মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পথে পথে ছড়ানো পাথর তবুও প্রত্যাশা

প্রকাশিত : ১ জানুয়ারী ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

শেষ সূর্যটাকে বিদায় জানিয়ে চলে গেছে আরেকটি বছর ২০১৪ সাল। একুশ শতকের আরও এক স্বস্তিকর বছরটি রেখে গেছে শান্তি, স্বস্তি, সমৃদ্ধির পথের সূচনারেখা। জনগণের জীবন থেকে চলে গেছে ভাল-মন্দ মেশানো একটি উজ্জ্ব¡ল বছর। নিয়ে এসেছে নতুন বছর ২০১৫ সাল। বাংলার ঘরে ঘরে নিয়ে আসুক শান্তি, স্বস্তি, মানুষের জীবনে জাগ্রত হোক সমৃদ্ধির উপাখ্যান। চেতনায় গড়ে উঠুক দেশপ্রেম। ভয়, চাপ, উৎকণ্ঠা, হানাহানি, সংঘর্ষ, সংঘাত মুক্ত হোক বছরটি। নতুন রূপে নব উদ্যমে, ‘আজি ভোর এলো দেনার ডানা মেলে মোর আঙিনায়’Ñএমনি এক পরিস্থিতিতে শুরু হলো নতুন বছরের পথ চলা। পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর প্রণোদনা নিয়ে সামনের দিনগুলো হয়ে উঠুক প্রাণবন্ত। সংঘাত, হানাহানির যে অংশ বা ২০১৪ সালের গোড়াতে দেখা দেয়ার সম্ভাবনা ছিল-তা ঘটেনি বলেই বছরটি ছিল নির্ভেজাল অগ্রগতির। রাজনৈতিক দলের কর্মসূচী দূর্বল থাকায় ব্যাপক সহিংসতার ছায়া পড়েনি বছরটিতে। তবে আলোচিত-সমালোচিত, নিন্দিত-নন্দিত ছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল অংশ নেয়নি। তারা বর্জনের পাশাপাশি নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির যে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিল, তা ধোপে টেকেনি। এর আগের বছর নারকীয় ২০১৩ সাল জুড়ে দেশব্যাপী হানাহানি, নৈরাজ্য, হত্যা, অগ্নিসংযোগসহ যে, অবস্থার সৃষ্টি করেছিল বিএনপি-জামায়াত জোট তা এক কথায় নজিরবিহীন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রোধ করার জন্য এই নারকীয় অবস্থার তৈরি করা হয়েছিল দেশজুড়ে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন। অসাংবিধানিক সরকার তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে বিএনপি-জামায়াত জোট যে অরাজকতা দেশজুড়ে সৃষ্টি করেছিল, নির্বাচনের পর তা স্তিমিত হয়ে যায়। জনমনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসে। নির্বাচন বর্জনকারীরা আর আন্দোলনের নামে ভাঙচুর, হানাহানির পথ খুঁজে পায়নি। বরং দিন দিন তাদের শক্তিমত্তা এবং জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। জনগণ বুঝে নিয়েছে, জামায়াতের ধর্মান্ধ ও পাকিস্তানী চেতনার রাজনীতি নিয়ে বিএনপি যা করেছে, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিপরীতে এক নব্য নাৎসীবাদের উত্থানের প্রচেষ্টা। এমনিতেই নির্বাচনী প্রথায় প্রথম আঘাত হেনেছিল বিএনপি। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে যে নির্বাচন হবার নির্ধারিত শিডিউল ছিল, তা হয়েছে ২০০৮ সালে। অনির্বাচিত সরকার টানা ২ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশকে রাজনীতি বিমুক্ত করতে চেয়েছিল। বেগম জিয়া সরকারের নানা প্রকারের ছলচাতুরী আর ষড়যন্ত্রের কারণেই বহু প্রত্যাশিত নির্বাচনের জন্য মানুষকে দু’বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই দুই বছর কারাগার দেখতেহ য়েছে রাজনীতিবিদদের। ‘চালাকী দিয়ে মহৎ কিছু হয় না’ এই প্রবাদবাক্যে বিশ্বাসী নয় বলে বিএনপি ‘উদ্দিনদের’ শাসন চালু করিয়ে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাসঙ্গিকতাকে বিনষ্ট করেছে। এর আগে ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিজেই নিজেকে বিতর্কিত করে এবং বিএনপির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে নির্বাচনকেও বিতর্কিত করেছিল। সেই বিএনপি এখনও গোঁ ধরে আছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। যা সংবিধানে নেই। আর দেশের সর্বোচ্চ আদালত ওই সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দিয়েছে এই বলে যে, এই ব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। সুতরাং তা সংবিধানে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।-তার পরও বিএনপি-জামায়াত জোটের আবদার সেই ব্যবস্থার অধীনেই সংসদ নির্বাচন করতে হবে। তাদের এই দাবির প্রতি দেশের কিছু ‘মতলবি’ শিক্ষিতজন এবং কতিপয় প্রচার মাধ্যম সমর্থন জানিয়ে পুরো বিষয়টিকে জটিল করে তোলার প্রচেষ্টায় এখনও রত। আর সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তারা বিদায়ী বছরে কয়েকদফা হরতাল ডেকেও জনসমর্থন পায়নি। যেমন পায়নি জামায়াতে ইসলামী নামক যুদ্ধাপরাধী দলটি। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি ঠেকানোর অপচেষ্টা হিসেবে হরতাল ডেকেছে। কিন্তু রাজপথে নামেনি। জনগণ সে সব হরতাল গ্রহণ করেনি। হরতাল নামক আন্দোলনের হাতিয়ারটিকে তারা ‘ভোঁতা’ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের দুর্বলতা সুস্পষ্ট। কিন্তু রাজনীতিকদের মন এখনও গণতন্ত্রের জন্য তৈরি হয়েছে, এমনটা নয়। তাদের ক্ষমতাপ্রীতি এখনও সীমাহীন। হিংসা-প্রতিহিংসায় পরিপূর্ণ মনে গণতন্ত্রকে কার্যকর করার স্পৃহা এখনও তেমন শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি অগণতান্ত্রিক আচরণে অভ্যস্ত বিএনপি-জামায়াতের কারণে। বর্তমানকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য চারপাশকে সৃজনশীলতার আলোকে আলোকিত করার কোন প্রয়াস রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখা যায় না। তেমনি রাজনীতিবিদদের মধ্যেও এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না।

সমাজে গণতন্ত্রের দাবি দীর্ঘদিনের। পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক জান্তা শাসকরা গণতন্ত্রের যে কবর রচনা করেছিল, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সেই লাশ কবর হতে উত্তোলন করে তাতে প্রাণ প্রবাহ স্থাপন করে সমাজকে গণতান্ত্রিক ধারায় নিয়ে যেতে চাইলেও পারেনি পশ্চাৎপদ মানসিকতার জান্তা শাসকের উত্তরসূরি বিরোধীদলগুলো অব্যাহত প্রতিবন্ধকতায়। ২০০৮ সালে আবার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ বর্তমানকে আরও সৃষ্টিশীল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। যাতে এই সমাজ ভবিষ্যতে আরও উজ্জ্বল ও মোহনীয় হয়ে ওঠে। ধর্মান্ধতার বিপরীতে অসম্প্রদায়িকতার বিকাশ গঠনে সচেষ্ট থাকলেও, প্রতিপক্ষ অব্যাহত তাকে পেছনের দিকে টানছে। সেই আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চালু করেছে। অমনি গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। বিচার বানচালের চেষ্টা শুরু থেকে করে আসছে বিএনপি-জামায়াত জোট। সেজন্য তারা ২০১৩ সালে তা-বও চালায়। কিন্তু গণরোষ তাদের স্তব্ধ করে দেয়। বাস্তব সত্য যে, বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্রের কোন বিকল্প না থাকলেও, তাকে ধ্বংস করার জন্য পঁচাত্তর পরবর্তী যে সময় প্রবহমান, তাকে ঘিরে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি চর্চার সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্রের খোলস পরিধান করে মূলত স্বৈরতন্ত্রের বিষ উগরে দিতে চায় তারা বার বার। আওয়ামী লীগ যতই গণতান্ত্রিক ধারার বিকাশ ঘটাতে চাইছে, ততই অগণতান্ত্রিক শক্তি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটা জনবিদিত, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়তে হলে রাজনীতিকদের মধ্যে সর্বাগ্রে গণতান্ত্রিক চেতনায় গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধ দিয়ে শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে সামনে রেখে আবারও সহিংস আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়েছে। সরকারকে উৎখাতের জন্য লাগাতার কর্মসূচী দেবার ঘোষণাও রয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকার তার প্রথম বছর প্রায় শান্তিপূর্ণভাবে পার করলেও সামনে অস্থিরতার আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। অবশ্য একবছর আগেও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে সামাজিক অবস্থায় যে বড় ধরনের হেরফের হয়েছে তা অবশ্য নয়। মূলত সামাজিক পরিস্থিতি এমন, যা এত অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। তবে এটা সত্য, আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ২০১৪ সালে প্রায় নির্বিঘেœ গেলেও, সামনে অশনি সংকেত বা অশুভ শক্তির ভিন্ন পক্ষাবলম্বনের প্রক্রিয়া থেমে নেই।

বর্তমান সরকারকে ‘অবৈধ’ সরকার আখ্যা দিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট দেশে-বিদেশে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু তা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, এমন নয়। দেশে যে সরকার রয়েছে তা নির্বাচিত সরকার। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় তারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। নিয়মিত সংসদ অধিবেশন চলছে। দেশে শান্তি, স্বস্তি বিরাজ করছে। দ্রব্যমূল্য সহনীয় মাত্রায়। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা এসেছে।

২০১৫ সালে দেশ কোন পথে চলবে, আগাম বলা না গেলেও এটুকু স্পষ্ট যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাজার কাজ অব্যাহত থাকবে শত বাধা বিপত্তিসত্ত্বেও। এই পথ থেকে সরে আসা বা সরে যেতে বাধ্য করার সব প্রক্রিয়াই স্তব্ধ হয়ে গেছে। যে জঙ্গীবাদের বিকাশ ঘটিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট, তার সমূলে বিনাশ ঘটানো যায়নি তখনও, তবে জঙ্গীদের শাখা প্রশাখার গোপন বিস্তার ঘটলেও জনসমর্থনের অভাবে তা বিকশিত হবার সম্ভাবনা নেই। বিশ্বজুড়ে এমনকি প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানে জঙ্গীবাদের বিস্তার ও সহিংসতা বাড়লেও, বাংলাদেশে তারা তাদের সেই কার্যক্রম চালাতে পারছে না, নানা পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখলেও।

দেশের মানুষ আশা করে বিএনপি সহিংসতার পথ ছেড়ে, স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় ফিরে যাবে। জ্বালাও পোড়াও নীতি পরিহার করে রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলা করবে মানুষ এটাও আশা করে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আদর্শ বিচ্যুত হয়ে লুটেরাদের আশ্রয় স্থলে পরিণত না হোক। তারা চায়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে আওয়ামী লীগ সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। দেশী-বিদেশী সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে দেশকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবে। ২০১৫ সেই পথই দেখায় যেন।

প্রকাশিত : ১ জানুয়ারী ২০১৫

০১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: