আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঘর ছেড়ে পরবাসে জেরার্ড

প্রকাশিত : ৭ জানুয়ারী ২০১৫
  • অতশী আলম

পেশাদারী ক্যারিয়ারে আর কোন ক্লাবেই খেলেননি স্টিভেন জেরার্ড। এক লিভারপুলের হয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন প্রায় তিন দশক। প্রাণের সেই ক্লাবের সঙ্গে চলতি মৌসুম শেষেই বন্ধন ছিন্ন করছেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক। ঘর ছেড়ে যাচ্ছেন পরবাসে।

শিশুবয়স থেকেই লিভারপুলের আস্থানায় যোগ দেন জেরার্ড। বয়স যখন সাত বছর তখনই দুরন্ত শিশুটির ওপর নজর পড়েছিল দ্য রেডসদের। লিভারপুলের স্কাউটে সুযোগ পাওয়া সেই কিশোর দুই বছর পর পা রাখেন লাল দুর্গে। এরপর একাডেমি জীবন শেষে নাম লেখান লিভারপুলের যুব দলে। সেটা ১৯৮৭ সালের ঘটনা। এরপর এক বছর বাদেই সুযোগ হয় দ্য রেডসদের মূল দলে। সেই থেকে অবিরাম, অপ্রতিরোধ্যভাবে ছুটে চলা। আর কিছুই ভাবেননি নিপাট এই ভদ্রলোক। প্রায় তিন দশকের পেশাদারী ক্যারিয়ারে পুরো সময়েই ছিলেন এ্যানফিল্ডের মধ্যমণি হয়ে। খেলেননি আর কোন ক্লাবে। সঙ্গতকারণেই পরিপূরক হয়ে উঠেছিল জেরার্ড আর লিভারপুল নামটি। সেই জেরার্ড অবশেষে ঘোষণা দিয়েছেন, প্রাণের ক্লাব লিভারপুল ছাড়ার। ৩৪ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার ২ জানুয়ারি আবেগী এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।

আসছে মে মাসে ৩৫ বছরে পা রাখবেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক জেরার্ড। লিভারপুলের সঙ্গে তার চুক্তির মেয়াদ আছে চলতি মৌসুম পর্যন্ত। বিভিন্ন ইংলিশ সংবাদমাধ্যম ধারণা করছিল, জেরার্ডকে আগামী নবেম্বর পর্যন্ত দলের হয়ে খেলতে প্রস্তাব দিয়েছিল লিভারপুল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মেজর সকার ক্লাবের কোন একটি দলে খেলতে আগ্রহ দেখিয়েছেন তিনি। বিদায়ের ঘোষণা দেয়ার পরই গুঞ্জনটা শোনা যাচ্ছিল। সেটিই নিশ্চিত হয়েছে অবশেষে। জেরার্ড যাচ্ছেন আটলান্টিকের ওপারেই। সামনের মৌসুমে তাঁর ঠিকানা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর সকার লীগের (এমএলএস) কোন ক্লাব। লিভারপুল নিজেদের টুইটার এ্যাকাউন্টে ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছে। শোনা যাচ্ছে, ইংল্যান্ডের পূর্বসূরি ডেভিড বেকহ্যামের ক্লাব এলএ গ্যালাক্সিই হতে পারে জেরার্ডের নতুন ঠিকানা। তার মানে ঘর ছেড়ে পরবাসী হচ্ছেন তারকা এই মিডফিল্ডার।

নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানাতে গিয়ে জেরার্ড বলেন, এটি হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। ক্লাবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি আরও বলেন, অবশ্য আমি খেলা ছাড়ছি না। তবে এই মুহূর্তে আমি জানি না কোথায় গিয়ে নোঙ্গর করব। শুধু এটিই বলতে পারি- সেটি হবে অন্য কোথাও। তবে এখানকার প্রতিদ্বন্দ্বী কোন ক্লাব নয়, অর্থাৎ লিভারপুলের বিরুদ্ধে খেলবে এমন কোন ক্লাব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল অ্যানফিল্ড ছাড়তে পারেন জেরার্ড। এ প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এখন তার পরিকল্পনার কথা ঘোষণার কারণ হচ্ছে ভবিষ্যতে যেন এ নিয়ে কোন বিভ্রান্তি না ছড়ায়। জেরার্ড বলেন, এই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমাকে ও আমার পরিবারকে কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। আমি এখন এই ঘোষণা দেয়ার কারণ হচ্ছেÑ কেউ যেন আমার ভবিষ্যত নিয়ে কোন কাল্পনিক গল্প ছড়াতে না পারে। যেন আমার কোচ ও ক্লাব কেউ এটি নিয়ে বিভ্রান্ত না হন।

জীবনের সবটুকু জুড়েই যে লিভারপুল আছে সেটাও নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন। বলেন, আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে লিভারপুল ফুটবল ক্লাব। যে কারণে এটিকে বিদায় বলাটা বেশ কঠিন। তবে আমার মনে হয় আমার পরিবার এবং ক্লাব সবার স্বার্থের কথা বিবেচনা করলে এটির একটি গুরুত্ব রয়েছে। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ইংল্যান্ড জাতীয় দল থেকে অবসর নেয়া তারকা এই মিডফিল্ডার বলেন, আমার ইচ্ছা এবং আকাক্সক্ষার ওপর ভিত্তি করেই এই সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে নেয়া হয়েছে। কারণ আমি এখন আমার জীবন ও ক্যারিয়ারের ভিন্ন একটি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই। আমি এটিও নিশ্চিত করে বলতে চাই যে, বাস্তবিক অর্থে এর ফলে আমার ক্যারিয়ারের ইতি ঘটলেও এ জন্য আমার কোন আক্ষেপ নেই। দীর্ঘ সময়জুড়ে ক্লাবে ভাল সময় কাটানোর জন্য তিনি কোচ ব্রেন্ডন রজার্স, ক্লাবের মালিক, সতীর্থসহ সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জেরার্ডের ভাষ্য, এটি আমার কাছে বিশেষ একটি জায়গা। একদিন হয়ত আমি আবারও লিভারপুলে ফিরে ক্লাবটিকে আরও কিছু দিব। এটিই আমার মনের একান্ত বাসনা। ক্লাব ছাড়ার ঘোষণা দিলেও বাকি সময়টুকু দলের হয়ে উজাড় করেই দিবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বলেন, একটি কথা না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে এখন থেকে লিভারপুলের হয়ে মৌসুমের শেষ ম্যাচটি পর্যন্ত মনপ্রাণ উজাড় করে খেলতে পিছপা হবো না। লিভারপুলের জয়ের জন্য আমি আমার সামর্থ্যরে সবটুকুই উজাড় করে দেব। বিদায়বেলায় জেরার্ড বলেন, একজন খেলোয়াড় ও অধিনায়ক হিসেবে আমি আপনাদের অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছি। আমি প্রতিটি মুহূর্ত আপনাদের সমর্থন পেয়ে এসেছি। এই অবস্থানে থেকেই আমি লিভারপুলের ক্যারিয়ার ও বর্তমান মৌসুমের ইতি ঘটাতে চাই। ১৯৯৮ সালে মূল দলে অভিষেকের পর লিভারপুলের হয়ে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৬৯৭ ম্যাচ খেলেছেন জেরার্ড। গোল করেছেন ১৮০টি।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের পর ইংল্যান্ডের হয়ে দীর্ঘ ১৪ বছরের পথচলাও থামান স্টিভেন জেরার্ড। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অধিনায়ক পদে থাকাকালীন সময়েই তিনি অবসর নেন। বিদায়বেলায় সতীর্থ, পরিবার, বন্ধু ও ভক্ত-সমর্থকদের ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। ২০০০ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে জয় পাওয়া ম্যাচে ইংল্যান্ডের হয়ে জেরার্ডের অভিষেক হয়। এরপর ধীরে ধীরে ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। ২০০৮ সালে জন টেরির জায়গায় সাময়িকভাবে অধিনায়কের দায়িত্ব পান। এরপর ২০১০ বিশ্বকাপে রিও ফার্ডিনান্ড চোট পাওয়ায় ফের অধিনায়ক হন অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডার। তারপর থেকে নিয়মিত অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেরার্ড। ইংল্যান্ডের হয়ে ১৪ বছরের ক্যারিয়ারে ১১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন তিনি। গোল করেছেন ২১টি। তিনটি বিশ্বকাপসহ দেশের হয়ে মোট ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জেরার্ড। ব্রাজিল বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর জেরার্ডের পরিবার, বন্ধু ও সাধারণ লোকজন তাকে নিয়ে সমালোচনায় মেতে উঠেছিলেন! তখন অনেকেই বলেছিলেন, জেরার্ডের অবসরে যাওয়া উচিত। অবশেষে সবাইকে কাঁদিয়ে সেই বিদায়ী ঘোষণা দেন ইংল্যান্ড ফুটবলের অন্যতম সেরা এই তারকা।

ইংল্যান্ডের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড জেরার্ডের (১১৪)। ইংলিশদের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন পিটার শিলটন (১২৫)। দুই নম্বরে আছেন ডেভিড বেকহ্যাম (১১৫)। জাতীয় দলে অভিষেক হওয়ার পর থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে খেলে চলেন জেরার্ড। নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এই তারকার ২০১২ সালের নবেম্বরে অবসরের গুঞ্জন রটেছিল। ১৯৮০ সালের ৩০ মে ইংল্যান্ডের হুইস্টোন এ জন্ম নেয়া জেরার্ড দীর্ঘ জাতীয় দল ও ক্লাবের হয়ে অনেক গৌরবময় অর্জন করেছেন। মাঝমাঠের খেলোয়াড় হলেও দলের প্রয়োজনে আক্রমণভাগ এমনকি রক্ষণভাগেও খেলে থাকেন। দ্রুতগতির দৌড়, তীব্র শট এবং অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। জেরার্ডের ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে আছে পিএফএ সেরা খেলোয়াড় (২০০৬), উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ সেরা খেলোয়াড় (২০০৪-২০০৫) ও পিএফএ সেরা তরুণ খেলোয়াড় (২০০১)। ক্লাবের হয়ে জিতেছেন এফএ কাপ (২০০০-২০০১, ২০০৫-২০০৬), উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ (২০০৪-২০০৫), লীগ কাপ (২০০০-২০০১, ২০০২-২০০৩), ইউরোপিয়ান সুপার কাপ (২০০১-২০০২), চ্যারিটি শিল্ড (২০০১-২০০২) ও উয়েফা কাপ (২০০০-২০০১)।

প্রকাশিত : ৭ জানুয়ারী ২০১৫

০৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: