষি অনুষদ থেকে ২০০৪ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ২০০৬ সালে শেকৃবির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: